04/11/2025
গায়ে কাঁটা দেওয়া শ্রাবণের বৃষ্টিটা শুরু হলো ঠিক তখনই, যখন রীনা ওর নতুন ফ্ল্যাটের খবরের কাগজে মোড়া গ্লাসগুলো গোছাচ্ছিল।
ধানমন্ডির পাঁচতলার এই পুরোনো ফ্ল্যাটটায় ও একা, আর তিন দিনের মাথায়ও কেন বাড়িটাকে ঠিক 'নিজের' বলে মনে হচ্ছে না?
চারদিকে এখনও যুদ্ধক্ষেত্র। খবরের কাগজে মোড়া প্লেট-গ্লাস, দড়ি দিয়ে বাঁধা বইয়ের স্তূপ। এর মধ্যেই আজ সকাল থেকে শুরু হয়েছে ঝুম বৃষ্টি। শ্রাবণের এই বৃষ্টি সহজে থামবার নয়। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে এক কাপ আদা-চা খেতে খেতে রীনা দেখছিল, কীভাবে বৃষ্টির তোড়ে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সামনের লেকটা।
ফ্ল্যাটটা বেশ পুরোনো ধাঁচের। কিন্তু রীনার ভালো লেগেছে এর খোলামেলা ভাব আর ঘরগুলোর উঁচু ছাদ দেখে। শুধু একটা জিনিস একটু অদ্ভুত। বসার ঘরের এক কোণায়, দেয়ালের সাথে লাগানো একটা পুরোনো টেলিফোন টেবিল। আর তার ওপর রাখা একটা ফ্যাকাসে ক্রিম রঙের টিএন্ডটি ল্যান্ডফোন।
প্রথম দিনই রীনা দেখেছিল, ফোনটার কর্ড কাটা। রিসিভারের তলাতেও ধুলোর আস্তরণ। মনে হয় আগের ভাড়াটে শোপিস হিসেবে রেখে গিয়েছিল। রীনাও ওটাকে আর নাড়েনি। এই যুগে ল্যান্ডফোনের কদরই বা কে করে?
সন্ধ্যার আঁধার নামতেই বৃষ্টিটা যেন আরও পেল। সেইসাথে শুরু হলো থেকে থেকে মেঘের গর্জন। রীনা জানালার পর্দাগুলো টেনে দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকেছিল রাতের খাবারের জোগাড় করতে।
এমন সময়, সমস্ত শব্দ ছাপিয়ে, ওটা বেজে উঠলো। তীব্র, যান্ত্রিক, ত্রিং-ত্রিং-ত্রিং!
রীনা চমকে উঠলো। রান্নাঘরের ছুরিটা হাত থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। শব্দটা আসছে বসার ঘর থেকে। অসম্ভব!
ও ধীর পায়ে বসার ঘরে এলো। হ্যাঁ, ওই ক্রিম রঙের ফোনটাই বাজছে। যার লাইন কাটা।
বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠলো। এটা কীভাবে সম্ভব? রীনা ফোনটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ওটা বেজেই চলেছে। একরোখা, কর্কশ শব্দে। পুরো ফ্ল্যাটের সব ফার্নিচার যেন এই একটা শব্দের জন্যেই কান পেতে আছে।
কাঁপতে কাঁপতে রীনা এগিয়ে গেল। হয়তো কোনো ব্যাটারি আছে ভেতরে? বা অন্য কোনো কৌশল? ও রিসিভারটা তুললো।
ওপাশটা আশ্চর্যরকম চুপচাপ। শুধু বৃষ্টির শব্দের মতো একটা হালকা 'শাঁ-শাঁ' আওয়াজ।
"হ্যালো?" রীনার গলাটা নিজের কাছেই অচেনা লাগলো।
কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর নেই। তারপর, ওই 'শাঁ-শাঁ' শব্দের ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ, প্রায় ডুবে যাওয়া একটা গলা ভেসে এলো। ভারী, কফ জড়ানো এক বৃদ্ধ কণ্ঠ।
"মা... ও মা... দরজাটা খোলো।"
রীনার গায়ের রোম খাড়া হয়ে গেল। "কে? কাকে চাচ্ছেন?"
"বড্ড দেরি হয়ে গেল আজ। বাসটা... বাসটা ছাড়েনি..." কণ্ঠটা যেন খুব কষ্ট করে কথা বলছে।
"আপনি ভুল নাম্বারে ফোন করেছেন," রীনা প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো। "এখানে মা-টা কেউ থাকে না।"
ওপাশটা আবার চুপ। রীনা ফোনটা রেখে দিতে যাবে, ঠিক তখনই সেই কণ্ঠস্বর আবার কথা বলে উঠলো। এবার আরও স্পষ্ট, আরও আকুতি ভরা।
"খোলো না মা... বাইরে খুব ঠান্ডা। আমি ভিজে গেছি।"
রীনা রিসিভারটা কানে চেপে ধরলো। "কে আপনি? এই নাম্বার কোথায় পেলেন? এই লাইন তো কাটা!"
"কাটা?" ওপাশের কণ্ঠস্বরটা যেন একটু অবাক হলো। "লাইন কাটা থাকলে কথা বলছো কীভাবে? মা, আমার জ্বর এসেছে মনে হয়... মাথাটা ঘুরছে..."
'ধপ' করে একটা শব্দ হলো। যেন কেউ ফোনটা রেখেই দিলো।
রীনা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিসিভারটা তখনও ওর কানে। ওপাশের লাইনটা এখন পুরোপুরি মৃত। শুধু বৃষ্টির শব্দের ভেতর দিয়ে ওর নিজের হৃৎপিণ্ডের আতঙ্কিত ধুকপুকানি।
ও ধড়াম করে রিসিভারটা নামিয়ে রাখলো। সাথে সাথেই ফোনটা আবার বাজতে শুরু করলো। ত্রিং-ত্রিং-ত্রিং!
রীনা ভয়ে দু'পা পিছিয়ে এলো। ও আর রিসিভার তুললো না। ফোনটা বেজেই চলল। দশ মিনিট... পনেরো মিনিট। রীনা সোফায় বসে কানে আঙুল দিয়ে রইলো। একসময় শব্দটা নিজেই থেমে গেল।
সেদিন রাতে রীনা আর ঘুমাতে পারলো না।
পরদিন সকালে দারোয়ান করিম ভাইকে ধরলো রীনা। কফি খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলো, "করিম ভাই, এই ফ্ল্যাটে আমার আগে কে থাকতো?"
করিম ভাই পান চিবোতে চিবোতে বললো, "আফা, আপনের আগেতো এক সাব থাকতো। ব্যাচেলর।" "আর তার আগে... হেই তো অনেক দিন আগের কথা। এক বুড়ি থাকতো। একলা।"
"একলা?"
"হ। তার পোলা নাকি বিদেশে কাম করতো। টাকা পাঠাইতো, কিন্তু নিজে আইতো না।" করিম ভাই একটু থামলো। "বুড়ি সারাদিন ওই টেলিফোনের কাছে বইসা থাকতো। কইতো, পোলা ফোন দিবো।"
"তারপর?"
"একদিন কী হইল, দুইদিন ধইরা দরজা খোলে না। আমরা দরজা ভাইঙ্গা দেখি, বুড়ি টেলিফোনটা হাতে ধইরা পইড়া আছে। স্ট্রোক করছিল।"
রীনার হাত থেকে কফির মগটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। "কবেকার কথা এটা?"
"তা ধরেন, চাইর-পাঁচ বছর তো হইবোই," করিম ভাই উদাসভাবে বললো। "তয় বুড়ির পোলা আর আহে নাই। আইজও না।"
রীনা আর কিছু না বলে উপরে উঠে এলো। বসার ঘরের কোণায় ফোনটা চুপচাপ বসে আছে। কাল রাতের দুঃস্বপ্ন।
ও এগিয়ে গিয়ে ফোনটার কাটা কর্ডটা ভালো করে দেখলো। হ্যাঁ, তামার তারগুলো বেরিয়ে আছে। এটা বাজার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
রীনা ফোনটা তুলে নিলো। টেবিল থেকে সরিয়ে, বারান্দার এক কোণায় রাখা ময়লার ব্যাগে ফেলে দিলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে, ওর ফ্ল্যাটের কলিংবেলটা বেজে উঠলো।
রীনা দরজা খুললো। দরজার ওপাশে কেউ নেই। শুধু একটা ভেজা ছাতা আর একজোড়া পুরোনো, কাদা মাখা স্যান্ডেল পড়ে আছে।
আর ভেজা মেঝের ওপর দিয়ে পানির দাগ এগিয়ে গেছে বসার ঘরের সেই কোণাটার দিকে, যেখানে একটু আগে পর্যন্ত ফোনটা রাখা ছিল।