13/08/2026
পুরনো ছবিগুলো এক একটা করে দেখতে দেখতে এই ছবিটা সামনে আসলো, কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেলাম।
ছবিটার মধ্যেই যেন নিজের শৈশবকে খুঁজে পেলাম আবার, সেদিন যে স্মৃতিগুলোর মূল্য সেদিন বুঝিনি, কিন্তু আজ মনে হয় ওগুলোই ছিল আমার জীবনের সবথেকে সোনালী সময়, ওগুলোই ছিল আমার জীবন....
মাছ ধরা নিয়ে কত কত সুন্দর সুন্দর স্মৃতিই না রয়েছে।
লেখা শুরু করলে শেষ হবেনা.....
শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটি যখন শেষ হয়ে শনিবার স্কুল খুলতো, অপেক্ষা করতাম আবার কবে বৃহস্পতিবার আসবে, কারণ বৃহস্পতিবার হাফ স্কুল, দুপুরের পরপরই স্কুল ছুটি হয়ে যাবে। ছুটির ঘন্টা বাজতেই পায়ে যেন ডানা গজাতো সেদিন.... ছুটে আসতাম বাসায়।
বাসায় ফিরে কাঁধ থেকে ব্যাগ ছুড়ে ফেলতাম খাটের উপর।
ভাত খাওয়ার কোনো ধৈর্য থাকতো না সেদিন, আধপেটা বা খালি পেটেই ছিপ কাঁধে নিয়ে দে দৌড়। পিছন থেকে মায়ের মমতার ডাক " খেয়ে যা! খেয়ে যা!"
কোনো কোনোদিন তাড়াহুড়োতে মাছ রাখার পাত্র নিতে ভুলে গিয়েছি, কোনোদিন আবার মাছের খাবার,
সেটা নিয়ে আবার কি বিড়ম্বনা!
জমির আইল খুঁড়ে খুঁড়ে কাদা মেখে কেঁচো খোঁজা, অথবা পাষান বন্ধুর কাছে অনুনয়-বিনয় করে কেঁচো ধার চাওয়া, কেঁচোও যে কত মূল্যবান হতে পারে সেই অনুভূতি পাষণ্ডের সেই ব্যবহারে সেদিন বুঝেছি।
কখনো কখনো আবার কাঙ্খিত জায়গায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে নেমে এসেছে সন্ধ্যা, তারপর হয়তো সাথে করে দুই একটা মাছ নিয়ে ফিরেছি বাসায় নয়তো খালি হাতে, আসতে আসতে বন্ধুদের সাথে কত কথা,কত তর্ক, আগামীকালকের জন্য কত কত পরিকল্পনা।
এক এক জনের এক, এক প্রস্তাব। কেউ বলেছে এ মাঠে তো কেউ বলেছে ও মাঠে, কেও বলেছে আগামীকাল খুব সকালে উঠে খালে যেতে হবে, এভাবেই রাস্তাজুড়ে চলেছে পরিকল্পনার পর পরিকল্পনা। এভাবেই গল্প করতে করতে বাসায় ফিরেছি, ততক্ষণে পৃথিবীর গায়ে নেমে এসেছে রাতের চাদর।
তারপর শুধু রাত পোহানোর অপেক্ষা। ভোর হতে না হতেই শুরু হয়ে যেত ব্যস্ততা—কেঁচো খোঁড়া, ভালো একটা পাত্র বাছাই, সাথে একটা গামছা। আর মায়ের সেই চিরচেনা মমতামাখা আদেশ , "ওরে কিছু খেয়ে যা! কিছু খেয়ে যা" কিন্তু কে শোনে কার কথা,সকাল সকাল পৌঁছাতেই হবে যে! না খেয়েই দৌড় লাগাতাম বন্ধুর বাড়ির দিকে।
অনেক দূরের পথ, যদি কোন ভাবে ছিপের সুতা কেটে যাই, বড়শি হারিয়ে যায়, সেই প্রস্তুতি নিতে যেন কোনভাবেই ভুল হতো না সেই ব্যস্ততার মাঝেও। কারণ সেদিনের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া, যেখানে যাচ্ছি সেখানে যেন মাছেরা ঝাকে ঝাকে খেলা করে। সরল মনের কি বিশ্বাস! কি প্রত্যাশা!
খালের ধারে পৌঁছেই শুরু হতো আসল গবেষণা,
মাছের সাইকোলজি বুঝে জায়গা নির্ধারণ করা।
এই জায়গা বেশি ঝোপালো, রোদ্রের মধ্যে মাছ এখানে এসে হয়তো বিশ্রাম করবে, আরো কত কি।
ছিপ মাটির উপর রেখে শুরু হতো বড়শিতে কেঁচো গাঁথা, সে সময় যদি কেউ ছিপ ডিঙিয়েছে তো তার সাথে বেঁধে যেতো হলুস্থুল কান্ড, সরল মনে কে বা কারা ঢুকিয়ে দিয়েছে এ বিশ্বাস, ছিপ ডিঙ্গালে মাছ হয় না সেদিন।
প্রস্তুতি শেষে পানিতে ছিপ ফেলে শুরু হতো আসল অপেক্ষা ,যদি পাশের বন্ধুর ছিপে আগেভাগে মাছ উঠেছে তো ভিতরে জ্বালা উঠেছে হিংসায়।
অপেক্ষা করতে করতে যখনই সুতায় টান লেগেছে মনে হয়েছে হয়তো এখানকার সব থেকে বড় মাছটা এখন আমার বড়শি গিলছে, কত সতর্কতা,কত কৌশলী টান।
যেভাবেই হোক মাছটাকে উঠাতেই হবে।
কখনো উঠেছে, আবার কখনো উঠেও হাত ফসকে পানিতে পড়েছে, তখন মনটা মলিন হয়ে গিয়েছে আবার। তারপরও প্রত্যাশা হারায়নি, আবার চেষ্টা,আবার টানের অপেক্ষা, কখনো কখনো মাছ না পেয়ে বিধাতার প্রতি কত অভিমানের সংলাপ, কত অলিখিত অভিযোগ, সে সব হাসির কথা নাইবা বললেম।
আর যেদিন মাছ রাখার পাত্রে অনেকগুলো মাছ ধরা পড়েছে সেদিন আমায় পায় কে, আমিই যেন রাজার রাজা সেদিন, মুখে কি হাসি, মাছ না পাওয়া বন্ধুকে খুব নরম ভাবে পচানো, সহানুভূতি দেখিয়ে দু একটা মাছ তাকে দেওয়া।
যখন প্রায় সন্ধ্যা নামার উপক্রম তখন বাসায় ফেরার প্রস্তুতি শুরু,বাসায় গিয়ে সবার আগে মাকে গিয়ে দেখাবো, বলব দেখো কত মাছ ধরেছি আজকে,মা খুব খুশি হবেন।
কিন্তু বেশিরভাগ সময় হতো হিতের বিপরীত, সন্ধ্যা করে ফেরার কারণে কত ঝড় ঝাপটা বয়ে যেত। তারপরও মা তো! সন্তানের এমন চেষ্টায় সেও খুব আনন্দ পেত, হয়তো রাগ ভেঙ্গে বলেই ফেলতো "অনেক মাছ হয়েছে তো আজ"
আবার,যদি কোনোদিন হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছে, ছিপ পেতে রেখে কোন তালগাছ বা বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছি, কোনভাবে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা, দু এক বন্ধু বলেছে বৃষ্টি হলে নাকি মাছেরা আনন্দে মেতে ওঠে, তখন তারা নাকি বরশি গেলে না। এই বিশ্বাসে বৃষ্টি আসলে মনটা খারাপ হয়ে যেত আর বুঝি মাছ সেদিন বরশি গিলবে না, খালি হাতে বাসায় ফিরতে হবে।
আবার কোনদিন, বড়শিতে যখন ভারী টান অনুভব করেছি বুঝতে বাকি নেই এই বরশি গিলেছে, সর্বনাশা কোনো অপদ, সাপ নয়তো গুইসাপ। কখনো ভয় পেয়ে বড়দের সাহায্য চেয়েছি।
বড়শির সাথে যদি কোনোভাবে ডাঙ্গায় উঠেছে, তো তার আর রক্ষা নেই, এক একটা বন্ধু হয়ে উঠেছে এক একটা আজরাইল। এক একটা যমদূত।
আহ ! কি সময়টাই না কাটিয়েছি সেদিন।
দেখতে দেখতে জীবনের মাঝামাঝি সময়ে চলে এসেছি। কিন্তু আজও কাউকে মাছ ধরতে দেখলে মনটা ফিরে যায় সেই দিনগুলোতে। মনে হয়, একবার হলেও তার হাত থেকে ছিপটা নিয়ে সেই পুরনো টানটা আবার অনুভব করি.......
১০ সেকেন্ডের মনোযোগের এই যুগে কেউই এত বড় লেখাপড়বে না জেনেও কেন যে লিখে ফেললাম জানিনা, তারপরও লিখতে মন চাইলো লিখলাম।
আর যদি কেউ পড়ে থাকেন তাহলে অবশ্যই কমেন্ট বক্সে আপনার অনুভূতি জানিয়ে যাবেন,
এমন একটা সোনালী দিন কি আপনি পার করেছেন? এমন একটা টান কি আপনি শৈশবে অনুভব করেছেন?
লেখা ও ছবি : কামরুজ্জামান।