30/03/2026
অসমাপ্ত গল্পের শেষ পাতা
শুরু হচ্ছে-
ব্যস্ত শহর নীলগঞ্জ। ইটের পর ইট সাজানো এই শহরে কতশত মানুষের বাস, কিন্তু সবার গল্প এক হয় না। এই শহরেরই এক কোণে একটি ছোট পরিবারে থাকে মাহিয়া। মাহিয়া দেখতে যেমন শান্ত, স্বভাবেও ঠিক ততটাই চুপচাপ। তার জগতটা খুব ছোট—একটু পড়াশোনা আর রাতের আকাশ।
মাহিয়ার ছোট পরিবারে তার সঙ্গে থাকেন তার বাবা আহসান হাবিব এবং মা রেহানা বেগম। আহসান সাহেব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে ঘরে ফিরে তিনি একটু শান্তি খোঁজেন। কিন্তু সেই ঘরে মাহিয়ার জন্য শান্তি খুব দুর্লভ। রেহানা বেগম মাহিয়াকে একদমই পছন্দ করেন না। এর পেছনে এক অদ্ভুত আর নিষ্ঠুর কারণ রয়েছে—রেহানা বেগম সবসময় চেয়েছিলেন তার যেন একটি ছেলে সন্তান হয়। কিন্তু মাহিয়ার জন্মের পর থেকেই তিনি তার ওপর বিমুখ হয়ে আছেন। একটি ফুটফুটে মেয়ে হয়ে জন্মানো যেন মাহিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ।
মাহিয়া এখন নীলগঞ্জ সরকারি কলেজ-এ দ্বাদশ শ্রেণিতে (Class 12) পড়ে। কলেজে তার তেমন কোনো বন্ধু নেই। সে যখন বারান্দা দিয়ে হেঁটে যায়, তখন তাকে দেখলে মনে হয় যেন এক বিষণ্ণ ছায়া হেঁটে যাচ্ছে। বাড়িতে তার কোনো ভুল না থাকলেও মা তাকে সবসময় বকাঝকা করেন, অকারণে রাগ ঝাড়েন। মায়ের কর্কশ কথাগুলো মাহিয়ার কানে তীরের মতো বিঁধলেও সে মাথা নিচু করে সব সহ্য করে নেয়। অবাক করার বিষয় হলো, আহসান সাহেব সব জানতেন। মাহিয়ার ওপর হওয়া এই মানসিক অত্যাচার তিনি নিজের চোখে দেখতেন, তবুও তিনি কোনোদিন প্রতিবাদ করেননি। হয়তো সংসারের অশান্তি এড়াতে, নয়তো তার কাছে মাহিয়ার চোখের জলের চেয়ে নিজের শান্তি বড় ছিল।
মাহিয়ার যখন খুব মন খারাপ হতো, বুক ফেটে কান্না আসত, তখন সে কাউকে কিছু বলত না। রাত গভীর হলে সে চুপচাপ নিজের ঘরের জানালার পাশে গিয়ে বসত। বাইরের অন্ধকারের মাঝে উজ্জ্বল চাঁদ উঁকি দিত। মাহিয়া সেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে করুণ হাসি হাসত। তার সারাদিনের জমানো সব কষ্ট, চোখের জল আর না বলা কথাগুলো সে একমনে চাঁদকে বলত। এই নিঃসঙ্গ শহরে চাঁদই ছিল তার একমাত্র নীরব সঙ্গী, যে অন্তত তার কথাগুলো কোনো অভিযোগ ছাড়াই শুনত।
পরদিন সকালে সূর্য উঠলেও মাহিয়ার জীবনে সেই একই ধূসর রুটিন। নীলগঞ্জ সরকারি কলেজের করিডোর দিয়ে সে যখন ক্লাসরুমের দিকে যাচ্ছিল, তার কাঁধের ব্যাগটা যেন আজ একটু বেশিই ভারী মনে হচ্ছিল।
মাহিয়া দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাসে চুপচাপ পেছনের বেঞ্চে বসেছিল। ইংরেজি ক্লাসে যখন শিক্ষিকা মিসেস সুলতানা তাকে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে দাঁড় করালেন, মাহিয়ার বুকটা ধড়ফড় করতে শুরু করল। সে উত্তরটা জানত, কিন্তু সবার সামনে কথা বলার কথা ভাবতেই তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। নার্ভাস হওয়ার কারণে সে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না, শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ক্লাসের কয়েকজন ছাত্রছাত্রী তখন ফিসফিস করে হাসতে শুরু করল। সেই হাসির শব্দ মাহিয়ার কানে অপমানের তপ্ত শিসার মতো বাজছিল।
মাহিয়ার চোখে পানি এসে যাচ্ছিল, কিন্তু মিসেস সুলতানা পরিস্থিতি বুঝতে পারলেন। তিনি কঠোর গলায় বাকিদের ধমক দিয়ে শান্ত করলেন এবং বললেন, "মাহিয়াকে নিয়ে হাসাহাসি করার কিছু নেই। সে অনেক মেধাবী, শুধু একটু লাজুক।" তিনি মাহিয়াকে আলতো করে বসিয়ে দিয়ে তাকে অভয় দিলেন। মাহিয়ার মনে হলো, এই মরুময় জীবনে এইটুকু সহমর্মিতাই তার জন্য অনেক বড় পাওনা।
ক্লাস শেষে ঘোষণা করা হলো যে কলেজ থেকে একটি শিক্ষাসফরের বা পিকনিকের আয়োজন করা হয়েছে। গন্তব্য হলো উত্তরবঙ্গের এক দুর্গম কিন্তু মায়াবী পাহাড়ী এলাকা—'মেঘগিরি'।
পাহাড়ের পাদদেশে একটি ছোট গ্রাম, যার চারপাশ ঘিরে রয়েছে নিবিড় ঘন জঙ্গল। সবাই হইহই করে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু মাহিয়ার মনে মেঘ জমল। বনভোজনের জন্য যে বিশাল অংকের চাঁদা ধরা হয়েছে, তার বাবার কাছে চাইলে হয়তো মা অশান্তি করবেন, আর মা তো কোনোদিনও এই টাকা দেবেন না।
মাহিয়ার বিমর্ষ চেহারা দেখে মিসেস সুলতানা তাকে আলাদা করে ডেকে নিলেন। তিনি মাহিয়ার পারিবারিক অবস্থা কিছুটা জানতেন। তিনি হাসিমুখে বললেন, "মাহিয়া, তোমার চাঁদা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তুমি আমার সাথে আমার সঙ্গী হিসেবে যাবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।" মাহিয়ার বিষণ্ণ মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে প্রথমবার কোনো ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে!
সেই রাতে জানালা দিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে মাহিয়া অনেক হাসল। সে চাঁদকে বলল, "জানো চাঁদ, আমি পাহাড় দেখতে যাব! সেখানে মেঘগুলো নাকি হাতের কাছে এসে ধরা দেয়। তুমিও কি সেখানে থাকবে আমার সাথে?"
পরদিন মাহিয়ার দিনটি শুরু হয়েছিল এক বুক আশা নিয়ে। কলেজে গিয়ে সে ক্লাসে মন দেওয়ার চেষ্টা করল। টিফিন পিরিয়ডে সবাই যখন পাহাড়ী এলাকায় যাওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব আর কেনাকাটার পরিকল্পনা করছিল, মাহিয়া তখন এক কোণে বসে ভাবছিল তার এই নতুন অভিজ্ঞতার কথা। মিসেস সুলতানার স্নেহ মাখানো আশ্বাসে তার মনটা একটু হালকা হয়েছিল।
কিন্তু বাড়ি ফেরার সাথে সাথেই সেই চেনা অন্ধকার তাকে গ্রাস করল। মাহিয়ার বাড়িতে ফেরার পর এক মুহূর্তও বিশ্রাম নেওয়ার জো নেই। কলেজের ব্যাগটা রেখেই তাকে রান্নাঘরের কাজে হাত দিতে হলো। ঘর মোছা থেকে শুরু করে রাতের রান্নার প্রস্তুতি—সবই তাকে করতে হয়। এক পর্যায়ে কাজ করতে করতে অসাবধানতাবশত একটি কাঁচের গ্লাস তার হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায়।
শব্দ শুনেই রেহানা বেগম ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকলেন। গ্লাস ভাঙা দেখেই তার রাগ চরমে উঠল। তিনি চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, "অলক্ষ্মী মেয়ে! একটা কাজও ঠিকমতো করতে পারিস না? তোকে পেটে ধরেছিলাম বলেই আজ আমার জীবনে এত অশান্তি। ছেলে হলে অন্তত বুড়ো বয়সের লাঠি হতো, আর তুই হলি গলার কাঁটা!"
রেহানা বেগমের এই কথাগুলো মাহিয়ার মনে গভীর ক্ষত তৈরি করল। সে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, তার গাল বেয়ে টপ টপ করে চোখের জল পড়ছিল। কিন্তু মায়ের রাগের যেন শেষ নেই। তিনি আরও বললেন, "তোর মতো মেয়ে মরে গেলেই আমি বাঁচি।" মাহিয়া চিৎকার করে কাঁদতে চেয়েছিল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। বাবা আহসান সাহেব পাশের ঘরে বসে সব শুনছিলেন, কিন্তু তিনি একবারের জন্যও উঠে এসে মাহিয়ার পক্ষ নিলেন না।
রাতে খাবার টেবিলে এক অসহ্য নীরবতা বিরাজ করছিল। মাহিয়া কোনোমতে কয়েক দানা ভাত মুখে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। তার মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে সে একদম একা, কেউ তাকে ভালোবাসার নেই।
মধ্যরাতে যখন পুরো শহর ঘুমে বিভোর, মাহিয়া তখন তার জানালার পাশে গিয়ে বসল। আকাশে আজ চাঁদটা অনেক বড় আর উজ্জ্বল। মাহিয়া চাঁদের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে বলতে লাগল, "চাঁদ, মা আমাকে কেন এত ঘৃণা করে? আমার অপরাধ কি শুধুই আমি মেয়ে হয়ে জন্মেছি? আমি তো কোনোদিন কারো ক্ষতি করিনি। বাবা কেন কিছু বলেন না? আমার খুব কষ্ট হয় চাঁদ, মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যদি কোনোদিন হারিয়ে যেতাম, কেউ কি আমাকে খুঁজত?"
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি এলো। ভোরের আলো তখনও ভালো করে ফোটেনি, চারদিকে হালকা কুয়াশার চাদর। মাহিয়ার বুকটা আজ এক অজানা আশঙ্কায় নয়, বরং এক চিমটি আনন্দে দুলছে। কথা মতো মিসেস সুলতানা নিজেই মাহিয়ার বাড়িতে গাড়ি নিয়ে এলেন। রেহানা বেগম খুব একটা খুশি না হলেও শিক্ষিকার সামনে কিছু বলতে পারলেন না। কোনো বড় ঝামেলা ছাড়াই মাহিয়া আজ ঘর থেকে বের হতে পারল।
সবাই বাসে উঠল। নীলগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কলকাকলিতে বাসটা মুখর। মাহিয়া সবার থেকে আলাদা হয়ে একদম পেছনের সিটে জানালার পাশে বসল। বাস চলতে শুরু করতেই বাইরের ঠাণ্ডা হাওয়া তার মুখে ঝাপটা দিয়ে গেল। জানালার বাইরে দ্রুত সরে যাওয়া গাছপালা, দিগন্তজোড়া মাঠ আর ভোরের স্নিগ্ধতা দেখে মাহিয়ার চোখে জল চলে এল। এটা দুঃখের জল নয়, এটা মুক্তির জল।
মাহিয়া মনে মনে বলতে লাগল—
"হয়তো এই বাসটা যদি কোনোদিন না থামত! যদি এই পথটা কোনোদিন শেষ না হতো! এই প্রকৃতি আমাকে ঘৃণা করে না, এই হাওয়া আমাকে বকা দেয় না। মা কেন আমাকে বুঝতে পারল না? কেন আমি তাঁর কাছে গলার কাঁটা? হে ঈশ্বর, এই পাহাড়ের কোলে আমাকে কোথাও লুকিয়ে ফেলো। আমি আর ওই চার দেয়ালের বন্দিশালায় ফিরতে চাই না। আমি এই অসীম আকাশ আর বুনো সবুজেই হারিয়ে যেতে চাই।"
বাস যখন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে উঠতে শুরু করল, মাহিয়ার শান্তি তখন চরমে। কিন্তু মানুষের সুখ কেন জানি খুব ক্ষণস্থায়ী হয়। হঠাৎ এক বিকট শব্দে বাসটি ব্রেক কষল। রাস্তার মাঝে বড় বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে পথ আটকে রাখা হয়েছে।
মুহূর্তের মধ্যে বাসের দরজা খুলে গেল। হুড়মুড় করে বাসে উঠে পড়ল তিনজন মুখোশধারী লোক। তাদের প্রত্যেকের হাতে ধারালো বড় বড় ছুরি। বাসের আনন্দঘন পরিবেশ এক নিমেষেই নরক হয়ে উঠল। মেয়েদের চিৎকারে আর ছেলেদের আতঙ্কে বাসটা কাঁপতে লাগল। মাহিয়াও ভয়ে কুঁকড়ে জানালার সাথে মিশে গেল। তার শান্ত পৃথিবীটা আবারও অশান্ত হয়ে উঠল।
ডাকাতদের মধ্যে একজন গম্ভীর গলায় গর্জে উঠল, "চুপ! একদম চুপ! কেউ যদি টু শব্দ করো, কলিজা নামিয়ে দেব।" তারা ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল বাস চালিয়ে নিয়ে যেতে। বাসটা এখন হাইজ্যাক হয়েছে। তারা সবাইকে অভয় দিয়ে বলল, "শান্ত হয়ে বসো। কথা শুনলে কারো ক্ষতি করব না। শুধু যা করতে বলি তা করো।"
বাসের ভেতরে এখন পিনপতন নীরবতা, শুধু কান্নার চাপা শব্দ আর ডাকাতদের কর্কশ কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। ডাকাতরা একে একে সবার কাছ থেকে মোবাইল, টাকা আর সোনার গয়না লুটে নিতে শুরু করল। মাহিয়ার কাছে মূল্যবান বলতে কিছুই ছিল না, শুধু একটি সস্তা ঘড়ি আর তার পড়ার বইগুলো। সে ভয়ে কুঁকড়ে বসে দেখছিল মানুষের অসহায়ত্ব।
লুট করা শেষ করে ডাকাতরা বাসের মাঝখানে বসে মালপত্র ভাগাভাগি করতে শুরু করে। কিন্তু লোভ মানুষের হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নেয়। ভাগাভাগি নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই শুরু হলো প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডা। দুই ডাকাত মিলে তৃতীয় ডাকাতের ওপর চড়াও হলো। এই তৃতীয় ডাকাতটির নাম আরিয়ান। আরিয়ান বাকিদের মতো নিষ্ঠুর ছিল না, সে বারবার বলছিল ছাত্রছাত্রীদের যেন বেশি আতঙ্কিত না করা হয়।
বাকি দুজন আরিয়ানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আরিয়ান একা হলেও বেশ সাহসী ছিল। সে চলন্ত বাসের মধ্যেই খালি হাতে লড়াই শুরু করল। কিন্তু হঠাৎ পরিস্থিতির মোড় ঘুরে গেল। এক ডাকাত কোমরের পেছন থেকে একটি পিস্তল বের করে চিৎকার করে উঠল। সে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে প্রথম গুলিটি ছুঁড়ল, যা সরাসরি গিয়ে লাগল ড্রাইভারের কাঁধে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে ড্রাইভার স্টিয়ারিং ছেড়ে দিল।
পরের মুহূর্তেই দ্বিতীয় গুলিটি চলল। এবার গুলিটি আরিয়ানের বাম হাতে বিঁধে গেল। আরিয়ান যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে বাসের মেঝেতে পড়ে গেল।
রক্তে বাসের মেঝে লাল হতে শুরু করল। বাকি দুই ডাকাত বুঝতে পারল বাসটি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং ড্রাইভার আহত হওয়ায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তারা দ্রুত বাসের দরজা খুলে চলন্ত বাস থেকেই নিচে লাফিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
বাসটি এখন চালকহীন। ড্রাইভার স্টিয়ারিংয়ের ওপর লুটিয়ে পড়েছে। আরিয়ান রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছটফট করছে। বাসের সবাই ভয়ে চিৎকার করছে, কারণ বাসটি এখন দ্রুতগতিতে পাহাড়ের খাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাহিয়া তার সিট থেকে দেখল, মৃত্যু যেন তাদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
নিয়ন্ত্রণহীন বাসটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রচণ্ড শব্দে নিচের খাদে গিয়ে আছড়ে পড়ল। গাছপালার ঝোপঝাড় থাকায় বাসের পতনের গতি কিছুটা কমে এসেছিল, তাই বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটল না। বাসের ভেতর চারদিকে শুধু কাঁচ ভাঙার শব্দ আর আর্তনাদ। এক সময় সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে।
চারদিকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর পুলিশের বাঁশির শব্দ শোনা যাচ্ছে। বাসের ভেতর মাহিয়ার জ্ঞান ফিরল সবার আগে। তার কপালে সামান্য চোট লেগেছে, কিন্তু শরীরের অন্য কোথাও বড় আঘাত নেই। সে দেখল সহপাঠীরা এবং শিক্ষিকারা একে একে বাস থেকে বের হচ্ছে বা উদ্ধারকর্মীরা তাদের নিয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই মাহিয়ার নজর পড়ল বাসের পেছনের দিকের মেঝেতে। সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে আরিয়ান। তার শরীর থেকে প্রচুর রক্ত ঝরছে, চোখ দুটো বোজা। মাহিয়া জানত সে একজন ডাকাত, কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে দেখে মাহিয়ার মনে এক অদ্ভুত মায়া হলো। হয়তো বাড়িতে নিজের প্রতি হওয়া অবহেলা আর একাকীত্ব তাকে অন্যের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছে।
মাহিয়া চুপিচুপি আরিয়ানের কাছে গিয়ে বসল। আরিয়ান যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে চোখ মেলল। মাহিয়ার দিকে তাকিয়ে সে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, "আমাকে... আমাকে এখান থেকে সরিয়ে দাও। পুলিশ আমাকে ধরলে আমার নির্ঘাত ফাঁসি হবে। আমি... আমি মরতে চাই না এভাবে।"
মাহিয়া দ্বিধায় পড়ে গেল। সে কাঁপা গলায় বলল, "কিন্তু আপনি তো ডাকাত! আপনি আমাদের ক্ষতি করতে চেয়েছিলেন।"
আরিয়ান মাহিয়ার হাতটা ধরার চেষ্টা করে বলল, "আমি পরিস্থিতির শিকার... দয়া করো মেয়েটি, আমাকে ওই জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যাও। আমি নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নেব। আমাকে বাঁচাও!"
মাহিয়ার মন মানল না। সে দেখল পুলিশ বাসের অন্য প্রান্তে সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত। এই সুযোগে সে আরিয়ানকে টেনেহিঁচড়ে বাসের পেছনের ভাঙা জানালা দিয়ে বাইরে বের করল। আরিয়ান যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিল, কিন্তু মাহিয়া তার সবটুকু শক্তি দিয়ে তাকে ধরে বনের ঘন অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
ঘন জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে তারা যখন বেশ কিছুটা ভেতরে ঢুকে পড়ল, তখন বাসের সাইরেনের শব্দ দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। মাহিয়া এখন এক অজানা জঙ্গলে, পাশে এক আহত ডাকাত। সে বুঝতে পারল না সে ঠিক করল না ভুল।
রাত গভীর হচ্ছে। নীলগঞ্জ সরকারি কলেজের বাস দুর্ঘটনাস্থলে এখন পুলিশের গাড়ির নীল-লাল বাতি আর উদ্ধারকর্মীদের ব্যস্ততা। একে একে সবাইকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আহসান হাবিব আর রেহানা বেগম হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে পৌঁছালেও সেখানে মাহিয়ার দেখা মিলল না। পুলিশ চারদিকে তল্লাশি চালাচ্ছে, কিন্তু ঘন জঙ্গলের ভেতরে মাহিয়ার কোনো চিহ্ন নেই। শহরের শান্ত মেয়েটি যেন এক নিমিষেই অন্ধকার অরণ্যে বিলীন হয়ে গেছে।
জঙ্গলের অনেকটা গভীরে, একটি ছোট স্বচ্ছ জলের জলাশয়ের ধারে পাথরের ওপর বসে আছে আরিয়ান। মাহিয়ার কাঁধের ওপর ভর দিয়ে সে এতদূর আসতে পেরেছে। মাহিয়ার হাতে তখনও কাঁপন, চোখে অজানা ভয়। চাঁদের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে জলাশয়ের জলে প্রতিফলিত হয়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে।
আরিয়ান তার রক্তাক্ত হাতটা চেপে ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ধন্যবাদ মাহিয়া। আজ তুমি না থাকলে হয়তো অন্ধকার সেলের ভেতরে আমার জায়গা হতো। কেন বাঁচালে আমাকে? আমি তো একজন অপরাধী।"
মাহিয়া থতমত খেয়ে বলল, "আমি জানি না। শুধু মনে হলো, আপনাকে এভাবে ফেলে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু আপনি কেন এই কাজ করেন? কেন মানুষের ক্ষতি করেন?"
আরিয়ান তিতকুটে হাসল। তারপর ম্লান স্বরে বলতে শুরু করল, "ক্ষতি করতে চাইনি কোনোদিন। ওই যে দুজন পালিয়ে গেল, ওরা আগেও আমাকে বারবার ধোঁকা দিয়েছে। আজ তো আমাকে মেরেই ফেলত। আমি এই পথে এসেছি শুধু একজনের জন্য—আমার মায়ের জন্য।"
আরিয়ানের কথা শুনে মাহিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান বলতে থাকল, "আমার মা... তিনি 'মাল্টিপল মাইলোমা' নামক এক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত। হাড়ের ক্যান্সার। প্রতি মাসে ইনজেকশন আর চিকিৎসার জন্য যে টাকা লাগে, তা জোগাড় করার মতো কোনো বৈধ পথ আমার সামনে খোলা ছিল না। আমি জানি আমি পাপ করছি, কিন্তু মায়ের যন্ত্রণার চেয়ে বড় কোনো নরক আমার কাছে নেই।"
আরিয়ানের চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। সে আবেগপ্রবণ হয়ে বলল—
"মাহিয়া, সমাজ আমাকে ডাকাত বলে চেনে, কিন্তু মায়ের কাছে আমি আজও সেই ছোট্ট খোকা। মা যখন যন্ত্রণায় কাতরায়, তখন আমার বিবেক কাজ করে না। আমি শুধু টাকা দেখি। আমার মা জানে না তার ছেলে হারানো পথে হাঁটছে। সে ভাবে আমি শহরে চাকরি করি। যদি আমি আজ মরে যেতাম বা জেলে যেতাম, আমার মা বিনা চিকিৎসায় তিলে তিলে শেষ হয়ে যেত।"
মাহিয়া স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। তার নিজের মা তাকে ঘৃণা করে কারণ সে মেয়ে, আর এই ছেলেটি তার মাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে অপরাধ জগতে পা বাড়িয়েছে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! মাহিয়ার মনে আরিয়ানের প্রতি থাকা ভয়টা ধীরে ধীরে মুছে গিয়ে এক গভীর মমতা আর শ্রদ্ধার জন্ম নিল। সে বুঝতে পারল, প্রতিটি মানুষের আড়ালে এক একটা অদৃশ্য ক্ষত থাকে।
পরদিন সকালে নীলগঞ্জ থানায় এক গুমোট পরিবেশ। আহসান হাবিব ম্লান মুখে বসে আছেন, আর রেহানা বেগম লোকদেখানো কান্নাকাটি করছেন। পুলিশ অফিসার জানালেন, দুর্গম মেঘগিরি জঙ্গলে উদ্ধারকাজ চালানো সহজ নয়, তবে তারা একটি বিশেষ টিম গঠন করেছেন যারা ড্রোন এবং প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে তল্লাশি শুরু করবে। জঙ্গলটি বিশাল এবং গোলকধাঁধার মতো, তাই মাহিয়ার খোঁজ পাওয়া সময়ের ব্যাপার।
অন্যদিকে, জঙ্গলের গভীরে মাহিয়া আর আরিয়ানের পৃথিবীটা একদম আলাদা। ভোরের আলো ফুটতেই মাহিয়া জলাশয়ের ধারে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিল। তার খুব খিদে পেয়েছে, কিন্তু এখানে খাবারের কোনো উৎস নেই। তবে আরিয়ান পাহাড়ের ছেলে, সে ম্লান হেসে ইশারায় কাছের কিছু বুনো ফল আর কচি ডুমুর দেখিয়ে দিল যেগুলো খাওয়া নিরাপদ। মাহিয়া অনেক কষ্ট করে সেগুলো পেড়ে আনল। এই প্রথম শহরের আলিশাদ মেয়েটি বুনো ফল দিয়ে সকালের নাস্তা সারল।
আরিয়ানের হাতের ক্ষতটা তখন ফুলে লাল হয়ে আছে। মাহিয়া ছোটবেলায় তার দাদির কাছে শুনেছিল কিছু লতা-পাতার গুণাগুণ। সে জলাশয়ের চারপাশ খুঁজে 'বিষল্যকরণী' আর নিম জাতীয় কিছু বুনো পাতা সংগ্রহ করল। তারপর একটি মসৃণ পাথরের ওপর অন্য একটি পাথর দিয়ে ঘষে ঘষে পাতাগুলো পিষে নিল। আরিয়ান অবাক হয়ে দেখছিল মাহিয়ার একাগ্রতা। মাহিয়া খুব যত্ন করে আরিয়ানের ক্ষতস্থানে সেই পাতার রস লাগিয়ে দিল এবং নিজের ওড়নার এক কোণ ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ করে দিল।
মাহিয়ার হাতের নরম ছোঁয়া আর তার এই নিঃস্বার্থ সেবা দেখে আরিয়ান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। যে মেয়েটিকে সে কয়েক ঘণ্টা আগে ভয় দেখিয়েছিল, সেই মেয়েটিই আজ তার জীবন বাঁচাচ্ছে। আরিয়ানের মনে হলো, পৃথিবীর সব অন্ধকার একদিকে আর মাহিয়ার এই পবিত্র মায়া অন্য দিকে। সে মনে মনে অনুভব করল, জীবনের এই কঠিনতম সময়ে সে হয়তো তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারটি খুঁজে পেয়েছে—ভালোবাসা।
দুপুরের খাবারের জন্য মাহিয়া জলাশয় থেকে পাথর ছুঁড়ে আর লাঠির সাহায্যে কিছু কাঁকড়া আর ছোট মাছ ধরার চেষ্টা করল। খুব সামান্য কিছু খাবার জোগাড় হলেও তারা ভাগ করে খেল। বিকেলে তারা শুকনো ডালপালা আর লতা দিয়ে একটি অস্থায়ী আস্তানা তৈরি করল।
রাত নামতেই জঙ্গলে শীতের প্রকোপ বাড়ল। মাহিয়া বুঝতে পারল আগুন ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব। সে বনের ভেতর থেকে শুকনো চকমকি পাথর (Flint stones) খুঁজে বের করল। অনেকক্ষণ ধরে পাথর দুটোকে একে অপরের সাথে ঘষতে ঘষতে আগুনের ফুলকি বের হলো, যা দিয়ে সে শুকনো পাতার স্তূপে আগুন ধরাল। আগুনের হালকা আঁচ আর লেলিহান শিখা তাদের শরীরকে উষ্ণ করল।
পরদিন সকালের সূর্য মেঘগিরির ঘন জঙ্গলের মাথায় উঁকি দিতেই শুরু হলো পুলিশের বিশেষ অভিযান। পাঁচজন চৌকস স্পেশাল ফোর্সের সদস্য নিয়ে গঠিত এই দলের নেতৃত্বে আছেন ইন্সপেক্টর রাজিব সারোয়ার। তিনি অত্যন্ত দক্ষ এবং শান্ত মেজাজের মানুষ। জঙ্গলের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি তার ড্রোনটি আকাশে ওড়ালেন। ড্রোনের ক্যামেরায় জঙ্গলের ওপরের ঘন সবুজ আস্তরণ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু মাহিয়ার কোনো চিহ্ন মিলছে না। রাজিব তার দল নিয়ে ধীরে ধীরে জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করলেন।
অন্যদিকে, আরিয়ানের ক্ষত এখন অনেকটা শুকিয়ে এসেছে। মাহিয়ার দেওয়া ভেষজ ওষুধ আর যত্নে সে এখন উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি ফিরে পেয়েছে। সকালে উঠে আরিয়ান মাহিয়াকে বলল, "মাহিয়া, আমি এখন মোটামুটি হাঁটতে পারব। চলো, তোমাকে তোমার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসি। পুলিশ নিশ্চয়ই তোমাকে খুঁজছে।"
আরিয়ানের কথা শুনে মাহিয়ার মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। সে বিষণ্ণ স্বরে বলল, "না আরিয়ান, আমি এখনই ওখান ফিরতে চাই না।"
আরিয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন? তোমার মা-বাবা তো দুশ্চিন্তা করছেন।"
মাহিয়া চুপ করে রইল। সে বলতে পারল না যে ওই বাড়িতে তার জন্য ভালোবাসা নেই, আছে শুধু ঘৃণা আর অবহেলা। সে শুধু ছোট করে বলল, "ওখানে কেউ আমাকে চায় না।"
দুপুরের দিকে তারা যখন জঙ্গলের সরু পথ দিয়ে হাঁটছিল, তখন হঠাৎ গাছের ডাল থেকে একটি বিষধর সাপ মাহিয়ার ঘাড়ের কাছে ঝুলে পড়ল। মাহিয়া আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। সাপটি ফণা তুলে মাক্রমণ করতে উদ্যত হতেই আরিয়ান ক্ষিপ্র গতিতে সাপের মাথাটা খপ করে ধরে ফেলল এবং দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। মাহিয়া ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। আরিয়ান তার কাঁধে হাত রেখে অভয় দিল। মাহিয়া ভেজা চোখে তাকিয়ে বলল, "ধন্যবাদ আরিয়ান। তুমি না থাকলে আজ হয়তো আমি থাকতাম না।"
রাত নামার সাথে সাথে পাহাড়ি জঙ্গলের শীতটা আরও জেঁকে বসল। মাহিয়া একটি গাছের তলায় কুঁকড়ে শুয়ে ছিল, ঠাণ্ডায় তার শরীর কাঁপছিল। আরিয়ান পাশেই বসে রাত জাগছিল। সে দেখল মাহিয়ার কষ্ট হচ্ছে। তার নিজের শরীরেও একটা জ্যাকেট ছিল, সে সেটি খুলে খুব সাবধানে মাহিয়ার গায়ের ওপর বিছিয়ে দিল। আরিয়ান নিজে ঠাণ্ডায় কষ্ট পেলেও মাহিয়ার প্রশান্ত ঘুম দেখে তার মনটা এক অজানা শান্তিতে ভরে উঠল।
পরদিন ভোরে যখন বনের পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে, মাহিয়ার ঘুম ভাঙল। চোখ মেলতেই সে দেখল আগুনের কুণ্ডলীটা নিভে ছাই হয়ে আছে, আর পাশের পাথরের ওপর আরিয়ান নেই। মাহিয়া ধড়ফড় করে উঠে বসল। চারদিকে ঘন কুয়াশা আর নিস্তব্ধতা। সে বারবার আরিয়ানের নাম ধরে ডাকল, কিন্তু বনের প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কোনো উত্তর এলো না।
মাহিয়ার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে পাথরের ওপর বসে দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার মনে হতে লাগল—সবাই তাকে ছেড়ে চলে যায়। মা তাকে চায় না, বাবা তাকে বোঝেন না, আর এখন এই গভীর জঙ্গলে যে মানুষটির ওপর সে ভরসা করেছিল, সেও কি তাকে ফেলে চলে গেল? এই নিঝুম অরণ্যে তার একাকীত্ব যেন এক বিশাল দানবের মতো তাকে গিলে খেতে আসছে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, "আমি জানতাম, আমার ভাগ্যে কেউ নেই। সবাই আমাকে একা করে দেয়। কেন তুমিও চলে গেলে আরিয়ান?"
ঠিক তখনই ঝোপঝাড়ের আড়ালে খসখস শব্দ হলো। মাহিয়া ভয়ে মুখ তুলে দেখল, আরিয়ান দুই হাতে কিছু বুনো ফল আর একটা প্লাস্টিকের বোতলে পরিষ্কার জল নিয়ে ফিরে আসছে। মাহিয়াকে কাঁদতে দেখে আরিয়ান দ্রুত দৌড়ে কাছে এলো। সে কিছু বলার আগেই মাহিয়া পাগলের মতো আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্নায় আজ কোনো লুকোছাপা ছিল না।
আরিয়ান থতমত খেয়ে গেল, তার হাতের ফলগুলো নিচে পড়ে গেল। সে আলতো করে মাহিয়ার মাথায় হাত রাখল এবং শান্ত গলায় বলল, "আরে, কাঁদছ কেন? আমি তো কোথাও যাইনি। তোমার জন্য সকালের খাবার খুঁজতে গিয়েছিলাম। এই তো আমি আছি।"
মাহিয়া কান্নাভেজা গলায় বলল, "আমি ভেবেছিলাম তুমিও আমাকে একা ফেলে চলে গেছ। আরিয়ান, আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না। কিন্তু কেন জানি তোমাকে দেখার পর থেকে মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীতে অন্তত একজন আছে যার কাছে আমি নিরাপদ। আমি তোমাকে অনেক আপন ভাবতে শুরু করেছি। প্লিজ, আমাকে কখনো ছেড়ে যেও না।"
আরিয়ান মাহিয়ার অশ্রুসিক্ত মুখটা দুহাতে তুলে ধরল। মাহিয়া তখন তার জীবনের সব না বলা কষ্টের কথাগুলো বলে দিল—কিভাবে তার মা তাকে ঘৃণা করে, কিভাবে সে ছোটবেলা থেকে একাকীত্বের সাথে যুদ্ধ করছে, আর কেন সে ওই শহরে আর ফিরতে চায় না।
আরিয়ানের বুকটা মায়ার টানে হু হু করে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটি কতটা নিঃস্ব হলে পর একটি ডাকাতের কাছে এসে আশ্রয় খুঁজছে। আরিয়ান মাহিয়াকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল—
"মাহিয়া, আমি হয়তো অন্ধকার জগতের মানুষ, কিন্তু আমার এই হাতটা কোনোদিন তোমার বিশ্বাস ভাঙবে না। আজ থেকে তুমি একা নও। তোমার পরিবার তোমাকে না চাইলে কী হবে? আমি কথা দিচ্ছি, যতদিন আমার শরীরে প্রাণ আছে, আমি তোমার ছায়া হয়ে থাকব। এই দুনিয়া যদি তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবুও আরিয়ান তোমার পাশে থাকবে।"
মেঘগিরি জঙ্গলের নির্জন এক জলাশয়ের ধারে রোদেলা দুপুরে সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। আরিয়ানের চওড়া কাঁধে মাথা রেখে শান্তভাবে বসে আছে মাহিয়া। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের আলো মাহিয়ার ফ্যাকাশে মুখে এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকদিন পর মাহিয়া নিজেকে নিরাপদ অনুভব করছে।
মাহিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলতে শুরু করল, "জানো আরিয়ান, ছোটবেলা থেকে যখন খুব কষ্ট হতো, আমি জানালার পাশে বসে চাঁদের সাথে কথা বলতাম। চাঁদই ছিল আমার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড। কেউ যখন আমার কথা শুনত না, চাঁদ তখন নীরবে সব শুনত। আমার খুব ইচ্ছে করত কোনোদিন যদি পাখি হতে পারতাম! ডানা মেলে এই শহর, এই বাড়ি—সব কিছু ছেড়ে অনেক উঁচুতে নীল আকাশে উড়ে যেতাম। সবাইকে মুক্তি দিয়ে আমি একাই হারিয়ে যেতাম মেঘের দেশে।"
আরিয়ান মুগ্ধ হয়ে মাহিয়ার কথাগুলো শুনছিল। মাহিয়া এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমি ভেবেছিলাম আমার পৃথিবীটা বুঝি ওইটুকু জানালার মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এই জঙ্গল আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।"
কথার মাঝখানেই হঠাৎ মাহিয়ার শরীরটা কুঁকড়ে উঠল। তার প্রচণ্ড কাশি শুরু হলো এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে বমি করে ফেলল। আরিয়ান আঁতকে উঠল যখন দেখল মাহিয়ার বমির সাথে তাজা লাল রক্ত বের হয়ে এসেছে। মাহিয়ার মুখটা মুহূর্তেই সাদা কাগজের মতো হয়ে গেল।
আরিয়ান পাগলের মতো মাহিয়ার হাত ধরে চিৎকার করে উঠল, "মাহিয়া! একি! তোমার রক্ত কেন বের হচ্ছে? কি হয়েছে তোমার?"
মাহিয়া মুখ মুছে নিজেকে সামলে নিয়ে খুব ক্লান্ত স্বরে বলল, "আরিয়ান, আমার ভেতরে এক মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে। ডাক্তাররা বলেছিল আমার 'সিস্টেমিক লুপাস এরিথেমাটোসাস' (Systemic Lupus Erythematosus - SLE) হয়েছে, যা আমার ফুসফুস আর কিডনিকে ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছে। সঠিক চিকিৎসা না হলে আমি বেশিদিন বাঁচব না।
আমি পরিবারকে এই কথা বলিনি। আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো না, তার ওপর মা জানলে হয়তো বলতেন—মরে যাওয়াই ভালো, আপদ বিদায় হবে। আমি চেয়েছিলাম নিঃশব্দে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে, যাতে কাউকে আমার জন্য এক ফোঁটা চোখের জলও ফেলতে না হয়।"
আরিয়ানের চোখে জল চলে এল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে এইটুকু মেয়ের জীবনে এত বড় পাহাড় সমান কষ্ট লুকিয়ে আছে। মাহিয়া আরিয়ানের হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে বলতে লাগল—
"আরিয়ান, আগে আমি মরতে চাইতাম, কিন্তু এখন আমি বাঁচতে চাই। তোমার ওই মায়াভরা চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, জীবনটা কত সুন্দর হতে পারত! আমি তোমার হাত ধরে আরও কয়েকটা দিন এই পৃথিবীটাকে দেখতে চাই। আমি এভাবে হারিয়ে যেতে চাই না আরিয়ান। আমি তোমার হয়ে বাঁচতে চাই। তুমি কি আমাকে বাঁচাবে? তুমি কি পারবে আমার এই অসমাপ্ত গল্পটা পূর্ণ করতে?"
মেঘগিরি জঙ্গলের সেই রাতটি ছিল অন্য সব রাতের চেয়ে আলাদা। মাহিয়ার অসুস্থতার কথা জানার পর আরিয়ানের বুকের ভেতরটা এক অজানা যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। তারা দুজনেই ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। মাথার ওপর বিশাল আকাশ আর সেই চিরচেনা রূপালি চাঁদ।
মাহিয়া আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে যেন চাঁদটাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করল। সে খুব ধীরলয়ে বলল, "আরিয়ান, চাঁদটা আজ কত মায়াবী দেখাচ্ছে না? আমাদের মাঝে যদি কেউ আগে ওপারে চলে যায়, তবে অন্যজন যেন এই চাঁদের সাথেই কথা বলে। আমরা আমাদের ভালোবাসার সব বার্তা এই চাঁদের মাধ্যমে পাঠাব। তুমি যখন একা থাকবে, চাঁদের দিকে তাকিয়ে কথা বলো—আমি ওপার থেকে ঠিকই তোমার হৃদস্পন্দন শুনতে পাব। হয়তো আমি থাকব না, কিন্তু জোছনা হয়ে তোমার গায়ে ঝরে পড়ব।"
আরিয়ান মাহিয়ার হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার গলা ধরে আসছিল। সে বলল, "না মাহিয়া, তুমি ওসব অপয়া কথা বলো না। আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না। অবাস্তব কল্পনায় আমাকে একা ফেলে যাওয়ার কথা ভেবো না।"
মাহিয়া ম্লান হেসে বলল, "জীবনটা তো একটা গল্পের মতো আরিয়ান। কার গল্প কখন শেষ হবে কেউ জানে না। তবে আমি চাই আমার গল্পের শেষ পাতায় যেন তোমার নামটা লেখা থাকে।"
আরিয়ান আর চুপ থাকতে পারল না। সে উঠে বসল এবং মাহিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল, "মাহিয়া, এভাবে বনের ভেতর বসে থাকলে তোমার চিকিৎসা হবে না। তোমাকে সুস্থ হতে হবে। আমার জন্য হলেও তোমাকে লড়তে হবে। আমরা কাল সকালেই জঙ্গল থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজব। তোমাকে শহরে ফিরতে হবে, ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে। আমার যা কিছু আছে, সব দিয়ে হলেও আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনব।"
মাহিয়া কিছুক্ষণ আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটির জন্য হলেও তাকে একবার অন্তত বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। সে রাজি হলো। দুজনে সিদ্ধান্ত নিল, ভোরের আলো ফুটলেই তারা জঙ্গল থেকে লোকালয়ের দিকে হাঁটা শুরু করবে।
পরদিন সকালে তারা যখন তাদের অস্থায়ী আস্তানা ছেড়ে বনের কিনারের দিকে এগোতে শুরু করল, তখন আরিয়ান মাহিয়ার দুর্বল শরীরটাকে আগলে রেখেছিল। মাহিয়া বারবার পিছে ফিরে তাকাচ্ছিল, এই জঙ্গলটিই তাকে প্রথম সত্যিকারের ভালোবাসা আর বাঁচার স্বাদ দিয়েছে।
এদিকে, ইন্সপেক্টর রাজিব সারোয়ারের নেতৃত্বে পুলিশের দলটি তাদের অনেক কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ড্রোনের সিগন্যাল আর মাটির ওপর পায়ের ছাপ অনুসরণ করে তারা সেই জলাশয়ের ধারে এসে পৌঁছাল, যেখানে গত রাতে মাহিয়া আর আরিয়ান ছিল। পোড়া কাঠের অবশিষ্টাংশ দেখে রাজিব বুঝতে পারলেন—তারা খুব বেশি দূরে নেই।
রাজিব তার টিমকে ইশারা করে বললেন, "সবাই সতর্ক হও! আমরা খুব কাছে। মেয়েটির সাথে হয়তো সেই বিপজ্জনক ডাকাত আছে। সাবধানে এগোতে হবে।"
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মরণপণ লড়াই শেষে মাহিয়া আর আরিয়ান অবশেষে ঘন জঙ্গলের সীমানা ছাড়িয়ে এক নির্জন পিচঢালা রাস্তায় এসে পৌঁছাল। দুপুরের তপ্ত রোদ রাস্তার কালো পিচ থেকে যেন আগুনের হলকা তুলছে, কিন্তু মাহিয়ার চোখে আজ এক অন্যরকম প্রশান্তি। সে আরিয়ানের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, "আরিয়ান, আমরা পেরেছি! ওই দেখো রাস্তা। এই পথ ধরে গেলেই হয়তো আমরা কোনো লোকালয় বা শহরে পৌঁছে যাব।"
আরিয়ান ম্লান হাসল। সে ভাবছিল শহরে গিয়েই সবার আগে মাহিয়াকে কোনো বড় হাসপাতালে ভর্তি করবে। নিজের ধরা পড়ার ভয়টা মাহিয়ার জীবনের কাছে আজ তুচ্ছ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ রাস্তার দুপ্রান্ত থেকে পুলিশের সাইরেন বেজে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে বেশ কয়েকটি পুলিশের গাড়ি তাদের ঘিরে ফেলল।
ইন্সপেক্টর রাজিব সারোয়ার গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে রিভলবার উঁচিয়ে ধরলেন। পুলিশের ধারণা ছিল আরিয়ান একজন ভয়ংকর ডাকাত যে মাহিয়াকে অপহরণ করে জঙ্গলে লুকিয়ে রেখেছিল। রাজিব গর্জে উঠলেন, "খবরদার! নড়াচড়া করবে না। মেয়েটিকে ছেড়ে দাও, নইলে গুলি করতে বাধ্য হব!"
আরিয়ান ভ্যাবাচাকা খেয়ে হাত তুলে দাঁড়াল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু রাজিব দেখলেন আরিয়ানের অন্য হাতটি মাহিয়ার কোমরের কাছে (যা আসলে মাহিয়াকে ধরে রাখার জন্য ছিল)। ভুল বুঝে রাজিব ট্রিগার টিপে দিলেন।
"না!"— মাহিয়ার চিৎকার বনের নিস্তব্ধতা ফালাফালা করে দিল। আরিয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল মাহিয়া বিদ্যুতগতিতে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বুলেটের তীক্ষ্ণ শব্দ আর মাহিয়ার আর্তনাদ একসাথে মিশে গেল। গুলিটা আরিয়ানের গায়ে লাগার কথা ছিল, কিন্তু তা সরাসরি মাহিয়ার বুকের বাম পাশে বিঁধে গেল।
আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে মাহিয়