15/07/2016
আল মাহমুদের সোনালি কাবিন : একটি বিশ্বমাপের গ্রন্থ
সায়ীদ আবুবকর
ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী, সন্ধ্যাসংগীত, প্রভাতসংগীত, ছবি ও গান, কড়ি ও কোমল, মানসী- এতগুলো কাঁচা রাস্তা পার হয়ে সোনার তরীতে এসে রবীন্দ্রনাথ পা ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন বাংলা কবিতার রাজপথে। তারপর তো তিনি সম্রাটই হয়ে বসলেন, যার রাজত্ব আজও অবধি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলা যায়। তবে মধুসূদন ও নজরুল বাংলা কবিতার অঙ্গনে প্রবেশ করেছিলেন জুলিয়াস সিজারের মতোÑ ‘ভেনি, ভিডি, ভিছি, এলাম, দেখলাম এবং জয় করে নিলাম’ স্টাইলে। তাদের প্রথম গ্রন্থেই নতুনত্ব ও মৌলিকত্ব উপহার দিয়ে তারা অভিভূত করেছিলেন বাংলা কবিতার পাঠককে। ফররুখ আহমদও তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ সাত সাগরের মাঝি দিয়েই জয় করে নিয়েছিলেন বাংলা কবিতাপ্রেমিকদের হৃদয়। জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদÑ এরা সকলেই বড় কবি বটে, কিন্তু এরা কেউ-ই রবীন্দ্রনাথের মতোই পরিস্ফুট হয়ে ওঠেননি তাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থে। আমের মুকুলের মতো এরা আস্তে আস্তে বেড়ে উঠেছেন এবং জ্যৈষ্ঠ মাসে এসেই পেকে উঠেছেন পুরোপুরি। আল মাহমুদ অবশ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন আমাদের স্বাধীনতার অনেক আগেই, পাকিস্তান আমলে, ১৯৬৮ সালে। লোক লোকান্তর ও কালের কলস তাকে এনে দিয়েছিল এ পুরস্কার। কিন্তু প্রকৃত আল মাহমুদকে বাংলা কবিতার পাঠকরা পান বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭৩ সালে। ১৯৭৩-এ প্রকাশিত সোনালি কাবিনই তাকে এনে দেয় আকাশছোঁয়া কাব্যখ্যাতি। আল মাহমুদ তার স্বকীয়তা নিয়ে আবির্ভূত হন সোনালি কাবিনেই।
এটা ঠিক যে, জসীমউদ্্দীন ও জীবনানন্দ দাশ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ পৃথক করে নিয়ে তার নিজস্ব ঢঙে এক পোড় খাওয়া আধুনিক বাংলাকে আল মাহমুদ উপস্থাপন করেছেন তার সোনালি কাবিনে। কিন্তু বাংলাদেশ ছাপিয়েও তার কণ্ঠ বৈশ্বিক ও সার্বজনীন হয়ে উঠতে দেখি আমরা এর প্রথম কবিতা ‘প্রকৃতি’তে। সুতরাং একথা বলা কিছুতেই সমীচীন হবে না যে, সোনালি কাবিন কেবল স্বদেশচিত্রই ধারণ করে আছে। তিনি যখন এরকম করে বলেনÑ
কতদূর এগোলো মানুষ!
কিন্তু আমি ঘোরলাগা বর্ষণের মাঝে
আজও উবু হয়ে আছি।
(প্রকৃতি)
তখন পাঠক টের পান যে, এ কবি কেবল দেশীয় আবহের মধ্যে বন্দী নন, এ কবি স্বদেশ ছাড়িয়ে সারা বিশ্বের মানুষের সাথে একাকার। তবে একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, শিল্পী-সাহিত্যিকরা তাদের শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন চেনাজানা জগতের পরিম-লে। শেক্সপিয়ার যখন তার জগদ্বিখ্যাত নাটক ও সনেটগুলো রচনা করেছিলেন তিনি তা করেছিলেন তার নিজের দেশ ও নিজের মানুষকেই চোখের সামনে রেখে। মধুসূদনের বিখ্যাত চতুর্দশপদী কবিতাগুলো রচিত হয়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চল যশোরের মাটি ও মানুষের জীবনকে ছুঁয়ে। এমনকি মধুসূদনের অমর মহাকাব্য মেঘনাদবধ কাব্যও দক্ষিণবঙ্গের মৃত্তিকাকে বুকে ধারণ করেই রচিত হয়েছে, তা বুঝা যায় এ কাব্যের অন্তর্দেশে প্রবহমান দেশপ্রেমের ফল্গুধারা দেখে।
অনুরূপভাবে আল মহমুদও তার কাব্যভা-ার গড়ে তুলেছেন দেশীয় আবহে। এর অর্থ এই নয় যে, এই কবির কাব্যপরিধি দেশের সীমার মধ্যে আবদ্ধ। রবার্ট ফ্রস্টকে বলা হয়, ‘পোয়েট অব নিউ ইংল্যান্ড’। কিন্তু সমগ্র বিশ্বে পঠিত হচ্ছে ফ্রস্টের কবিতা। তার মেন্ডিং ওয়াল, ডেথ অব আ হায়ার্ড ম্যান, বার্চেচ প্রভৃতি কবিতা তার স্বদেশের চিত্র ধারণ করেও সার্বজনীন হয়ে উঠেছে এদের শাশ্বত ম্যাসেজধর্মিতার কারণে। তদ্রƒপ আল মাহমুদও যখন বলেনÑ
সোনালি খড়ের স্তূপে বসতে গিয়ে প্রত্যাগত পুরুষ সেজন
কী মুশকিল দেখলো যে নগরের নির্ভাজ পোশাক
খামছে ধরেছে হাঁটু। ঊরতের পেশি থেকে সোজা
অতদূর কোমর অবধি
সম্পূর্ণ যুবক যেন বন্দী হয়ে আছে এক নির্মম সেলাইয়ে।
যা কিনা এখন তাকে স্বজনের সাহচর্য, আর
দেশের মাটির বুকে, অনায়াসে
বসতে দেবে না।
(খড়ের গম্বুজ)
তখন ফ্রস্টের কবিতার মতোই আল মাহমুদের কবিতাও স্বদেশের চিত্রকল্প নিয়ে রচিত হয়েও সার্বজনীন হয়ে ওঠে। নগরজীবন ও গ্রামীণ জীবনের অন্তর্দ্বন্দ্ব কেবল বাংলাদেশী বিষয় নয়, এ দ্বন্দ্ব সারা পুথিবীর সব আধুনিক মানুষের।
আল মাহমুদের সোনালি কাবিনকে যখন কেবল শাশ্বত বাংলার কাব্য বলে আলোচনা করা হয়, তখন এর প্রকৃত কাব্যগুণকে অস্বীকার করা হয়। সমালোচকরা একথা ভুলে যান যে, আল মাহমুদের সোনালি কাবিন আর জসীমউদ্্দীনের নকশিকাঁথার মাঠ ও জীবনানন্দের রূপসী বাংলা এক ধারার কাব্যগ্রন্থ নয়। আল মাহমুদ এদের থেকে পৃথক ও আধুনিক এ কারণে যে, দেশের চিত্র আঁকতে গিয়েও তার বৈশ্বিক হয়ে উঠতে কোনো সমস্যা হয়নি। জীবনানন্দ দাশ যখন বলেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়’ তখন কেবল বাংলাদেশই ভেসে ওঠে পাঠকের মানসচোখে। কিন্তু আল মাহমুদ যখন এরকম করে বলে ওঠেন
আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ,
এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ
যেন না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ।
তখন কোনো দুর্মুখেরও এ সাহস থাকে না যে বলে, এ কাব্যের আবেদন কেবল দেশের মাটিতেই সীমাবদ্ধ।
প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রকৃত কবি কিছুতেই আধুনিক কবি হিসেবে গণ্য হতে পারেন না, যদি না তিনি দেশ, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি ছাপিয়ে বৈশ্বিক না হয়ে উঠতে পারেন। এ কারণে যে কোনো দেশের ও যে কোনো ভাষার একজন প্রকৃত কবি সত্যিকারার্থেই একজন বিশ্বকবি। আর তাকে বিশ্বকবি হয়ে উঠতে হয় স্বদেশের মাটি ও ধুলো সর্বাঙ্গে মেখেই। আল মাহমুদ তার সোনালি কাবিনে এ কাজটা যথাযথ করতে পেরেছেন বলে খাঁটি কবি হয়ে উঠতে পেরেছেন তিনি সন্দেহাতীতভাবে।