24/05/2026
বনলতা এক্সপ্রেস (Banalata Express)
আমার রেটিং: ৭/১০
অবশেষে তানিম নুরের বহুল আলোচিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দেখেই ফেললাম! সিনেমাটা নিয়ে চারদিকে যে পরিমাণ হাইপ ছিল, সত্যি বলতে দেখার পর মনের মধ্যে ভালো লাগা আর কিছু আক্ষেপের একটা দারুণ মিক্সড ফিলিং কাজ করছে। তবে সব খামতি পেরিয়ে দিনশেষে এটা কিন্তু মনটা একদম ভালো করে দেওয়ার মতো একটা সিনেমা।
একদম পিওর ফ্যামিলি ড্রামা!
একদম পিওর আর নিখাদ ফ্যামিলি ড্রামা। হুমায়ুন আহমেদের বিখ্যাত উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে বানানো এই গল্পে এক ট্রেনের জার্নিতেই লুকিয়ে আছে হাসি, আনন্দ, কান্না আর এক অদ্ভুত পরিতৃপ্তি। সিনেমার শেষ দৃশ্যের ইমোশন আর কিছু সংলাপ (যেমন জন্মের সময় কানের আযান আর জানাজার নামাজের মধ্যবর্তী সময়টুকুই যে জীবন) জাস্ট ভেতরটা নাড়িয়ে দেয়! পরিবার নিয়ে একসাথে জম্পেশ করে দেখার মতো চমৎকার পরিচ্ছন্ন একটা সিনেমা।
অভিনয়ের জোর আর ছোট ছোট চরিত্রের সেই ম্যাজিক!
সিনেমার আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে এর কাস্টিংয়ে। বড় বড় তারকাদের পাশাপাশি পার্শ্বচরিত্রগুলো যেভাবে স্ক্রিন কাঁপিয়েছে, জাস্ট ফাটিয়ে দিয়েছে!
মোশাররফ করিম: উনি জাস্ট এক কথায় অনবদ্য! ট্রেলারে ওনার লাউড অভিনয় দেখে একটু ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু সিনেমায় উনি এত শান্ত আর ব্যালেন্সড পারফর্ম করেছেন যে পুরো সিনেমা জুড়েই ওনার একটা অদৃশ্য হোল্ড ছিল।
শরীফুল রাজ: রাজ আসলেই অনেক জোস একজন অভিনেতা, কী সুন্দর অভিনয়টাই না করেছে! ‘আসহাব’ নামের এই লাজুক আর রহস্যময় চরিত্রে ওনার লুক আর পারফরম্যান্স দেখে আমি নিজেই বেশ অবাক হয়েছি। ‘দেয়ালের দেশ’ দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম ওনি কতটা ভার্সেটাইল অ্যাক্টর, এখানেও ওনার কাজ সেই মুগ্ধতার রেশ রেখে গেছে।
শ্যামল মাওলা: এই যাত্রার অন্যতম সেরা পারফর্মার! এংরি দৃশ্যে ওনার ক্যারেক্টারের শেড পরিবর্তন দেখার মতো ছিল, ওনার বউয়ের চরিত্রে মম-ও বেশ বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন।
ছোট্ট নিতু ও পার্শ্বচরিত্রের আসল চমক: উপন্যাসে না থাকলেও সিনেমায় যুক্ত করা আজিজ-আফিয়ার সেই ছোট্ট মেয়ে ‘নিতু’র কাণ্ডকারখানা আর পাক্কা অভিনয় জাস্ট মুগ্ধ করবে! আর পকেটমারের চরিত্রে যিনি ছিলেন, উনি স্ক্রিনে আসা মানেই দুর্দান্ত কিছু! ইভেন লোকো মাস্টার ওনার অভিনয়টাও এত নিখুঁত আর ন্যাচারাল যে পুরো রেলওয়ের চেনা আবহটা ওনারা মিলে একদম জীবন্ত করে তুলেছেন।
মেকিং, স্ক্রিনপ্লে এবং টেকনিক্যাল কেল্লাফতে!
এই সিনেমার মেকিংকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার পেছনে পর্দার পেছনের কারিগরদের অবদান ছিল অসামান্য।
আর ট্রেনের ভেতরের ওই দুর্দান্ত লাইটিং, সিনেমাটোগ্রাফির সাথে তানভীর ইসলাম রিয়াদের করা ইনভিজিবল ও স্পেশাল ভিএফএক্স (VFX) কাজ ছিল এক কথায় ইমপ্রেসিভ! ব্যাকগ্রাউন্ডে আইয়ুব বাচ্চুর ‘উড়াল দেব আকাশে’ বা ‘বাংলাদেশ’ এবং মাইলসের ‘চাইতেই পারো’র মতো জনপ্রিয় গানের নিডেল-ড্রপ ব্যবহার পুরো জার্নিটাকে এক অদ্ভুত নস্টালজিক ফিল দিয়েছে।
তবে হ্যাঁ, কিছু জায়গা আরেকটু ভালো হতেই পারত:
১. শুরুটা আরেকটু 'হুকি' হতে পারত: তানিম নুরের সিনেমা যেভাবে শুরু হয়, সেই তুলনায় এটার স্টার্টিংটা দর্শককে চটজলদি আটকে ফেলার মতো ছিল না। শুরুতে গল্পের গতি কিছুটা ধীর মনে হয়েছে।
২. চরিত্রগুলোর গভীরতা আরেকটু দরকার ছিল: উপন্যাসকে পর্দায় আনায় প্রতিটি চরিত্রের পার্টগুলো বেশ ছোট ছোট মনে হয়েছে। ব্যাকস্টোরি থাকলেও ওনাদের সাথে মনের ভেতরের কানেকশনটা পুরোপুরি তৈরি হওয়ার আগেই যেন পার্ট শেষ হয়ে যায়। এছাড়া ক্লাইম্যাক্সের পর রেজোলিউশন আর ফ্ল্যাশব্যাকগুলো (বিশেষ করে একেকের ফ্ল্যাশব্যাক) একটু কম লেন্দি লেগেছে।
৩. চঞ্চল চৌধুরীকে নিয়ে এক আকাশ আক্ষেপ! আমার সবচেয়ে বড় আক্ষেপের জায়গা কিন্তু চঞ্চল চৌধুরী। উনি এখানে কোনো ক্যামিও ক্যারেক্টার ছিলেন না, বরং একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামন্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন (সাথে ওনার স্ত্রী রূপে বাঁধন)। কিন্তু ওনার স্ক্রিন টাইম ছিল খুবই কম! চঞ্চল চৌধুরীর মতো একজন পাওয়ারহাউজ অভিনেতাকে এমন একটা ইন্টারেস্টিং চরিত্রে পেয়েও এত কম সময়ের জন্য পর্দায় দেখা যাবে, এটা মেনে নেওয়া একটু কঠিন। ওনার চরিত্রটা আরেকটু এক্সপ্লোর করলে সিনেমাটা আরও একধাপ ওপরে যেত।
শেষ কথা:
শুরুর দিকের ধীরগতি আর চরিত্রগুলোর ছোট ছোট পার্টের কমতি থাকলেও, একটা সুন্দর এন্ডিং আর নিখুঁত অভিনয়ের জোরে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ শতভাগ খাঁটি বাংলাদেশী ছায়াছবি হিসেবে মন ভরিয়ে দিয়েছে। যারা এখনো উইকেন্ডে পরিবার নিয়ে কী করবেন ভাবছেন, কোনো চিন্তা ছাড়া টিকিট কেটে দ্রুত দেখে নিতে পারেন! ঈদ আনন্দে কাটুক। ঈদ মোবারক!