12/10/2024
নোবেল জয়ী হান কাংয়ের লেখাঃ 'আমার রমণীর ফল'🔲
তখন মে মাসের শেষদিক, যখন আমার স্ত্রীর শরীরের জ*খমণ্ডলো প্রথম খেয়াল করি। এমন একদিন যখন দারোয়ানের দপ্তরের পাশের বাগিচার লাইল্যাকগুলো ছি*ন্ন জি*হ্বার মতো ল*কলক করে পাপড়ি ছড়াচ্ছিল এবং পথচারীর জুতা মাড়িয়ে যাচ্ছিল সিনিয়র সিটিজেন সেন্টারের প্রবেশপথের পাকা ফলকগুলোর ওপর পচে যাওয়া সাদা ফুলের আচ্ছাদন।
সূর্য তখন একদম প্রায় মাথার ওপরে। পাকা পিচের মাং*সের রঙের সূর্যালোক গলগল করে ঢুকে পড়ছিল লিভিং রুমের মেঝেতে, ঝেড়ে দিচ্ছিল অগুনতি ধুলা পরাগের কণা। ও সেই অ*সুখ-মিষ্টি, কুসুম গরম সূর্যের আলো আমার সাদা গেঞ্জির পিঠের ওপর দিয়ে বয়ে গেল, যখন আমি ও আমার স্ত্রী রোববার সকালের খবরের কাগজটার পাতা ওল্টাচ্ছিলাম।
গত সপ্তাহটা সেই একই ক্লা*ন্তির রেশ ধরে রেখেছিল, যা বিগত বহু মাস ধরে আমি অনুভব করে আসছি। ছুটির দিনগুলোতে নিজেকে আমি একটু বেশি ঘুমিয়ে থাকতে দিই, আর ঘুম থেকে উঠেছি তখনও কয়েক মিনিট হয়েছে কেবল। বিছানায় নিজের দিকে শুয়ে তখনও আমার অলস প্রত্যঙ্গগুলো একটা স্বস্তিকর জায়গায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম। যতটা ধীরে সম্ভব খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছিলাম।
"একটু দেখবে? বুঝতে পারছি না দাগগুলো এখনও মিলিয়ে যাচ্ছে না কেন।" ওর কথাগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করার বদলে আমি সে গুলোকে আমার নীরবতার মসৃণ চাদরের ওপর নিছক ঝামেলা হিসেবেই গ্রহণ করলাম। আনমনা হয়ে ওর দিকে একবার মুখ তুলে তাকালাম।
চট করে সোজা হয়ে বসলাম। আঙুল দিয়ে তখনও খবরের কাগজে কী পড়ছিলাম, তা ধরে রেখে এক হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছলাম। আমার স্ত্রী ব্রা অবধি গেঞ্জিটা তুলে রেখেছিল; পিঠ থেকে পেট পর্যন্ত গভীর ঘা ফুটে ছিল।
"এটা কীভাবে হলো?"
যতটুকু মুচড়ে বসলে আমি ওর মেরুদন্ডটাকে ওর প্লিটেড স্কার্টের চেইন পর্যন্ত সারি বেয়ে উঠে যেতে দেখতে পাব, ততটুকু সরে বসল। একটা নবজাতকের মুষ্টির সমান আবছা নীল ঘা, এত স্পষ্ট যে মনে হয় কালি দিয়ে ছাপানো হয়েছে। "কী? কীভাবে হলো এসব?" আমার তী*ক্ষ্ণ, জোরালো কণ্ঠে আমাদের আঠারো পিয়োংয়ের ফ্ল্যাটের শান্ত পরিবেশটা ভেঙে গেল । "আমি ঠিক জানি না, ভেবেছিলাম বেখেয়ালে কোনখানে ধা*ক্কা খেয়েছি হয়তো, কয়দিন পর এমনিতেই দাগগুলো চলে যাবে, কিন্তু এখন দেখছি আরও বাড়ছে।” আমার স্ত্রী আমার নজর এড়িয়ে যাচ্ছিল, কোনো অ*পরাধী বাচ্চার মতো। বকার মতো দেওয়াতে একটু খারাপ লাগল আমার চেষ্টা, করলাম আরেকটু কোমল স্বরে কথা বলতে।
"ব্যথা হচ্ছে না?" "না, একদমই না। বরং জ*খমণ্ডলো যেখানে, সেখানে কোনো অনুভূতিই টের পাচ্ছি না। কিন্তু বুঝছোই তো, সেটা তো আরও বেশি চিন্তার বিষয়।"
একটু আগে ওর মুখে যে অ*পরাধী ভাবটা লক্ষ্য করছিলাম, সেটা কোনো চিহ্ন না রেখেই মিলিয়ে গেল। তার বদলে সেখানে দেখা গেল একটা মৃদু, বেখাপ্পা হাসি। আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, ওর হাসপাতালে যাওয়া দরকার কিনা, আর তখনও সেই হাসিটা ওর ঠোঁটের ওপর খেলা করছিল।
পুরো ঘটনাটা থেকে হঠাৎ নিজেকে খুব বিচ্ছিন্ন মনে হলো। আমার স্ত্রীর মুখটা আমি একটা ঠান্ডা, নির্লিপ্ত নজরে পর্যবেক্ষণ করলাম। যে মুখটার সামনে নিজেকে আবিষ্কার করলাম, সেটা খুব অপরিচিত মনে হলো। অপরিচিত, এমনকি প্রায় অবাস্তব মনে হলো; এ রকমটা তো কেউই আশা করে না, বিশেষত চার বছর এক ছাদের নিচে থাকার পর। আমার স্ত্রী আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট। সে বছর উনত্রিশ বছরে পা দিয়েছিল। একসঙ্গে যখন বের হতাম, তখন ওর মুখের কারণে ওকে এত ছোট দেখাত যে ব্যাপারটা প্রায় বি*রক্তিকর ছিল। বিয়ের আগে প্রায়ই ওকে দেখে লোকজন স্কুলপড়ুয়া ভেবে ভুল করত। এখন সেই মুখে ক্লা*ন্তির স্পষ্ট ছাপ, যা তার আয়তচক্ষু মুখের নিষ্পাপতায় একটা আকস্মিক ছেদ টানে। এখন আর কেউ ওকে দেখে স্কুলপড়ুয়া ভেবে ভুল করবে না, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ভাবারও কথা না। এখন বরং ওকে দেখতে ওর আসল বয়সের চেয়ে বেশি বয়স্ক মনে হয়। কাঁচাপাকা আপেলের মতো ওর সেই গাল, যেখানে লালের আভা একটু একটু করে ফুটত, সেটা এখন দেখতে লাগে চুপসানো, ভচকানো কাদার মতো। যে কোমর একসময় মিষ্টি আলুর চারার মতো কোমল ও নরম ছিল, যে কোমরে একসময় চমৎকার ঢেউ খেলত, তা এখন করুণভাবে সমতল।
শেষ ঠিক কবে নিজের স্ত্রীকে ন*গ্ন দেখেছিলাম, ঠিক মনে করতে পারছিলাম না, আর তখনও ওকে দেখার মতো যথেষ্ট আলো ছিল। সে বছর তো দেখিইনি, তা নিশ্চিত; তার আগের বছরও দেখেছি কিনা তাও নিশ্চিত হতে পারছিলাম না।
যেই একজনের সঙ্গে আমি এক ঘরে থাকি, তার শরীরের এত গভীর ক্ষতগুলো কীভাবে আমার নজরে না পড়ে পারল? আমার স্ত্রীর চোখের কোণের উজ্জ্বল বলিরেখাগুলো গোনার চেষ্টা করলাম আমি। তারপর ওকে বললাম, সব কাপড় খুলে ফেলতে। ওর গালের হাড়ের রেখা বেয়ে একটা লাল আভা ফুটে উঠল, ওজন কমে যাওয়ার কারণে হাড়গুলো আরও অনেক তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিল। ও আপত্তি করার চেষ্টা করল।
"কেউ দেখে ফেললে?" অন্য বেশির ভাগ ফ্ল্যাটই যেখানে কোনো বাগান কিংবা কার পার্কিংয়ের দিকে মুখিয়ে থাকে, সেখানে আমাদের বাড়ির বারান্দাটা ছিল পূর্বদিকের মেইন রোডের দিকে মুখ করা। সবচেয়ে কাছের অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক থেকে তিন রাস্তা দূরে থাকায় এটা মূল রাস্তা ও চুংচাং নদী উভয় দ্বারা বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে খুব শ*ক্তিশালী টেলিস্কোপ ছাড়া কারও পক্ষেই আমাদের দেখা সম্ভব ছিল না। এবং এত গতিতে চলে যাওয়া গাড়িগুলোর ভেতর থেকে কেউ আমাদের লিভিং রুমের মধ্যে দেখে ফেলবে, সেই সম্ভাবনাও নিশ্চয়ই ছিল না। ফলে আমার স্ত্রীর আপত্তিটাকে আমি ল*জ্জা হিসেবেই দেখলাম।
নতুন নতুন যখন বিয়ে হয়, তখন ছুটির দিনগুলোতে এই একই লিভিং রুমে, বারান্দার এই কাচের দরজা ও আগস্টের প্র*চণ্ড উ*ত্তাপ সামলানোর জন্য এর পাশে র জানালাটা একদম মেলে রেখেই আমরা দিনের মধ্যবেলায় বারবার মিলিত হতাম। আনাড়ির মতো হাতড়ে বেড়াতাম একে অপরকে, যা আমাদের কাছে খুব নতুন ছিল। তারপর একসময়, অনিবার্যভাবে, একটা ক্লা*ন্তির ভারে আমরা দেবে গেলাম।
এক বছরের মতো পার হয়ে যাওয়ার পর আমরা আর একে অপরের ভালোবাসার প্রতি অতটা অনভ্যস্ত রইলাম না, আর প্রথমদিককার সেই উ*ত্তেজনা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। আমার স্ত্রী খুব তাড়াতাড়ি বিছানায় চলে যেতে শুরু করল, আর সাধারণত ওর ঘুম খুব গভীর হয়। আমার যদি বাসায় ফিরতে দেরি হতো, তাহলে ধরেই নিতে হতো যে ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। সদর দরজার তালায় চাবিটা মুড়িয়ে যখন ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকতাম, একদম একা, স্বাগত জানানোর কেউ নেই, তখন সে অবস্থায়ই হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে অ*ন্ধকার বেডরুমে ঢুকে দেখতাম ওর নিতান্ত নিঃশ্বাসের ছন্দও আমাকে অ*বর্ণনীয়ভাবে নিঃস*ঙ্গ করে ফেলছে। মুছে নেওয়ার জন্য, তখন ওর আধখোলা, ঘুমে-ঢাকা চোখ দেখে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারতাম না ও কি আমার এই আলিঙ্গন প্র*ত্যাখ্যান করছে, নাকি উ*ষ্ণতার সাথে ফিরিয়ে দিচ্ছে। ও কেবল আমার চুলের মধ্য দিয়ে নীরব আঙুল বুলিয়ে দিত, যতক্ষণ না আমার শরীরের সব নড়াচড়া থেমে যেত।
"সবটুকু? তুমি চাও আমি সবটুকু খুলে ফেলি?"
ওর কুঁ*চকানো মুখটা কান্নার গমক আটকে রাখতে পারছিল না। আমার স্ত্রী এই মাত্র খুলে ফেলা অ*ন্তর্বাসটা ভাঁজ করে একটা বল বানিয়ে নিজের যো*নিদেশ ঢাকল।
এই তো তখন ওর ন*গ্ন শরীর, বসন্তের সূর্যালোকের নিচে পুরোপুরি প্রকাশিত। সত্যিই বহুদিন হয়ে গিয়েছিল। অথচ তখনও আমি ন্যূনতম কা*মনা অনুভব করতে পারলাম না।
শুধু ওর পা*ছাই না, ওর পাঁজর আর হাঁটুর নিচ অবধি হলদে-সবুজ জ*খমণ্ডলো, যা এমনকি উ*রুর মধ্যিখানটাতেও দা*গ ফেলে গেছে, দেখে প্র*চণ্ড এক রাগ আমাকে আঁকড়ে ধরল, আর তারপর একই রকম আচানকভাবে রা*গটা ছেড়ে চলেও গেল, পিছে রেখে গেল একটা অসংগত বি*ষাদ। কেননা এই নারী, যার মন এত সহজেই খেই হারিয়ে ফেলে, ঘুম কি প্রথম সন্ধ্যার দিকে হাঁটতে বের হওয়ার স্মৃতিকেও মিইয়ে দিয়েছে- ঘুমের যবনিকা কি ইতোমধ্যে ভোঁ*তা করে দিয়েছে সব বোধ- যে পা হ*ড়কে গেল একটা ধীরগতি গাড়ির তলে, কিংবা হয়তো আমাদের ই বাড়ির নিভু-আলোর ইমা*র্জেন্সি সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে পড়ে গেল নিচে? আমার স্ত্রীর এই অবয়ব, এইখানে নিজের যো*নিদেশ রক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে, পিঠ বসন্তের রোদ, আনমনা হয়ে জিজ্ঞেস করছে ওর হাসপাতালে যাওয়া উচিত হবে কিনা, কী যে দীন, বেচারা, দুঃ*খী এই মহিলা যে কোনো শব্দই যথেষ্ট হবে না ওর জন্য। ফলে এমন এক দুঃ*খ আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল, যা বহুকাল ধরে অনুভব করিনি। কেবল ওর শী*র্ণ শরীরটা নিজের শরীরে আঁকড়ে ধরে বসে থাকলাম আমি।
বাংলা অনুবাদ: মাহীন হক
(টিকা: 'আমার রমণীর ফল' নামীয় গল্পের প্রথম অধ্যায়। ইংরেজি নাম 'My Woman's Fruit'। কোরীয় থেকে ইংরেজি করেছেন দেবোরাহ স্মিথ)