21/08/2023
কয়েকদিন আগে ফেসবুকে একটা লেখা চোখে পড়ল। প্রায় ৫হাজার শেয়ার, অজস্র লাইক কমেন্ট। লেখার বিষয়বস্তু হচ্ছে কিভাবে বাঙ্গালিরা রান্নাঘরে আর খাওয়ার পেছনে বেশি সময় নস্ট করে জীবন বরবাদ করছে আর আমেরিকানরা গড়ে সাতাশ মিনিট এইসব কাজে সময় দিয়ে চাদের দেশে যাচ্ছে!
এই ধরনের লেখা নিয়ে আমার অবজারভেশন হলো, নতুন নতুন প্রবাসে যাওয়া বা থিতু হবার পর কিছু মানুষ প্রবল আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগে এবং এই ধরনের গার্বেজ প্রসব করে। নতুন যা দেখে তাই সেরা ভাবা এবং নিজের কালচারের সব কিছুকে ঘৃণা করার ব্যাপারটা ট্রেন্ডি মনে হয়। বাঙ্গালি খাবার অস্বাস্থ্যকর, মান খারাপ, মসলা মানে খারাপ, তেল মানে খারাপ এই ধরনের কিছু ম্যালন্যারেটিভ অনেকদিন ধরেই চলছে। আমি এই লেখায় চেস্টা করছি সেই ন্যারেটিভগুলোর সম্যক বিশ্লেষণ করার।
# #এই লেখাটি নারীর এমপাওয়ারমেন্ট বিরোধী কিংবা নারীকে জোরপুর্বক রান্না ঘরে আটকে রাখা বা যে কাউকেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে রান্না করতে বলা সংক্রান্ত নয়। মূল লেখার যে অংশে বাঙ্গালি খাদ্যাভ্যাস অস্বাস্থ্যকর কিংবা খাদ্যভ্যাসের কারনে বাঙ্গালিরা ইন্টেলেকচুয়াল না এই ধরনের স্টেরিওটাইপিং করা হয়েছে সে সংক্রান্ত। বাঙ্গালী নারীদের না চাইতেও জোর পূর্বক রান্নাঘর সময় কাটাতে হয় এ ব্যাপারে আমি একমত এবং রান্নার বেপারটি কোন নির্দিষ্ট জেন্ডারে সীমাবদ্ধ না থেকে শেয়ার্ড রেস্পন্সিবিলিটি হওয়া উচিত বলে মনে করি। পরিবারের যেকোন কাজই শেয়ার্ড রেসপনসেবলিটি হওয়া উচিত। কালচারের যে অংশটিতে জোর পূর্বক জেন্ডার রোল চাপিয়ে দেয়া হয় আমি সে অংশের সমর্থক নই, এটার পরিবর্তন হওয়া দরকার। এই সমস্যা শুধু বাঙ্গালি কালচারে না, বহি:র্বিশ্বেও আছে।
বাঙ্গালি খাবারের মূল অনুসঙ্গ ভাত, এর সাথে "তরকারি" হিসেবে মাছ মাংস শাক সবজি সবই আমরা কম বেশি বিভিন্ন পরিমানে খাই। ম্যালন্যারেটিভ এর একটা অংশ বলে ভাত খাওয়া খারাপ। কেন খারাপ? কতটুকু খারাপ? কি পরিমানে খাওয়া খারাপ? কোন ধরনের ভাত খারাপ? এইসব প্রশ্নের উত্তর না ভেবেই গড়পড়তা বলে দেয়া হয় কথাটি। একবেলার স্বাস্থ্যকর সুষম খাবারের ক্ষেত্রে বলা হয় মোট খাবারের চার ভাগের এক ভাগ (২৫%) শর্করা হতে হবে (https://www.hsph.harvard.edu/nutritionsource/healthy-eating-plate/)। শর্করার খুব ভালো উৎস ভাত। বলা হয় হোলমিল কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার জন্য অর্থাৎ মেশিনে না ছাটা লাল চাল যেটা আমাদের দাদারা নানারা, তাদের পুর্বপুরুষেরা খেতেন, বাঙ্গালি কালচারে ভাতের অস্তিত্ব লাল চাল হিসেবেই। যুগের চাহিদায় খেতে মজা লাগে বলে মেশিনে ছেটে আমরা সাদা চাল খাই সেটা বাঙ্গাল কালচারের দোষ না, নিজেদের দোষ। আমেরিকান বলেন আর ইউরোপীয়ান বলেন, ভাতের বদলে তারা হয়তো গম, আলু বা ভুট্টার তৈরি খাবার খায়। এই খাবারগুলোর GI তথা গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (রক্তে সুগারের পরিমান বাড়ানোর সক্ষমতা) তুলনা করলে দেখা যায়, সাদা চালের GI ৭০, লাল চালে ৫৫, সাদা আটায় ৮৫, লাল আটায় ৪৫, ওট ৬০, আলু ৮০ (https://glycemic-index.net/glycemic-index-of-grains/)। তাহলে দেখা যাচ্ছে সাদা চাল, সাদা আটা, আলু সবারই GI কাছাকাছি। মেশিন প্রসেসড না হলে, লাল চাল বা লাল আটা উভয়ই উপকারী। গোটা আমেরিকায় কার্বোহাইড্রেট এর মূল উৎস সাদা আটা-ময়দায় বানানো বার্গার, ব্রেড ইত্যাদি কিংবা বেকড পটেতো বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। সাদা শর্করার মিস্টি মোহে সবাই আক্রান্ত।
এরপর আসি অন্যান্য উপাদানে। খাবারের ২৫% প্রোটিন থেকে আসা উচিত। এই উৎস রেড মিট থেকে কম আসলে ভালো অর্থাৎ গরু, ছাগলের চেয়ে মাছ, ডিম, ডাল এগুলো ভালো প্রোটিন। বাঙ্গালি খাবারে প্রোটিনের মূল উৎস কখনোই মাংস ছিলো না, মাছে ভাতে বাঙ্গালী এমনিতে বলে না। মাছ প্রোটিনের সাথে সাথে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড এবং ভিটামিন ডি এর উৎস যেগুলো আজকাল মানুষ বোতলে ভরে ট্যাবলেট হিসেবে কিনে খায়। লাল মাংস খাওয়ার দিক থেকে সারা বিশ্বে চ্যাম্পিয়ন আমেরিকানরাই (১২৯ কেজি/বছর/প্রতিজন), আর সবার তলানিতে বাংলাদেশিরা (৪.৩ কেজি/বছর/প্রতিজন) (https://worldpopulationreview.com/country-rankings/meat-consumption-by-country ) আপনি নিজে বেশি খান সেটা আপনার সমস্যা, বাঙ্গালি কালচারের সমস্যা না। নেহারী, বিরিয়ানী, কালাভুনা আর রেজালা এগুলোর কোনটাই বাঙ্গালি খাবার না।
এবারে আসি তেলের কথায়, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশত হেলদি ডায়েট প্লেট এর বিবরনে (https://www.hsph.harvard.edu/nutritionsource/healthy-eating-plate/) বলা হয়েছে "পরিমিত" মাত্রায় ভেজিটেবল ওয়েল খেতে। সেই তেল হতে পারে জলপাই, সূর্যমুখী, সয়াবিন (জ্বি ঠিকই পড়ছেন), বাদাম, ভূট্টা, ক্যানোলা ইত্যাদি। এবং মাত্রার ক্ষেত্রেও কোন সর্বোচ্চ মাত্রার কথা বলা নেই। জনস্বাস্থ্য গবেষকেরা বহুদিন ধরে চলে আসা ডায়েটারি ফ্যাট বনাম কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ এর সম্পর্ক নিয়ে নতুন এভিডেন্স পেয়েছেন। লক্ষাধিক লোকের উপরে করা একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে খাবারে তেল এর পরিমান এর সাথে হৃদরোগ এর সম্পর্ক ও এ জনিত মৃত্যুহার এর সম্পর্ক কম, বরং রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট (সাদা চাল, সাদা আটা) এর সাথে মৃত্যুহারের সম্পর্ক আছে (https://www.bmj.com/content/361/bmj.k2139)। তেল খেলে রক্তনালীতে তেল জমে কোলেস্টেরল, LDL, Triglyceride ইত্যাদি বাড়ে এর কোন প্রমান নেই। তবে স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ট্রান্সফ্যাট ক্ষতিকর এবং তারা কোলেস্টেরল বাড়ায় ওর প্রমাণ আছে।
তেল খেলে কোন তেল খাবেন এর পেছনেই আছে বাণিজ্যিক প্রচারনা। সয়াবিন তেলকে "বিষ" দাবী করে বহু অসাধু ব্যবসায়ী এবং চিকিৎসক, "অর্গানিক", "ভার্জিন", "এক্সট্রা-ভার্জিন", "খাটি" , "ঘানি ভাঙ্গা" ইত্যাদি চটকদার শব্দ ব্যবহার করে অলিভওয়েল, নারকেল তেল ও সরিষার তেল এর দাম বহুগুণে বাড়িয়ে প্রচারনা করছে। তেল এর তুলনায় দুটো হিসাব করা হয়, প্রথমত ক্ষতিকারক স্যচুরেটেড ফ্যাটি এসিড এর পরিমান। সবচেয়ে বেশি নারকেল তেল ও পাম তেলে, সবচেয়ে কম ক্যানোলা/ সূর্যমুখী তেলে। সয়াবিন এবং এক্সট্রাভার্জিন অলিভ অয়েলে স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিডের মাত্রা প্রায় সমান। দ্বিতীয়ত, স্মোক পয়েন্ট, অর্থাৎ কত তাপমাত্রায় ধোয়া বের হতে শুরু করে। এটা গুরুত্বপূর্ণ কারন উচ্চতাপমাত্রায় এই তেলগুলোর ফ্যাটি এসিড ভেঙ্গে ফ্রি র্যাডিকেল বের হয় যা শরীরে নানা ধরনের প্রদাহ তৈরি করতে পারে। তাই কোন রান্না উচ্চতাপমাত্রায় করা হলে (ভাজি করা) হাই স্মোকিং পয়েন্টযুক্ত তেল ব্যবহার করা উচিত। ভার্জিন বা এক্সট্রা ভার্জিন অলিভওয়েল উচ্চতাপ সহনীয় না। এর স্মোক পয়েন্ট ১৯৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস আর সয়াবিন তেলের ২৩৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস। নারকেল/ক্যানোলার তাপ সহনীয়তা আরও কম (https://en.m.wikipedia.org/wiki/Smoke_point )। এবার আসি সরিষায়। সরিষার তেল শরীরের জন্য অনেক উপকারী এই প্রচারনা দীর্ঘদিনের। অথচ এই তেলটি উন্নত বিশ্বে খাবার তেল হিসেবে নিষিদ্ধ। সরিষা তেলে উচ্চমাত্রায় ইরুসিক এসিড থাকে যা হৃদপিন্ডের জন্য ক্ষতিকর। এনিমেল স্টাডিতে এর প্রমান পাওয়া গেছে (https://efsa.onlinelibrary.wiley.com/doi/full/10.2903/j.efsa.2016.4593 #:~:text=A%20high%20intake%20of%20erucic,peroxisomal%20degradation%20of%20erucic%20acid.)। তবে সরাসরি মানব দেহে এর প্রভাব নিয়ে বড় গবেষনা হয়নি, যেকারনে কিছু দেশে ইরুসিক এসিডের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারন সাপেক্ষে খাবার তেল হিসেবে এর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আমাদের দেশে সরিষার তেলে ইরুসিক এসিডের মাত্রা নির্ধারন করা হয়না বা এ সংক্রান্ত কোন আইনও নেই।
সবশেষে আসি মসলার ব্যবহারে। এখানেও অপপ্রপচার দীর্ঘদিনের। তেল মসলা বিহীন খাবারের প্রচার করেন অনেকে কোন ধরনের এভিডেন্স ছাড়াই। বাঙ্গালি খাবারে মূল মসলা কি কি? হলুদ, ধনিয়া, জিরা, আদা, রসুন, পেয়াজ, মরিচ, কিছু ক্ষেত্রে গরম মসলা হিসেবে দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ইত্যাদি। আমি একজন ক্যান্সার গবেষক হিসেবে জানি কিউকারমিন বিভন্ন ক্যান্সার গবেষণায় এন্টি ক্যান্সার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হলুদে কিউকারমিন থাকে। সারাবিশ্বে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ১ নাম্বার প্রতিষ্ঠান জন হপকিন্স বিশ্ব বিদ্যালয়ের বিবৃতি অনুসারে (https://www.hopkinsmedicine.org/health/wellness-and-prevention/5-spices-with-healthy-benefits ): কিউকারমিন ক্যান্সার ছাড়াও বিভিন্ন প্রদাহ যেমন আর্থরাইটিস, আলঝেইমার এমনকি বিষন্নতা দূর করার জন্যেও স্বীকৃত। আদা বমি বা বমিভাব কমানোতে ভূমিকা রাখে, রসুন রক্তে কোলেস্টেরেলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। মরিচের ক্ষেত্রে বা জেনারেলি মসলার ক্ষেত্রে বলা হয় এটা নাকি পেটে আলসার তৈরি করে কিন্তু গবেষনায় দেখা গেছে মরিচের ক্যাপ্সায়াসিন পেটে আলসার তৈরিকারী ব্যাক্টেরিয়া হেলিকোব্যাক্টার পাইলেরি কে মেরে ফেলে (https://academic.oup.com/femsle/article/146/2/223/489538 #)। এছাড়াও শরীরে পেইন রিসেপ্টর এর পরিমান কমিয়ে বিভন্ন ব্যাথা নিরাময়ে (আর্থাইটিস) সাহায্য করে। এই ক্যাপ্সায়াসিন এর জেল পাওয়া যায় জয়েন্টে ব্যাথা কমানোর জন্য। দারচিনি গুড়ার এন্টিব্যাক্টেরিয়াল প্রোপার্টি আছে, ব্লড সুগার কমানোয় ভূমিকা রাখে, জিরা ও ধনিয়া গুড়াও ব্লাড প্রেসার ও হৃদরোগ কমানোতে ভূমিকা রাখে (https://www.webmd.com/diet/health-benefits-cumin #:~:text=weight%20loss%20drug.-,Nutrition,disease%2C%20and%20high%20blood%20pressure.)। তাহলে কোন মসলাটা আপনাকে ক্ষতি করলো? হ্যা, বেশি ঝাল তরকারী খেলে আপনার পেটে মুখে জ্বালাপোড়া হবে, কারন ক্যাপ্সায়াসিন পেইন রিসেপ্টরের উপরে কাজ করে, এর মানে এই না সে আপনার শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করছে। আপনি ঝাল খান আপনার সহন ক্ষমতা অনুসারে। এইসব মসলা নিতেই গোটা ইউরোপ শত শত বছর যুদ্ধ করে এই উপমহাদেশে রাজত্ব করেছে।
এবার আসি রান্নার সময়ে। আমেরিকা ইমিগ্রেন্টদের দেশ। বহু এথিনিসিটির লোক সেখানে তাই নির্দিষ্ট কালচার নেই। কম বেশি সবাইকে কাজ করে খেতে হয়, ইউরোপের মত সরকারি সোশাল কেয়ার সাপোর্ট কম, পকেটে পয়সা যার নাই সে রাস্তা ঘাটে মারা পড়বে বিনা চিকিৎসায়। তাই ছেলে বুড় নারী পুরুষ সবাই কাজ করে। রান্নার সময় কম, তাই ফাস্ট ফুড কালচার জনপ্রিয়। চট করে ফ্রোজেন ফুড ভেজে নেয়া বা মাইক্রোওয়েভে গরম করা, ঠান্ডা স্যান্ডউইচ বা কর্নফ্লেক্স খেয়ে ফেলা, এটাই ওদের রুটিন। এটা ভালো অভ্যাস না খারাপ সেই বিচার করা যাবেনা। খাবার যদি সুষম হয়, তা বানাতে কত সময় লাগলো সেটা গুরুত্বপুর্ণ না যদি আপনার হাতে সময় থাকে এবং সেই সময় দিতে ভালো লাগে। নিজস্ব কালচার যাদের আছে, যেমম ইউরোপে বা দক্ষিণ আমেরিকায় বা এশিয়ায়, প্রত্যেকেরই নিজস্ব ক্যুজিনের রান্নায় অনেক আয়োজন থাকে। ইউরোপীয়ানরা চিজ আর ব্রেড নিয়ে যে কত গবেষণা করে আর সময় দেয় তা নিয়ে বহু ডকুমেন্টারি আছে। মরিচের জন্মই তো দক্ষিণ আমেরিকায় আর তাদের খাবার যথেস্ট "মেসি"। যারা রাধতে ভালোবাসে তারা রান্নার সময় রান্নাঘর "মেসি" হওয়া নিয়ে চিন্তা করে না, খাবারের স্বাদ ও সজ্জা নিয়ে চিন্তা করে। সব দেশেই। আপনি ভালো রেস্টুরেন্ট এর কিচেনে যান, দেখবেন বিশাল কর্মযজ্ঞ। রান্নায় পদ্ধতির উপর নির্ভর করে কিচেন সাজানো হয়, যেমন বেকিং এর জন্য এক ধরনের, উড বার্ন পিজার জন্য এক ধরনের, কাবাব এর জন্য এক ধরনের, ফ্রাই এর জন্য আরেক ধরনের। ঘরের কিচেনে কিচেন হুড থাকে ধোয়া, মসলা টেনে নেয়ার জন্য। বাঙালী কালচারে গ্রামে গঞ্জে রান্নাঘর মূল ঘরের বাইরে আলাদা যায়গায় হতো, শহরে সে সুযোগ নেই তাই খোলামেলা জানালা, এক্সহস্ট ফ্যান আর কিচেন হুড থাকলে রান্নার গন্ধ, ধোয়া কমিয়ে ফেলা সম্ভব। কাউকে দাওয়াত দিলে বা নিজে খেলে ১ পদ রান্না করবো নাকি ১৪ পদ রান্না করবো সেটা আমার ব্যাপার। আমি যদি ১৪ পদ রান্না করে খাওয়াতে পছন্দ করি, সেটা আমাকে মানসিক তৃপ্তি দেবে। আমি অন্তত আপনাকে দাওয়াত দিলে স্যান্ডউইচ আর কোক ঢেলে দেবোনা। তবে হ্যা, এটার জন্য চাপ সৃষ্টি করা বা পদ সং্খ্যা কম হয়েছে বলে জাজমেন্ট দেয়া অনুচিত। রান্না একটি স্কিল। রান্না মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে, দু:শ্চিন্তা কমাত সাহায্য করে। যে লেখার প্রতিবাদ হিসেবে এটা লিখছি, সেখানে বলা হয়েছে আমরা নাকি রান্নায় অনেক সময় নস্ট করি বলে ভাল আড্ডা দিতে পারিনা, ইন্টেলেকচুয়াল আলাপ হয়না। অথচ এ অঞ্চলে (দক্ষিণ এশিয়া) বাঙ্গালিরাই ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবে পরিচিত, দিন ভর রান্না করে, পেট ভরে ভাত খেয়ে আমরা বাউল দর্শনের জন্ম দিয়েছি, পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম এই বঙ্গে, হাজারো গীতিকবিতার জন্ম এই বাঙ্গে, আমাদের মেয়েরা মায়েরা নকশি কাথার মত জটিল আরও অনেক হস্তশিল্পের জননী, আমাদের দাদী নানীরা রূপকথার বিশাল ভান্ডার তৈরি করে নাতিনাতনিদের সাথে আড্ডা মেরেই। আপনার চোখে সাদা চামড়ার লম্বা চওড়া দম্পতির টিপটপ বাসায় স্যান্ডউইচ আর কোক খেয়ে ভেগান ফুডের আড্ডা দেয়াটাকে একমাত্র সহিহ আড্ডা মনে হয় কারন আপনার নিজস্ব পরিচয় নিয়ে ইনসিকিউরিটি আছে। আমি ঝাল মসলা দিয়ে পেট ভরে ভাত খেয়ে দুপুরে ভাত ঘুম দিয়ে সন্ধ্যায় কাছারি ঘরে ষোল গুটি খেলতে খেলতে "মানুষ ধর মানুষ ভজ, শোন বলি রে পাগল মন" গাইতে গাইতে আড্ডা দেয়ার জীবনকে সুখ সমৃদ্ধির জীবন ধরে নেবো।
দুটো আলাদা কালচারকে কখনো তুলনা করা যায়না কোনটা ভালো কোনটা খারাপ। সব কালচারেই ভালো মন্দ থাকতে পারে। আপনি যেখানেই যান না কেন, আপনার কালচার নিয়ে বিব্রত হবার, ইনসিকিউরিটিতে ভোগার কিছু নেই। আপনার পাশের লোকটি কাটা চামুচ দিয়ে স্যালমন ফিলে খাচ্ছে বলে আপনি পাঙ্গাসের ঝোল দিয়ে ভাত মেখে খেতে পারবেন না এমন নয়। হাতটা ভালো করে ধুয়ে খেলেই হলো। কাটা চামুচের লোকটা ঠিকই ম্যাকডোনাল্ডে বার্গার খেতে গেলে দুই হাত দিয়ে ধরে খাবে, খাবার আগে হাত ধোবেও না, বড়জোর টিস্যুতে মুছে নেবে। আপনার জন্ম, বড় হওয়া যদি এই বাঙলায় হয় কিংবা আপনার বাবা মা যদি আপনাকে বাঙ্গালি সংস্কৃতিতে বড় করে, আপনার পরিচয় সেটাই, এই পরিচয়ে গর্বিত হোন, লজ্জিত না, বাঙ্গালি চাদের দেশে গেলেও বাঙ্গালি এবং সেটা আমাদের গর্ব। অন্য কারও সংস্কৃতি ধার করে গর্ব করার প্রয়োজন আমাদের নেই।
ডা. মো: মারুফুর রহমান
চিকিৎসক ও গবেষক
দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ শেফিল্ড, যুক্তরাজ্য