14/03/2026
কলেজের সেই প্রথম দিনটির কথা ভাবলে আজও বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে ওঠে। নবীনবরণ অনুষ্ঠান—চারদিকে ঢাক-ঢোলের শব্দ, নতুন নতুন মুখের আনাগোনা, আর রঙিন সব আড্ডা। সেই উৎসবের কোলাহলের মাঝে আমার চোখ দুটো হঠাৎ থমকে গিয়েছিল একটি শান্ত ছেলের ওপর। ভিড়ের মাঝে ও যেন এক টুকরো স্নিগ্ধতা। কেন জানি মনে হয়েছিল, এই অচেনা মানুষটাই বুঝি আমার খুব চেনা। কোনো এক অদৃশ্য সুতোয় ও আমায় টেনেছিল সেদিন। সেই প্রথম দেখা থেকেই মনের এক গহীন কোণে ওকে সযত্নে সাজিয়ে রেখেছিলাম। কাউকে বলিনি, এমনকি ওকেও না। একতরফা ভালো লাগাগুলো যখন গোপনে মহীরুহ হয়ে উঠছিল, তখন ভাগ্যের এক অদ্ভুত খেলায় কলেজের ফেসবুক গ্রুপে ওর আইডিটা পেয়ে গেলাম। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর সময় আমার আঙুল কাঁপছিল, বুক ধড়ফড় করছিল এক অজানা ভয়ে। কিন্তু সবটুকু অবাক করে দিয়ে ও যখন নিজেই মেসেজ দিয়ে বলল, "তোমাকেই তো আমি খুঁজছি!"—সেদিন মনে হয়েছিল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী মেয়ে।
আমি সেদিনই বুঝেছিলাম, ভালোবাসা হয়তো দুই তরফ থেকেই ছিল। ও ভাবত আমি খুব সহজ-সরল একটা মেয়ে, দুনিয়াদারির প্যাঁচঘোচ বুঝি না। আমাদের সম্পর্কের শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো। কিন্তু সেই স্বপ্নের কাঁচ ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ওর বন্ধুরা আড়ালে বলত, ও নাকি আমার সাথে কেবল সময় কাটানোর জন্য মিশছে। কিন্তু প্রেমে পড়লে মানুষ বোধহয় অন্ধ আর বধির হয়ে যায়। আমিও হয়েছিলাম। ওর ওপর আমার বিশ্বাস ছিল পাহাড় সমান।
হঠাৎ একদিন সব এলোমেলো হয়ে গেল। ওর আইডি থেকে একটা অচেনা মেয়ের মেসেজ এল— "কে তুমি?" মুহূর্তেই আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। যাকে আমি আমার আকাশ ভেবেছি, তার ভাগ অন্য কেউ নেবে—এটা ভাবতেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। সেই মেয়েটার সাথে আমার প্রচণ্ড ঝগড়া হলো, গালিগালাজ হলো। অথচ যাকে নিয়ে এই যুদ্ধ, সেই মানুষটা সারাদিন নিখোঁজ। রাতে যখন ওর দেখা পেলাম, আমি কেবল সত্যটা জানতে চেয়েছিলাম। আমি ওর ফোন থেকে সেই মেয়েটির—মৌ-এর—বাড়ির নম্বর নিয়ে ফোন করে সব বিচার দিলাম। আমার প্রেমিক সেখানে মূর্তির মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিল। তখন বুঝিনি, তার সেই নীরবতা কোনো অনুশোচনা ছিল না; বরং অন্য কাউকে হারানোর চরম আতঙ্ক ছিল।
সম্পর্কটা এরপর থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে লাগল। ও ফেসবুকে সারাক্ষণ বিষণ্ণ পোস্ট দিত, আর আমি বোকার মতো ভাবতাম হয়তো আমার সাথে ঝগড়া করে ও কষ্ট পাচ্ছে। দু-মাস পর একদিন আমার সামনে ও শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। ওর সেই কান্নার আওয়াজ আজও আমার কানে বাজে। ও বলল, "আমি ওর কাছে চলে যাব, ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না।" আমার পায়ের তলার মাটি যেন এক নিমিষেই সরে গেল। যাকে আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে আগলে রেখেছি, সে অন্য কারো জন্য মেঘ হয়ে ঝরছে! ওর কষ্ট দেখে আমি নিজের ক্ষতগুলোর কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। ওর এক বন্ধু তখন ওকে বোঝাচ্ছিল, "মৌ-এর সাথে তোর হবে না রে, ওর বাসা দূরে, পরিবার মানবে না। এভা তো ঘরের মেয়ে, একে দিয়েই তোর পরিবারকে মানাতে পারবি।"
সেদিন প্রথম উপলব্ধি করলাম, আমি ওর কাছে ভালোবাসা নই, স্রেফ একটা 'সেফ অপশন'। যখন ও মৌ-কে পেল না, তখন আবার আমার কাছে ফিরে এল। আমি জানতাম ওর হৃদয়ে আমার কোনো স্থান নেই, তবুও আমি ওকে ছেড়ে যেতে পারিনি। প্রতিদিন বিষের মতো নীল হয়ে জিজ্ঞেস করতাম, "তুমি কি ওকে ভুলে গেছ?" ও হাসিমুখে বলত, "হ্যাঁ।" কিন্তু সেই হাসি ছিল সাপের কামড়ের মতো বিষাক্ত। এক মাসও কাটেনি, একদিন মাঝরাস্তায় ও আমায় থামিয়ে প্রশ্ন করল, "এভা, আমাকে ভুলতে তোমার কতদিন সময় লাগবে?"
কথাটা শুনে মনে হলো কেউ আমার জ্যান্ত বুকে ধারালো ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। ও কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আমি তোমার সাথে ভালো নেই। প্লিজ, আমাকে মৌ-এর কাছে ফিরিয়ে দাও।" নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্যের কাছে ভিক্ষা দেওয়ার চেয়ে বড় যন্ত্রণা পৃথিবীতে আর কী হতে পারে? ওর সেই আকুতি সইতে না পেরে আমি নিজেই মৌ-কে মেসেজ দিলাম ওর সাথে কথা বলতে। ভেবেছিলাম হয়তো একদিন কথা বললে ওর মন শান্ত হবে, পরদিন ও আবার আমার কাছেই ফিরবে। কিন্তু পরদিন সকালে উঠে দেখলাম ওরা একে অপরের হয়ে গেছে। আমাকে এক নিমিষেই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হলো কোনো এক ভাগাড়ের আবর্জনার মতো।
আমি যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছি, ও তখন আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, "তুমি কয়েকটা দিন অপেক্ষা করো, আমি আবার তোমার কাছে আসব।" অর্থাৎ মৌ-এর সাথে বনিবনা না হলে আমি তো 'বিকল্প' হিসেবে আছিই! ও আমাকে অগ্রাহ্য করা শুরু করল। আমার অস্তিত্ব তখন ওর কাছে কেবল এক বিরক্তির নাম। বন্ধুদের চাপে নিজেকে সামলাতে অন্য একটি ছেলের সাথে কথা বলা শুরু করেছিলাম। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকত সেই মানুষটার কাছেই। নতুন ছেলেটির চোখের দিকে তাকালে আমি আমার প্রাক্তনকেই খুঁজতাম। ছেলেটি যখন আমার মনের এই অস্থিরতা বুঝে গেল, সেও একদিন নীরবে সরে গেল। আমার তাতে কোনো আফসোস ছিল না।
এরপর একদিন ও আবার ফিরে এল। যেন কিছুই হয়নি! আমি তো পাগল, ওকে দেখেই সব ভুলে গেলাম। কিন্তু ও যখন জানতে পারল মাঝখানের সময়টাতে আমি অন্য কারো সাথে কথা বলেছি, ও পশুর মতো আচরণ শুরু করল। আমাকে চড়-থাপ্পড় মারল, যাচ্ছেতাই গালি দিল। আমাকে টেনে নিয়ে গেল সেই ছেলেটির সামনে। ওর নোংরা অভিযোগ ছিল, আমি নাকি ওই ছেলেটির সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছি। আমার চরিত্র নিয়ে ওর সেই বিষাক্ত প্রশ্নগুলো আমার আত্মাকে ছিঁড়ে ফেলছিল। ছেলেটি যখন সবার সামনে পরিষ্কার করে বলল যে আমাদের মধ্যে কিছুই হয়নি, ও তখন গটগট করে চলে গেল। আর আমি? আমি ওর পেছনে গিয়ে সেই ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলাম, যা আমি কোনোদিন করিনি। কেবল ওকে হারানোর ভয়ে আমি নিজের শেষ আত্মসম্মানটুকুও ওই রাস্তার ধুলোয় বিসর্জন দিলাম।
পরবর্তী দিনগুলো ছিল জীবন্ত নরক। ও কথায় কথায় আমাকে সেই অপবাদ দিত। নোংরা ভাষায় বিঁধত। অথচ ওর সব নোংরা অতীত আমি সমুদ্রের মতো বিশাল মন নিয়ে সয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ ও আবার খুব যত্ন দেখাতে শুরু করল। আমার তপ্ত মরুভূমির মতো জীবনে এক পশলা বৃষ্টির মতো মনে হলো ওকে। ভাবলাম, মানুষটা বুঝি এবার সত্যিই বদলেছে। কিন্তু কপালে সুখ নেই যার, তার জন্য সব আশাই মরিচিকা। একদিন ওর ফোন চেক করে দেখলাম, সেই পুরনো মৌ-এর সাথে ওর নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। সবটুকু যত্ন ছিল নিছক অভিনয়।
আমার পরিবারের সবাই ওর কথা জানত, কিন্তু ও কোনোদিন ওর বাসায় আমার কথা বলেনি। বিয়ের কথা তুললেই ও এড়িয়ে যেত। আজ আমাদের আর কথা হয় না। ও নেই, কিন্তু আমার জগতের প্রতিটি ধূলিকণায় ওর স্মৃতি বিষ হয়ে মিশে আছে। আমি জানতাম ও আমাকে কোনোদিন প্রকৃত ভালোবাসেনি, তবুও আমি ওকে ভালোবেসে গেছি নিঃস্বার্থভাবে। আজ এক অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করে। ফোনের গ্যালারিতে ওর ছবি নেই হয়তো, কিন্তু মস্তিষ্কের কোষে কোষে ওর প্রতিটি আঘাত আর প্রতিটি ভালোবাসার নাটক পাথরে খোদাই করা অক্ষরের মতো রয়ে গেছে।
আমি জানি, ওর জীবনে আমার কোনো জায়গা নেই। আমি ছিলাম ওর গল্পের একটি অপ্রয়োজনীয় চরিত্র, যে কেবল প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু আমার গল্পের প্রতিটি পাতায় শুধু ও-ই ছিল। আজ আমি একা, বিষণ্ণ এক নিঃসঙ্গ পথিক। ভালোবাসা হয়তো সবার জন্য নয়, অন্তত আমার মতো মেয়েদের জন্য তো নয়ই। আমার এই নিঃশব্দ কান্নার খবর কোনোদিন ওর কানে পৌঁছাবে না, আর পৌঁছালেও ওর তাতে কিছু যায় আসবে না। কারণ কিছু মানুষ জন্মায় কেবল ভালোবাসার জন্য, আর কিছু মানুষ জন্মায় শুধু ব্যবহৃত হওয়ার জন্য।