12/07/2026
এই ঘটনায় কয়েকটা লেয়ার আছে।
প্রথমত, অনেকগুলো মিডিয়া, বিশেষ করে বামধারার মিডিয়া, বা অনেক ব্যক্তিও এই ঘটনাকে "অনার কিলিং" হিসেবে অভিহিত করছে। তাদের দাবি, পাকিস্তান/আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশেও অনার কিলিং আমদানি হচ্ছে।
কিন্তু ঘটনার বিবরণ পড়লে পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায়, এটা অনার কিলিংয়ের কোনো ঘটনা না। এখানে পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য মেয়েকে হত্যা করা হয়নি।
মেয়ে একাধিক ছেলের সাথে প্রেম করত, সেজন্য পারিবারিক অশান্তি চলছিল, বাবা মেয়েকে মারতে গিয়েছিল, সেই লাঠির বাড়ি মাথায় লেগে মেয়ে মারা যায়। পরবর্তীতে লাশ গোপন করার জন্য বাবা-মা সেটাকে বস্তাবন্দী করে।
ঘটনার প্রথম অংশ খুবই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে যেহেতু অধিকাংশ মানুষই মুসলমান এবং সমাজ যেহেতু এখনও মোটামুটি রক্ষণশীল, তাই ছেলেমেয়েরা প্রেম করলে বাবা-মা সেটাতে বাধা দিবেই। এবং মেয়ে যদি একাধিক ছেলের সাথে প্রেম করে, তাহলে বাবা-মা যে তাকে মারধোর করবে, সেটাও স্বাভাবিক।
মেরে ফেলাটা অবশ্য স্বাভাবিক না। কিন্তু ঘটনার বিবরণ থেকে বোঝা যায়, মেরে ফেলাটা ইচ্ছাকৃত ছিল না। ওটা দুর্ঘটনাক্রমে মাথায় বাড়ি লেগে যাওয়ায় ঘটেছে। এটা আনফরচুনেট। কিন্তু এরপর যেটা হয়েছে, বস্তাবন্দী করে লাশ গুম করা, সেটা তো পরিষ্কার অপরাধই।
কিন্তু এরপরেই আসে ঘটনার আরেকটা দিক। এই সংক্রান্ত প্রতিটা নিউজের নিউজের নিচে বিপুল সংখ্যক মন্তব্য - বাবা-মা ঠিকই করেছে। এরকম বাবা-মা ঘরে ঘরে দরকার। এরকম মেয়েকে মেরে ফেলা ঠিকই আছে।
এখন ব্যাপারটা একটু চিন্তা করেন। ইসলামে কেউ যদি বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্কও করে, এবং সেটা যদি সে নিজে স্বীকার করে, বা চারজন সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত হয়, তাহলেও কিন্তু তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড না। ১০০ দোররা।
এবং সেটাও প্রমাণ করা খুবই কঠিন। কারণ যদি তিনজন সাক্ষীও তাকে শারীরিক সম্পর্ক করা অবস্থায় দেখে, তাহলেও ওটাকে প্রমাণ হিসেবে ধরা যাবে না। চারজনই লাগবে। উল্টা যদি চারজন সাক্ষী না পাওয়া যায়, তিনজনও পাওয়া যায়, তাহলেও প্রমাণ না হওয়ায় যে অভিযোগ করেছিল, উল্টা তাকেই ৮০ দোররা খেতে হবে মিথ্যা অভিযোগকারী হিসেবে।
অর্থাৎ দেশে যদি শতভাগ শরিয়া আইন থাকত, তারপরেও এই মেয়ের কোনোভাবেই মৃত্যুদণ্ড হতো না। ১০০ দোররাও হতো না। কারণ তার বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগও নাই। প্রেমের অভিযোগে সাধারণ কিছু শাস্তি হতো, যেটা বিচারক পরিস্থিতি বুঝে নির্ধারণ করত।
কিন্তু বাঙালির কাছে ইসলামও যথেষ্ট না। তাদের আরও কঠোর ধর্ম লাগবে। ইসলাম নিজেই এইসব ব্যাপারে যথেষ্ট কড়া, কিন্তু তারা সেটাতেও সন্তুষ্ট না। ইসলামের বাইরে গিয়ে তারা মেয়েকে মেরে ফেলার পক্ষপাতী। এবং এরকম ঘটনা তারা ঘরে ঘরে চায়।
এদের কমেন্টের রিপ্লাই দিলে এরা আপনাকেই অমুসলিম বানিয়ে দিবে। কিন্তু এরা নিজেরা যা চাইছে, তার সাথে ইসলামের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নাই। নিজেদের উগ্রতাকেই এরা ইসলাম বলে ভাবছে এবং ইসলামের নাম দিয়ে চালিয়ে দিতে চাইছে।
আমাদের সমাজের নৈতিকতার অবস্থা ভয়াবহ খারাপ। কিন্তু নৈতিকতা মানে শুধু ছেলেমেয়ের প্রেম না। নৈতিকতা মানে অন্যের ধন-সম্পত্তি মেরে খাওয়া, চুরি-বাটপারি করা, বিভিন্ন অবৈধ কাজকর্ম করা, জুয়া খেলা, ধর্ষণ-বলাৎকার করা - সবকিছুই।
এর সবগুলো থেকেই আমাদের উত্তরণ দরকার। অনেকগুলোতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ দরকার। কিন্তু অনেকগুলো পরাবারিক শিক্ষা, পারিবারিক শাসন আরও বেশি দরকার। পরিবারের মা-বাবার মধ্যেই সবার আগে ইসলামের জ্ঞান এবং চর্চা বেশি দরকার।
সেগুলো নিয়ে আলাপ না করে আরও অনৈসলামিক পথে গিয়ে যে হত্যার যোগ্য না, তাকেও হত্যা করার ব্যাপারে আনন্দ এবং উৎসাহ প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে না ইসলামের কোনো উপকার হবে, না সমাজের কোনো উপকার হবে, না নিজের কোনো উপকার হবে।