14/08/2026
সীমানার ওপারে এক বন্ধুত্ব
বাংলাদেশের যশোরের ৩০ বছর বয়সী যুবক রায়হানের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ৫০ বছর বয়সী অরুণ দার পরিচয় হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শুরুটা ছিল একটি সাধারণ মন্তব্য থেকে। তারপর ধীরে ধীরে প্রতিদিনের খোঁজখবর, গল্প আর জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে করতে দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে এক অদ্ভুত সুন্দর বন্ধুত্ব।
বয়সের পার্থক্য ছিল বিশ বছর, দেশের সীমানাও ছিল আলাদা। কিন্তু মন থেকে তারা যেন ছিল একই পরিবারের মানুষ। রায়হান অরুণ দাকে কখনো শুধু বন্ধু ভাবেনি, বড় ভাই আর অভিভাবকের মতো সম্মান করত। অন্যদিকে অরুণ দা বলতেন, “রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মানুষ চাইলে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।”
প্রতিদিন সকালে রায়হান একটি বার্তা পাঠাত, “দাদা, কেমন আছেন?” আর রাতে ঘুমানোর আগে অরুণ দা লিখতেন, “ভালো থেকো ভাই, নিজের খেয়াল রেখো।”
এভাবেই কেটে যায় কয়েক বছর।
হঠাৎ একদিন অরুণ দা ব্যক্তিগত কাজে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আগের মতো নিয়মিত কথা বলা আর হলো না। কয়েকদিন কোনো বার্তা না পেয়ে রায়হানের মন অস্থির হয়ে উঠল। ফোন হাতে নিয়েও বারবার রেখে দিত। মনে হতো, “দাদা নিশ্চয়ই ব্যস্ত। বিরক্ত করা ঠিক হবে না।”
তবু প্রতিদিনই সে পুরোনো কথোপকথন খুলে দেখত। একসঙ্গে হাসির মুহূর্তগুলো, জীবনের উপদেশ, আর উৎসাহের কথাগুলো পড়ে তার চোখ ভিজে উঠত। মনে হতো, মানুষটি যেন অনেক দূরে থেকেও খুব কাছে আছে।
একদিন বিকেলে বৃষ্টি হচ্ছিল। জানালার পাশে বসে রায়হান আকাশের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, “দাদা, আপনাকে খুব মনে পড়ছে। যদি একদিন দেখা হতো!”
ঠিক তখনই ফোনে একটি বার্তা ভেসে উঠল।
“কেমন আছো ভাই? অনেক দিন কথা হয়নি। ভেবো না, তোমাকে ভুলে যাইনি।”
রায়হানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, “আমি ভালো আছি দাদা। কিন্তু সত্যি বলছি, আপনাকে খুব মিস করি।”
অরুণ দা লিখলেন, “দূরত্ব বন্ধুত্বকে কমায় না। বরং সত্যিকারের বন্ধুত্বকে আরও শক্ত করে। একদিন নিশ্চয়ই দেখা হবে।”
সেদিন রায়হান বুঝেছিল, সব সম্পর্ক প্রতিদিন দেখা করার ওপর টিকে থাকে না। কিছু সম্পর্ক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আর আন্তরিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। দেশের সীমান্ত, বয়সের পার্থক্য কিংবা হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব—কিছুই সেই সম্পর্ককে দুর্বল করতে পারে না।
আজও বাংলাদেশে বসে রায়হান যখন সন্ধ্যার আকাশের দিকে তাকায়, তখন তার মনে হয়, ভারতের কোথাও না কোথাও অরুণ দাও হয়তো একই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। একই আকাশ, দুটি দেশ, দুটি মানুষ—কিন্তু একটি হৃদয়ের বন্ধুত্ব। আর সেই বন্ধুত্বই তাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের বন্ধু কখনো দূরে থাকে না; সে সবসময় হৃদয়ের খুব কাছেই থাকে।