09/03/2026
“ধরা যাক দেশে ফেরার দিন তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা ছিলো ১০০। এখন সেটা ৭০ এর বেশি আছে মনে হয় না। নির্বাচনের মাত্র ২০ দিনের মাথায় যিনি ৩০ শতাংশ জনপ্রিয়তা হারাতে পারেন, অ্যাকশন ও ইনঅ্যাকশনের মাধ্যমে, তিনি ৫ বছরে বিএনপিকে কোথায় নেবেন ভেবে শঙ্কিত হচ্ছি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ সবচেয়ে বড় ডিসাইডিং ফ্যাক্টর। ১২ তারিখ মুক্তিযুদ্ধের উপর ভর করেই বিএনপি বিপদ কাটিয়েছে, এবং দুঃখের বিষয়— ক্ষমতায় গিয়েই ভুলে গেছে যে এক মাঘে শীত যায় না।
১২ তারিখের আগে মৌলবাদী শক্তির প্রধান লক্ষ্য ছিলো তারেক রহমানকে খু*ন করা। আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের মাঝখানে একমাত্র বাধা হয়ে ছিলেন তারেক রহমান।
তারা প্রকাশ্যে বলেছে, “তারেক জিয়ার শা উয়া মাউয়া ছিঁড়ে লাত্থি দিয়ে ভারত পাঠানো হবে।”
তারেক রহমান ও বাংলাদেশ, এ দুটিকে বাঁচাতেই মানুষ মৌলবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। আমি দিয়েছি, আমার ১৪ গোষ্ঠী দিয়েছে। নগ্নভাবে বিএনপি’র পক্ষে ভোট চেয়েছি।
কিন্তু প্রাপ্তিটা কী? দেড় বছর বিএনপি তৃণমূল যাদের সাথে পূর্ণশক্তি নিয়ে লড়াই করলো, দেশবাসীও সমর্থন দিলো, সেই অশুভ শক্তির সাথেই তারেক রহমান শপথ নিয়ে ডলাডলি শুরু করলেন। তাদের বাসায় যাচ্ছেন, ইফতার করছেন, কানাকানি করছেন, মাথা পেতে দোয়া নিচ্ছেন।
যেভাবে শয়তান অবুজ বালকের মাথায় হাত বোলায়, সেভাবে নারীবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা প্রধানমন্ত্রীর মাথায় হাত বোলাচ্ছে। সমাজকে জানাচ্ছে, দেখো, প্রধানমন্ত্রীকেও আমাদের দোয়া নিয়ে চলতে হয়!
মানুষ বলে, বিএনপি ও জামাতের মাঝে পার্থক্য নেই। আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু মনে হচ্ছে, তারেক রহমান উঠে পড়ে লেগেছেন দেশবাসীকে এটা বিশ্বাস করানোর জন্য।
দেশে আসার পর তার কাজগুলো একটু দেখি:
(১) ডাকসু’র ক্ষুদে রাজাকাররা তার সাথে মিটিং করলো। তিনিও মিটিং করলেন। কিন্তু ডাকসু’তে জেতা ছাত্রদলের কেউ তার সাথে মিটিংয়ের সুযোগ পেলো না। তিনিও খুঁজলেন না।
(২) গোলাম আজমের ছেলে তার সাথে মিটিং করলো, তিনিও করলেন।
(৩) ওসমান হাদীর কবর জেয়ারত করলেন, নজরুলের কবরের উপর আরেক নজরুলকে স্বীকৃতি দিলেন।
কিন্তু একই সময়ে মৌলবাদীদের হাতে নিহত হওয়া দীপু চন্দ্রের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ তার হয় নি।
দীপুর পরিবারের কোনো খোঁজ নিয়েছেন বলেও জানা যায় নি।
(৪) একদিকে বললেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা হবে, আরেকদিকে ৭-ই মার্চের ভাষণ বাজানোর অপরাধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উপর মব ঘটতে দিলেন।
মবে অংশ নিয়েছে শাহবাগা থানা বিএনপি, ডাকসু রাজাকারচক্র, ও পুলিশ।
মবের শিকার ভিক্টিমকে পুলিশ আটকও করেছে, এবং ওসি বলেছে— ৭ই মার্চের ভাষণ নাকি নিষিদ্ধ!
তালিকা আরও লম্বা করতে পারি। লাভ কী? হাতির কান বড়, কিন্তু শুনে কম।
মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্পত্তি নয়, এমন কথা নিরপেক্ষ রবীন্দ্রনাথরা খুব বলি। কিন্তু ভেবে দেখা দরকার, মুক্তিযুদ্ধ নিজেই আত্মরক্ষার প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের ঘাড়ে সওয়ার হয় কি না? আওয়ামী লীগ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকে রাজাকারদের হাত থেকে বাঁচানোর মতো বিকল্প কেউ আছে কি না? আমরা যে আশা করেছিলাম, বিএনপি সেই বিকল্প হবে, লক্ষণ কোথায়?
আজ যে বিএনপি ৭-ই মার্চের ভাষণকে নিজেদের মনে করে বাঁচাতে পারলো না, উল্টো আক্রমণ করলো, বা আক্রমণে সহযোগিতা করলো, এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজাকারদের সাথে দাঁড়ালো, এর ফল কার ঘরে গেলো? আমি তো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধ আবার বাধ্য হয়ে আওয়ামী লীগকে খুঁজবে। বিএনপির উপর সে ঠিক ভরসা করতে পারছে না।
নির্বাচনের আগে অনেক কিছু বলতে চেয়েও বলি নি, কারণ বিএনপিকে দুর্বল করতে চাই নি। এখন মনে হচ্ছে বলা দরকার।
৫ আগস্টের পর সারাদেশে যে মব ঘটলো, মাজার ভাঙা হলো, বাউল পেটানো হলো, গান-বাজনায় আক্রমণ চালানো হলো, দীপু চন্দ্রকে পিটিয়ে মেরে গাছে ঝুলিয়ে লাশ পোড়ানো হলো, বিএনপি তখন কী করছিলো? তারা কেন এগুলো প্রতিরোধ করতে পারলো না? তাদের তো প্রতিরোধের মতো সাংগঠনিক শক্তি ছিলো। ইউনূসের রাজনীতিক ক্ষমতা নেই, কিন্তু তারেক রহমানের ছিলো। তিনি কেন সেই শক্তি ব্যবহার করলেন না? দেশবাসী তো তার দিকে তাকিয়ে ছিলো।
সারাদেশে হিন্দুরা যে চোখ বুজে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে, সেই হিন্দুরা এখন কী বার্তা পাচ্ছে? যে-নারীরা মৌলবাদ থেকে বাঁচতে বিএনপি’র উপর ভরসা করলো, সেই নারীরা মৌলবাদীদের সাথে তারেক রহমানের ঢলাঢলি দেখে কী ভাবছে? একটি হিন্দু ছেলেকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মেরে লাশ পুড়িয়ে দেয়া হলো, তারেক রহমান কী কারণে সেই হিন্দু পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারলেন না, যেভাবে তিনি ওসমান হাদীর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন?
এক মাঘে শীত যায় না। গতকাল থেকে সেকুলার লিবারেল প্রগ্রেসিভ সম্প্রদায় আমাকে বিরামহীনভাবে গালিগালাজ করছে, ইনবক্স ভরে উঠেছে বার্তায়, কারণ আমার কথায়ই নাকি তারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।
আমি কী জবাব দেবো?”
—মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
প্রতিক্রিয়া / ৭ মার্চ ২০২৬