25/11/2025
আমাদের প্রতিবেশি ভাগ্য খুব খারাপ ছিলো।
আমার জন্ম যেখানে, সেখানকার প্রতিবেশিরা মোটামুটি ভালো ছিলো। তারপরও বিভিন্ন অত্যাচার সহ্য করেছি আমরা।
জাস্ট দরিদ্র হওয়ার কারণে।
দরিদ্রদের প্রতি মানুষের যেকোনো ব্যবহার করার সাহস বেশি থাকে তাই।
নানারকম অত্যাচারের অনেক গল্প আছে। সেসব আজ এই পোস্টে বলবো না। জাস্ট একটা বলি।
আমাদের এক বাড়ি পর একটা বাড়িতে ছেলের সুন্নতে খৎনার অনুষ্ঠান।
তারা এলাকার প্রায় সবাইকে দাওয়াত দিয়েছে। আমরা ইমিডিয়েট প্রতিবেশি হিসেবে দাওয়াত পাবো স্বাভাবিক।
কিন্তু আমরা পাইনি।
কারণ তারা জানে আমরা দাওয়াত পেলে আমরা ছোটো ছোটো তিন ভাইবোন দাওয়াত খাবো। কিন্তু তেমন টাকা বা গিফট দিতে পারবো না।
আমার আব্বা মারা গেছে তখন। আমার নিরক্ষর মা তিন সন্তান নিয়ে অকূল সাগরে পড়েছে৷ আমাদের খাওয়া পড়া জোগাড় করতেই কষ্ট। সে তাদের মনমতো টাকা দিয়ে দাওয়াত খাবে কীভাবে!
এই চিন্তাই হয়তো তারা করেছিলো।
আমরা দাওয়াত পাইনি। আমাদের মন খুব খারাপ।
আমার দুই বোন আর আমি। ছোটো।
আমাদের মনের অবস্থা বুঝে আমার মায়ের কষ্টটা কেমন ছিলো এখন আঁচ করতে পারি।
এজন্যই ভীষণ খারাপ লাগে এখন।
মা আর বোনেরা কেমন ফিল করছিলো সেই ১৯৯৯ সালের ওই দিনে, এই কল্পনা আমাকে ভেঙেচুরে দেয়।
অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকেই রান্নাবান্নার শব্দ। ড্যাগের নাড়াচাড়ার শব্দ আসে।
মা না করে দেওয়ায় আমরা আগের দিন থেকেই ওদিকে যাওয়া অফ করেছি।
আমার লজ্জা লাগছে যে আমার বয়সী সবাই আজ দাওয়াত খাবে, কিন্তু আমাকে বলে নাই, এজন্য। আমি বেশ দূরে দূরেই থাকলাম।
দুপুরের আগেই বিরিয়ানির ঘ্রাণে ম ম করছে চারপাশ। শিশু বয়সের পাকস্থলী। লোভে ভরপুর।
নিজেকে কষ্ট দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছি৷ বুঝি এখন।
আমাদের খবর কেউ নিলো না।
মা সন্ধ্যাবেলা পোষা মুরগিটা জবাই করে রান্না করে দিলো। আমরা খেলাম।
২০০২ সালে আরেক করুণ অভিজ্ঞতা জীবনের গল্পে যোগ হলো।
আমরা আমাদের জন্মস্থান ছেড়ে আরেক জায়গায় চলে এলাম।
আমার মা আমাদের নিয়ে শুরু করলো আরেক জীবন।
না, আমার মা আর বিয়ে করেনি।
একাই যুদ্ধ করেছে।
আমরা পেলাম নতুন প্রতিবেশি।
অদ্ভুত অদ্ভুত মানুষে ভরপুর এক এলাকা।
এই এলাকার গল্প অনেকবার বলেছি। তাই আর বললাম না।
অল্প কথায় শেষ করবো তাই।
আমাদের ইমিডিয়েট প্রতিবেশিদের টিনের চালে আমাদের পেয়ারা গাছের পাতা পড়তো। এটা নিয়ে বহুবার ঝগড়া হয়েছে। আমার মা ঝগড়াতে এক্সপার্ট ছিলো না।
পারতো না তাদের সাথে।
তারা ছিলো বিহারি।
৭১ এর পর তারা আর যায়নি। রয়ে গিয়েছিলো।
ইভেন ঝগড়া ইস্যুতে আমাদের এলাকার বেশিরভাগ বিহারিই ছিলো চরম জঘন্যতম ও এক্সট্রিম লেভেলের।
সব বিহারিই এমন ছিলো তা না। কিন্তু ৯০% ই এমন ছিলো।
তারা নিজেদের ফ্যামিলির সাথে লাগা সামান্য ইস্যুর ঝগড়াকে যে পর্যায়ে নিয়ে যেতো, তার ৫% ও কোনো সভ্য মানুষ বা আমরা কল্পনা করতে পারি না।
আমাদের দুই-তিনটা মুরগি ছিলো।
শখে পালা।
সেই মুরগি উনাদের সীমানায় গেলেও তারা বাজেভাবে ঝগড়া করতো।
যে মহিলা আমাদের পিছনে সবসময় লেগে থাকতো, উনার মেয়ের বাল্যবিবাহ ঠিক হলো। অনুষ্ঠান করবে।
এই এলাকার অনুষ্ঠান মানে হলো ব্যবসা।
ছোটো করে অনুষ্ঠান। উঠানে প্যান্ডেল টাঙিয়ে এলাকার কিছু মানুষকে দাওয়াত দেওয়া। আর দাওয়াতের নামে গিফট ও টাকা তোলা। এটাই মূলত উদ্দেশ্য।
তো দাওয়াত খেতে বসেছি।
সম্ভবত সব প্লান করা ছিলো। বলে দিয়েছে কারো সামনে পোলাও মাংসের গামলা রাখা যাবে না। যার লাগবে, মাংস ৩-৪ পিসের বেশি দেওয়া যাবে না।
উনাদের এক আত্মীয় খাবার দিচ্ছে। কী আশ্চর্য! ডাকাডাকি করি আসে না। চাইলে এক পিস দেয়।
আড়মোড়া দেখেই আমি বুঝে গেছি কাহিনি কী।
আমি বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই স্পষ্ট কথা বলতে পছন্দ করি। আমি বলেই ফেললাম, মাংস কি ২ পিসের বেশি দিতে না করেছে নাকি ভাই?
আমার কথায় সবাই সচকিত হলো। সবাই ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছে৷ সবাই ইশারায়, ফিসফিস করে বলা শুরু করলো ব্যাপারটা এমনই হচ্ছে।
ঘটনাটা আমার কাছে জাস্ট মজার ছিলো।
আর মানুষের মেন্টালিটি চিন্তায় আফসোসের ছিলো। আফসোস আরো বাড়লো।
পাশের টেবিলে কোনো এক ফাঁকে একটা লোক বসেছে। অল্প বোধবুদ্ধি তার। আলাভোলা। ঠিক পাগল না। আবার স্বাভাবিক না। সেও বিহারি বংশোদ্ভূত।
সে খেতে বসার সাথে সাথেই খেই খেই করে উঠলো একজন। দাওয়াত দেয় নাই অথচ খেতে বসছে তাই।
এই টাইপের মানুষগুলো সব জায়গায় নিগৃহীত। না ভালো খায়৷ না ভালো পরে।
রাস্তার পাশে দাওয়াত হচ্ছে। আর তারও পরিচিত বাড়ির মেয়ের বিয়ে।
সে লোভ সামলাতে পারেনি।
খেতে বসেছিলো।
যে খেতে বসে যায়, তাকে এভাবে ধমক দেওয়া অবশ্যই মানুষের কাজ না। আর যাই হোক।
ওই লোককে মাংস দেওয়া হচ্ছে না।
ঝোল আর চর্বিটর্বি দিয়ে গেছে।
আমি ডেকে বললাম, "ভাই আমরা আর খাবো না। উনাকে মাংস দেন।"
বলে উঠে গেলাম।
মূলত এসব পরিবেশ ও নানাবিধ কারণেই আমি এলাকার মানুষের সাথে তেমন মিশতাম না। বাসা থেকে বের হতাম কম। বের হলে সেটা এলাকায় না। অন্য জায়গায় যেতাম।
আমার চিন্তাধারা অ্যাজ ইউজুয়াল মানুষদের ট্র্যাক অনুযায়ী না।
আমি ফিল করতে পারি আমি আলাদা।
এবং এই আলাদাটা বেশিরভাগটুকুই লজিক্যাল ও অথেনটিক।
এইটুকু বোঝার বোধ আল্লাহ আমাকে দিয়েছে। এজন্য আমি আত্মবিশ্বাসী।
আমি যা অবজার্ভ করি, বিশ্লেষণ করি নিজে নিজে, এই অবজারভেশন, বিশ্লেষণ করার মতো বোধটুকু যাদের নাই, তারা অনেকেই ভাবে আমি অহঙ্কারী, বেশি বুঝি।
তাতে আমার সামান্যতম কিছু যায় আসে না।
কারণ আমার একসেপ্টেন্স যেখানে যেখানে যাদের কাছে হওয়ার দরকার, তাদের কাছে আছে।
আপনি আওয়ামিলীগ হলে যেমন রাজাকারদেরকে কোনোভাবেই আপনার যুক্তি বোঝাতে পারবেন না, একমতে আনতে পারবেন না, আমার ব্যাপারটাও তেমন।
যারা একগুঁয়েমি করতেই থাকবে, যুক্তি মানবে না, বাস্তবতা ও সত্য মানবে না, তাদের সাথে আপনি সারাদিন তর্ক মারামারি করেও কোনো লাভ নাই।
কারণ ওদের চিন্তা বিশ্বাস যুক্তির লেভেল আলাদা। আলাদা বলেই সমাজে এত কনফ্লিক্ট।
যাদের সাথে চিন্তায় বোধে আমার কোনোভাবেই যায় না, তাদের সাথে আমি চলি না।
এজন্যই আমার দ্বিতীয় প্রতিবেশীদেরকে আমি এড়িয়ে চলতাম।
কারণ চারপাশে মানুষ দেখি। কিন্তু মানুষ হয়ে উঠতে দেখি না তেমন কাউকে।
তাদের দোষই বা কীভাবে দেবো।
আল্লাহ সবার ঘিলু সমান করে বানায় না।
ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হলেও যেখানে মানুষের মনুষ্যত্ব লাভের ঘিলু কম থাকে, সেখানে পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথা নাইবা বললাম।
িজের_কথা_বলি