17/02/2026
রাষ্ট্রীয় অনুদানে নির্মিত ১৯৮৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত **দহন** বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ছিলেন শেখ নিয়ামত আলী—যিনি তাঁর স্বতন্ত্র নির্মাণভঙ্গি ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয়।
‘দহন’ কেবল প্রেমের গল্প নয়; এটি ঢাকার মধ্যবিত্ত সমাজের স্বপ্নভঙ্গ, টানাপোড়েন ও নীরব সংগ্রামের এক নির্মোহ দলিল। এখানে ব্যক্তিগত প্রেম, স্বার্থ ও আকাঙ্ক্ষা বৃহত্তর সামাজিক দায়বদ্ধতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। চলচ্চিত্রটি দেখায়—মধ্যবিত্ত এমন এক শ্রেণি, যারা না পুরোপুরি জয়ী হতে পারে, না পুরোপুরি পরাজিত; এক অদৃশ্য দেয়ালের ভেতর তাদের জীবন যেন অবিরাম দহন।
ছবির শুরুতেই দর্শক ঢাকার নগরবাস্তবতার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হন—উঁচু ভবনের উত্থান, কালোটাকার দাপট, ইটভাঙা নারী-শিশুশ্রমিক, রিকশাচালক ও যাত্রীর তুচ্ছ দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে শহরের এক কঠোর বাস্তবতা ফুটে ওঠে। বিচ্ছিন্ন দৃশ্যগুলো আসলে মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান চাপ ও সংকটের সামগ্রিক চিত্র।
মুনির চরিত্রের মাধ্যমে সমাজ-সচেতন এক তরুণের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক কৌশলের দগ্ধ বাস্তবতা উঠে আসে। হুমায়ুন ফরীদি তাঁর শক্তিশালী অভিনয়ে মুনিরকে সময়ের এক প্রতীকী চরিত্রে রূপ দিয়েছেন।
চলচ্চিত্রটিকে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন বুলবুল আহমেদ, ববিতা, শর্মিলী আহমেদ ও আসাদুজ্জামান নূর-সহ অন্যান্য শিল্পীরা।
‘দহন’-এর আরেকটি বড় শক্তি এর নির্মাণশৈলী—ফ্যাক্টস, ফিকশন, প্রতীক ও হিউমারের সংমিশ্রণে এটি এক ধরনের ডকু-ড্রামার রূপ পেয়েছে। পরিচালক পুরোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভাঙার সংগ্রামী আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরে মুক্তির সম্ভাবনা অনুসন্ধান করেছেন।
তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও দশটি বাচসাস পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘দহন’ আজও প্রাসঙ্গিক—কারণ এর প্রশ্নগুলো এখনো আমাদের সমাজে অনুরণিত হয়। আশির দশকের ঢাকা ও মধ্যবিত্ত মানসিকতার যে জীবন্ত দলিল এটি নির্মাণ করেছে, তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রভাণ্ডারে এক অনন্য সংযোজন হয়ে আছে।