Miraz & Rahat

Miraz & Rahat আসসালামুয়ালাইকুম, আমাদের page এ সবাইকে আমন্ত্রণ।

*আমরা মূলতা আমাদের নিজস্ব লেখা= কবিতা,গল্প,নাটক(script) এইগুলো upload দিব।

ধন্যবাদ ❤️✨💽

অসমাপ্ত গল্পের শেষ পাতাশুরু হচ্ছে-ব্যস্ত শহর নীলগঞ্জ। ইটের পর ইট সাজানো এই শহরে কতশত মানুষের বাস, কিন্তু সবার গল্প এক হয়...
30/03/2026

অসমাপ্ত গল্পের শেষ পাতা

শুরু হচ্ছে-
ব্যস্ত শহর নীলগঞ্জ। ইটের পর ইট সাজানো এই শহরে কতশত মানুষের বাস, কিন্তু সবার গল্প এক হয় না। এই শহরেরই এক কোণে একটি ছোট পরিবারে থাকে মাহিয়া। মাহিয়া দেখতে যেমন শান্ত, স্বভাবেও ঠিক ততটাই চুপচাপ। তার জগতটা খুব ছোট—একটু পড়াশোনা আর রাতের আকাশ।

মাহিয়ার ছোট পরিবারে তার সঙ্গে থাকেন তার বাবা আহসান হাবিব এবং মা রেহানা বেগম। আহসান সাহেব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে ঘরে ফিরে তিনি একটু শান্তি খোঁজেন। কিন্তু সেই ঘরে মাহিয়ার জন্য শান্তি খুব দুর্লভ। রেহানা বেগম মাহিয়াকে একদমই পছন্দ করেন না। এর পেছনে এক অদ্ভুত আর নিষ্ঠুর কারণ রয়েছে—রেহানা বেগম সবসময় চেয়েছিলেন তার যেন একটি ছেলে সন্তান হয়। কিন্তু মাহিয়ার জন্মের পর থেকেই তিনি তার ওপর বিমুখ হয়ে আছেন। একটি ফুটফুটে মেয়ে হয়ে জন্মানো যেন মাহিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ।

মাহিয়া এখন নীলগঞ্জ সরকারি কলেজ-এ দ্বাদশ শ্রেণিতে (Class 12) পড়ে। কলেজে তার তেমন কোনো বন্ধু নেই। সে যখন বারান্দা দিয়ে হেঁটে যায়, তখন তাকে দেখলে মনে হয় যেন এক বিষণ্ণ ছায়া হেঁটে যাচ্ছে। বাড়িতে তার কোনো ভুল না থাকলেও মা তাকে সবসময় বকাঝকা করেন, অকারণে রাগ ঝাড়েন। মায়ের কর্কশ কথাগুলো মাহিয়ার কানে তীরের মতো বিঁধলেও সে মাথা নিচু করে সব সহ্য করে নেয়। অবাক করার বিষয় হলো, আহসান সাহেব সব জানতেন। মাহিয়ার ওপর হওয়া এই মানসিক অত্যাচার তিনি নিজের চোখে দেখতেন, তবুও তিনি কোনোদিন প্রতিবাদ করেননি। হয়তো সংসারের অশান্তি এড়াতে, নয়তো তার কাছে মাহিয়ার চোখের জলের চেয়ে নিজের শান্তি বড় ছিল।

মাহিয়ার যখন খুব মন খারাপ হতো, বুক ফেটে কান্না আসত, তখন সে কাউকে কিছু বলত না। রাত গভীর হলে সে চুপচাপ নিজের ঘরের জানালার পাশে গিয়ে বসত। বাইরের অন্ধকারের মাঝে উজ্জ্বল চাঁদ উঁকি দিত। মাহিয়া সেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে করুণ হাসি হাসত। তার সারাদিনের জমানো সব কষ্ট, চোখের জল আর না বলা কথাগুলো সে একমনে চাঁদকে বলত। এই নিঃসঙ্গ শহরে চাঁদই ছিল তার একমাত্র নীরব সঙ্গী, যে অন্তত তার কথাগুলো কোনো অভিযোগ ছাড়াই শুনত।

পরদিন সকালে সূর্য উঠলেও মাহিয়ার জীবনে সেই একই ধূসর রুটিন। নীলগঞ্জ সরকারি কলেজের করিডোর দিয়ে সে যখন ক্লাসরুমের দিকে যাচ্ছিল, তার কাঁধের ব্যাগটা যেন আজ একটু বেশিই ভারী মনে হচ্ছিল।

মাহিয়া দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাসে চুপচাপ পেছনের বেঞ্চে বসেছিল। ইংরেজি ক্লাসে যখন শিক্ষিকা মিসেস সুলতানা তাকে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে দাঁড় করালেন, মাহিয়ার বুকটা ধড়ফড় করতে শুরু করল। সে উত্তরটা জানত, কিন্তু সবার সামনে কথা বলার কথা ভাবতেই তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। নার্ভাস হওয়ার কারণে সে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না, শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ক্লাসের কয়েকজন ছাত্রছাত্রী তখন ফিসফিস করে হাসতে শুরু করল। সেই হাসির শব্দ মাহিয়ার কানে অপমানের তপ্ত শিসার মতো বাজছিল।

মাহিয়ার চোখে পানি এসে যাচ্ছিল, কিন্তু মিসেস সুলতানা পরিস্থিতি বুঝতে পারলেন। তিনি কঠোর গলায় বাকিদের ধমক দিয়ে শান্ত করলেন এবং বললেন, "মাহিয়াকে নিয়ে হাসাহাসি করার কিছু নেই। সে অনেক মেধাবী, শুধু একটু লাজুক।" তিনি মাহিয়াকে আলতো করে বসিয়ে দিয়ে তাকে অভয় দিলেন। মাহিয়ার মনে হলো, এই মরুময় জীবনে এইটুকু সহমর্মিতাই তার জন্য অনেক বড় পাওনা।

ক্লাস শেষে ঘোষণা করা হলো যে কলেজ থেকে একটি শিক্ষাসফরের বা পিকনিকের আয়োজন করা হয়েছে। গন্তব্য হলো উত্তরবঙ্গের এক দুর্গম কিন্তু মায়াবী পাহাড়ী এলাকা—'মেঘগিরি'।

পাহাড়ের পাদদেশে একটি ছোট গ্রাম, যার চারপাশ ঘিরে রয়েছে নিবিড় ঘন জঙ্গল। সবাই হইহই করে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু মাহিয়ার মনে মেঘ জমল। বনভোজনের জন্য যে বিশাল অংকের চাঁদা ধরা হয়েছে, তার বাবার কাছে চাইলে হয়তো মা অশান্তি করবেন, আর মা তো কোনোদিনও এই টাকা দেবেন না।

মাহিয়ার বিমর্ষ চেহারা দেখে মিসেস সুলতানা তাকে আলাদা করে ডেকে নিলেন। তিনি মাহিয়ার পারিবারিক অবস্থা কিছুটা জানতেন। তিনি হাসিমুখে বললেন, "মাহিয়া, তোমার চাঁদা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তুমি আমার সাথে আমার সঙ্গী হিসেবে যাবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।" মাহিয়ার বিষণ্ণ মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে প্রথমবার কোনো ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে!

সেই রাতে জানালা দিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে মাহিয়া অনেক হাসল। সে চাঁদকে বলল, "জানো চাঁদ, আমি পাহাড় দেখতে যাব! সেখানে মেঘগুলো নাকি হাতের কাছে এসে ধরা দেয়। তুমিও কি সেখানে থাকবে আমার সাথে?"

পরদিন মাহিয়ার দিনটি শুরু হয়েছিল এক বুক আশা নিয়ে। কলেজে গিয়ে সে ক্লাসে মন দেওয়ার চেষ্টা করল। টিফিন পিরিয়ডে সবাই যখন পাহাড়ী এলাকায় যাওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব আর কেনাকাটার পরিকল্পনা করছিল, মাহিয়া তখন এক কোণে বসে ভাবছিল তার এই নতুন অভিজ্ঞতার কথা। মিসেস সুলতানার স্নেহ মাখানো আশ্বাসে তার মনটা একটু হালকা হয়েছিল।

কিন্তু বাড়ি ফেরার সাথে সাথেই সেই চেনা অন্ধকার তাকে গ্রাস করল। মাহিয়ার বাড়িতে ফেরার পর এক মুহূর্তও বিশ্রাম নেওয়ার জো নেই। কলেজের ব্যাগটা রেখেই তাকে রান্নাঘরের কাজে হাত দিতে হলো। ঘর মোছা থেকে শুরু করে রাতের রান্নার প্রস্তুতি—সবই তাকে করতে হয়। এক পর্যায়ে কাজ করতে করতে অসাবধানতাবশত একটি কাঁচের গ্লাস তার হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায়।

শব্দ শুনেই রেহানা বেগম ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকলেন। গ্লাস ভাঙা দেখেই তার রাগ চরমে উঠল। তিনি চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, "অলক্ষ্মী মেয়ে! একটা কাজও ঠিকমতো করতে পারিস না? তোকে পেটে ধরেছিলাম বলেই আজ আমার জীবনে এত অশান্তি। ছেলে হলে অন্তত বুড়ো বয়সের লাঠি হতো, আর তুই হলি গলার কাঁটা!"

রেহানা বেগমের এই কথাগুলো মাহিয়ার মনে গভীর ক্ষত তৈরি করল। সে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, তার গাল বেয়ে টপ টপ করে চোখের জল পড়ছিল। কিন্তু মায়ের রাগের যেন শেষ নেই। তিনি আরও বললেন, "তোর মতো মেয়ে মরে গেলেই আমি বাঁচি।" মাহিয়া চিৎকার করে কাঁদতে চেয়েছিল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। বাবা আহসান সাহেব পাশের ঘরে বসে সব শুনছিলেন, কিন্তু তিনি একবারের জন্যও উঠে এসে মাহিয়ার পক্ষ নিলেন না।

রাতে খাবার টেবিলে এক অসহ্য নীরবতা বিরাজ করছিল। মাহিয়া কোনোমতে কয়েক দানা ভাত মুখে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। তার মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে সে একদম একা, কেউ তাকে ভালোবাসার নেই।

মধ্যরাতে যখন পুরো শহর ঘুমে বিভোর, মাহিয়া তখন তার জানালার পাশে গিয়ে বসল। আকাশে আজ চাঁদটা অনেক বড় আর উজ্জ্বল। মাহিয়া চাঁদের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে বলতে লাগল, "চাঁদ, মা আমাকে কেন এত ঘৃণা করে? আমার অপরাধ কি শুধুই আমি মেয়ে হয়ে জন্মেছি? আমি তো কোনোদিন কারো ক্ষতি করিনি। বাবা কেন কিছু বলেন না? আমার খুব কষ্ট হয় চাঁদ, মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যদি কোনোদিন হারিয়ে যেতাম, কেউ কি আমাকে খুঁজত?"

অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি এলো। ভোরের আলো তখনও ভালো করে ফোটেনি, চারদিকে হালকা কুয়াশার চাদর। মাহিয়ার বুকটা আজ এক অজানা আশঙ্কায় নয়, বরং এক চিমটি আনন্দে দুলছে। কথা মতো মিসেস সুলতানা নিজেই মাহিয়ার বাড়িতে গাড়ি নিয়ে এলেন। রেহানা বেগম খুব একটা খুশি না হলেও শিক্ষিকার সামনে কিছু বলতে পারলেন না। কোনো বড় ঝামেলা ছাড়াই মাহিয়া আজ ঘর থেকে বের হতে পারল।

সবাই বাসে উঠল। নীলগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কলকাকলিতে বাসটা মুখর। মাহিয়া সবার থেকে আলাদা হয়ে একদম পেছনের সিটে জানালার পাশে বসল। বাস চলতে শুরু করতেই বাইরের ঠাণ্ডা হাওয়া তার মুখে ঝাপটা দিয়ে গেল। জানালার বাইরে দ্রুত সরে যাওয়া গাছপালা, দিগন্তজোড়া মাঠ আর ভোরের স্নিগ্ধতা দেখে মাহিয়ার চোখে জল চলে এল। এটা দুঃখের জল নয়, এটা মুক্তির জল।

মাহিয়া মনে মনে বলতে লাগল—

"হয়তো এই বাসটা যদি কোনোদিন না থামত! যদি এই পথটা কোনোদিন শেষ না হতো! এই প্রকৃতি আমাকে ঘৃণা করে না, এই হাওয়া আমাকে বকা দেয় না। মা কেন আমাকে বুঝতে পারল না? কেন আমি তাঁর কাছে গলার কাঁটা? হে ঈশ্বর, এই পাহাড়ের কোলে আমাকে কোথাও লুকিয়ে ফেলো। আমি আর ওই চার দেয়ালের বন্দিশালায় ফিরতে চাই না। আমি এই অসীম আকাশ আর বুনো সবুজেই হারিয়ে যেতে চাই।"

বাস যখন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে উঠতে শুরু করল, মাহিয়ার শান্তি তখন চরমে। কিন্তু মানুষের সুখ কেন জানি খুব ক্ষণস্থায়ী হয়। হঠাৎ এক বিকট শব্দে বাসটি ব্রেক কষল। রাস্তার মাঝে বড় বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে পথ আটকে রাখা হয়েছে।

মুহূর্তের মধ্যে বাসের দরজা খুলে গেল। হুড়মুড় করে বাসে উঠে পড়ল তিনজন মুখোশধারী লোক। তাদের প্রত্যেকের হাতে ধারালো বড় বড় ছুরি। বাসের আনন্দঘন পরিবেশ এক নিমেষেই নরক হয়ে উঠল। মেয়েদের চিৎকারে আর ছেলেদের আতঙ্কে বাসটা কাঁপতে লাগল। মাহিয়াও ভয়ে কুঁকড়ে জানালার সাথে মিশে গেল। তার শান্ত পৃথিবীটা আবারও অশান্ত হয়ে উঠল।

ডাকাতদের মধ্যে একজন গম্ভীর গলায় গর্জে উঠল, "চুপ! একদম চুপ! কেউ যদি টু শব্দ করো, কলিজা নামিয়ে দেব।" তারা ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল বাস চালিয়ে নিয়ে যেতে। বাসটা এখন হাইজ্যাক হয়েছে। তারা সবাইকে অভয় দিয়ে বলল, "শান্ত হয়ে বসো। কথা শুনলে কারো ক্ষতি করব না। শুধু যা করতে বলি তা করো।"

বাসের ভেতরে এখন পিনপতন নীরবতা, শুধু কান্নার চাপা শব্দ আর ডাকাতদের কর্কশ কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। ডাকাতরা একে একে সবার কাছ থেকে মোবাইল, টাকা আর সোনার গয়না লুটে নিতে শুরু করল। মাহিয়ার কাছে মূল্যবান বলতে কিছুই ছিল না, শুধু একটি সস্তা ঘড়ি আর তার পড়ার বইগুলো। সে ভয়ে কুঁকড়ে বসে দেখছিল মানুষের অসহায়ত্ব।

লুট করা শেষ করে ডাকাতরা বাসের মাঝখানে বসে মালপত্র ভাগাভাগি করতে শুরু করে। কিন্তু লোভ মানুষের হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নেয়। ভাগাভাগি নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই শুরু হলো প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডা। দুই ডাকাত মিলে তৃতীয় ডাকাতের ওপর চড়াও হলো। এই তৃতীয় ডাকাতটির নাম আরিয়ান। আরিয়ান বাকিদের মতো নিষ্ঠুর ছিল না, সে বারবার বলছিল ছাত্রছাত্রীদের যেন বেশি আতঙ্কিত না করা হয়।

বাকি দুজন আরিয়ানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আরিয়ান একা হলেও বেশ সাহসী ছিল। সে চলন্ত বাসের মধ্যেই খালি হাতে লড়াই শুরু করল। কিন্তু হঠাৎ পরিস্থিতির মোড় ঘুরে গেল। এক ডাকাত কোমরের পেছন থেকে একটি পিস্তল বের করে চিৎকার করে উঠল। সে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে প্রথম গুলিটি ছুঁড়ল, যা সরাসরি গিয়ে লাগল ড্রাইভারের কাঁধে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে ড্রাইভার স্টিয়ারিং ছেড়ে দিল।

পরের মুহূর্তেই দ্বিতীয় গুলিটি চলল। এবার গুলিটি আরিয়ানের বাম হাতে বিঁধে গেল। আরিয়ান যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে বাসের মেঝেতে পড়ে গেল।

রক্তে বাসের মেঝে লাল হতে শুরু করল। বাকি দুই ডাকাত বুঝতে পারল বাসটি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং ড্রাইভার আহত হওয়ায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তারা দ্রুত বাসের দরজা খুলে চলন্ত বাস থেকেই নিচে লাফিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

বাসটি এখন চালকহীন। ড্রাইভার স্টিয়ারিংয়ের ওপর লুটিয়ে পড়েছে। আরিয়ান রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছটফট করছে। বাসের সবাই ভয়ে চিৎকার করছে, কারণ বাসটি এখন দ্রুতগতিতে পাহাড়ের খাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাহিয়া তার সিট থেকে দেখল, মৃত্যু যেন তাদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

নিয়ন্ত্রণহীন বাসটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রচণ্ড শব্দে নিচের খাদে গিয়ে আছড়ে পড়ল। গাছপালার ঝোপঝাড় থাকায় বাসের পতনের গতি কিছুটা কমে এসেছিল, তাই বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটল না। বাসের ভেতর চারদিকে শুধু কাঁচ ভাঙার শব্দ আর আর্তনাদ। এক সময় সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
​বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে।

চারদিকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর পুলিশের বাঁশির শব্দ শোনা যাচ্ছে। বাসের ভেতর মাহিয়ার জ্ঞান ফিরল সবার আগে। তার কপালে সামান্য চোট লেগেছে, কিন্তু শরীরের অন্য কোথাও বড় আঘাত নেই। সে দেখল সহপাঠীরা এবং শিক্ষিকারা একে একে বাস থেকে বের হচ্ছে বা উদ্ধারকর্মীরা তাদের নিয়ে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই মাহিয়ার নজর পড়ল বাসের পেছনের দিকের মেঝেতে। সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে আরিয়ান। তার শরীর থেকে প্রচুর রক্ত ঝরছে, চোখ দুটো বোজা। মাহিয়া জানত সে একজন ডাকাত, কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে দেখে মাহিয়ার মনে এক অদ্ভুত মায়া হলো। হয়তো বাড়িতে নিজের প্রতি হওয়া অবহেলা আর একাকীত্ব তাকে অন্যের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছে।

মাহিয়া চুপিচুপি আরিয়ানের কাছে গিয়ে বসল। আরিয়ান যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে চোখ মেলল। মাহিয়ার দিকে তাকিয়ে সে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, "আমাকে... আমাকে এখান থেকে সরিয়ে দাও। পুলিশ আমাকে ধরলে আমার নির্ঘাত ফাঁসি হবে। আমি... আমি মরতে চাই না এভাবে।"

মাহিয়া দ্বিধায় পড়ে গেল। সে কাঁপা গলায় বলল, "কিন্তু আপনি তো ডাকাত! আপনি আমাদের ক্ষতি করতে চেয়েছিলেন।"

আরিয়ান মাহিয়ার হাতটা ধরার চেষ্টা করে বলল, "আমি পরিস্থিতির শিকার... দয়া করো মেয়েটি, আমাকে ওই জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যাও। আমি নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নেব। আমাকে বাঁচাও!"

মাহিয়ার মন মানল না। সে দেখল পুলিশ বাসের অন্য প্রান্তে সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত। এই সুযোগে সে আরিয়ানকে টেনেহিঁচড়ে বাসের পেছনের ভাঙা জানালা দিয়ে বাইরে বের করল। আরিয়ান যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিল, কিন্তু মাহিয়া তার সবটুকু শক্তি দিয়ে তাকে ধরে বনের ঘন অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।

ঘন জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে তারা যখন বেশ কিছুটা ভেতরে ঢুকে পড়ল, তখন বাসের সাইরেনের শব্দ দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। মাহিয়া এখন এক অজানা জঙ্গলে, পাশে এক আহত ডাকাত। সে বুঝতে পারল না সে ঠিক করল না ভুল।

রাত গভীর হচ্ছে। নীলগঞ্জ সরকারি কলেজের বাস দুর্ঘটনাস্থলে এখন পুলিশের গাড়ির নীল-লাল বাতি আর উদ্ধারকর্মীদের ব্যস্ততা। একে একে সবাইকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আহসান হাবিব আর রেহানা বেগম হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে পৌঁছালেও সেখানে মাহিয়ার দেখা মিলল না। পুলিশ চারদিকে তল্লাশি চালাচ্ছে, কিন্তু ঘন জঙ্গলের ভেতরে মাহিয়ার কোনো চিহ্ন নেই। শহরের শান্ত মেয়েটি যেন এক নিমিষেই অন্ধকার অরণ্যে বিলীন হয়ে গেছে।

জঙ্গলের অনেকটা গভীরে, একটি ছোট স্বচ্ছ জলের জলাশয়ের ধারে পাথরের ওপর বসে আছে আরিয়ান। মাহিয়ার কাঁধের ওপর ভর দিয়ে সে এতদূর আসতে পেরেছে। মাহিয়ার হাতে তখনও কাঁপন, চোখে অজানা ভয়। চাঁদের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে জলাশয়ের জলে প্রতিফলিত হয়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে।

আরিয়ান তার রক্তাক্ত হাতটা চেপে ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ধন্যবাদ মাহিয়া। আজ তুমি না থাকলে হয়তো অন্ধকার সেলের ভেতরে আমার জায়গা হতো। কেন বাঁচালে আমাকে? আমি তো একজন অপরাধী।"

মাহিয়া থতমত খেয়ে বলল, "আমি জানি না। শুধু মনে হলো, আপনাকে এভাবে ফেলে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু আপনি কেন এই কাজ করেন? কেন মানুষের ক্ষতি করেন?"

আরিয়ান তিতকুটে হাসল। তারপর ম্লান স্বরে বলতে শুরু করল, "ক্ষতি করতে চাইনি কোনোদিন। ওই যে দুজন পালিয়ে গেল, ওরা আগেও আমাকে বারবার ধোঁকা দিয়েছে। আজ তো আমাকে মেরেই ফেলত। আমি এই পথে এসেছি শুধু একজনের জন্য—আমার মায়ের জন্য।"

আরিয়ানের কথা শুনে মাহিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান বলতে থাকল, "আমার মা... তিনি 'মাল্টিপল মাইলোমা' নামক এক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত। হাড়ের ক্যান্সার। প্রতি মাসে ইনজেকশন আর চিকিৎসার জন্য যে টাকা লাগে, তা জোগাড় করার মতো কোনো বৈধ পথ আমার সামনে খোলা ছিল না। আমি জানি আমি পাপ করছি, কিন্তু মায়ের যন্ত্রণার চেয়ে বড় কোনো নরক আমার কাছে নেই।"

আরিয়ানের চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। সে আবেগপ্রবণ হয়ে বলল—

"মাহিয়া, সমাজ আমাকে ডাকাত বলে চেনে, কিন্তু মায়ের কাছে আমি আজও সেই ছোট্ট খোকা। মা যখন যন্ত্রণায় কাতরায়, তখন আমার বিবেক কাজ করে না। আমি শুধু টাকা দেখি। আমার মা জানে না তার ছেলে হারানো পথে হাঁটছে। সে ভাবে আমি শহরে চাকরি করি। যদি আমি আজ মরে যেতাম বা জেলে যেতাম, আমার মা বিনা চিকিৎসায় তিলে তিলে শেষ হয়ে যেত।"

মাহিয়া স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। তার নিজের মা তাকে ঘৃণা করে কারণ সে মেয়ে, আর এই ছেলেটি তার মাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে অপরাধ জগতে পা বাড়িয়েছে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! মাহিয়ার মনে আরিয়ানের প্রতি থাকা ভয়টা ধীরে ধীরে মুছে গিয়ে এক গভীর মমতা আর শ্রদ্ধার জন্ম নিল। সে বুঝতে পারল, প্রতিটি মানুষের আড়ালে এক একটা অদৃশ্য ক্ষত থাকে।

পরদিন সকালে নীলগঞ্জ থানায় এক গুমোট পরিবেশ। আহসান হাবিব ম্লান মুখে বসে আছেন, আর রেহানা বেগম লোকদেখানো কান্নাকাটি করছেন। পুলিশ অফিসার জানালেন, দুর্গম মেঘগিরি জঙ্গলে উদ্ধারকাজ চালানো সহজ নয়, তবে তারা একটি বিশেষ টিম গঠন করেছেন যারা ড্রোন এবং প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে তল্লাশি শুরু করবে। জঙ্গলটি বিশাল এবং গোলকধাঁধার মতো, তাই মাহিয়ার খোঁজ পাওয়া সময়ের ব্যাপার।

অন্যদিকে, জঙ্গলের গভীরে মাহিয়া আর আরিয়ানের পৃথিবীটা একদম আলাদা। ভোরের আলো ফুটতেই মাহিয়া জলাশয়ের ধারে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিল। তার খুব খিদে পেয়েছে, কিন্তু এখানে খাবারের কোনো উৎস নেই। তবে আরিয়ান পাহাড়ের ছেলে, সে ম্লান হেসে ইশারায় কাছের কিছু বুনো ফল আর কচি ডুমুর দেখিয়ে দিল যেগুলো খাওয়া নিরাপদ। মাহিয়া অনেক কষ্ট করে সেগুলো পেড়ে আনল। এই প্রথম শহরের আলিশাদ মেয়েটি বুনো ফল দিয়ে সকালের নাস্তা সারল।

আরিয়ানের হাতের ক্ষতটা তখন ফুলে লাল হয়ে আছে। মাহিয়া ছোটবেলায় তার দাদির কাছে শুনেছিল কিছু লতা-পাতার গুণাগুণ। সে জলাশয়ের চারপাশ খুঁজে 'বিষল্যকরণী' আর নিম জাতীয় কিছু বুনো পাতা সংগ্রহ করল। তারপর একটি মসৃণ পাথরের ওপর অন্য একটি পাথর দিয়ে ঘষে ঘষে পাতাগুলো পিষে নিল। আরিয়ান অবাক হয়ে দেখছিল মাহিয়ার একাগ্রতা। মাহিয়া খুব যত্ন করে আরিয়ানের ক্ষতস্থানে সেই পাতার রস লাগিয়ে দিল এবং নিজের ওড়নার এক কোণ ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ করে দিল।

মাহিয়ার হাতের নরম ছোঁয়া আর তার এই নিঃস্বার্থ সেবা দেখে আরিয়ান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। যে মেয়েটিকে সে কয়েক ঘণ্টা আগে ভয় দেখিয়েছিল, সেই মেয়েটিই আজ তার জীবন বাঁচাচ্ছে। আরিয়ানের মনে হলো, পৃথিবীর সব অন্ধকার একদিকে আর মাহিয়ার এই পবিত্র মায়া অন্য দিকে। সে মনে মনে অনুভব করল, জীবনের এই কঠিনতম সময়ে সে হয়তো তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারটি খুঁজে পেয়েছে—ভালোবাসা।

দুপুরের খাবারের জন্য মাহিয়া জলাশয় থেকে পাথর ছুঁড়ে আর লাঠির সাহায্যে কিছু কাঁকড়া আর ছোট মাছ ধরার চেষ্টা করল। খুব সামান্য কিছু খাবার জোগাড় হলেও তারা ভাগ করে খেল। বিকেলে তারা শুকনো ডালপালা আর লতা দিয়ে একটি অস্থায়ী আস্তানা তৈরি করল।

রাত নামতেই জঙ্গলে শীতের প্রকোপ বাড়ল। মাহিয়া বুঝতে পারল আগুন ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব। সে বনের ভেতর থেকে শুকনো চকমকি পাথর (Flint stones) খুঁজে বের করল। অনেকক্ষণ ধরে পাথর দুটোকে একে অপরের সাথে ঘষতে ঘষতে আগুনের ফুলকি বের হলো, যা দিয়ে সে শুকনো পাতার স্তূপে আগুন ধরাল। আগুনের হালকা আঁচ আর লেলিহান শিখা তাদের শরীরকে উষ্ণ করল।

পরদিন সকালের সূর্য মেঘগিরির ঘন জঙ্গলের মাথায় উঁকি দিতেই শুরু হলো পুলিশের বিশেষ অভিযান। পাঁচজন চৌকস স্পেশাল ফোর্সের সদস্য নিয়ে গঠিত এই দলের নেতৃত্বে আছেন ইন্সপেক্টর রাজিব সারোয়ার। তিনি অত্যন্ত দক্ষ এবং শান্ত মেজাজের মানুষ। জঙ্গলের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি তার ড্রোনটি আকাশে ওড়ালেন। ড্রোনের ক্যামেরায় জঙ্গলের ওপরের ঘন সবুজ আস্তরণ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু মাহিয়ার কোনো চিহ্ন মিলছে না। রাজিব তার দল নিয়ে ধীরে ধীরে জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করলেন।

অন্যদিকে, আরিয়ানের ক্ষত এখন অনেকটা শুকিয়ে এসেছে। মাহিয়ার দেওয়া ভেষজ ওষুধ আর যত্নে সে এখন উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি ফিরে পেয়েছে। সকালে উঠে আরিয়ান মাহিয়াকে বলল, "মাহিয়া, আমি এখন মোটামুটি হাঁটতে পারব। চলো, তোমাকে তোমার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসি। পুলিশ নিশ্চয়ই তোমাকে খুঁজছে।"

আরিয়ানের কথা শুনে মাহিয়ার মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। সে বিষণ্ণ স্বরে বলল, "না আরিয়ান, আমি এখনই ওখান ফিরতে চাই না।"

আরিয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন? তোমার মা-বাবা তো দুশ্চিন্তা করছেন।"

মাহিয়া চুপ করে রইল। সে বলতে পারল না যে ওই বাড়িতে তার জন্য ভালোবাসা নেই, আছে শুধু ঘৃণা আর অবহেলা। সে শুধু ছোট করে বলল, "ওখানে কেউ আমাকে চায় না।"

দুপুরের দিকে তারা যখন জঙ্গলের সরু পথ দিয়ে হাঁটছিল, তখন হঠাৎ গাছের ডাল থেকে একটি বিষধর সাপ মাহিয়ার ঘাড়ের কাছে ঝুলে পড়ল। মাহিয়া আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। সাপটি ফণা তুলে মাক্রমণ করতে উদ্যত হতেই আরিয়ান ক্ষিপ্র গতিতে সাপের মাথাটা খপ করে ধরে ফেলল এবং দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। মাহিয়া ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। আরিয়ান তার কাঁধে হাত রেখে অভয় দিল। মাহিয়া ভেজা চোখে তাকিয়ে বলল, "ধন্যবাদ আরিয়ান। তুমি না থাকলে আজ হয়তো আমি থাকতাম না।"

রাত নামার সাথে সাথে পাহাড়ি জঙ্গলের শীতটা আরও জেঁকে বসল। মাহিয়া একটি গাছের তলায় কুঁকড়ে শুয়ে ছিল, ঠাণ্ডায় তার শরীর কাঁপছিল। আরিয়ান পাশেই বসে রাত জাগছিল। সে দেখল মাহিয়ার কষ্ট হচ্ছে। তার নিজের শরীরেও একটা জ্যাকেট ছিল, সে সেটি খুলে খুব সাবধানে মাহিয়ার গায়ের ওপর বিছিয়ে দিল। আরিয়ান নিজে ঠাণ্ডায় কষ্ট পেলেও মাহিয়ার প্রশান্ত ঘুম দেখে তার মনটা এক অজানা শান্তিতে ভরে উঠল।

পরদিন ভোরে যখন বনের পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে, মাহিয়ার ঘুম ভাঙল। চোখ মেলতেই সে দেখল আগুনের কুণ্ডলীটা নিভে ছাই হয়ে আছে, আর পাশের পাথরের ওপর আরিয়ান নেই। মাহিয়া ধড়ফড় করে উঠে বসল। চারদিকে ঘন কুয়াশা আর নিস্তব্ধতা। সে বারবার আরিয়ানের নাম ধরে ডাকল, কিন্তু বনের প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কোনো উত্তর এলো না।

মাহিয়ার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে পাথরের ওপর বসে দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার মনে হতে লাগল—সবাই তাকে ছেড়ে চলে যায়। মা তাকে চায় না, বাবা তাকে বোঝেন না, আর এখন এই গভীর জঙ্গলে যে মানুষটির ওপর সে ভরসা করেছিল, সেও কি তাকে ফেলে চলে গেল? এই নিঝুম অরণ্যে তার একাকীত্ব যেন এক বিশাল দানবের মতো তাকে গিলে খেতে আসছে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, "আমি জানতাম, আমার ভাগ্যে কেউ নেই। সবাই আমাকে একা করে দেয়। কেন তুমিও চলে গেলে আরিয়ান?"

ঠিক তখনই ঝোপঝাড়ের আড়ালে খসখস শব্দ হলো। মাহিয়া ভয়ে মুখ তুলে দেখল, আরিয়ান দুই হাতে কিছু বুনো ফল আর একটা প্লাস্টিকের বোতলে পরিষ্কার জল নিয়ে ফিরে আসছে। মাহিয়াকে কাঁদতে দেখে আরিয়ান দ্রুত দৌড়ে কাছে এলো। সে কিছু বলার আগেই মাহিয়া পাগলের মতো আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্নায় আজ কোনো লুকোছাপা ছিল না।

আরিয়ান থতমত খেয়ে গেল, তার হাতের ফলগুলো নিচে পড়ে গেল। সে আলতো করে মাহিয়ার মাথায় হাত রাখল এবং শান্ত গলায় বলল, "আরে, কাঁদছ কেন? আমি তো কোথাও যাইনি। তোমার জন্য সকালের খাবার খুঁজতে গিয়েছিলাম। এই তো আমি আছি।"

মাহিয়া কান্নাভেজা গলায় বলল, "আমি ভেবেছিলাম তুমিও আমাকে একা ফেলে চলে গেছ। আরিয়ান, আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না। কিন্তু কেন জানি তোমাকে দেখার পর থেকে মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীতে অন্তত একজন আছে যার কাছে আমি নিরাপদ। আমি তোমাকে অনেক আপন ভাবতে শুরু করেছি। প্লিজ, আমাকে কখনো ছেড়ে যেও না।"

আরিয়ান মাহিয়ার অশ্রুসিক্ত মুখটা দুহাতে তুলে ধরল। মাহিয়া তখন তার জীবনের সব না বলা কষ্টের কথাগুলো বলে দিল—কিভাবে তার মা তাকে ঘৃণা করে, কিভাবে সে ছোটবেলা থেকে একাকীত্বের সাথে যুদ্ধ করছে, আর কেন সে ওই শহরে আর ফিরতে চায় না।

আরিয়ানের বুকটা মায়ার টানে হু হু করে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটি কতটা নিঃস্ব হলে পর একটি ডাকাতের কাছে এসে আশ্রয় খুঁজছে। আরিয়ান মাহিয়াকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল—

"মাহিয়া, আমি হয়তো অন্ধকার জগতের মানুষ, কিন্তু আমার এই হাতটা কোনোদিন তোমার বিশ্বাস ভাঙবে না। আজ থেকে তুমি একা নও। তোমার পরিবার তোমাকে না চাইলে কী হবে? আমি কথা দিচ্ছি, যতদিন আমার শরীরে প্রাণ আছে, আমি তোমার ছায়া হয়ে থাকব। এই দুনিয়া যদি তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবুও আরিয়ান তোমার পাশে থাকবে।"

মেঘগিরি জঙ্গলের নির্জন এক জলাশয়ের ধারে রোদেলা দুপুরে সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। আরিয়ানের চওড়া কাঁধে মাথা রেখে শান্তভাবে বসে আছে মাহিয়া। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের আলো মাহিয়ার ফ্যাকাশে মুখে এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকদিন পর মাহিয়া নিজেকে নিরাপদ অনুভব করছে।

মাহিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলতে শুরু করল, "জানো আরিয়ান, ছোটবেলা থেকে যখন খুব কষ্ট হতো, আমি জানালার পাশে বসে চাঁদের সাথে কথা বলতাম। চাঁদই ছিল আমার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড। কেউ যখন আমার কথা শুনত না, চাঁদ তখন নীরবে সব শুনত। আমার খুব ইচ্ছে করত কোনোদিন যদি পাখি হতে পারতাম! ডানা মেলে এই শহর, এই বাড়ি—সব কিছু ছেড়ে অনেক উঁচুতে নীল আকাশে উড়ে যেতাম। সবাইকে মুক্তি দিয়ে আমি একাই হারিয়ে যেতাম মেঘের দেশে।"

আরিয়ান মুগ্ধ হয়ে মাহিয়ার কথাগুলো শুনছিল। মাহিয়া এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমি ভেবেছিলাম আমার পৃথিবীটা বুঝি ওইটুকু জানালার মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এই জঙ্গল আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।"

কথার মাঝখানেই হঠাৎ মাহিয়ার শরীরটা কুঁকড়ে উঠল। তার প্রচণ্ড কাশি শুরু হলো এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে বমি করে ফেলল। আরিয়ান আঁতকে উঠল যখন দেখল মাহিয়ার বমির সাথে তাজা লাল রক্ত বের হয়ে এসেছে। মাহিয়ার মুখটা মুহূর্তেই সাদা কাগজের মতো হয়ে গেল।

আরিয়ান পাগলের মতো মাহিয়ার হাত ধরে চিৎকার করে উঠল, "মাহিয়া! একি! তোমার রক্ত কেন বের হচ্ছে? কি হয়েছে তোমার?"

মাহিয়া মুখ মুছে নিজেকে সামলে নিয়ে খুব ক্লান্ত স্বরে বলল, "আরিয়ান, আমার ভেতরে এক মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে। ডাক্তাররা বলেছিল আমার 'সিস্টেমিক লুপাস এরিথেমাটোসাস' (Systemic Lupus Erythematosus - SLE) হয়েছে, যা আমার ফুসফুস আর কিডনিকে ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছে। সঠিক চিকিৎসা না হলে আমি বেশিদিন বাঁচব না।

আমি পরিবারকে এই কথা বলিনি। আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো না, তার ওপর মা জানলে হয়তো বলতেন—মরে যাওয়াই ভালো, আপদ বিদায় হবে। আমি চেয়েছিলাম নিঃশব্দে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে, যাতে কাউকে আমার জন্য এক ফোঁটা চোখের জলও ফেলতে না হয়।"

আরিয়ানের চোখে জল চলে এল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে এইটুকু মেয়ের জীবনে এত বড় পাহাড় সমান কষ্ট লুকিয়ে আছে। মাহিয়া আরিয়ানের হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে বলতে লাগল—

"আরিয়ান, আগে আমি মরতে চাইতাম, কিন্তু এখন আমি বাঁচতে চাই। তোমার ওই মায়াভরা চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, জীবনটা কত সুন্দর হতে পারত! আমি তোমার হাত ধরে আরও কয়েকটা দিন এই পৃথিবীটাকে দেখতে চাই। আমি এভাবে হারিয়ে যেতে চাই না আরিয়ান। আমি তোমার হয়ে বাঁচতে চাই। তুমি কি আমাকে বাঁচাবে? তুমি কি পারবে আমার এই অসমাপ্ত গল্পটা পূর্ণ করতে?"

​মেঘগিরি জঙ্গলের সেই রাতটি ছিল অন্য সব রাতের চেয়ে আলাদা। মাহিয়ার অসুস্থতার কথা জানার পর আরিয়ানের বুকের ভেতরটা এক অজানা যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। তারা দুজনেই ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। মাথার ওপর বিশাল আকাশ আর সেই চিরচেনা রূপালি চাঁদ।

মাহিয়া আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে যেন চাঁদটাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করল। সে খুব ধীরলয়ে বলল, "আরিয়ান, চাঁদটা আজ কত মায়াবী দেখাচ্ছে না? আমাদের মাঝে যদি কেউ আগে ওপারে চলে যায়, তবে অন্যজন যেন এই চাঁদের সাথেই কথা বলে। আমরা আমাদের ভালোবাসার সব বার্তা এই চাঁদের মাধ্যমে পাঠাব। তুমি যখন একা থাকবে, চাঁদের দিকে তাকিয়ে কথা বলো—আমি ওপার থেকে ঠিকই তোমার হৃদস্পন্দন শুনতে পাব। হয়তো আমি থাকব না, কিন্তু জোছনা হয়ে তোমার গায়ে ঝরে পড়ব।"

আরিয়ান মাহিয়ার হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার গলা ধরে আসছিল। সে বলল, "না মাহিয়া, তুমি ওসব অপয়া কথা বলো না। আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না। অবাস্তব কল্পনায় আমাকে একা ফেলে যাওয়ার কথা ভেবো না।"

মাহিয়া ম্লান হেসে বলল, "জীবনটা তো একটা গল্পের মতো আরিয়ান। কার গল্প কখন শেষ হবে কেউ জানে না। তবে আমি চাই আমার গল্পের শেষ পাতায় যেন তোমার নামটা লেখা থাকে।"

আরিয়ান আর চুপ থাকতে পারল না। সে উঠে বসল এবং মাহিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল, "মাহিয়া, এভাবে বনের ভেতর বসে থাকলে তোমার চিকিৎসা হবে না। তোমাকে সুস্থ হতে হবে। আমার জন্য হলেও তোমাকে লড়তে হবে। আমরা কাল সকালেই জঙ্গল থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজব। তোমাকে শহরে ফিরতে হবে, ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে। আমার যা কিছু আছে, সব দিয়ে হলেও আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনব।"

মাহিয়া কিছুক্ষণ আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটির জন্য হলেও তাকে একবার অন্তত বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। সে রাজি হলো। দুজনে সিদ্ধান্ত নিল, ভোরের আলো ফুটলেই তারা জঙ্গল থেকে লোকালয়ের দিকে হাঁটা শুরু করবে।

পরদিন সকালে তারা যখন তাদের অস্থায়ী আস্তানা ছেড়ে বনের কিনারের দিকে এগোতে শুরু করল, তখন আরিয়ান মাহিয়ার দুর্বল শরীরটাকে আগলে রেখেছিল। মাহিয়া বারবার পিছে ফিরে তাকাচ্ছিল, এই জঙ্গলটিই তাকে প্রথম সত্যিকারের ভালোবাসা আর বাঁচার স্বাদ দিয়েছে।

এদিকে, ইন্সপেক্টর রাজিব সারোয়ারের নেতৃত্বে পুলিশের দলটি তাদের অনেক কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ড্রোনের সিগন্যাল আর মাটির ওপর পায়ের ছাপ অনুসরণ করে তারা সেই জলাশয়ের ধারে এসে পৌঁছাল, যেখানে গত রাতে মাহিয়া আর আরিয়ান ছিল। পোড়া কাঠের অবশিষ্টাংশ দেখে রাজিব বুঝতে পারলেন—তারা খুব বেশি দূরে নেই।

রাজিব তার টিমকে ইশারা করে বললেন, "সবাই সতর্ক হও! আমরা খুব কাছে। মেয়েটির সাথে হয়তো সেই বিপজ্জনক ডাকাত আছে। সাবধানে এগোতে হবে।"

অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মরণপণ লড়াই শেষে মাহিয়া আর আরিয়ান অবশেষে ঘন জঙ্গলের সীমানা ছাড়িয়ে এক নির্জন পিচঢালা রাস্তায় এসে পৌঁছাল। দুপুরের তপ্ত রোদ রাস্তার কালো পিচ থেকে যেন আগুনের হলকা তুলছে, কিন্তু মাহিয়ার চোখে আজ এক অন্যরকম প্রশান্তি। সে আরিয়ানের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, "আরিয়ান, আমরা পেরেছি! ওই দেখো রাস্তা। এই পথ ধরে গেলেই হয়তো আমরা কোনো লোকালয় বা শহরে পৌঁছে যাব।"

আরিয়ান ম্লান হাসল। সে ভাবছিল শহরে গিয়েই সবার আগে মাহিয়াকে কোনো বড় হাসপাতালে ভর্তি করবে। নিজের ধরা পড়ার ভয়টা মাহিয়ার জীবনের কাছে আজ তুচ্ছ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ রাস্তার দুপ্রান্ত থেকে পুলিশের সাইরেন বেজে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে বেশ কয়েকটি পুলিশের গাড়ি তাদের ঘিরে ফেলল।

ইন্সপেক্টর রাজিব সারোয়ার গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে রিভলবার উঁচিয়ে ধরলেন। পুলিশের ধারণা ছিল আরিয়ান একজন ভয়ংকর ডাকাত যে মাহিয়াকে অপহরণ করে জঙ্গলে লুকিয়ে রেখেছিল। রাজিব গর্জে উঠলেন, "খবরদার! নড়াচড়া করবে না। মেয়েটিকে ছেড়ে দাও, নইলে গুলি করতে বাধ্য হব!"

আরিয়ান ভ্যাবাচাকা খেয়ে হাত তুলে দাঁড়াল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু রাজিব দেখলেন আরিয়ানের অন্য হাতটি মাহিয়ার কোমরের কাছে (যা আসলে মাহিয়াকে ধরে রাখার জন্য ছিল)। ভুল বুঝে রাজিব ট্রিগার টিপে দিলেন।

"না!"— মাহিয়ার চিৎকার বনের নিস্তব্ধতা ফালাফালা করে দিল। আরিয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল মাহিয়া বিদ্যুতগতিতে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বুলেটের তীক্ষ্ণ শব্দ আর মাহিয়ার আর্তনাদ একসাথে মিশে গেল। গুলিটা আরিয়ানের গায়ে লাগার কথা ছিল, কিন্তু তা সরাসরি মাহিয়ার বুকের বাম পাশে বিঁধে গেল।

আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে মাহিয়

দ্য স্কারলেট ট্রুথ (The Scarlet Truth) এখন আমরা সায়নের নিস্তব্ধ অ্যাপার্টমেন্টে। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো শব...
10/03/2026

দ্য স্কারলেট ট্রুথ (The Scarlet Truth)


এখন আমরা সায়নের নিস্তব্ধ অ্যাপার্টমেন্টে। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সায়ন সোফায় বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, ঠিক তখনই তার কানে এল এক অদ্ভুত শব্দ।

বাথরুমের দিক থেকে একটা অস্পষ্ট কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দটা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। সায়নের বুকটা ধক করে উঠল। সে বিড়বিড় করে উঠল, "সারা? তুমি কাঁদছ কেন?"

সায়ন ধীর পায়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। প্রতিটা পদক্ষেপ যেন এক একটা পাহাড় সমান ভারী। সে দেখল বাথরুমের দরজাটা কিছুটা খোলা হয়ে আছে। ভেতর থেকে হলদেটে আলো চুঁইয়ে পড়ছে বাইরে। সায়ন কাঁপাকাঁপা হাতে দরজাটা পুরোটা ঠেলে দিল। আর যা দেখল, তাতে তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল।

বাথরুমের আয়নার সামনে মেঝেতে বসে আছে তার স্ত্রী সারা। তার সেই প্রিয় সারা, যাকে সে এতদিন আগলে রেখেছে। সারা দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কাঁদছে। তার কান্নার শব্দে এক অদ্ভুত হাহাকার মিশে আছে।

সায়নের বুকের ধকপকানি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সে ধীর পায়ে সারার কাছে এগিয়ে গেল। সারা দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল, কিন্তু সায়নের উপস্থিতি টের পেয়ে সে ধীরে ধীরে মুখ তুলল। সারার দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, চোখের মণি দুটো লাল হয়ে আছে। সায়ন লক্ষ্য করল, সারার থরথর করে কাঁপতে থাকা ডান হাতে ধরা আছে একটি প্রেগনেন্সি টেস্ট কিট।

সায়ন সেই কিটটির দিকে তাকালো। সেখানে ফুটে আছে একটিমাত্র লাল রেখা—একটি 'নেগেটিভ সাইন'। সারা ভাঙা গলায় আর্তনাদ করে উঠল, "সায়ন, আমি বলেছিলাম না? আমি কোনোদিন মা হতে পারবো না। আমাদের স্বপ্নগুলো সব মিথ্যে। আমি সত্যিই কোনোদিন মা হতে পারবো না!"

সারার সেই বুকফাটা আর্তনাদ বাথরুমের চার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে সায়নের কানে তীরের মতো বিঁধতে লাগল। সায়ন তাকে সান্ত্বনা দিতে হাত বাড়াল, কিন্তু স্পর্শ করার আগেই চারপাশের দেয়ালগুলো যেন কাঁপতে শুরু করল।

হঠাৎ এক তীব্র ঝাঁকুনিতে সায়নের চোখ খুলে গেল। সে দেখল সে নিজের বিছানায় শুয়ে আছে। ভোরের ধূসর আলো জানলা দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে ঘরে। সায়নের পুরো শরীর ঘামে ভিজে একাকার, কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে বালিশে। বুকটা এখনো হাপরের মতো ওঠানামা করছে।

সে হন্তদন্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ঘরময় চোখ বুলিয়ে দেখল কোথাও কেউ নেই। সেই কান্না নেই, সেই সারা নেই। সারা ঘর নিস্তব্ধ। সায়ন বুঝতে পারল, এতক্ষণ সে এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের ঘোরে ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের রেশ যেন বাস্তবকেও হার মানাচ্ছে। সে টলতে টলতে বাথরুমে গেল মুখ ধোয়ার জন্য।

বেসিনে জলের ঝাপটা দিয়ে সায়ন যখন মাথা তুলল, তখন তার রক্ত হিম হয়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়ানো তার নিজের প্রতিচ্ছবিটি যেন আর তার চেনা নয়। আয়নার ভেতর থেকে যে সায়ন তার দিকে তাকিয়ে আছে, তার মুখমণ্ডল বিকৃত, চোখের কোটরে এক পৈশাচিক অন্ধকার। সেই প্রতিচ্ছবিটি যেন সায়নকে দেখে বিদ্রূপের হাসি হাসছে। সায়নের মনে হলো আয়নার ভেতরকার মানুষটা তাকে গিলে খেতে আসছে।

সায়ন আতঙ্কে কয়েক পা পিছিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিল। সে নিজের মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল:

"এসব কী হচ্ছে আমার সাথে? আমি কি সত্যিই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি? নাকি এসবের আড়ালে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি না?"

কিছুক্ষণ পর সায়নের চোখের সেই আতঙ্ক বদলে গেল এক কঠোর সংকল্পে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারছে, গত তিন বছর ধরে সে যে বিভ্রান্তির বেড়াজালে নিজেকে বন্দী করে রেখেছে, তার বিনাশ হওয়া প্রয়োজন। সে ধীর কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে নিজেকেই বলল:

"সময় এসে গেছে। এই অসহ্য যন্ত্রণা আর লুকোচুরির অবসান আমাকেই ঘটাতে হবে। আজই সব সত্য সামনে আসবে।"

সায়ন আয়নার সামনে থেকে সরে এল। তার চোখে এখন অদ্ভুত এক স্থিরতা, যা কোনো বড় ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।

সায়নের অফিসের কাঁচের দেয়াল ভেদ করে বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছিল তার টেবিলে। কিন্তু সেই আলো সায়নের মনের অন্ধকার দূর করতে পারছিল না। যান্ত্রিকভাবে অফিসের কিছু জরুরি ফাইল সই করে সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার মাথায় তখন একটাই নাম ঘুরপাক খাচ্ছে—ডাক্তার আলেকজান্ডার।

কিছুক্ষণ পরেই সে আলেকজান্ডারের চেম্বারের সামনে এসে দাঁড়াল। সায়নকে ভেতরে ঢুকতে দেখে আলেকজান্ডারের চোখের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন, "আমি জানতাম তুমি আসবেই সায়ন। কিছু সত্য খুব বেশিক্ষণ আড়ালে রাখা যায় না।"

সায়ন অস্থিরভাবে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলল, "আমি আর পারছি না আলেকজান্ডার। আমার অতীত আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এটা কেমন করে সম্ভব যে গত তিন বছরের একটা মুহূর্তও আমার স্মৃতিতে নেই? কেন প্রতি রাতে আমি অদ্ভুত সব শব্দ শুনি? কেন মনে হয় কেউ আমাকে সারাক্ষণ অনুসরণ করছে? আমি আমার অতীত জানতে চাই, এখনই!"

আলেকজান্ডার শান্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি দেয়ালের এক কোণে ঝোলানো বিশাল একটি পুরনো আমলের আয়নার সামনে সায়নকে নিয়ে গেলেন। আয়নাটির ফ্রেম খোদাই করা কালো কাঠে ঢাকা, যা দেখলে এক ধরণের অস্বস্তি হয়। আলেকজান্ডার ফিসফিস করে বললেন, "অতীত অনেক সময় আমাদের সামনেই থাকে, শুধু দেখার চোখ লাগে। সায়ন, এই আয়নার দিকে তাকাও। গভীরভাবে দেখো। বলো তো, নিজের প্রতিবিম্ব ছাড়া আর কী দেখতে পাচ্ছ?"

সায়ন আয়নার ওপর স্থির দৃষ্টি রাখল। প্রথমে সব ঝাপসা মনে হলেও ধীরে ধীরে আয়নার ভেতরকার দৃশ্য বদলে যেতে লাগল। সায়নের গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল, কপালে জমে উঠল বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে অস্ফুট স্বরে বলতে শুরু করল, "ওটা কে? আলেকজান্ডার, ওটা আমি নই!"

তার কণ্ঠস্বর ভয়ে বুজে এল। সে কাঁপতে কাঁপতে বলল, "আমার ঠিক পেছনে একটা নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথায় একটাও চুল নেই... চামড়া ফ্যাকাশে সাদা, যেন শরীরের শিরা-উপশিরায় এক ফোঁটা রক্তও অবশিষ্ট নেই। তার কোটরগত চোখ দুটো আমার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে। সে... সে হাসছে!"

আয়নার সেই হাড়হিম করা দৃশ্য সায়নের মস্তিষ্কে যেন এক তীব্র বৈদ্যুতিক ঝটকা দিল। অবশ শরীর নিয়ে সে আলেকজান্ডারের চেম্বার থেকে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এল। তার কানে তখন বাজছে সেই রক্তহীন নারীমূর্তির অট্টহাসি। কোনো এক অজানা তাড়নায় সায়ন নিজের গাড়িতে উঠে বসল এবং তীব্র গতিতে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

আলেকজান্ডার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সায়নের চলে যাওয়া দেখছিলেন। তার মুখে এক রহস্যময় গম্ভীরতা। তিনি নিচু স্বরে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন, "অবশেষে সময় হলো। সায়ন, তোমার তালাবদ্ধ অতীতের দুয়ার খুলে গেছে। সত্য জানার জন্য প্রস্তুত হও।"

বাড়িতে পৌঁছে সায়ন সোজা সেই রহস্যময় স্টোর রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। প্রতিদিন এই দরজায় বিশাল এক মরচে ধরা তালা ঝোলানো থাকে, যার চাবি সে কোনোদিন খুঁজে পায়নি। কিন্তু আজ দৃশ্যটা আলাদা। আজ দরজায় কোনো তালা নেই! শুধু তাই নয়, দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে, যেন কেউ তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।

সায়ন কাঁপাকাপা হাতে দরজায় মৃদু ধাক্কা দিল। এক অদ্ভুত, কর্কশ শব্দ করে পাল্লা দুটো সরে গেল। সায়ন আশা করেছিল ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার দেখবে, কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ভেতর থেকে এক তীব্র, উজ্জ্বল সাদা আলো ঠিকরে বেরিয়ে এল। সেই আলো এতই প্রখর যে সায়নকে হাত দিয়ে চোখ আড়াল করতে হলো।
​এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে সায়ন সেই আলোর বৃত্তের দিকে পা বাড়াল। তার চারপাশের পরিচিত দেয়াল, আসবাবপত্র—সবকিছু যেন ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যেতে লাগল। সময়ের চাকা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল দ্রুতগতিতে।

২০২২ সালের সেই বর্তমান মুহূর্তটি মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল। সায়নের চোখের সামনে এখন এক নতুন দৃশ্যপট। চারপাশের পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো ঝড়ের গতিতে পিছিয়ে যাচ্ছে পেছনে...২০১৫
বাতাসে তখন এক অদ্ভুত সজীবতা। দৃশ্যটি এখন সাত বছর আগের।

২০১৫ সাল। নিও-সিটি যেন আজ এক উৎসবের নগরী। শহরের উপকণ্ঠে একটি সুসজ্জিত বাগানবাড়িতে আয়োজন করা হয়েছে এক জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহ অনুষ্ঠানের। চারদিকে আলোর রোশনাই, রজনীগন্ধার সুবাস আর অতিথিদের কলকাকলিতে মুখরিত চারপাশ।

আজ অরণ্য আর সারা-র দীর্ঘদিনের ভালোবাসার পূর্ণতা পাওয়ার দিন। মণ্ডপে যখন তারা একে অপরের পাশে বসল, তখন দুজনের চোখেই ছিল আগামীর এক সুন্দর স্বপ্নের ঝিলিক। অরণ্যের পরনে ছিল সাদা শেরওয়ানি, আর সারা লাল টুকটুকে বেনারসিতে যেন এক অপার্থিব রূপ ধারণ করেছিল। প্রথা মেনে যখন তাদের শুভদৃষ্টি হলো, অরণ্য অনুভব করল তার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে। অবশেষে সারা তার হতে চলেছে।

তাদের এই আনন্দের দিনে সারাক্ষণ ছায়ার মতো পাশে ছিল অরণ্যের অভিন্নহৃদয় বন্ধু আমান। আমান আজ বন্ধুকে নিয়ে বড্ড গর্বিত। অতিথিদের আপ্যায়ন থেকে শুরু করে প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ে সে তদারকি করছিল, যাতে অরণ্যের এই বিশেষ দিনে কোনো খামতি না থাকে। অরণ্য একবার আমানের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসল—এই বন্ধুত্ব আর এই নতুন জীবন, দুই-ই তার কাছে পরম পাওয়া।

রাত বাড়ার সাথে সাথে অনুষ্ঠান শেষ হলো। অতিথিরা বিদায় নিলেন। নিও-সিটির কোলাহল ছাপিয়ে এক গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এল।

নিশিরাত। ফুলশয্যার ঘরটি গোলাপের পাপড়ি আর মোমের আলোয় সাজানো। ঘরের মৃদু সুবাস এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। অরণ্য ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করল। সে দেখল সারা বিছানার এক কোণে মাথা নিচু করে বসে আছে। তার ঘোমটার আড়ালে লজ্জা আর মৃদু কম্পন স্পষ্ট।
​অরণ্য ধীর পায়ে তার সামনে এসে বসল। পরম মমতায় সারার চিবুক স্পর্শ করে তার মুখটি উপরে তুলল সে। দুজনের দৃষ্টি যখন একে অপরের ওপর স্থির হলো, তখন সেখানে ছিল অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসা। অরণ্য ফিসফিস করে বলল, "সারা, আজ থেকে আমরা আর দুজন নই, আমরা এক।"

সারা শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরণ্যের বুকে মাথা রাখল। বাইরে তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, যা পরিবেশকে আরও নিবিড় করে তুলল। মোমের হালকা আলোয় তাদের ছায়া দেয়ালে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া সেই মুহূর্তটিতে তারা সমস্ত জাগতিক চিন্তা ভুলে একে অপরের সান্নিধ্যে হারিয়ে গেল। এক গভীর শারীরিক ও মানসিক মিলনের মাধ্যমে তারা তাদের দাম্পত্য জীবনের প্রথম প্রহরটি অতিবাহিত করল। সেই রাতে অরণ্য জানত না, এই সুখের আড়ালে সাত বছর পরের কোনো এক অন্ধকার তার অপেক্ষায় ওত পেতে আছে।

বিয়ের পরের প্রথম সকাল। নিও-সিটির এক শান্ত সাবার্বান এলাকায় নিজেদের নতুন ছোটো অ্যাপার্টমেন্টে রোদ ঝলমলে এক আবহে অরণ্য আর সারার ঘুম ভাঙল। জানালার পর্দা ভেদ করে আসা ভোরের নরম আলোয় সারাকে আরও মায়াবী দেখাচ্ছিল। নতুন জীবনের প্রথম সকালটা ছিল একদম নিস্তরঙ্গ, যেন একরাশ শান্তি এসে ভিড় করেছে এই চার দেয়ালে।

অরণ্য নিও-সিটির একটি নামকরা ব্যাংকে কর্মরত। দায়িত্ববোধের টানে বিয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই তাকে আজ কাজে বেরোতে হলো। সারা পরম যত্নে তার জন্য সকালের নাস্তা তৈরি করে দিল। ডাইনিং টেবিলে বসে দুজনে মিলে চা খেতে খেতে আগামীর ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে আলাপ করল। অরণ্য ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সারার কপালে একটি আলতো চুমু এঁকে দিয়ে বলল, "আজ একটু তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করব।"

সারাদিন ব্যাংকের ব্যস্ততা, ফাইলের পাহাড় আর গ্রাহকদের ভিড়ের মাঝেও অরণ্যের মন পড়ে ছিল সেই নতুন বাড়িতে। ফেরার পথে রাস্তার ধারের এক বৃদ্ধার কাছ থেকে সে একগুচ্ছ সতেজ লাল গোলাপ কিনে নিল। গোলাপের প্রতিটি পাপড়ি যেন তাদের নতুন প্রেমের সুবাস বহন করছিল।
​বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে অরণ্য কলিং বেল বাজাল। সারা দরজা খুলতেই দেখল অরণ্য তার সামনে একটি টকটকে লাল গোলাপ বাড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সারার চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক খেলে গেল। সে গোলাপটি হাতে নিয়ে তার ঘ্রাণ নিল।

অরণ্য সারার হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীরস্থিরে বলল, "সারা, আমি তোমাকে চিরকাল এইভাবেই ভালোবেসে যাবো। তুমি আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা। আমি জানি, আমাদের শুরুর দিনগুলো, আমাদের এই সম্পর্কের যাত্রাপথটা খুব একটা সহজ ছিল না।

অনেক বাধা পেরিয়ে আজ আমরা এক ছাদের নিচে। আমি শুধু চাই, আমাদের গল্পের শেষটা যেন পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর গল্পের মতো হয়।"
​সারা আবেগে আপ্লুত হয়ে অরণ্যের বুকে মাথা রাখল। বাইরে গোধূলির আলো তখন মিলিয়ে গিয়ে আকাশের কোণে প্রথম তারাটি উঁকি দিচ্ছে।

ডাইনিং রুমের হালকা হলদেটে আলোয় তাদের ছায়া এক হয়ে মিশে রইল। এভাবেই দিনের পর দিন ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে তাদের সময় কাটতে লাগল। প্রতিটি সকাল আসত নতুন আশা নিয়ে, আর প্রতিটি রাত কাটত একে অপরের নিবিড় সান্নিধ্যে। নিও-সিটির সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটটি তখন পৃথিবীর সবচাইতে সুখী জায়গা বলে মনে হচ্ছিল।

২০১৭ সাল। নিও-সিটির সেই হাসিখুশি অ্যাপার্টমেন্টে এখন যেন এক বিষণ্ণতার ছায়া নেমে এসেছে। দুই বছর আগের সেই উজ্জ্বল দিনগুলো আজ ধূসর স্মৃতির মতো মনে হয়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে অরণ্যের সেই সাজানো গোছানো ব্যাংকটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে, আর সেই সাথে অরণ্য হয়ে পড়েছে বেকার। সংসারের টানাটানি আর অভাবের কালো মেঘ তাদের মাথার ওপর ঘনীভূত হচ্ছে।

কিন্তু অভাবের চেয়েও বড় এক সত্য সারাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। কয়েকদিন ধরে সে শরীরে এক অদ্ভুত দুর্বলতা অনুভব করছিল। অরণ্যকে কিছু না জানিয়ে সে চুপিচুপি নিও-সিটির এক সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে এসেছে। সেখান থেকে যে রিপোর্ট এসেছে, তা সারার পায়ের তলার মাটি সরিয়ে দিয়েছে। ডাক্তার জানিয়েছেন, সে এক মারণব্যাধিতে আক্রান্ত—হয়তো তার হাতে সময় খুব কম। কোনো এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

ডাইনিং টেবিলের এক কোণে বসে সারা যখন শূন্য চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, তখন অরণ্য তার পাশে এসে বসল। অরণ্যের চোখেও আজ ক্লান্তির ছাপ, সারাদিন চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরেছে সে। সারার ফ্যাকাশে মুখটা দেখে সে তার হাতটা চেপে ধরল।

অরণ্য নরম স্বরে বলল, "সারা, আমি জানি সময়টা আমাদের জন্য খুব কঠিন যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি খুব দ্রুত নতুন একটা কাজ খুঁজে নেব। তুমি মিছেমিছি অভাব নিয়ে এতো ভেবো না। তুমি নিজের যত্ন করো, ঠিকঠাক মতো খাওয়াদাওয়া করো। আমি থাকতে তোমার কোনো চিন্তা নেই।"

সারা জোর করে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে বলতে পারল না যে, সে হয়তো আর বেশিদিন তার এই সেবা করার সুযোগ পাবে না। অভাবের এই ঝড়ের মধ্যে নিজের অসুস্থতার খবর দিয়ে সে অরণ্যকে আর ভেঙে ফেলতে চাইল না। সে শুধু মাথা নিচু করে রইল।

২১শে জুলাই, ২০১৭
​পরদিন সকালে নিও-সিটিতে ঝুম বৃষ্টি নামল। অরণ্য সকাল সকাল কাজের সন্ধানে বাইরে বেরিয়ে গেছে। সারা বাথরুমে ঢুকে এক অদ্ভুত কাঁপা কাঁপা হাতে একটি ছোট স্ট্রিপ বের করল। কয়েকদিন ধরে সে এক অন্যরকম শারীরিক পরিবর্তনও লক্ষ্য করছিল।

বৃষ্টির শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে সারার বুকের ধড়ফড়ানি বাড়ছে। সে প্র্যাগনেন্সি টেস্ট (Pregnancy Test) করল।

২১শে জুলাইয়ের সেই বৃষ্টিভেজা সকালটা সারার জীবনের সবচাইতে দীর্ঘ এবং যন্ত্রণাময় সকাল হয়ে এল। বাথরুমের আবছা আলোয় সে কাঁপাকাঁপা হাতে প্রেগনেন্সি টেস্টের স্ট্রিপটির দিকে তাকিয়ে রইল। ডাক্তার আগেই তাকে সতর্ক করেছিলেন যে, তার শরীরের যা অবস্থা এবং যে মারণব্যাধি তার ভেতরে বাসা বেঁধেছে, তাতে মা হওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মনের কোণে এক চিলতে সুপ্ত আশা ছিল—হয়তো কোনো অলৌকিক কিছু ঘটবে। হয়তো এই অভাব আর অন্ধকারের মাঝে একটা নতুন প্রাণ তাদের জীবনে আলোর উৎস হয়ে আসবে।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল নিষ্ঠুর। স্ট্রিপের ওপর একটি মাত্র লাল দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠল। নেগেটিভ।
​সারার বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নিজের অসুস্থতা, আসন্ন মৃত্যুভয় আর এখন এই মাতৃত্বের স্বপ্নভঙ্গ—সব মিলিয়ে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বাথরুমের ঠাণ্ডা মেঝেতে বসে সে দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার সেই বুকফাটা কান্নার শব্দ বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজ ছাপিয়ে পাশের ঘরে পৌঁছে গেল।

অরণ্য তখনো বিছানায় আধোঘুমে ছিল। সারার আর্তনাদ শুনে সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। মুহূর্তের মধ্যে দুশ্চিন্তা তাকে গ্রাস করল। সে দ্রুত পায়ে বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে সারার বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে অরণ্যের বুকটা কেঁপে উঠল।

সে দ্রুত সারার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল এবং তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করল। অরণ্য তখনও জানে না সারার শরীরের ভেতরে কী ভয়াবহ রোগ দানা বেঁধেছে। সে শুধু ভাবল, হয়তো সন্তান না হওয়ার দুঃখটাই সারাকে এভাবে ভেঙে ফেলেছে।

অরণ্য অত্যন্ত মমতায় সারার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল, "সারা, শান্ত হও। এভাবে ভেঙে পড়লে চলে? একবার না হলে পরের বার হবে। আমাদের তো অনেক সময় পড়ে আছে। একটা টেস্ট নেগেটিভ এসেছে বলে কি সব শেষ হয়ে গেল? তুমি মিছেমিছি এতো চিন্তা করছ। দেখবে, সব ঠিক হয়ে যাবে।"

সারা অরণ্যের বুকে মুখ লুকিয়ে আরও জোরে কাঁদতে লাগল। সে বলতে পারল না যে, তার কাছে আর 'পরের বার' বলে কিছু নেই। সময় তার হাত থেকে বালির মতো ফসকে যাচ্ছে। অরণ্যের এই সান্ত্বনা যেন তার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে আরও বেশি করে নুন ছিটিয়ে দিচ্ছিল। সে জানত, এই ঘরে হয়তো কোনোদিন কোনো শিশুর হাসি শোনা যাবে না, কারণ তার নিজের জীবনপ্রদীপই নিভে আসার অপেক্ষায়।

অরণ্য সারাকে পাঁজকোলা করে তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। সে জানত না, এই কান্নার আড়ালে সারা তার কাছ থেকে কোন ভয়াবহ সত্য লুকিয়ে যাচ্ছে। নিও-সিটির সেই ছোট্ট ঘরটিতে তখন কেবল এক পৈশাচিক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল।

অভাবের কালো ছায়া আর অসুস্থতার গুমোট আবহে দিনগুলো কাটছিল যন্ত্রণার মতো। সায়নের এই অতীতে অর্থাৎ ২০১৭ সালে নিও-সিটিতে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। সারার শরীরের অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছিল। অরণ্য লক্ষ্য করল, সারা আগের মতো আর হাসে না, তার সেই উজ্জ্বল চোখ দুটো গর্তে ঢুকে গেছে।

একদিন সকালে অরণ্য শিউরে উঠল যখন দেখল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সারার চিরুনিতে গোছা গোছা চুল উঠে আসছে। তার মাথা প্রায় খালি হয়ে যাচ্ছে, আর ফ্যাকাশে চামড়ার নিচে নীলচে শিরাগুলো ভয়ংকরভাবে ভেসে উঠছে।

অরণ্য আর দেরি করল না। একপ্রকার জোর করেই সে সারাকে নিয়ে নিও-সিটির বড় হাসপাতালে গেল। সেখানে একের পর এক পরীক্ষা চলল। অরণ্য করিডোরে পায়চারি করছিল, তার বুক ধড়ফড় করছিল এক অজানা আশঙ্কায়।

অবশেষে ডাক্তার যখন তাকে চেম্বারে ডাকলেন, তার গম্ভীর মুখ দেখে অরণ্যের রক্ত হিম হয়ে এল। ডাক্তার একটি ফাইলের দিকে তাকিয়ে বললেন, "অরণ্য বাবু, আপনার স্ত্রীর অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। তিনি একটি বিরল জেনেটিক রোগে আক্রান্ত, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয়—'হেমাটো-নিওট্রোফিয়া' (Hemato-Neutrophia)। এই রোগে শরীরের রক্ত দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং কোষগুলো নিজেকেই ধ্বংস করতে শুরু করে। মাথার চুল পড়ে যাওয়া আর শরীরের এই রক্তশূন্যতা সেই রোগেরই লক্ষণ।"

অরণ্য স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার কানে ডাক্তার সাহেবের কথাগুলো যেন দূর থেকে ভেসে আসা কোনো প্রতিধ্বনির মতো বাজছিল। ডাক্তার থামলেন না, তিনি আরও যোগ করলেন, "সারাকে বাঁচানো হয়তো সম্ভব, কিন্তু তার জন্য ইমিউনো-থেরাপির এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া লাগবে। এতে প্রচুর টাকার প্রয়োজন, যা জোগাড় করা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আর এই মুহূর্তেই তাকে লাইফ সাপোর্ট (Life Support)-এ রাখা জরুরি, নয়তো তার হৃদযন্ত্র যেকোনো সময় কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে।"

অরণ্যের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। ব্যাঙ্কের চাকরিটা যাওয়ার পর থেকে তারা আধপেটা খেয়ে দিন কাটাচ্ছে, জমানো টাকা বলতে গেলে কিছুই নেই। যে ঘরে কালও ভালোবাসার স্বপ্ন ছিল, আজ সেখানে কেবল হাসপাতালের যন্ত্রপাতির কর্কশ শব্দ আর মৃত্যুর হাতছানি।

সে আইসিইউ-এর জানালার কাঁচ দিয়ে দেখল, সারা অচেতন হয়ে শুয়ে আছে। তার নাকে-মুখে নলের জটলা, মাথার সেই ঘন চুলগুলো আজ আর নেই। অরণ্য দেয়াল ধরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। একদিকে তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা সারার নিভে আসা প্রাণ, আর অন্যদিকে এক বিশাল অঙ্কের টাকার পাহাড়। অরণ্য কি পারবে নিও-সিটির এই নিষ্ঠুর শহরে তার ভালোবাসাকে ফিরিয়ে আনতে? নাকি এই অর্থকষ্টই তাদের বিচ্ছেদ ডেকে আনবে?

২০১৯ সাল। নিও-সিটির সেই একসময়ের স্বপ্নিল অ্যাপার্টমেন্টটি এখন এক ধ্বংসস্তূপের মতো দেখায়। ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলে এক বুকফাটা হাহাকার আর ওষুধের কটু গন্ধ নাকে আসে। যে ঘরে একসময় সুরুচিপূর্ণ আসবাব আর হাসির শব্দ ছিল, সেখানে এখন কেবল শূন্যতা। অরণ্য একে একে সব বিক্রি করে দিয়েছে—আলমারি, সোফা, এমনকি তাদের বিয়ের উপহারগুলোও। এখন সেখানে কেবল একটি জরাজীর্ণ বিছানা আর কিছু যান্ত্রিক সরঞ্জামের কর্কশ শব্দ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটিকে চিনতে পারা এখন অসম্ভব। সারার সেই মায়াবী রূপ হারিয়ে গেছে 'হেমাটো-নিওট্রোফিয়া'-র অতল গহ্বরে। তার মাথার একটি চুলও আর অবশিষ্ট নেই; মস্তকটি এখন সম্পূর্ণ মসৃণ এবং ফ্যাকাশে। শরীরের চামড়া শুকিয়ে হাড়ের সাথে লেগে গেছে, আর রক্তের অভাবে গায়ের রঙ হয়ে গেছে পাথরের মতো সাদা। সে এখন জীবন্ত কোনো মানুষ নয়, বরং এক ছায়ামূর্তিতে পরিণত হয়েছে।
​ঘরের এক কোণে রাখা লাইফ সাপোর্ট মেশিনের একঘেয়ে 'বিপ... বিপ...' শব্দই কেবল জানান দিচ্ছে যে সারা এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছে। অরণ্য নিজের সর্বস্ব দিয়ে এই মেশিনটি টিকিয়ে রেখেছে।

সে এখন একটি ছোট কারখানায় দিনমজুরের মতো হাড়ভাঙা খাটুনি খাচ্ছে। যা বেতন পায়, তার সিংহভাগ চলে যায় মেশিনের বিদ্যুৎ বিল আর সারার জীবনরক্ষাকারী ওষুধের পেছনে। নিজের খাওয়ার জন্য অবশিষ্ট থাকে সামান্যই।

অরণ্য কাজ থেকে ফিরে সারার সেই কঙ্কালসার হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার চোখে আজ আর জল নেই, আছে কেবল এক গভীর শূন্যতা আর দুশ্চিন্তার পাহাড়। সে জানে, এই লাইফ সাপোর্ট কেবল মৃত্যুকে কিছুটা পিছিয়ে দিচ্ছে মাত্র। মূল চিকিৎসার জন্য যে বিশাল অঙ্কের টাকা প্রয়োজন, তা এই সামান্য চাকরিতে কয়েক জন্মেও জমানো সম্ভব নয়।

বাইরে নিও-সিটির আকাশ আজ মেঘলা। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অরণ্য অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, সারা হয়তো ধীরে ধীরে এক অন্য জগতের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে, আর সে অসহায়ভাবে কেবল সেটা দেখছে। অরণ্যের মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে—হয় তাকে খুব দ্রুত অনেক টাকা জোগাড় করতে হবে, না হয় নিজের চোখের সামনে তিলে তিলে সারার শেষ নিঃশ্বাসটুকু নিভে যেতে দেখতে হবে।

২০১৯ সালের সেই গুমোট বিকেলে নিও-সিটির আকাশটা ছিল তামাটে রঙের। সারাদিন কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি আর যন্ত্রের কানফাটানো আওয়াজে অরণ্য আজ বিধ্বস্ত। তার শরীর আর চলছে না, আর মনটা যেন বিষাক্ত হয়ে আছে। রাস্তার ধারের ধুলোবালি মাখা একটা সস্তা মদের দোকানের সামনে এসে সে থমকে দাঁড়াল। বাড়িতে গেলেই সেই লাইফ সাপোর্ট মেশিনের একঘেয়ে শব্দ আর সারার সেই কঙ্কালসার ফ্যাকাশে মুখ—এসব দেখার মতো মানসিক শক্তি আজ তার নেই।

বাড়িতে একজন নার্স রাখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার খরচ জোগাতে অরণ্যের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। সে দোকানের এক কোণে বসে গ্লাসের পর গ্লাস সস্তা মদ গিলতে শুরু করল। নেশার নীল বিষ যখন তার রক্তে মিশতে শুরু করল, তখন ভেতরকার জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আর হতাশা আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বেরিয়ে আসতে চাইল।

অরণ্য তার সামনের টেবিলে সশব্দে গ্লাসটা রাখল। ঝাপসা চোখে পাশের লোকটার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলতে শুরু করল, যা সে গত দুই বছর ধরে নিজের মনে চেপে রেখেছিল। সে বলতে লাগল, "এই মেয়েটাকে নিয়ে আমি আর পারছি না ভাই... আর কতদিন? এভাবে আর কতদিন একটা জ্যান্ত লাশের সেবা করে যাব আমি?"

মদের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে অরণ্যের কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এল। সে তিক্ত গলায় বলতে থাকল, "আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে। কোনো ভবিষ্যৎ নেই এই মেয়েটার সাথে আমার। ডাক্তার বলেছিল ও কোনোদিন মা হতে পারবে না—কোনো সন্তান নেই, কোনো সুখ নেই। এমনকি আমাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্কও নেই বছরের পর বছর। কোনো **ক্স নেই, কোনো আনন্দ নেই—জীবনটা একদম মরে গেছে। প্রতিদিন এই হাড়ভাঙা খাটাখাটনি আর সব টাকা ওই মেশিনের পেছনে ঢালা... আমি আর সহ্য করতে পারছি না!"

সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য চোখে জানালার দিকে তাকাল। নেশার ঘোরে তার নৈতিকতা আর ভালোবাসার বাঁধনগুলো তখন আলগা হয়ে গেছে। সে নিষ্ঠুরভাবে বলে উঠল, "সারা যদি আজ মরে যায়, তবেই আমি শান্তি পাব। ও মরে গেলেই আমার মুক্তি। নিজের এই অবস্থা আর দেখা যায় না। আমি আর মানুষ নেই, আমিও একটা মেশিন হয়ে গেছি।"

অরণ্য টলতে টলতে দোকান থেকে বেরিয়ে এল। নিও-সিটির নিওন আলোগুলো তার চোখে বিঁধছে। তার ভেতরে এখন এক পৈশাচিক লড়াই চলছে—একদিকে ফেলে আসা দিনের ভালোবাসা, আর অন্যদিকে বর্তমানের অমানুষিক যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

নিও-সিটির রাতের আকাশটা আজ ঘন কালো মেঘে ঢাকা, যেন সারার মনের বিষণ্ণতা আজ প্রকৃতির গায়েও লেপ্টে আছে। ঘরের এক কোণে লাইফ সাপোর্ট মেশিনের সেই পরিচিত 'বিপ... বিপ...' শব্দটা আজ যেন একটু বেশিই করুণ শোনাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে থাকা কঙ্কালসার সারা একদৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার ফ্যাকাশে গাল বেয়ে নোনতা জল গড়িয়ে কান পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছিল। সে শুনতে পাচ্ছিল না অরণ্য বাইরে কী বলছে, কিন্তু সে নিজের ভেতরকার হাহাকারটুকু ঠিকই টের পাচ্ছিল। সে জানে, তার এই শরীরটা এখন কেবল অরণ্যের জন্য এক বিশাল বোঝা, এক অন্তহীন যন্ত্রণার নাম।

সারা জানে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। সে আর চায় না তার প্রিয় মানুষটি প্রতিদিন তিলে তিলে শেষ হয়ে যাক। নার্স যখন ওষুধের ট্রলি গুছিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াল, সারা খুব কষ্ট করে নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা বাড়াল। তার কণ্ঠস্বর এতটাই ক্ষীণ যে মনে হচ্ছিল বাতাসেই মিলিয়ে যাবে।

সে নার্সের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, "সিস্টার... তুমি আমার হয়ে একটা শেষ কাজ করে দেবে? আমার হাত চলছে না, তুমি কি একটা চিঠি লিখে দেবে?"

নার্স কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সারার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই চোখে এমন এক আকুতি ছিল যা উপেক্ষা করা অসম্ভব। সে একটি কাগজ আর কলম নিয়ে সারার শিয়রে বসল। সারা চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল, আর নার্স তার প্রতিটি শব্দ সযত্নে কাগজে টুকে নিতে লাগল। চিঠিতে লেখা হলো:

"অরণ্য, তুমি আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা। বছরের পর বছর তুমি আমার এই জ্যান্ত লাশের জন্য নিজেকে শেষ করে দিচ্ছ, আমি সব বুঝি। কিন্তু আমি আর তোমার জীবনের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। আমি এই নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই, আর তোমাকে দিতে চাই এক নতুন জীবন। আমি মারা গেলে হয়তো তুমি আবার হাসতে পারবে, আবার বাঁচতে শিখবে।"

​চিঠির পরের অংশটুকু লিখতে গিয়ে সারার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। সে যোগ করল:

"জানেন অরণ্য, আজ আমাদের বিবাহিত জীবনের চার বছর পূর্ণ হলো। এই বিশেষ দিনে আমি তোমার সেই পুরনো সারা হয়ে তোমার সামনে আসতে চাই। আমি একটু সাজতে চাই অরণ্য, ঠিক সেই চার বছর আগের মতো। আমি তোমাকে এক শেষ উপহার দিতে চাই। আমি তোমাকে নতুন করে জানতে চাই, আরও একবার ভালোবাসতে চাই। ইতি—তোমার সারা। আই লাভ ইউ অরণ্য।"

নার্স যখন শেষ শব্দটা লিখে কলম থামাল, সারার চোখের জল তখন চিঠির কাগজের এক কোণে ছোট্ট একটা দাগ ফেলে দিয়েছে। সারা অতি কষ্টে ইশারায় নির্দেশ দিল চিঠিটা যেন পাশের জরাজীর্ণ ডাইনিং টেবিলের ড্রয়ারের ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়। সে চায় না অরণ্য ঘরে ঢুকেই এটা দেখুক; এটা হোক তাদের শেষ বিদায়ের এক গোপন দলিল।

এরপর শুরু হলো এক অদ্ভুত ও হৃদয়বিদারক সাজসজ্জা। সারা নার্সকে অনুরোধ করল আলমারির নিচে পড়ে থাকা সেই উজ্জ্বল লাল রঙের ড্রেসটি বের করতে। দুই বছর আগে যে পোশাকে সারাকে পরীর মতো লাগত, আজ সেই কাপড়টি তার কঙ্কালসার শরীরে ঝুলে রইল। তার মাথায় একটিও চুল নেই, গাল দুটো ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছে, গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে সাদা—লাল রঙের তীব্রতার পাশে তার এই চেহারা এক বিভীষিকার মতো দেখাচ্ছিল। তবুও নার্স পরম মমতায় তার ঠোঁটে সামান্য লিপস্টিক আর কপালে একটা লাল টিপ পরিয়ে দিল।

সারা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে শিউরে উঠল না, বরং এক চিলতে ম্লান হাসল। সে মনে মনে ভাবল, "অরণ্য তো আমাকে মন থেকে ভালোবাসে, সে নিশ্চয়ই আমার এই রূপের আড়ালে সেই পুরনো সারাকেই খুঁজে পাবে। আজ আমাদের চার বছর পূর্ণ হলো, সে অন্তত একবার আমাকে জড়িয়ে ধরবে না?"

অরণ্যকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য সারা নিজেকে পুনরায় বিছানায় গুছিয়ে নিল। গলার নিচ পর্যন্ত একটা ভারী কম্বল টেনে দিল সে, যাতে অরণ্য ঘরে ঢুকে প্রথমেই তার লাল পোশাক আর সাজগোজ দেখতে না পায়। সে চায় অরণ্য কাছে আসুক, কম্বলটা সরাক, তারপর দেখুক তার প্রিয়তমা আজ কত যত্ন করে সেজেছে।

সারা নার্সকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলল, "সিস্টার, আজ আমাদের বিশেষ দিন। আমি চাই আজ রাতে আমরা দুজন একা থাকি। তুমি আজ ছুটি নাও, কাল সকালে এসো।"

নার্স দ্বিধাগ্রস্ত হলেও সারার জেদের কাছে হার মানল। সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় শেষবারের মতো লাইফ সাপোর্ট মেশিনের দিকে তাকাল—সেখানে লাল-সবুজ আলোগুলো মিটমিট করছে।

ঘর এখন নিস্তব্ধ। কেবল মেশিনের সেই যান্ত্রিক শব্দ আর সারার দ্রুত হতে থাকা হৃদস্পন্দন। সে দরজার দিকে চেয়ে রইল। নিও-সিটির নিওন আলো জানালার পর্দা চিরে ঘরের ভেতর এক মায়াবী ছায়া তৈরি করেছে। সারা প্রহর গুনছে—কখন অরণ্য টলমল পায়ে ঘরে ঢুকবে, কখন সে তার সেই রুক্ষ কিন্তু পরিচিত কণ্ঠস্বরে ডাকবে—"সারা!" সে জানে না অরণ্য আজ বাইরে কী বিষাক্ত কথা বলে এসেছে; সে শুধু জানে আজ তাদের ভালোবাসার চার বছর।

বাইরে নিও-সিটির নিস্তব্ধ রাত, আর অরণ্য টলমল পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে নিজের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। মদের তীব্র ঝিমঝিমুনি তার মাথায়, পৃথিবীটা যেন তার চোখের সামনে দুলছে। কিন্তু দরজার কাছে আসতেই সে থমকে গেল। আজ দরজাটা কেন জানি ভেজানো।

ভেতরে পা রাখতেই অরণ্যের ঝাপসা চোখে এক অদ্ভুত পরিবর্তন ধরা পড়ল। ঘরটা আজ আর আগের মতো অগোছালো বা নোংরা নয়। নার্স যাওয়ার আগে সারার কথামতো ঘরটা কিছুটা গুছিয়ে দিয়ে গেছে, কোথাও যেন একটা হালকা সুগন্ধি ছড়ানো। অরণ্য বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল, তারপর নিজের ঘামে ভেজা শার্টটা খুলে এক কোণে ছুড়ে ফেলল। বেসিনের কাছে গিয়ে চোখে-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল সে, কিন্তু মনের ভেতরে জ্বলতে থাকা সেই বিষাক্ত আগুন তাতে কমল না।

সে টলতে টলতে সারার ঘরের পর্দার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দরজার পাল্লা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল সারা কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে, তার চোখে এক অন্যরকম দীপ্তি। অরণ্যকে দেখে সারার ফ্যাকাশে ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, "তুমি এসেছো অরণ্য? আমি জানতাম তুমি আজ ঠিক সময়েই ফিরবে। জানো, আজ আমাদের বিশেষ দিন। আমি তোমার জন্য একটা উপহার রেখেছি..."

সারার কথা শেষ হওয়ার আগেই অরণ্য সশব্দে খাটের পাশের একটা টুলে লাথি মারল। তার চোখ দুটো মদের নেশায় লাল হয়ে আছে, আর মুখ দিয়ে বেরোচ্ছে একরাশ ঘৃণা। সে তর্জনী উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল, "চুপ! একদম চুপ! একদম একটা শব্দও করবে না তুমি!"

অরণ্যের গলার স্বরে ঘরটা যেন কেঁপে উঠল। সে সারার বিছানার ওপর ঝুঁকে পড়ে হিংস্র গলায় বলতে লাগল, "উপহার? কিসের উপহার দেবে তুমি আমাকে? তুমি আমার জীবনটা তিলে তিলে নষ্ট করে দিয়েছ সারা! আমার জীবনের সব রঙ শুষে নিয়েছ তুমি। দেখো আমার দিকে—আমি কি আর মানুষ আছি? আমি একটা রোবট হয়ে গেছি!"

অরণ্যের কন্ঠস্ব

Address

Tangail
Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Miraz & Rahat posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share

Category