03/12/2021
গল্পঃ গ্রীনরোড by Wasim Subhan Choudhury
মোবাইলের সাউন্ড মিউট করেছি, ঘরের সব বাতি নিভিয়েছি, বাথরুমের নষ্ট হওয়া পানির কলের প্যাচ লাগিয়েছি।
শান্তিতে ঘুমাবো বলে।
একটানা ১২ ঘন্টা শিফট শেষ করে এসেছি। এক সপ্তাহ ধরে এই চলছে। ঘুম দরকার।
যেটা করিনি, তা হল ল্যান্ড ফোনের রিসিভার তুলে রাখিনি। সেটাই কাল হলো। রাত দেড়টায় সেজ ফুপুর ফোন - বাবা জহিরউদ্দিন, একটু আয় আমার বাসায়।
কাঁচা ঘুম ভাঙার বিরক্তি প্রকাশ করলাম না। মন চাইলো বলতে - বুড়ি আমারে করছোস কেন ফোন? কিন্তু বললাম - ফুফু কি হইছে?
ফুফু বলেন - শ্বাস নিতে কষ্ট হইতেছে, বাম হাত ব্যথা করে।
আশির কাছাকাছি বয়স তার। ধারণা করলাম হার্টের সমস্যা।
আরো ভাতিজা ভাতিজি আছে। কিন্তু আমাকেই ফোন করতে হয়েছে তার। বললাম - আপনি টাইট কইরা বইসা থাকেন, আসতেছি।
জিন্স পরেই ঘুমিয়েছিলাম, উঠে টিশার্টটা গায়ে জড়ালাম। সেন্ডেল পড়লাম। হোন্ডা নিয়ে ছুটলাম লালমাটিয়ায়।
পৌঁছে দেখি অবস্থা আসলেই খারাপ। বুড়ি নেতিয়ে গেছে। পাশে কাজের মেয়ে দাঁড়িয়ে। সে ভয় পেয়েছে। আমি উবার ডাকলাম, পাজকলা করে বুড়িকে তুললাম গাড়ীতে। গন্তব্য গ্রীন রোডের সেন্ট্রাল হাসপাতাল। গাড়িতে উঠে মিনমিনে স্বরে বুড়ি বলে - জহিরউদ্দিন, দেরি করে ফেললি বোধহয়।
আমি বলি - ফুফু আপনে কাশার চেষ্টা করেন। ফার্স্ট এইড এর চিকিৎসা হিসেবে আমি এটুকুই জানি যে এই সময় জোর করে কাশি দিতে হয়।
ফুফু কাশি দেবার চেষ্টা করেন, পারেন না।
রাতের রাস্তা। খালি। হাসপাতালে পৌঁছতে সময় বেশি লাগে না। ইমারজেন্সিতে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা সাথে সাথেই ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেন। ফুপু ইশারা দিয়া আমাকে সাথে থাকতে বলেন। আমি ইশারা না বুঝার ভান করি। বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরাই।
সেজ ফুপুর তিন ছেলেমেয়ে। ফুপা গত হয়েছেন কয়েক বছর আগে। ভূগোলিক দূরত্বের হিসাবে ছেলেমেয়ের সবচেয়ে কাছেরটা বরিশালে থাকে। বিবাহিত, তিন সন্তানের জননী। মোটা হওয়া আর স্বামীর প্রশংসা ছাড়া কোন কাজ সে করতে পারে বলে মনে হয় না। অন্য দুই কুলাঙ্গার অস্ট্রেলিয়া থাকে। সিগারেট খেতে খেতে চিন্তা করি তাদের জানাবো নাকি। মাথা ঝিম হয়ে আছে। সিদ্ধান্ত নিতে পারিনা।
সিগারেট শেষ করে ভিতরে যাই। কর্তব্যরত ডাক্তার বলে, মাইল্ড একটা অ্যাটাক হয়েছে। অবজারভেশনে রাখতে হবে ৪৮ ঘন্টা। আমি তাদেরকে আমার নাম্বার দিই। এক ডাক্তার বলে - আপনাকে চিনেছি। আপনি তো বোধহয় সাংবাদিক। এই ইউটিউব ফেসবুকের যুগে তিনি এখনো টিভিতে বালসাল খবর দেখেন শুনে আমি আপ্লুত হই। কিন্তু প্রকাশ করি না।
জিজ্ঞেস করি - রোগীর অবস্থা কি? ডাক্তার বলেন - ভালো না, অানস্টেবল। আপনি রাতটা এখানে থাকেন। এটা শুনে আমার বিরক্তি লাগে ডাক্তারের উপর। চেয়েছিলাম বাড়ী ফিরে যাব। এটা বলাতে আটকে গেলাম। বলি - আচ্ছা, আছি।
আগে জানতাম ক্রিটিক্যাল পেসেন্টদের আইসিইউতে রাখা হয়, এখন জানলাম হার্টের পেসেন্টদের এইচডিইউতে রাখা হয়। ডাক্তার বলেন - একাউন্টস সারা রাত খোলা থাকে, আপনি কথা বলে আসেন। আমি মুগ্ধ হই ওই তার ভদ্রতায়। কি সুন্দর করে বললেন টাকাপয়সার ব্যাপারটা।
কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করি। বিরক্ত লাগে। সেজ ফুপুর ছেলেমে়য়েদের চেনা আছে। ইতরগুলোর কাছ থেকে এই টাকা উদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই কম। একমাত্র ফুপু এই যাত্রা বেঁচে গেলে টাকা উদ্ধার করা যাবে।
এইচডি ইউয়ের বাইরে ওয়েটিং রুমে বসি কিছুক্ষণ। ঝিম আসে, কিন্তু ঘুম আসে না। মূল ওয়েটিং রুমে যাই। এখানেও লোকজন কম। ঘড়িতে সময় দেখি - রাত তিনটা বাজে। একটা সিগারেট ধরাই। কেউ বাধা দেয় না; বাধা দেবার কেউ নেই এই রুমে। অস্ট্রেলিয়ায় এখন ভোর। কুলাঙ্গার দুটোকে ভাইবারে মেসেজ পাঠাই। শর্ট এন্ড পৃসাইস - Fupu had a heart attack, admitted at central hospital.
নিকোটিন আর ক্যাফিন আমার শরীরের সাপ্লিমেন্টারি সাবস্টেন্স। নিকোটিন শরীরে গেছে, শরীর ক্যাফিন চায়। কিন্তু পা দুইটা সায় দেয় না ক্যান্টিনে যেয়ে বসতে।
হঠাৎ মনে পড়ে মোটরসাইকেল রেখে এসেছি ফুপুর বাসায়। তার কাজের মেয়ে সেখানে আছে। ওকে এনে এখানে রাখলেই তো হয়। আমি বাঁচি।
পাঠাও কল করে চলে যাই লালমাটিয়া। কাজের মেয়েকে বলি ব্যাগ গোছাতে। মোটর সাইকেলে করে ওকে নিয়ে আসি হাসপাতালে। এইচডি ইউয়ের ওয়েটিং রুমের বাইরে রেখে আমি রওনা দেই নিজের ঢেড়ায়।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। মাথা ঝিমঝিপ করে। লিফট দিয়ে নামবো। হঠাৎ দেখি স্নিগ্ধা। চমকে উঠি। প্রথমে মনে হয় বিভ্রম। স্থির হয়ে চোখ কচলে দেখি, না এটা তো স্নিগ্ধা! সেও তাকায়। চোখাচোখি হয়। দুজনের কারোরই এখানে থাকার কথা নয়। চোখাচোখি হবার কথা না। ওর সাথে চোখাচোখি হবার দিন পেছনে ফেলে এসেছি। তবুও চোখাচোখি হয়।
স্নিগ্ধা এগিয়ে আসে।
চলবে