14/08/2026
৬২০টি শিশুর হাসি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পুরস্কার... ❤️🎨
গত কয়েক মাস ধরে আমাদের ঘুমের ভেতরেও ছিল একটি স্বপ্ন—শিশুদের নিয়ে এমন একটি শিল্প উৎসব করব, যেখানে জয়-পরাজয়ের চেয়ে বড় হবে অংশগ্রহণ, আনন্দ আর সৃজনশীলতা।
সেই স্বপ্নের নাম ছিল ‘রঙে রেখায় সুলতান’।
৭ আগস্ট, শিল্পী এস. এম. সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে যশোরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৬২০ জন শিশু যখন একই সঙ্গে রং-তুলি হাতে বসেছিল, তখন মনে হয়েছিল—এ শুধু ছবি আঁকার আয়োজন নয়, ভবিষ্যৎকে রঙে রাঙানোর এক ছোট্ট প্রয়াস।
আজ, ১৪ আগস্ট, সেই স্বপ্নের আরেকটি অধ্যায় সম্পন্ন হলো।
জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সকাল থেকেই আসতে শুরু করে শিশু আর অভিভাবকরা। বিকেলের আগেই হলভর্তি মানুষ। একসময় এমন অবস্থা হলো যে, অনেক অভিভাবককে দাঁড়িয়ে, এমনকি হলের বাইরেও অবস্থান করে অনুষ্ঠান দেখতে হয়েছে। এই সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা কৃতজ্ঞ—এত মানুষ আমাদের এই ছোট্ট উদ্যোগকে নিজের অনুষ্ঠান মনে করে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই যখন 'রঙে রেখায় সুলতান' নৃত্যালেখ্যে শিশুদের সঙ্গে তাদের ১২ জন মা একই মঞ্চে উঠলেন, তখন মনে হলো—শিল্প শুধু শিশুদের নয়, পুরো পরিবারেরও। কেউ ব্যাংকার, কেউ গৃহিণী, কেউ কোনোদিন মঞ্চে নাচেননি। কিন্তু সন্তানের হাত ধরে তাঁরা আজ শিল্পের ভাষায় ভালোবাসা প্রকাশ করলেন। এই দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে অনেক দিন থেকে যাবে।
এরপর শুরু হলো সেই প্রতীক্ষার মুহূর্ত—ফলাফল ঘোষণা।
ক-বিভাগে প্রথম হয়েছে সোহাগি ইসলাম (ছোঁয়া)। যৌথভাবে দ্বিতীয় মুহাইরাহ যাহরিন আদিনা ও অর্জুন। তৃতীয় আদ্রীশ চক্রবর্তী, চতুর্থ আতিফা হাছনিজা আবরিন এবং পঞ্চম আবরার জাহান সকাল।
খ-বিভাগে প্রথম সালমান হোসাইন আল মামুন। দ্বিতীয় হাবিবুল বাশার আনসারী, তৃতীয় আধিলা রসুল পার্শা, চতুর্থ জিনিয়ামিন রাইসা এবং পঞ্চম মারিয়াম রহমান আইযা।
গ-বিভাগে প্রথম আমেনা জান্নাতী মানহা। দ্বিতীয় আরাফ আইয়ান, তৃতীয় আহসাব ফারজিন শামস এবং চতুর্থ সৌম্যদ্বীপ দে।
ঘ-বিভাগে প্রথম নুর-এ-আয়েশা আয়াত। দ্বিতীয় দেবার্ষী চন্দ্র। যৌথভাবে তৃতীয় বিদ্যা মালাকার (মৌমি) ও জুনাইরা আকতার। চতুর্থ সপ্তর্ষি বসু এবং পঞ্চম আজমিয়া ফেরদৌস জোয়া।
তবে আজকের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত ছিল অন্য জায়গায়।
মঞ্চে যখন একের পর এক শিশুর হাতে সনদপত্র তুলে দেওয়া হচ্ছিল, তখন আমরা বুঝেছি—এই আয়োজনের আসল বিজয়ী একজন নয়, সবাই।
৬২০ জন শিশুর প্রত্যেকেই আজ অংশগ্রহণের সনদপত্র পেয়েছে। আবার শিল্পী এস. এম. সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী স্মরণে ১০৩ জন শিশুকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ স্বীকৃতি সম্মাননা।
আমরা সম্মান জানিয়েছি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকেও, যারা শিশুদের শিল্পচর্চায় উৎসাহ দিয়েছে। 'সর্বাধিক অংশগ্রহণ সম্মাননা' পেয়েছে জয়তি সোসাইটি, যশোর এবং 'উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ সম্মাননা' পেয়েছে মৌমাছি স্কুল, যশোর।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেলোয়ার হোসেন খান খোকন, প্রশাসক, জেলা পরিষদ, যশোর।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইকবাল কবির জাহিদ, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ; শিল্পী বিমানেশ বিশ্বাস, প্রাক্তন প্রধান, ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়; মাহমুদ হাসান বুলু, সহ-সম্পাদক, যশোর ইনস্টিটিউট, যশোর এবং প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, যশোর; ও শিল্পী তন্দ্রা মুখার্জী, শিল্পী, এস. এম. সুলতান সংগ্রহশালা, নড়াইল।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, ভাস্কর শিল্পী মাহবুব জামাল শামিম। আরও বক্তব্য রাখেন আবুল বাসার শরফুদ্দৌলা, জীবন সদস্য, চারুপীঠ; শিল্পী মফিজুর রহমান রুন্নু, প্রাক্তন অধ্যক্ষ, চারুপীঠ; শাহীন ইকবাল, প্রাক্তন অধ্যক্ষ, উপশহর ডিগ্রি কলেজ; শিল্পী সান্ত্বনা শাহরিণ, সহকারী অধ্যাপক, প্রিন্টমেকিং ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়; এবং মামুনুর রশীদ, সাধারণ সম্পাদক, চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট, যশোর অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চারুপীঠের অন্যতম সদস্য সাইদা বানু শিল্পী ।
আজকের অনুষ্ঠানে আমাদের সঙ্গে ছিলেন সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, অভিভাবক এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী। তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা।
সবশেষে শুধু একটি কথাই বলতে চাই—
আজ আমরা ৬২০টি শিশুর হাতে শুধু একটি সনদপত্র বা একটি ক্রেস্ট তুলে দিইনি; আমরা তাদের স্বপ্ন দেখার সাহসকে সম্মান জানিয়েছি।
হয়তো এই ৬২০ জনের মধ্য থেকেই একদিন কেউ বাংলার শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। হয়তো আরেকজন এস. এম. সুলতান জন্ম নেবে।
সেই স্বপ্ন নিয়েই আমাদের পথচলা।
সবার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ। ❤️
চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট, যশোর