10/06/2026
মাঝরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল। তপ্ত খটখটে পিচঢালা রাস্তাটা মুহূর্তেই ভিজে একাকার।
শহরের একটি ছোট্ট ভাড়া বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সায়ান। মাত্র কয়েক দিন হলো সে একটা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে। আজ প্রথম বেতনের টাকাটা পকেটে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে সে। মনে এক অদ্ভুত আনন্দ, কিন্তু একই সঙ্গে বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে।
সায়ানের মনে পড়ে গেল আজ থেকে সাত বছর আগের এক ঝড়ের রাতের কথা। তখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। হঠাৎ করেই টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় দিন কাটছিল তার। ওষুধের চড়া দাম আর হাসপাতালের বিল মেলাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারটি তখন প্রায় নিঃস্ব।
সেদিন রাতে সায়ানের প্রচণ্ড জ্বর উঠেছিল। জ্বরের ঘোরে সে শুধু দেখছিল, তার কপালে কেউ একজন বারবার জলপট্টি দিচ্ছে আর অবিরত কেঁদে চলেছে। মাঝরাতে যখন তার চোখ খুলল, সে দেখল মা শিউলি বেগম বিছানার পাশে মেঝেতে বসে আছেন। মায়ের হাতের চুরির জায়গাগুলো খালি। সায়ানের চিকিৎসার খরচ জোগাতে মা তাঁর বিয়ের শেষ সম্বল, সোনার চুড়ি জোড়াও বিক্রি করে দিয়েছেন।
সায়ান সেদিন দুর্বল গলায় বলেছিল, "মা, তোমার শেষ স্মৃতিটুকুও তুমি শেষ করে দিলে?"
মা শিউলি বেগম সায়ানের কপালে হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বলেছিলেন, "পাগল ছেলে! আমার আসল সম্পদ তো তুই। তুই বেঁচে থাকলে আমার হাজারটা সোনার চুড়ি হবে।"
বারান্দা থেকে ঘরের ভেতর চলে এলো সায়ান। টেবিলে রাখা ব্যাগ থেকে একটা ছোট মখমলের বাক্স বের করল। তারপর আলতো পায়ে মায়ের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
মা তখনো ঘুমাননি, জায়নামাজে বসে তসবিহ জপছিলেন। ছেলেকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিষ্টি হেসে বললেন, "কী রে সায়ান, এত রাতে ঘুমাশনি কেন?"
সায়ান মায়ের কাছে গিয়ে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসল। মায়ের কুঁচকে যাওয়া, খসখসে হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। মায়ের এই হাত দুটোই তাকে খাইয়ে দিয়েছে, রাত জেগে সেবা করেছে, আর আজ তাকে এই যোগ্য অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
সায়ান পকেট থেকে প্রথম মাসের বেতনের পুরো টাকাটা মায়ের হাতে তুলে দিল। তারপর মখমলের বাক্সটা খুলে মায়ের খালি কবজিতে পরিয়ে দিল এক জোড়া চকচকে সোনার চুড়ি।
মা চমকে উঠে বললেন, "এ কী করেছিস সায়ান! প্রথম মাসের সব টাকা দিয়ে..."
মায়ের কথা শেষ করতে না দিয়ে সায়ান মায়ের কোলে মাথা রাখল। ঠিক যেমনটা সে ছোটবেলায় করত। সায়ানের চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল মায়ের শাড়িতে। সে ফিসফিস করে বলল, "তোমার সেই চুড়ি দুটোর ঋণ শোধ করার ক্ষমতা এই পৃথিবীর কোনো ব্যাংকের টাকার নেই, মা। এটা ঋণ শোধ নয়, তোমার সেই হাসির একটা ছোট্ট উপহার।"
শিউলি বেগমের চোখ বেয়েও তখন আনন্দাশ্রু ঝরছে। তিনি সায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু ঘরের ভেতরটা এক স্বর্গীয় ভালোবাসার ওমে ভরে উঠেছে। মায়ের দোয়ার চেয়ে বড় কোনো আশ্রয় আর এই পৃথিবীতে নেই।