Being Artist

Being Artist A Platform Where True Artists Rules!

05/01/2023

খুব সাধারণ একটা সানগ্লাস বক্স বানানোর চেষ্টা করলাম

18/10/2022

সাদা সাদা কালা কালা

16/10/2022

আজ পাশা খেলবো

অধিক শোকে মানুষ পাথর হয়ে যায় শুনেছি। পিয়াল ভাই হয়ে গেলেন সাধু সন্ন্যাসী। সারাদিন গৃহবন্দী থাকেন। কারও সাথে খুব একটা কথা ...
14/08/2022

অধিক শোকে মানুষ পাথর হয়ে যায় শুনেছি। পিয়াল ভাই হয়ে গেলেন সাধু সন্ন্যাসী। সারাদিন গৃহবন্দী থাকেন। কারও সাথে খুব একটা কথা বলেন না। ঠিকমতো খান না, ঘুমান না, গোসল করেন না, দাঁড়ি গোফ কামান না। এমনকি তাকে বাথরুম পর্যন্ত বলে কয়ে করাতে হয়।

যেদিন বাসা থেকে বুয়া পালিয়ে গেল, সেদিন থেকে পিয়াল ভাইয়ের জীবনে শোকের মাতম শুরু হয়ে গেছে। অবশ্য তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এই মাসটাই শোকাবহ।

পিয়াল ভাইয়ের শোচনীয় অবস্থা দেখে আমার কষ্ট হয়। তার থেকেও বেশি কষ্ট হয় খাওয়া-দাওয়ার বেলায়। দ্রব্যমূল্যের এই উর্ধ্বগতির সময়ে হোটেলে গিয়ে খাওয়া পোষায় না। এদিকে বাসায় রান্নাবান্না করার মতো কেউ নেই।

রুমমেট তন্ময় খুব বড় মুখে বলেছিল রান্নাবান্নার ব্যাপারটা সেই সামলাবে। তারপর টানা কয়েকদিন ভাতের নামে পায়েস, ডালের নামে হলুদ পানির শরবত, ভাজির নামে লবণ-মরিচ দিয়ে মাখানো কাঁচা সবজি খেয়ে জীবনের আয়ু কমে গেছে কয়েক বছর।

বাধ্য হয়ে কাজের বুয়া পেতে খোঁজ দ্য সার্চ মিশন শুরু করলাম। সকাল সন্ধ্যা পল্টনের এক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অফিসে চাকরি করি আর রাতে বাসায় ঢোকার আগ পর্যন্ত বুয়া খুঁজি। এক্ষেত্রে ভাগ্য সহায় হলেও পিয়াল ভাই সহায় হলেন না।

কেননা আমি যাকেই খুঁজে আনি, তাকেই বাদ দিয়ে দেন তিনি। এভাবে চারজন বুয়াকে বিদায় করার পর আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো। আমি পিয়াল ভাইয়ের মুখোমুখি বসলাম।

‘ভাই আপনার সমস্যা কী?’

‘আজ আমার মন ভালো নেই।’

‘সেটা তো আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এর সাথে কাজের বুয়ার সম্পর্ক কী? আমি যারেই আনি তারেই আপনি রিজেক্ট করে দিচ্ছেন। আপনার আসলে কী ধরনের বুয়া দরকার?’

‘কেমন বুয়া দরকার? এই ধরো চেহারা সুরত একটু ভালো হওয়া চাই। খুব বেশি লম্বা না, আবার খুব বেশি খাটোও না। উচ্চতায় ধরো আমার কাছাকাছি হবে। স্বাস্থ্যবান হলে ভালো। তবে মোটা হওয়া চলবে না।’

‘ভাই, আপনি কি কাজের বুয়া খুঁজছেন, না কী নিজের জন্য পাত্রী খুঁজছেন? ঠিক করে বলেন তো।’

আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না পিয়াল ভাই। চুপচাপ বসে রইলেন। সেইসাথে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন রুমে থাকা টেবিলটার দিকে। তার দৃষ্টি বরাবর তাকিয়ে দেখলাম টেবিলে একটি বই রাখা। কাসেম বিন আবুবাকার এর উপন্যাস- প্রেম যেন এক সোনার হরিণ। আমি ছোট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

ফ্ল্যাটের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকলো। কেমন যেন দমবন্ধ করা পরিবেশ। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে ভাবলাম তন্ময়ের সাথে শলাপরামর্শ করা যাক। কিন্তু তার রুমে গিয়ে দেখি অবস্থা আরও সিরিয়াস।

ছেলেটার কোলের উপর গিটার, একহাতে মোবাইল, আরেক হাত থুতনিতে। দেখে মনে হলো কোনো এক গভীর ভাবনায় মগ্ন। আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। অবাক ব্যাপার হলো, আমার দিকে একনজর তাকালোও না ছেলেটা।

‘কী ভাবছো?’ হালকা কেশে প্রশ্ন করলাম আমি।

‘আমি কিছু ভাবতে পারি না।' আমার দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলো তন্ময়।

‘কীভাবে বুঝলে কিছু ভাবতে পারো না?’

‘ভেবে চিন্তেই বলছি।’

কেমনটা লাগে! আসলাম একটু শলাপরামর্শ করতে, এখন দেখি পাগলের এলাকায় বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করেছি। মেজাজ কিঞ্চিত খারাপ হলো বটে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করলাম না।

এখন মেজাজ খারাপ করলে চলবে না। ঠাণ্ডা মাথায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমি তন্ময়কে কিছু বলতে যাব এমন সময় সে নিজেই কথা শুরু করলো।

‘জানেন জামসেদ ভাই, আমি না সরাসরি কাউকে প্রশংসা করতে ভয় পাই।’

‘বিষয়টা কীরকম?’

‘একবার ফেসবুকে এক আপুর ছবিতে কমেন্ট করেছিলাম- শাড়িতে আপনাকে সুন্দর লাগে। তিনি রিপ্লাই দিলেন, শাড়িতে সবাইকেই সুন্দর লাগে। আপনি পরেন। আপনাকেও সুন্দর লাগবে। এই কমেন্টের পর আর কাউকে প্রশংসা করার সাহস পাই না।’

‘অদ্ভুত ব্যাপার।’

‘হ্যাঁ। তবে এমন ভাববেন না যে কেবল মেয়েদের প্রশংসা করি। ছেলেদেরও করতাম। একবার এক বড়ভাইয়ের ছবিতে কমেন্ট করলাম- ভাই, পাঞ্জাবি আর লুঙ্গিতে দারুণ মানিয়েছে আপনাকে। উত্তরে তিনি লিখলেন, লুঙ্গি ছাড়াও মানায় কিন্তু। দাঁড়াও, তোমাকে লুঙ্গি ছাড়া ছবি পাঠাই। এরপর তিনি সত্যি সত্যি ইনবক্সে ছবি পাঠিয়েছিলেন। আমার আর দেখার সাহস হয়নি। স্প্যামবক্সে ফেলে রেখেছি।’

‘কী সাংঘাতিক!’

এরপর দীর্ঘ সময় কেউ কোনো কথা বললাম না। আমি এদিকে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম তন্ময়কে বলবো, পিয়াল ভাইকে নিয়ে যেন বাসার বাইরে কোথাও ঘুরে আসে। বাসায় থাকতে থাকতে সবার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

প্রস্তাবটা দেওয়ার আগেই গিটারে টুংটাং আওয়াজ তুলে তন্ময় গান ধরলো- ‘ভুল মানুষের কাছে ভুল করে বারবার ফিরে এসেছি, কাঁদতে হবে জেনেও হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসেছি; ভুল করেছি, আমি ভুল করেছি।’

সুখে থাকলে নাকি ভূতে কিলায়। আর আমাকে কিলাচ্ছে তন্ময় আর পিয়াল ভাই। সেই বিকেল থেকে একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছে তন্ময়। ঘুরেফিরে তার একই কথা, পিয়াল ভাই কেমন কেমন জানি করছে। কখনো হাউমাউ করে কাঁদছে, কখনো বুক চাপড়ে বিলাপ করছে। আমি তাকে শান্ত হতে বললাম, দু-একটা পরামর্শ দিলাম। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হলো না।

অপরদিকে অফিসে বসে বারবার কল রিসিভ করায় অফিসের বস সামসুদ্দোহা রিফাত সাহেবের নজরে পড়ে গেলাম। এক পর্যায়ে তিনি আমার ডেস্কের সামনে এসে হাজির হলেন।

‘এসব প্রেম-ট্রেম অফিসের বাইরে করলে হয় না?’ খানিক ধমকের সুরে বললেন রিফাত সাহেব।

‘প্রেম করি না স্যার। জরুরি দরকারে রুমমেট বারবার কল দিচ্ছে।’

‘রুমমেটের সাথে রুমেই প্রেম করো। অফিসে এসেও কেন লুতুপুতু করতে হবে?’

‘ভুল বুঝছেন স্যার। আমার দুজন রুমমেট। তারা দুজনেই পুরুষ।’

‘এসব চলে নাকি তাহলে!’

রিফাত সাহেব মুচকি হেসে চোখ টিপলেন। তিনি হঠাৎ কী বুঝলেন আর কী বোঝালেন তার কিছুই বুঝলাম না। বোঝার চেষ্টাও করলাম না। কোনোমতে অফিসের সময়টা কাটিয়ে দ্রুত বাসায় ফিরলাম। তারপর যা শুনলাম, তাতে আমার নিজেরই ডুকরে কান্না পেল।

তন্ময়কে বলেছিলাম পিয়াল ভাইকে নিয়ে চিড়িয়াখানা ঘুরে আসতে। সারাদিন আজব চিড়িয়া অবস্থায় ঘরে বসে থাকার চাইতে বাইরের আলো বাতাস গায়ে লাগলে ভালো লাগবে।

তাছাড়া চিড়িয়াখানায় খাঁচাবন্দি বাদর দেখে পিয়াল ভাই হয়তো শান্ত হবেন। অনুপ্রাণিত হবেন। তারপর বাসায় এসে চার দেয়ালের মাঝে আর বাদরামি করবেন না।

অথচ হতচ্ছাড়া তন্ময় করলো কী? পিয়াল ভাইকে নিয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেন ঘুরে এসেছে। সে ভেবেছিল প্রকৃতি দেখে চোখের শান্তি হবে। কিন্তু বোটানিক্যাল গার্ডেনে কপোত-কপোতী দেখে পিয়াল ভাইয়ের হাপিত্যেশ বেড়ে দিগুণ হয়েছে।

তার উপর তন্ময় নিজেই হতাশায় ডুবে গেছে। স্কুলের বাচ্চাকাচ্চাদের প্রেম পিরিতি দেখে এসে সেই যে ঘরবন্দী হয়েছে আর বেরুনোর নামগন্ধ নেই। আমার সাথে যতবার দেখা হয়, খালি এক কথা- ‘ভাই, কী করলাম জীবনে!’ আর আমি কপাল চাপড়ে চিন্তা করি- কী হবে এই জীবনে!

দিন যায় রাত আসে। জীবন থেমে নেই। রোজকার মতো আজকেও অফিসে গেলাম। কাজকর্ম করলাম। তারপর বাসায় ফিরে আসলাম। কিন্তু বাসায় ফিরে দেখি হুলুস্থূল কাণ্ড।

পিয়াল ভাই নিজে একজন কাজের বুয়া এনেছেন। অবশ্য তাকে বুয়া বললে অন্যায় হবে। পোশাক-আশাক, আচার-আচরণে আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট। দেখতেও সুন্দরী। যেন সদ্য ইন্টার পাশ তরুণী। পিয়াল ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এ হচ্ছে কানিজ ফাতেমা ইভা। আমাদের নতুন গৃহপরিচারিকা।’

টাইটেল শুনে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। অপরদিকে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো বুয়া। বলল, ‘হাই। হাউ ডু ইউ ডু?’ আমি আরেক দফা ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম। আমার তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে ভেংচি কাটলো বুয়া। এরপর পিয়াল ভাইয়ের দিকে ফিরে বলল, ‘আজ তাহলে আসি। কুকিং ইজ ডান। সি ইউ নট ফর মাইন্ড।’

‘টেক কেয়ার। ঠিক আছে। সি ইউ টুমোরো। টাটা।’

আনন্দে গদগদ হয়ে বললেন পিয়াল ভাই। বুয়াকে দরজা অবধি এগিয়ে দিয়ে আসলেন। খানিক বাদে তন্ময় তার রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। এসেই এদিক-সেদিক কী যেন খোঁজাখুঁজি শুরু করলো। আমি দাঁড়িয়ে কেবল কাণ্ডকারখানা দেখছি। কিছু বলার অবস্থায় নেই। পিয়াল ভাই তন্ময়কে থামালেন।

‘কী খুঁজছিস?’

‘বুয়াকে দেখছি না যে। কোথায় গেল?’

‘সে তো চলে গেছে।’

‘এটা কোনো কথা ভাই! আমাকে একবার ডাকলেনও না। গুড নাইট জানাতে চেয়েছিলাম। ধুর!’

‘তোর গুড নাইটের খ্যাতায় আগুন। যা রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে আয়। একটা জরুরি আলাপ আছে সবার সাথে।’

খাবার আনার পর কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল। পিয়াল ভাই বারবার মাথা চুলকাচ্ছেন। তন্ময়ও কী যেন আবার খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। পরে জানতে পারলাম রুই মাছ কেনা হয়েছে আজ। অথচ বুয়া কেবল ভাত আর ডাল রান্না করে গেছে।

পিয়াল ভাইকে দেখলাম কিছুটা হতাশ হলেন। তারপর ডাল-ভাত খেতে গিয়ে উল্টো টাশকি খেয়ে বসে রইলেন। শুধু তিনি একা নন, আমরা তিনজনেই টাশকি খেয়ে বসে রইলাম। রুই মাছ পাওয়া গেছে। কিন্তু সেটা পাওয়া গেছে ডালের কড়াইতে। আমাদের বুয়া, মানে নতুন গৃহপরিচারিকা তরল ডালের সঙ্গে রুই মাছ রান্না করেছে। বলাই বাহুল্য, এভাবেও যে মাছ রান্না করা যায় তা আমরা কেউ কখনো কল্পনাও করিনি।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পিয়াল ভাই শব্দ করে হাসলেন কিছুক্ষণ। তিনি একা একাই হাসলেন। আমি আর তন্ময় বিরস বদনে তার হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

এক পর্যায়ে হাসি থামিয়ে বললেন, ‘রান্না তো রান্নাই। খাওয়া গেলেই হলো। ও হ্যাঁ, একটা জরুরি কথা। আগামীকাল বাসায় পুরনো এক রুমমেট ফিরবে। কী এক জরুরি কাজে যেন আসবে। তার কিন্তু রাগ ভালো না। সবাইকে একটু কায়দা করে থাকতে হবে। নাহলে বেকায়দায় পড়তে হবে।’

এই বলে খাওয়া শুরু করলেন পিয়াল ভাই। কে আসবে, কীরকম বেকায়দায় পড়তে হবে তার কিছুই বললেন না। অবশ্য আমাদের জন্য আপাতত বেকায়দার বিষয় হলো এই ডালরুই খাওয়া।

পিয়াল ভাইয়ের পর তন্ময় খাওয়া শুরু করলো। আমি তাদের প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায় আছি। এমন সময় খাওয়া বাদ দিয়ে গান ধরলো তন্ময়, ‘আগে যদি জানতাম, তবে মন ফিরে চাইতাম; এই জ্বালা আর প্রাণে সহে না, ও মন রে...।’

রম্য সিরিজ : ডিয়ার রুমমেটস (পর্ব-০২)
লেখা: Zamsedur Rahman Sajib
১৪ আগস্ট ২০২২


আমি কোনো মানুষ না। আমি একটা বাদুড়। আমার কাজ হচ্ছে ঝুলে থাকা। বারবার নিজেই নিজেকে বোঝাচ্ছি এটা। লোকাল বাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে ...
07/08/2022

আমি কোনো মানুষ না। আমি একটা বাদুড়। আমার কাজ হচ্ছে ঝুলে থাকা। বারবার নিজেই নিজেকে বোঝাচ্ছি এটা। লোকাল বাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে বাসার পথ ধরেছি।

প্রচণ্ড গরমে শরীরে থাকা চর্বি-তেল গলে পানি হয়ে যাচ্ছে। তেলের কথা ভাবতেই বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। হায়রে তেল! ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল, অকটেনের দাম বেড়েছে। নিজস্ব গাড়ি না থাকলেও টাকা বাঁচানোর কায়দা নেই। যানবাহনের ভাড়া বেড়েছে। দেশের সবকিছুতেই যখন বাড়াবাড়ি চলছে, সেখানে বাড়েনি কেবল জীবনের মূল্য।

আমার পাশের সীটে দুজন ভদ্রলোক জীবনমুখী আলোচনায় ব্যস্ত। তর্কে তর্কে তাদের একজন দেশকে শ্রীলংকা অপরজন সিঙ্গাপুর বানানোর প্রয়াস চালাচ্ছে। এই তর্কযুদ্ধে হঠাৎ ব্যাঘাত ঘটালো আমার মোবাইল ফোন। হাউমাউ করে শব্দ তুলল যন্ত্রটা।

তারা একরাশ বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকাল। এদিকে ভিড়ের মধ্যে অনেক চেষ্টা তদবির করে কলটা রিসিভ করলাম আমি। কণ্ঠ শুনে বুঝলাম, রুমমেট পিয়াল ভাই কল দিয়েছেন।

‘জি পিয়াল ভাই।’

‘তুমি কই?’

‘আমি তো বাসে।’

‘বাস থেকে নামবা কবে?’

‘আজকেই নামব। গোটা রাস্তায় জ্যাম। একটু দেরি হবে আরকি।’

‘আচ্ছা শোনো, বাসায় আসার সময় হোটেল থেকে চিংড়ি মাছের তরকারি আইনো। আমাদের চোর মহোদয় হঠাৎ চিংড়ি মাছ খেতে চাইছে। মনে করে তরকারিটা নিয়ে এসো।’

এই বলে কল কেটে দিলেন পিয়াল ভাই। আমি বাদুড় থেকে বলদে পরিণত হলাম। বোকার মতো কানে মোবাইল চেপে রাখলাম কিছুক্ষণ। লোকটার কাণ্ডকারখানা দেখে হতবাক হয়ে যাই।

দুদিন আগে বাসায় চোর ঢুকেছিল। তাকে হাতেনাতে ধরার পরেও পুলিশে দেওয়া হয়নি। উল্টো বাসায় রেখে জামাই আদর করা হচ্ছে। এর কোনো মানে হয়! অভাব অনটনের ঠ্যালায় নিজে দুবেলা ডালভাত খেতে পারি না। আর এখন আমাকে কোথাকার কোন চোরের জন্য চিংড়ি মাছ কিনে বাসায় ফিরতে হবে। অজান্তেই বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

খাবার নিলাম হোটেল থেকে। এরপর বিল পরিশোধের জন্য মানিব্যাগ বের করতে গিয়ে দিনে চতুর্থবারের মতো ধোঁকা খেলাম। আমার কাছে মানিব্যাগ নেই। বাসায় থাকা চোর মহোদয় নিজের অলস সময় কাটাতে হাত সাফাই করেছে। এমনটা সে বাকি রুমমেটদের সাথেও করে। এটা-ওটা হাতিয়ে নিয়ে পিয়াল ভাইয়ের রুমে রেখে দেয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এতে পিয়াল ভাই রাগ হন না। উল্টো তার চৌর্যকর্মে মুগ্ধ হন।

কিন্তু এই মুহূর্তে রাগ হচ্ছে আমার। তাতে সমস্ত শরীর জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। জোরে পা চালিয়ে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে নুরজাহান রোডে এসে দাঁড়ালাম। এখানকার এক পুরনো পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ তলায় বাসা আমাদের। বাসা বলতে ৩টা রুম, ২টা বাথরুম, ১টা কিচেন এবং ডাইনিং স্পেসের একটি ফ্ল্যাট। যার সদস্য সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। নরমালি আমরা তিনজন থাকলেও কে কবে কখন হুট করে এসে উপস্থিত হয় ঠিক নেই। যারা আসে তাদের দাবী- তারা এই ফ্ল্যাটেরই সদস্য।

প্রথমদিকে ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগলেও আস্তে ধীরে তা গা সওয়া হয়ে গেছে। অবশ্য ছোটবেলা থেকে আমার সবকিছুতে মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস। কোনোকিছুতে অভিযোগ করতে পারি না। আর সেটাই আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

উদাহরণ হিসেবে এই ফ্ল্যাটের কথাই ধরা যাক। উঠেছি ২ মাসও হয়নি। কিন্তু মনে হয় যেন দুই যুগ পেরিয়ে গেছে। এখানে রোজ একটা না একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হতে হয়। অথচ তারপরও ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে না। হাসিমুখে মানিয়ে নেই সব। যেমন মানিয়ে নিয়েছি চোরের বিষয়টা।

চোরের কাহিনিটা সংক্ষেপে বলি। গত পরশুদিনের ঘটনা। রাত আড়াইটার মতো বাজে। হঠাৎ পিয়াল ভাইয়ের ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে গেল। তিনি গলার স্বর নিচু করে ডাকছেন।

‘জামসেদ, ঘুমাইছো?’

‘জি ভাই।’

‘ও আচ্ছা।’

পিয়াল ভাই আর কোনো কথা বলেন না। আমি বহু কষ্টে চোখের পাতা খুলে দেখি, তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। একচুল নড়েননি। তিনি সিনিয়র মানুষ। ডাকার পরে এখন যদি না উঠি, বেয়াদবি হয়ে যাবে। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। পিয়াল ভাইয়ের চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই তার ভেতরে কী চলছে।

‘তুমি কি কিছু টের পেয়েছ?’ শান্ত গলায় প্রশ্ন করলেন পিয়াল ভাই।

‘না তো ভাই। কী হয়েছে?’

‘চোর ধরা পড়েছে।’

নির্বিকার কণ্ঠে জবাব দিলেন পিয়াল ভাই। এদিকে জবাব শুনে আমার চোখ থেকে ঘুম ছুটে গেছে। বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম হলো। কোনোকিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই তিনি আমাকে অপর রুমমেট তন্ময়ের রুমে নিয়ে গেলেন। গিয়ে ড্রিম লাইটের মৃদু আলোয় দেখলাম লাশের মতো বিছানায় পড়ে ঘুমাচ্ছে বেচারা।

পিয়াল ভাই রুমের টিউব লাইট জ্বেলে দিলেন। তখন নজর গেল ফ্লোরে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা এক যুবকের দিকে। হাত-পা দঁড়ি দিয়ে বাঁধা। মুখে কাপড় গুঁজে রাখা। চোখ-মুখ ফুলে আছে। দেখে বোঝা যায়, উপর্যুপরি উত্তম মাধ্যম দেওয়া হয়েছে। এমন দৃশ্য দেখে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। ফট করে পিয়াল ভাইয়ের দিকে ফিরলাম।

‘এই লোকটা কে?’

‘চোর। ঘণ্টাখানেক আগে তন্ময় নিজ হাতে ধরেছে।’

হাসিমুখে জবাব দিলেন পিয়াল ভাই। এদিকে আমার মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। আর কোনো কথা বলতে পারলাম না। খানিক পর ঘুমানোর জন্য যে যার রুমে ফিরে গেলাম। কিন্তু সে রাতে আমার আর ঘুমই হলো না।

আসল কাহিনি শুরু হলো পরদিন সকালে। পিয়াল ভাই চোরকে নিয়ে বৈঠকে বসলেন। কীভাবে এই বাসায় সে ঢুকেছে সেটা জানার চেষ্টা করলেও চোর মহোদয় তার সিক্রেট শেয়ার করল না। তবে তন্ময়ের চড়-থাপ্পড় আর পিয়াল ভাইয়ের জেরাতে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে আসলো।

চোরের নাম মিনহাজুল আবেদীন। শিক্ষিত চোর। অনার্স মাস্টার্স পাশ। কিন্তু বর্তমানে চাকরির বাজার মন্দা বলে এই পেশা বেছে নিয়েছে। নিজের অতীত বলতে গিয়ে ইমোশনাল হয়ে পড়ায় বাকিদের মন কিছুটা নরম হলো।

‘সবই বুঝলাম। কিন্তু দুনিয়াতে এত পেশা থাকতে চুরি কেন বেছে নিলে? এর পেছনের কাহিনি কী?’ প্রশ্ন করলেন পিয়াল ভাই।

‘কনফিডেন্স।’ শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলো চোর।

‘কনফিডেন্স! সেটা কীরকম?’

‘সখীনা নামের একটি মেয়েকে খুব ভালোবাসতাম। যেদিন তার মন চুরি করতে সক্ষম হলাম, সেদিনই বুঝতে পেরেছি এ লাইনে আমার ফিউচার ব্রাইট। বলতে পারেন এটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম চুরি। কনফিডেন্সের উৎস। তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।’

‘কপাল! এ জীবনে কতবার নিজের মন চুরি হলো। অথচ আমি কোনোদিন কারও মন চুরি করতে পারলাম না। ঠিকই আছে, এই পেশা সবার জন্য না। দক্ষতা থাকা লাগে।’

কথাগুলো বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন পিয়াল ভাই। অপরদিকে সঙ্গীতপ্রেমী তন্ময় হাতে গিটার তুলে নিল। টুংটাং শব্দ তুলে চাপা গলায় গান ধরল- ‘চুরি করেছ হৃদয় তুমি ছাড়া কেউ নয়, তাইতো তোমায় বড় চেনা মনে হয়...।’

গানের সাথে তাল মিলিয়ে মাথা দুলাতে লাগল চোর আর পিয়াল ভাই। আমি এই দৃশ্য হজম করতে পারলাম না। উঠে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম।

আস্ত একটা দিন পেরিয়ে গেলেও যখন চোরকে বাসা থেকে বের করার কোনো আগ্রহ দেখলাম না কারও মধ্যে, তখন খুব মেজাজ খারাপ হলো। পিয়াল ভাইকে টেনে আড়ালে নিয়ে গেলাম।

‘ভাই, এসব হচ্ছেটা কী? একটা চোরকে ঘরে বসিয়ে কেউ দুধ-কলা খাওয়ায়?’

‘ঘরে দুধ-কলা আছে নাকি? আমি তো খেতে গিয়ে কিছুই পেলাম না।’

‘আরে আপনি কথার মর্ম বোঝেন না কেন! বোঝাতে চাইছি যে, একটা চোরকে অহেতুক ঘরে রাখার কোনো মানে হয় না। হয় পুলিশে সোর্পদ করেন, নাহয় এমনেই ছেড়ে দেন। ঘরে রাখার তো দরকার নেই।’

‘তুমি এমন অস্থির হচ্ছো কেন? তোমার কোনোকিছু চুরি করেছে নাকি? করে থাকলে বলো, ডেকে ঝাড়ি দিয়ে দেই।’

পিয়াল ভাইয়ের কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম আমি। এই লোকটার মাথায় কী চলছে বুঝতে পারছি না। আমার হতবিহ্বল চেহারা দেখে বোধহয় তিনি মনের অবস্থা আঁচ করতে পারলেন। এগিয়ে এসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন।

‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’ শান্ত গলায় প্রশ্ন করলেন পিয়াল ভাই।

‘করেন।’

‘বাসায় কি সত্যিই দুধ-কলা আছে?’

‘না ভাই।’

‘আচ্ছা থাক, অসুবিধা নাই। এবার শোনো, তুমি তো জানোই আমার ছোটখাটো ব্যবসা আছে। সেগুলো খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। ফ্রিল্যান্সিং করেও তেমন একটা আয় হয়না। আমি ভাবছিলাম যে চোরের সাথে যদি কোনোভাবে পার্টনারশীপ করা যায়, তাহলে এ লাইন থেকে ভালো আয়-ইনকাম সম্ভব। বোঝোই তো, এই দেশ মূলত চোরদের। ছোটবড় হরেক রকমের চোর আর তাদের সিন্ডিকেটের অভাব নাই। যদি করা যায় কায়দা, তবে ফায়দাই ফায়দা!’

পিয়াল ভাইয়ের কথা কয়েক লাইন শোনার পর থেকে আমার মস্তিষ্ক তার স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করেছে। বাকি কথাগুলো শুনলাম বটে, কিন্তু মস্তিষ্কে ধারন করতে পারলাম না। আমার হঠাৎ এক কবির কথা মনে পড়ল। যিনি বলেছিলেন- ‘জীবন মানেই বেদনা। থাক সোনা, আর কেঁদো না।’

অতীত ছেড়ে এবার বর্তমানে আসা যাক। চিংড়ি মাছের তরকারি নিয়ে বাসায় ফিরলাম। তন্ময়ের বেসুরো গলার গান ভেসে আসছে, ‘ক্ষমা করে দিও আমাকে, ভুলতে পারিনা তোমাকে; চলে গেছো অনেক দূরে, আসবে না জানি ফিরে...।’

পিয়াল ভাইয়ের রুমে গিয়ে দেখি তিনি মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। পাশেই গিটার হাতে তন্ময় গলার রগ ছিড়ে গান গাইছে। তাদের বিমর্ষ চেহারা দেখে মনের ভেতর খচখচানি শুরু হলো। চুপচাপ পাশে গিয়ে বসলাম। চোর মহোদয়ের কথা মনে পড়ল। বাসায় ঢুকেছি পর্যন্ত তার দেখা পাইনি।

‘ভাই, চোরটাকে যে দেখছি না। সে কোথায়?’

‘পালিয়ে গেছে।’

নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিলেন পিয়াল ভাই। শুনে প্রথমে খুশির সীমা ছাড়িয়ে গেলেও পরমুহূর্তে দুশ্চিন্তা তার সীমানা অতিক্রম করল। ঘরে মূল্যবান জিনিসের কমতি নেই। মোবাইল, ম্যানিব্যাগ, ল্যাপটপ, নগদ টাকা-পয়সাসহ চুরি করার মতো অনেক জিনিসপত্র রয়েছে। চোর কী তবে পোটলা-পুটলি গুছিয়ে ভেগে গেল? ভাবতে গিয়ে মাথা ঘুরালো আমার।

‘ভাই, বাসার কোনো মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি যায়নি তো?’

‘গেছে। সবচাইতে মূল্যবান জিনিসটাই চুরি গেছে।’

‘হায়হায়! কী চুরি হয়েছে?’

আমার প্রশ্নের জবাবে একটি চিরকুট হাতে ধরিয়ে দিলেন পিয়াল ভাই। আমি কাঁপা হাতে সেটা তুলে নিলাম। বুঝতে পারলাম এটা চোরের রেখে যাওয়া চিরকুট। চোরের হাতের লেখা সুন্দর আছে বলতে হয়। চিরকুটে লেখা- ‘আপনাদের খাতির যত্নের কথা কখনো ভুলব না। আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু কখনো খালি হাতে ফিরে যাবার অভ্যাস নেই বিধায় আপনাদের কাজের বুয়াকে চুরি করে নিয়ে গেলাম। টাটা!’

হাঁ করে চিরকুটের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর পিয়াল ভাইয়ের দিকে ফিরলাম। তার চোখদুটো অশ্রুতে ছলছল করছে। বিরবির করে কী কী যেন বলছেন। যতটুকু বুঝতে পারলাম, কাজের বুয়ার শোক কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। মহিলাটির রান্নার সুনাম করছেন বিরবির করে। এদিকে আমি চিন্তা করছি অন্য একটা বিষয়।

‘পিয়াল ভাই, আমাদের কাজের বুয়ার নামটা যেন কী ছিল?’

‘ভালো নাম তো জানি না। ডাকনাম ছিল সখীনা।’

মনে মনে আমিও এই নামটা আশা করছিলাম। এবার দুইয়ে দুইয়ে চার হিসেব মিলেছে। সেইসাথে আপদও বিদেয় হয়েছে। ভাগ্য ভালো যে বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। বাসার কোনো জিনিসপত্র চুরি যায়নি।

তন্ময়ের কাছ থেকে শুনলাম বুয়া চলে যাবার আগে চুলায় ভাত বসিয়ে গেছে। আর আমি ফেরার পথে চিংড়ি তরকারি নিয়ে এসেছি। রাতের খাওয়া দাওয়া নিয়ে আপাতত কোনো চিন্তা নেই।

‘পিয়াল ভাই, চলেন খেয়ে নেই।’

‘তোমরা খাও। আমার খিদে নেই। বুয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার খিদেও চলে গেছে।’

এই বলে আওয়াজ তুলে কাঁদতে লাগলেন তিনি। আমি তাকে আর ঘাটালাম না। তন্ময়কে বললাম চলো খেয়ে নেই। সে কোনো জবাব দিলো না। গিটারে টুংটাং শব্দ তুলে গান ধরল- ‘ও সখীনা গেছোস কিনা ভুইল্লা আমারে, আমি অহন রিসকা চালাই ঢাহা শহরে...।’

রম্য সিরিজ: ডিয়ার রুমমেটস (পর্ব-০১)
লেখা: Zamsedur Rahman Sajib
৭ আগস্ট ২০২২


06/07/2022

বহুদিন পর বন্ধুর সাথে দেখা। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উৎকুণ্ঠিত স্বরে বলল, ‘কী রে দোস্ত, তোর চোখের নিচে কালি কেন?’

‘কালি না। চোখে কাজল দিয়েছি।’

সত্যই বললাম। চোখে আসলেই কাজল দিয়েছি। আর কাজল দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো চোখের নিচে পড়া কালি যেন বোঝা না যায়। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা টেকনিক আরকি।

এখন কষ্টের কথা কী আর বলি! চোখের নিচে কালি পড়ার কারণ ইদানিং আমার তেমন ঘুম হচ্ছে না। যে স্বল্প সময় ঘুম হয়, সেটাও নানান স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নে জর্জরিত। যুক্তিহীন সেসকল স্বপ্নের উৎস সম্পর্কে অবশ্য খানিক ধারণা করতে পারি।

দৈনন্দিনকার বিভিন্ন ঘটনা আমার মস্তিষ্কের উপর প্রভাব তৈরি করে। ফলে সাবকনশাস মাইন্ড সেগুলোকে স্বপ্নে ডাইভার্ট করে দেয়।

এই তো সেদিন, স্বপ্নে দেখলাম হিরো আলম এসে বেসুরো গলায় গান গাইছে। গান শুনে মন-মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ হলো। কিন্তু হিরো আলমকে দোষ দেওয়া যায় না। সে নিজে থেকে আসেনি। আমার সাবকনশাস মাইন্ড তাকে পাজাকোলা করে তুলে এনেছে।

তার কারণ, বিগত বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুকে তার গানের ভিডিওগুলো দেখা হচ্ছে। ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা মানুষেরা তার গানগুলো ক্রমাগত শেয়ার করায় দেখতে বাধ্য হয়েছিলাম। আর এখন স্বপ্নে তার গান শুনতে বাধ্য হচ্ছি।

হিরো আলম গান গাইছে। আমি ভাবলেশহীন চেহারা বানিয়ে বসে আছি। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি না। এক পর্যায়ে গান শেষ করে সে আমার দিকে এগিয়ে আসলো।

‘কেমন লাগল আমার গান?’

আমি জবাব দিলাম না। বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম।

‘একটা কথা তো বইলবে।’

‘কী?’

‘কেমন লাগল আমার গান?’

‘ভালো।’

বুকে পাথর রেখে জবাব দিলাম। কারও মুখের উপর নিন্দা জানাতে ইচ্ছে করল না। তাছাড়া বেচারার জন্য মায়াও লাগল। সে সখের বশে গান গায়। মনে হয় পাবলিকদের এন্টারটেইন করার চেষ্টাও করে। কিন্তু পারে না। তার চেষ্টাকে ছোট করার কিছু নেই।

‘আমার গান ভালো হইছে না?’

‘হ্যাঁ।’

‘তাহলে আমার গানের ভিডিওতে মানুষ নেতিবাচক কমেন্ট করে ক্যান? গালাগালি করে ক্যান?’

‘আমি তো জানি না।’

‘জানেন না ক্যান? এটা জানার চেষ্টা করবেন। যারা বাজে কমেন্ট করে তাদের রিপ্লাই দিবেন। ঠিক আছে?’

‘জি। ঠিক আছে।’

‘কথা দিলেন কিন্তু!’

না। আমি কোনো কথা দিইনি। কিন্তু পরবর্তীতে বাস্তব জীবনে ঠিকই সেসব নেতিবাচক কমেন্টের রিপ্লাই দিয়েছি। আর লোকজনও আমাকে রীতিমতো ধুয়ে দিয়েছে। হাসিঠাট্টা করেছে। বুক ফেটে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। এসব আমি কী করছি? কেন করছি?

চারপাশে যা দেখি, সেগুলো আমার স্বপ্ন পর্যন্ত চলে আসে। বিচিত্র সব স্বপ্ন। সেদিন দেখলাম আমি একটি ঘরে আবদ্ধ। চারপাশ অন্ধকার। কোনোকিছু দেখা যাচ্ছে না। এমন সময় এক কণ্ঠস্বর ভড়কে দিল আমাকে।

‘টর্চলাইট বা মোমবাতি আছে?’

‘না তো। কে বলছেন আপনি?’

‘আমি বিদ্যুৎ অফিসের লোক।’

‘কী চাই?’

‘কিছু চাই না। তবে টর্চলাইট অথবা মোমবাতি পেলে ভালো হতো। লোডশেডিংয়ের কারণে বাতি বন্ধ। দেখছেন না, চারপাশ কীরকম অন্ধকার।’

‘আপনি না বিদ্যুৎ অফিসের লোক! জানেন না বিদ্যুৎ কখন আসবে?’

‘জানি না। আমাদের কাছে এ ধরনের তথ্য থাকে না।’

আলাপের এই পর্যায়ে পীনপতন নীরবতা। সেই নীরবতা ভাঙল ঘুম থেকে ওঠার পর। চারপাশ অন্ধকার। প্রচণ্ড গরম। ড্রিম লাইট, ফ্যান বন্ধ। বুঝলাম, বাস্তব জীবনেও লোডশেডিং চলছে।

একবার খুব অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখলাম। গরুর হাটে ঘুরঘুর করছি। চারপাশে শত শত গরু। অথচ মানুষ কেবল একজন, আমি।

এমন সময় পেছন থেকে কেউ একজন শিস বাজাল। আমার নাম ধরেও ডাকল। পেছন ফিরে কাউকে দেখলাম না। আশ্চর্য হলাম। খানিক পরে আবার শিস, আবার ডাক। আমাকে আরেক দফায় আশ্চর্য করে দিয়ে একটি লাল রঙের গরু কথা বলে উঠল, ‘বস এদিকে আসেন।’

ছানাবড়া চোখে গরুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। হচ্ছেটা কী? বিস্ময় কাটতে সময় লাগল। নিজেকে বোঝালাম, অস্বাভাবিক কিছুই না। গল্পের গরু যদি গাছে চড়তে পারে, তাহলে আমার স্বপ্নে গরু কেন কথা বলতে পারবে না। আমি লাল গরুটার দিকে এগিয়ে গেলাম।

‘বস, শরীর ভালো?’

‘হ্যাঁ। তোমার?’

‘খুব একটা ভালো না। মানুষের সমস্যা কী বুঝতে পারি না। ইনজেকশন দিয়ে দিয়ে আমাকে কীরকম মোটা বানিয়ে ফেলেছে। সারাক্ষণ হাঁসফাঁস করি। মনে হয় এখনই বুঝি স্ট্রোক করব। একেবারে লেজেগোবরে অবস্থা।’

গরুর কথা শুনে আমার মন খারাপ হয়। তাকে কী বলে শান্ত্বনা দেবো ভাষা খুঁজে পাই না। যদিও কপাল ভালো সে বাংলা ভাষায় কথা বলছে। তাদের নিজস্ব ভাষায় কিছু বলা লাগলে মুশকিল আরও বাড়তো।

‘বস, ধারণা করেন তো আমার নাম কী?’

আমি কিছু বলতে পারলাম না। গরুকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখা গেল।

‘আমি একটা ক্লু দেই। বাংলা সিনেমার হিরোর নামে আমার নাম রাখা হয়েছে। এবার আইডিয়া করেন তো, আমার নাম কী?’

আমি এবারও কিছু বলতে পারলাম না। প্রতিবছর কোরবানির সময় এলে অসংখ্য গরুর নামকরণ করা হয়। বড় বড় সংবাদ মাধ্যমে নিউজ হয় সেগুলো নিয়ে। এখন বাংলা সিনেমা ইন্ড্রাস্ট্রীতে হিরোর অভাব নেই। তাদের নামে হর-হামেশাই গরু পাওয়া যায়। কার নাম বলব ভেবে পেলাম না। স্বপ্নটাও আর দীর্ঘস্থায়ী হলো না।

ইদানিং মন বসে না পড়ার টেবিলে। অথচ পড়াশোনার বিশেষ দরকার। সবেমাত্র গ্রাজুয়েশন শেষ হয়েছে। ঘরের এক কোণায় বেকার পড়ে আছি। চাকরি বাকরির জন্য পড়াশোনা জরুরি।

ভেবে দেখলাম, এই দেশের মানুষ জীবনে দু ধরনের পরীক্ষার জন্য জানপ্রাণ লাগিয়ে পড়াশোনা করে। এক- ভর্তি পরীক্ষা। দুই- চাকরি পরীক্ষা। এটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে চোখে ঘুম চলে আসলো।

ঘুমিয়ে পড়তেই স্বপ্ন দেখলাম। অসম্ভব সুন্দরী এক রমণী স্বপ্নে এসে বলছে, ‘চলো বিয়ে করি।’

শুনে তো আমার আক্কেলগুড়ুম। বলে কী মেয়ে! আমার নিজের স্বপ্নকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। মানে সিরিয়াসলি! বলা নেই কওয়া নেই, হুট করে সুন্দরী এক মেয়ে এসে বিয়ের জন্য চাপাচাপি করছে। তাও আবার যেমন তেমন সুন্দরী না। বিসিএস ক্যাডারদের বউদের মতোন সুন্দরী!

মন চাইল তাকে জড়িয়ে ধরে বলি, ‘হ্যাঁ। চলো বিয়ে করি।’ কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজের ইচ্ছাকে সংবরণ করলাম। হাসি মুখটাকে যথাসম্ভব গুরুগম্ভীর করে জবাব দিলাম, ‘এটা সম্ভব না।’ খেয়াল হলো, জবাব দিতে গিয়ে চোখে জল এসে গেছে।

‘কিন্তু কেন সম্ভব না?’ উদ্বেগ নিয়ে প্রশ্ন করল মেয়েটি।

‘আরে আজব! আমি একজন বেকার যুবক। চাকরি নাই, চালচুলো নাই। এই মুহূর্তে বিয়ে অসম্ভব।’

‘চাকরির জন্যই তো বিয়েটা জরুরি। একটু বোঝার চেষ্টা করো।’

আমি সত্যিই বোঝার চেষ্টা করলাম। কোনো কূল-কিনারা বের করতে পারলাম না। উল্টো মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হয়ে গেল। রাগ হলো নিজের উপর। ছ্যাহ! সুন্দরী মেয়ের পাল্লায় পড়ে কী সব ভাবছি। বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। মেয়েটি কিছুক্ষণ পর আবার বলল, ‘কিছু বুঝতে পারলে?’

‘না। পারিনি। আপনি বোঝান।’

‘মনোযোগ দিয়ে শোনো। আমরা বিয়ে করব। তারপর খুব শীঘ্রই আমাদের বাবু হবে। যেভাবে হোক, যেমন করে হোক, একসঙ্গে ট্রিপল বাবু নিব। একটু কায়দা করে তাদের নামকরণ করলেই তোমার সরকারি চাকরি কনফার্ম!’

আইডিয়া শুনে লাফিয়ে উঠলাম আমি! এতটাই উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলাম যে এক লাফে সোজা স্বপ্ন থেকে বাস্তবে ফিরে এসেছি। মনের ভেতর আনন্দের ঝড় বইছে। টেবিল ঘড়ি দেখলাম। ভোর সাড়ে চারটা বাজে। কোথায় যেন শুনেছিলাম, ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। তার মানে স্বপ্ন এবার সত্যি হবে।

আমার হঠাৎ আফসোস হয়। ইশ! জীবনে বেলা বোসের মতো কেউ একজন থাকলে খুব ভালো হতো। ২৪৪১১৩৯ নম্বরে কল দিয়ে বলতাম, ‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো। এইবার কেউ আটকাতে পারবে না!’

গল্প: স্বপ্ন এবার সত্যি হবে!
লেখা: Zamsedur Rahman Sajib

৬ জুলাই ২০২২

ফটোগ্রাফি ফেস্টিভ্যালবায়োস্কোপ-৪উদ্বোধনঃ ১৭ জুন শুক্রবার, সকাল ১১ টা।বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী (সেগুনবাগিচা,ঢাকা) জাতীয় ...
15/06/2022

ফটোগ্রাফি ফেস্টিভ্যাল
বায়োস্কোপ-৪
উদ্বোধনঃ ১৭ জুন শুক্রবার, সকাল ১১ টা।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী (সেগুনবাগিচা,ঢাকা) জাতীয় চিত্রশালা'র গ্যালারী-৬ এ চলে আসুন দলবলে। দেখা হবে সবার সাথে। পুরস্কার বিতরণ বিকাল ৫ টায়।

12/05/2022

গল্প: চড় কাহিনি
লেখা: Zamsedur Rahman Sajib

জনা বিশেক মানুষ থানার বাইরে ঠাডাপরা রোদে দাঁড়িয়ে আছি। প্রত্যেকেরই কেউ না কেউ থানায় বন্দি। আসামীর নাম ডাকা হলে কয়েকজন করে ভেতরে যাচ্ছে। দেখা সাক্ষাৎ করে আসছে আসামীর সঙ্গে।

এদিকে গরমে খুন হয়ে যাবার মতো অবস্থা। পাশে দাঁড়ানো মাঝ বয়সী একজন আমার কোমড়ে খোঁচা দিল। রাগ হলো প্রচণ্ডরকম। মনে চাইছে ব্যাটার নামে শ্লীলতাহানি কিংবা যৌন হয়রানির মামলা ঠুকে দেই। চেনা নাই জানা নাই, সরাসরি কোমড়ে হাত দিল। মগের মুল্লুক নাকি!

‘আমার ভাই বুঝলেন, আপন মায়ের পেটের ভাই, থানায় তারে দেখবার আইছি।’

খরগোশের মতো লম্বা দুইটা দাঁত বের করে বলল লোকটা। আরে ব্যাটা! আপনের মায়ের পেটের ভাই হোক কিংবা বাপের পেটের ভাই, সেইটা দিয়ে আমি কী করব! দেখা করতে আসছেন, দেখা করে বিদেয় হোন। আমার কোমড় খামচায়া এই অপ্রয়োজনীয় তথ্য বিলি করতে কে বলেছে! মনে মনে বললাম কথাগুলো। সামনাসামনি কিছু বললাম না। চোখ রাঙাতে গিয়ে গরমে চোখে পানি চলে আসলো। কী যে যন্ত্রণা।

‘বুঝলেন ভাই, আমার এই ভাইটা জমিজমা নিয়ে খুব তিড়িংবিড়িং করতেছিল। তেড়ে এসে বলে, তোরে দেইখা নেব। আমি চামে ওর নামে মামলা ঠুকে দিসি। এখন আমিই ওরে দেখতে আসি ফুসরত পাইলে। হেহে!’

এটুকু বলে লোকটা খ্যাকখ্যাক শব্দে হাসতে থাকে। অথচ এখানে হাসির কী আছে বুঝতে পারলাম না। এই যে ভরদুপুরে অহেতুক আমাকে বিরক্ত করছে, শুধুমাত্র এর জেরেই লোকটার নামে বড় ধরনের মামলা হওয়া উচিত। ব্যাটা খরগোশ!

‘এ ভাই, কথা কন না ক্যা? আপনি কারে দেখতে আসছেন?’

‘আমার এক বন্ধুকে দেখতে আসছি।’

‘ও। সে কী করছে? খুন-খারাপি?’

‘বলা যায়। তবে অপরাধ সেটা না। তার আসল অপরাধ সে হুটহাট চড় মেরে বসে।’

‘কীহ! এইটা কোনো অপরাধ হলো নাকি? এ তো সামান্য ব্যাপার। তা কারে চড় মারছিল?’

লোকটার কথার কোনো জবাব দিতে পারলাম না। কী বলব তাকে? কাকে চড় মেরেছে সেই প্রশ্নের চাইতে কাকে চড় মারেনি এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ। কিন্তু আমি চুপচাপ রইলাম। লাজলজ্জার কাহিনি মুখে বলা দুষ্কর। তারচেয়ে লিখে বোঝাই, আপনারা পড়ে কাহিনি বুঝুন।

আমার বন্ধু তানজিম খুবই বিরল প্রজাতির নিরীহ ছেলে। কোনো সাতে-পাঁচে নাই। সরল সোজা ভদ্র স্বভাবের। এতটাই সরল সোজা যে, পরের জন্মে সাপ হয়ে জন্মালেও আঁকাবাঁকা না চলে সোজাই চলবে। এতটুকু গ্যারান্টি আমি দিতে পারি।

কিন্তু তার একটাই দোষ। হুটহাট যে কারও গালে-মুখে চড় মেরে বসে। সেকি চড় নাকি, রীতিমতো ঠাটিয়ে চড়! তবে তার পেছনে যুক্তিযুক্ত কারণ আছে।

রাগে বা আক্রোশে নয়, সে চড় মারে মশা মারার জন্য। ছোটবেলায় একবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিল। এরপর থেকে মশা দেখলেই সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। পাগলা ষাঁড়ের মতো তেড়ে যায়। মশার গুষ্টি উদ্ধার না করা পর্যন্ত তার স্বস্তি হয় না।

মশা নিয়ে তানজিমের জীবনে ট্রাজেডির শেষ নাই। ছোট থাকতে কয়েকবার স্কুল বদলাতে হয়েছে শুধুমাত্র এই মশার কারণে। প্রতিবারই স্কুলের কোনো শিক্ষকের গালে ঠাসঠুস চড় মেরে বসে। পরিণামে টিসি ধরিয়ে দেয় হাতে।

একবার তো স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত মন্ত্রী মহোদয়ের গালেও চড় কষিয়ে দিয়েছিল। ফলস্বরূপ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল তারা।

একাধিকবার প্রেমে ছ্যাকা খাওয়ার একমাত্র কারণ ছিল প্রেমিকার গালে অকস্মাৎ চড় মেরে বসা। বিয়ের দিন কাজী সাহেবকেও ছাড় দেয়নি। সবচাইতে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে চাকরি জীবনে। কলিগ বলি আর অফিসের বস বলি, তানজিমের চড় থেকে কেউই রেহায় পায়নি।

কোনো চাকরি দু মাসের বেশি টেকে না। বন্ধু মহলে তার পরিচয় দাঁড়িয়েছে কিলার তানজিম। যে কী না মশা পেলে ছাড়ে না। খুনোখুনি লাগিয়ে দেয়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, দুনিয়ার আর কারো চোখে মশা পড়ুক বা না পড়ুক, তার চোখে কীভাবে যেন মশা এসে যায়। গন্ধ শুঁকে হোক অথবা ষষ্ঠ ঈন্দ্রিয়ের বারোটা বাজিয়ে, মশাকে সে খুঁজে বের করবেই।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বন্ধু তানজিম আজ থানায় বন্দি। কারণটা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা না। মশা মারতে গিয়েই তার আজ এই পরিণতি। কিন্তু আইনের নীতিমালায় মশা মারাকে কেন্দ্র করে কোনো অপরাধের কথা উল্লেখ নেই। এখানে ভিন্ন একটা প্যাঁচ আছে।

বিয়ের এক বছরও হয়নি, তানজিম এর মাঝেই বেশ কয়েকবার তার স্ত্রীর গালে চড় মেরেছে। এমন নয় যে তার স্ত্রী মূল বিষয়টা জানে না। সে জানে। পরে তানজিমকে নিষেধ করেছে- শুধু মশা কেন, তার গালে হাতি ঘোড়া এসে বসলেও যেন চড় না মারে।

কিন্তু মশা দেখলে কী আর তানজিমের মাথা ঠিক থাকে! কখনোই না। চড় মারা কার্যক্রম তাই অব্যাহত থাকে। অপরদিকে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে তার স্ত্রীও নারী নির্যাতন মামলা দিয়ে বসে।

কথায় আছে কপালের লিখন না যায় খণ্ডন। তানজিমের বেলায় ঠিক তাই ঘটেছে। এমন সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তা তানজিমের নাম ডাকলেন। অবশেষে দেখা করার সুযোগ হলো। থানায় ঢুকে আমাদের উকিল সাহেবকে পেয়ে গেলাম। বাম গালে হাত চেপে বসে আছেন।

আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই তিনি বললেন, ওই হতচ্ছাড়ার কেস তিনি লড়বেন না। যা বোঝার বুঝে গেলাম। উকিলের কাছে ক্ষমা চেয়ে দেখা করলাম তানজিমের সঙ্গে। তার হুলিয়া দেখার মতো হয়েছে। ফুলে ফেঁপে আছে চেহারা চোখ-মুখ। যেন কেউ পায়ের তলায় ফেলে আচ্ছামতো পিষেছে।

‘এ কী রে! তোর চেহারার এই অবস্থা কেন?’

‘আমার পেছনে বাকি চারজনকে দেখছিস, একেকজন দাগী আসামি। মেরে আলুভর্তা করেছে আমাকে।’

‘কিন্তু হুদাই কেন মারতে যাবে তোকে?’

‘আর বলিস না দোস্ত। গতকাল রাতে তাদের গালে-মুখে বারবার মশা এসে বসছিল...!’

‘থাক ভাই। আর কিছু বলতে হবে না। আমি বুঝতে পারছি।’

‘আমি কবে মুক্তি পাব?’

‘যেদিন তোর হাত থেকে মশারা মুক্তি পাবে, সেদিন তোরও মুক্তি মিলবে।’

‘কিন্তু...।’

কথা শেষ করতে পারে না তানজিম। গলা জড়িয়ে আসে। বেচারা অশ্রুসিক্ত চোখে আমার দিকে অপলক তাকিয়ে রয়েছে। আমি কী বলব ভেবে পাই না। দশটা না পাঁচটা না, আমার একটাই বাল্যকালের বন্ধু। অবহেলা করতে পারি না। এড়িয়ে যেতে পারি না। আবার সহ্যও করতে পারি না।

তানজিম ইশারায় কাছে ডাকে। আমি তার দিকে এগিয়ে যাই। পাশে দাঁড়ানো পুলিশ সন্দেহের দৃষ্টিতে আমাদের দিকে চেয়ে রয়েছে। সেদিক থেকে নজর ঘুরিয়ে তানজিমের দিকে ফিরলাম।

সে হয়তো কানে কানে কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। কাছে পৌছানো মাত্র তানজিম ঠাটিয়ে একটা চড় মারল আমাকে। চড় খেয়ে দুনিয়া যখন লাটিমের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন আশপাশে সবার হাসির শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলাম।

রাগে, দুঃখে, লজ্জায় আমি উল্টোপথে হাঁটা ধরি। পেছন থেকে তানজিম একটানা চিল্লিয়ে যাচ্ছে। বলছে- ‘রাগ করিস না দোস্ত। তোকে ইচ্ছে করে মারিনি। এই দেখ, আমার হাতে মশা।’

মনে মনে বলি, ওই মশাকে এবার মাটি দে হতচ্ছাড়া। চল্লিশার আয়োজন করে পুরো এলাকাবাসী ডেকে এনে খাওয়া। তোর মতো বন্ধুর চাইতে মশা মারার কয়েল আর অ্যারোসলও ভালো।

মশা বৃদ্ধি সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, দেশের মন্ত্রী আমলারা যেখানে হাতে হাত গুটিয়ে বসে আছে, সেখানে তানজিমের মতো বোকা ছেলেদের এত হাত চলবে কেন, এত সিরিয়াস হতে হবে কেন! যত্তসব।

১২ মে ২০২২

09/05/2022

মা একেবারে নতুন বউ সেজে আমার রুমে এসে উপস্থিত। তার সাজগোজ দেখে চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেলাম। বাসার মহারানী হুট করে রাজকুমারী হলো কেন বুঝতে পারলাম না।

‘তোমাকে কি ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে? হঠাৎ নতুন বউয়ের সাজ ধরলে যে!’

‘ঢঙের কথা। এটা তোর বাপ শুনলে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করবে।’ মুচকি হেসে বললেন মা।

‘তোমাকে এই সাজে দেখলে এমনিতেও হার্ট অ্যাটাক করবে। নাকি ইতোমধ্যে করে ফেলেছে? হাসপাতালে রওনা হবো?’

‘ধুর। বাজে কথা ছাড় তো। একটু দেখে বল, কপালের টিপটা ঠিকঠাক আছে না? বেশি বড় লাগে?’

‘টিপ না পড়লেই তো ভালো। পথে-ঘাটে পুলিশে আজেবাজে কথা বলবে! খবর দেখো না?’

‘দুনিয়ার সব পুলিশ কী এক নাকি! খারাপ যেমন আছে, তেমনি ভালোও আছে। কোথায় আসলাম তোর মতামত নিতে, আর তুই এটা-সেটা বলে বারবার প্রসঙ্গ ঘুরাচ্ছিস। থাক তুই, আমি গেলাম।’

‘তা নাহয় যাও। কিন্তু এত সাজগোজ করে যাচ্ছটা কোথায়?’

‘আজ আমাদের গার্লস স্কুলের গেট টুগেদার। সেখানে যাব। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হবে। তোর বাপকে দেখে রাখিস।’

মা দ্রুত পায়ে হেঁটে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। আহা, সময়ের কী ব্যবধান। একটা সময় মা কোনো কাজে বা কোথাও গেলে বাবাকে বলে যেত, শহীদকে দেখে রেখো। এখন উল্টো মা আমাকে বলে, বাবাকে যেন দেখে রাখি। সময়ের এই বিবর্তন একেবারেও মন্দ না। বেশ ভালোই লাগে।

পরশু একটা চাকরির পরীক্ষা থাকায় পড়াশোনার চেষ্টা করছি। কিন্তু মন বসে না পড়ার টেবিলে। এমন সময় বাসার কলিংবেলের শব্দ কানে এলো। অনেকক্ষণ ধরে বাজছে। কেউ কোনো সাড়া দিচ্ছে না। অন্যরুম থেকে মায়ের চিৎকার ভেসে এলো, ‘এতক্ষণ ধরে কলিংবেল বাজছে। কেউ দরজা খুলছে না কেন?’

প্রতুত্তরে বাবা হাঁক ছাড়লেন, ‘আরে আমি বাথরুমে। শহীদ করেটা কী?’

এরপর মা পুনরায় যখন চিৎকার জুড়লেন, ততক্ষণে আমি বাসার দরজায় পৌঁছে গেছি। জানি যে দরজা খোলার এই মহান দায়িত্ব আমার ঘাড়েই চাপবে। তখনও অপরপাশের ব্যক্তি মনের হরষে কলিংবেল চেপে যাচ্ছে।

আমি দরজা খুললাম। সামনে অপ্সরীর মতোন সুন্দরী এক নারী দাঁড়িয়ে। আরেকটু হলে ক্রাশই খেয়ে যেতাম। কিন্তু তাকে দেখে মনে হলো, বয়সে তিনি আমার চাইতে অনেক বড়। তাই যথাসময়ে নিজেকে সামলে নিলাম।

‘কাকে চান?’

‘আপনি শরীফ আহমেদ?’ প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন তিনি।

‘উনি বাথরুমে। আমি তার ছেলে। কোনো জরুরি দরকার?’

‘কিরে, কে এসেছে?’

পেছনে মা এসে উপস্থিত হলেন। আমি সরে গিয়ে জায়গা করে দিলাম। এমন সময় বাবাও এসে দাঁড়ালেন। মায়ের পাশে গিয়ে সামনে থাকা নারীকে দেখলেন একনজর। কিন্তু চিনলেন বলে মনে হলো না। মাকে প্রশ্ন করলেন বাবা, ‘ইনি কে?’

‘তা আমি কী করে বলব।’ হতবাক হয়ে জবাব দিলেন মা। তারপর মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কে বলুন তো?’

‘আমি শরীফ আহমেদের হবু স্ত্রী।’

এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো আমরা কেউ বাসায় নেই। বরং রাশিয়া-ইউক্রেন বর্ডারে দাঁড়িয়ে আছি। আর মাত্রই আকাশ থেকে ধামড়া সাইজের বোমা এসে পড়েছে। যেটার বিস্ফোরণে আমরা রীতিমতো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছি। আমার নিজেরই পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হলো। মায়ের অবস্থা বোঝা গেল না। বাবাকে দেখলাম বিশাল বড় হাঁ করে এদিক-সেদিক দুলছে। এমন শক তিনি সামলে উঠতে পারছেন না।

ঘটনার গভীরে ঢুকতে গিয়ে নিজেকে বেশ কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। জানা গেল, মহিলাটির নাম সিলভী রহমান। লন্ডন প্রবাসী। বাবার সাথে তার ফেসবুকে পরিচয়। তারপর প্রেমের টানে সোজা বাংলাদেশে এসেছেন। দুঃখ আর হতাশায় নিজের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে হলো।

আমি ৬ বছর যাবৎ ফেসবুক ব্যবহার করছি। প্রোফাইলে থাকা ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ছবিটা দামী ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে তোলা। অথচ এখন পর্যন্ত গ্রামের একটা মেয়েও পটাতে পারিনি। এদিকে আমার বাবা ফেসবুক আইডি খুলেছে দুই মাসও হয়নি। প্রোফাইলে নিজের কোনো ছবি নেই। বরং খরগোশের ছবি দেওয়া। কিন্তু এরই মাঝে আধা বিদেশি নারী পটিয়ে ফেলেছে। লোকটা পারেও বটে!

পত্রপত্রিকা, টিভি-চ্যানেলে হরহামেশাই খবর দেখা যায়- প্রেমের টানে ব্রাজিল কন্যা উড়ে এলো ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়াতে, নিউজিল্যান্ডের রূপসী এলো নোয়াখালীতে... আরও কত কী! এবার বুঝি বাবার কাহিনিও পত্রিকা-টিভিতে দেখতে হবে। এই সমাজে আর মুখ দেখানোর সুযোগ থাকলো না। বন্ধু-বান্ধবেরা উঠতে বসতে কথা শোনাবে- ‘বাপের ব্যাটা, সিপাহির গাধা!’

মা গলা খাকারি দিলেন। সেই শব্দে আমার হুঁশ ফিরলো। দেখলাম অগ্নি দৃষ্টিতে তিনি বাবার দিকে তাকিয়ে। ভয়ে বাবা শব্দ তুলে ঢোক গিললেন।

‘তোমার কি কিছু বলার আছে?’ প্রশ্ন করলেন মা।

‘হ্যা। আমার কোনো দোষ নাই। সব দোষ শহীদের।’ কাঁপা গলায় জবাব দিলেন বাবা।

‘অ্যাহ! এসব কী বলছ বাবা? রামলীলা করবা তুমি আর রামকেলানি খাব আমি! এটা অন্যায়। কী দোষ করেছি আমি?’ বিস্ময় আর দ্বিধা নিয়ে বললাম কথাগুলো। আকস্মিৎ এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। নিজেকে বাঁচাতে বাবা এভাবে বলির পাঠা বানিয়ে ফেলবে আমাকে, তা একমুহূর্তের জন্যও মাথায় আসেনি। কী ধূর্ত রে বাবা!

‘তোরই দোষ। তুই যদি আমাকে ফেসবুক আইডি খুলে না দিতি, তাহলে আর এতকিছু হতো না।’

‘সে হিসাবে তো সব দোষ মার্ক জাকারবার্গের। ওই ব্যাটা ফেসবুক আবিষ্কার না করলে এইদিন দেখা লাগতো না।’

‘এটাও অবশ্য মন্দ বলিসনি।’ মাথা চুলকে জবাব দেন বাবা।

‘চুপ করো। খবরদার কেউ আর একটা শব্দও উচ্চারণ করবা না।’

ধমকে উঠলেন মা। আমরা বাপ-বেটা ভয়ে জিপার টানলাম ঠোঁটে। শ্বাস-প্রশ্বাসও মেপে মেপে ফেলতে লাগলাম যেন তিনি রেগে না যান। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত রাখলেন মা। তাকে অমন অবস্থায় দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। ধোলাই খাওয়ার রিস্ক না থাকলে সান্ত্বনা দেওয়া যেত। কিন্তু জানের মায়া থাকায় চুপচাপ বসে রইলাম।

বাবার হবু স্ত্রী পরিচয়দানকারী সিলভী রহমানের গল্প শুনলেন মা। তিনি ডিভোর্সি। দুই সন্তান নিয়ে লন্ডনে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। এমন সময় ফেসবুকে বাবার সাথে পরিচয়। ইনবক্সে কদিন আলাপ হয়েছে। বুঝতে পারলেন লোকটা সরল সোজা। যার কারণে ভালোবেসে ফেলেন। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে বিয়ে করবেন?’

বাবা নাকি দুষ্টামি করে জবাব দিয়েছিল, ‘করা যায়।’ এরপর মহিলা ঠিকানা চাইলে বাবা তাকে বাসার ঠিকানা দেন। ভেবেছিলেন ফেইক আইডি, অথবা পরিচিত কেউ মজা নিচ্ছে। তিনি ঘূণাক্ষরেও টের পাননি, খাল কেটে কুমির আনছেন। অথচ কুমির চাষাবাদের কিছুই জানেন না বেচারা!

‘ইয়ে মানে... যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে একটি প্রশ্ন করতাম।’ হাসিমুখে বললাম আমি।

‘বলুন।’

‘আপনার কোনো কন্যা সন্তান আছে?’

‘কেন?’

‘না মানে, ধরেন আমার বাবার ব্যাপারে হতাশ হতে হলো। একেবারে খালি হাতে ফিরে না গিয়ে আমাকে আপনার সম্ভাব্য মেয়ে জামাই হিসেবে বিবেচনা করে দেখতে পারেন!’

লাজুক হেসে বললাম আমি। কিন্তু কোনো রেসপন্স পেলাম না। মহিলা হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। মা আর বাবার কপালে বিরক্তির ভাঁজ দেখা গেল। চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো জবুথবু হয়ে বসে রইলাম। পিনপতন নীরবতা। একটা মুহূর্তে মা কথা বললেন।

‘দেখুন, যা হবার তা তো হয়েছেই। এ নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাই না। সমাজে আমাদের মান-সম্মান রয়েছে। সেটা ধুলোয় মিশে যাক, তা নিশ্চয়ই চাইবেন না। আপনি দয়া করে চলে যান। আমার স্বামীর হয়ে ক্ষমা চাইছি আমি।’

‘ক্ষমা নিতে আসিনি। নিজের হবু স্বামীকে বুঝে নিতে এসেছি। আমি জানতাম, আপনারা কেউ রাজি হবেন না। এজন্য আসার সময় পুলিশে খবর দিয়ে এসেছি। কিছুক্ষণের মধ্যে চলেও আসবে। আমি এখান থেকে একচুল নড়ব না।’

দরাজ গলায় কথাগুলো বলে মোবাইল বের করে কাকে যেন কল দিলেন মহিলা। অন্যদিকে ঘুরে কথা সাড়লেন। এদিকে আমার বাবার কাম সাড়া! তিনি হন্তদন্ত কাঁপছেন। সোফায় তার পাশে বসে সেটা বেশ ভালোভাবেই টের পেলাম। মা ভাবলেশহীন চেহারা বানিয়ে বসে রইলেন। খানিক বাদে কলিংবেলের শব্দ কানে এলো। আমরা সবাই একত্রে দরজার দিকে তাকালাম।

দরজা খোলায় আমার জুড়ি নেই। তাই এবারও আমাকে দরজা খুলতে হলো। কথায় আছে- যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। মহিলা যখন পুলিশের কথা বলেছিলেন, ভেবেছিলাম ঢপ মারছেন। মিছে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখন সত্যি সত্যিই পুলিশ এসে হাজির। দরজা খুলে দেওয়ার পর দেখি, লম্বা চওড়া জলজ্যান্ত এক পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে।

‘আপনিই কি শরীফ আহমেদ?’

‘আমার কপাল এতটাও খারাপ না। আমি শহীদ। শরীফ আহমেদ ভেতরে আছেন।’

কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরে প্রবেশ করলেন পুলিশ অফিসার। একাই এসেছেন। সবাইকে ডাইনিং রুমে দেখে নিজের পরিচয় দিলেন। শহরে নতুন বদলি, নাম ওসি বাদল হোসেন। আমার বাবা হঠাৎ এই ঝড়-বাদল নিতে পারলেন না। মানসিক চাপ, আতঙ্কে কচি খোকার মতো ডুকরে কেঁদে উঠলেন। চোখের জল নাকের জল মিলেমিশে একাকার। সুযোগ বুঝে মায়ের শাড়ির আঁচলে নাকও মুছলেন। তাকে দেখে আমারও কান্না পেল।

‘এইটা কোনো কথা! আমি তো দুষ্টামি করছিলাম। তার এতবড় খেসারত দিতে হবে কে জানতো! ঘরে সুন্দরী বউ, বলদ সমান ছেলে, সুখের সংসার। আমি কেন আরেকটা বিয়ে করতে যাব, তাই হয় নাকি! এটা অন্যায়। আমার কোনো দোষ নাই। সব ভাগ্যের দোষ। পোড়া কপাল, ফাটা কপাল, বিদঘুটে কপাল। আমাকে আপনারা মাফ করে দেন। দোহাই লাগে...!’

বাবা গায়ের জোরে কাঁদছেন, বিলাপ করছেন। আমরা সবাই নীরব দর্শক। এমন অবস্থায় মা হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। সবাই সেদিকে ভূত দেখার মতো হাঁ করে তাকিয়ে আছি। হায়রে! আমার মা কী তবে পাগল হয়ে গেল! বাবার কান্না থেমে গেছে। খানিক বাদে মায়ের সঙ্গে পুলিশ অফিসার এবং মহিলাটিও হাসতে শুরু করলেন!

বাবা আর আমি একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি। কোনো কিছু মিস করে গেলাম কী না বুঝতে পারছি না। বাবার চেহারা একবার হাসি হাসি লাগে, পর মুহূর্তেই আতঙ্কগ্রস্থ দেখায়। হয়তো বুঝতে পারছেন না, বাকিদের সাথে হাসিতে যোগ দেবেন কী না।

‘তুই হেসে দিলি কেন? মজাই তো লাগছিল।’ মায়ের উদ্দেশ্যে বললেন মহিলাটি।

‘বেচারার বিলাপ শুনে হাসি আর আটকে রাখতে পারলাম না।’

‘আমি যে কী কষ্টে হাসি চেপে রেখেছিলাম, সেটা বোঝাতে পারবো না। তবে তুই ঠিকই বলেছিলি, দুলাভাই একেবারেই বাচ্চা মানুষ। তার মতো সহজ সরল মানুষ আর দ্বিতীয়টি নেই। এত সহজে বোকা বনে যাবে, কল্পনাও করিনি।’

তাদের কথোপকথন আমার মাথার উপর দিয়ে গেল। তবে এতটুকু বুঝতে পারলাম, মা আর এই মহিলা একে অপরের চেনা পরিচিত। পাশে তাকিয়ে দেখি বাবা নেই। এদিক-সেদিক নজর ঘুরানোর পর তাকে পাওয়া গেল মেঝেতে! শরীরের ভর ছেড়ে দিয়ে বাবা মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছেন। কপাল বেয়ে ঘাম ছুটছে। তাকে টেনে তুলতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

অতিথি আপ্যায়ন পর্ব চলছে। টেবিলে বাহারি পদের খাবার। বাবা বাদে সকলেই খেতে বসেছি। তিনি নিজেকে বাথরুমে বন্দি করেছেন। লজ্জায় নাকি বেরুতে পারছেন না। এদিকে কলা খেতে খেতে বাকিদের ছলাকলার কাহিনি কীর্তি শুনছি। সিলভী আন্টি আমার মায়ের বান্ধবী। চট্টগ্রামে ছিলেন বহুদিন। পুলিশ অফিসার আর কেউ নন, তারই স্বামী। সম্প্রতি আঙ্কেল ঢাকায় বদলি হওয়ায় শহরে শিফট হয়েছেন।

স্কুল জীবনের বান্ধবী হলেও অনেকদিন তাদের মাঝে দেখা সাক্ষাত নেই। ফেসবুকে টুকটাক আলাপ হতো। এবার স্কুলে গেট টুগেদার উপলক্ষে দেখা হবার কথা ছিল। কিন্তু মায়ের ফন্দিতে এতকিছু ঘটে গেল যা ধারণার বাইরে। সব শুনে আমি ফ্যালফ্যাল চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। গলা শুকিয়ে গেলে কিছুক্ষণ পরপর পানি খাই। আমার মা যে কীরকম ডেঞ্জারাস মানুষ, তা এই প্রথম টের পেলাম।

‘এই যে, বাবু সোনা।’

সিলভী আন্টির ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। বুকের ভেতরে খচখচানি শুরু হয়ে গেছে। আমি এখনো স্বাভাবিক হতে পারিনি। ঈষৎ লজ্জা আর দুশ্চিন্তায় তার দিকে সেভাবে তাকাতেই পারছি না।

‘জি আন্টি, বলুন।’

‘তখন কী যেন বলছিলে? আমার কোনো কন্যা সন্তান আছে কী না? এবার জবাবটা দেই। একটা নয়, আমার দুটো কন্যা সন্তান রয়েছে। বড়জন বিবাহের উপযুক্ত। এবার গিয়ে তোমার বাবাকে ডেকে আনো। আজ বিয়ের পাকা কথা দিয়ে যাই।’ দুষ্টুমি মাখা হাসি দিয়ে বললেন আন্টি।

‘ঠিক আছে আন্টি। আমি এখুনি বাবাকে ডেকে আনছি।’

এই বলে লাফিয়ে উঠে চেয়ার ছাড়লাম। ছুট লাগালাম সেখান থেকে। পেছনে তিনজন মানুষ একসাথে হাসাহাসি করছে। তারা কী ভাবছে কে জানে। আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। যদি তারা ভেবে থাকে- বিয়ের জন্য পাগল হয়ে গেছি অথবা বাবাকে ডাকতে গেছি, তাহলে বড্ড ভুল ভাবছে।

আমি মূলত বাসা থেকে বেরিয়ে যাবার উদ্দেশ্যে ছুট লাগিয়েছি। এক বাসায় বাবা-ছেলে একত্রে বাথরুম আটকিয়ে বসে থাকলে কেমন দেখায়! এর চাইতে লজ্জা এড়াতে দু-একবেলা বাইরে কাটানো উত্তম। কী যে ক্রিটিকাল কন্ডিশনে পড়েছি, বাপরে বাপ!

গল্প: ক্রিটিকাল কন্ডিশন
লেখা: Zamsedur Rahman Sajib

৯ মে ২০২২

Address

Dhaka
1236

Telephone

+8801571773428

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Being Artist posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Establishment

Send a message to Being Artist:

Share