20/06/2026
#মা_ক্লারা
গত বছর ২০২৫ সালে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ ছিল ৭ জুন, শনিবার। দীর্ঘ একটি ছুটি গ্রামের বাড়িতে কাটিয়েছিলাম। তখন জানতাম না, সেটিই হবে মায়ের সঙ্গে কাটানো আমার জীবনের শেষ দীর্ঘ ছুটি।
গত ছাব্বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঢাকার বাইরে কাজ করছি। তাই দীর্ঘ ছুটিতে অন্য কোথাও না গিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফেরা, পরিবারের সবাইকে নিয়ে মায়ের কাছে যাওয়াই ছিল আমাদের আনন্দ।
গত বছর দেশের বাইরে থেকে আমার কাকাতো ভাইও এসেছিল। নানা ব্যস্ততা আর আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সময় কাটাতে গিয়ে মাকে হয়তো একটু কম সময়ই দিয়েছিলাম। জানতাম না, সেটিই হবে আমাদের মায়ের সঙ্গে শেষ একসঙ্গে থাকা।
এরপর মা চিরদিনের জন্য ছুটি নিয়ে নিলো- সব কষ্ট, বেদনা, সীমাবদ্ধতা, আফসোস, হতাশা আর পরিশ্রম থেকে।
মা এপ্রিল-মে মাস থেকেই বলছিলো, তাঁর পিঠে হালকা ব্যথা। মেডিসিন ও কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ক্যালসিয়াম, ভিটামিনসহ কিছু ওষুধও চলছিল। জুনে বাড়ি গিয়ে বুঝলাম, ব্যথাটা অনেক বেড়েছে। মা একজন অর্থোপেডিক চিকিৎসক দেখাতে চেয়েছিলো। আমি তখনই তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মায়ের কিছু অসমাপ্ত কাজ, এক বোনের অপারেশন, আরেক বোনের স্কুলের ছুটি-সব মিলিয়ে তিনি একটু পরে আসতে চেয়ে ছিলো।
আমিও বুঝতে পারিনি, সেই পিঠের ব্যথা তাঁকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।
মাকে বলেছিলাম, “সব গুছিয়ে ঢাকায় চলে আসো, ডাক্তার দেখাবো।” আমরা চলে আসার পরও বাড়ি থেকে কয়েক দফায় আত্মীয়স্বজন ও ভাইবোনেরা ঢাকায় এসেছিলো। অনেক অনুরোধ করলেও মা তাঁদের সঙ্গে আসেনি। মা কী এমন গুছিয়ে রাখতে চেয়েছিলো, জানি না। শুধু জানি, সেই দেরিই আমাদের জীবনের সব আলো নিভিয়ে দিল।
আজ সকালে প্রায় সাড়ে পাঁচ কেজির একটি ব্রয়লার মুরগি কিনেছি। মা ঢাকায় এলে এমনভাবেই বড় হাঁস-মুরগি বছরে দু-একবার কিনতাম। গত বছরও কিনেছিলাম। রানী রান্না করতে গিয়ে মায়ের কথা মনে করে কেঁদে ফেলল। পরে খাওয়ার সময়ও মায়ের প্রসঙ্গ তুললো। একটু ভালো খাবার হলে, মা খুব তৃপ্তি আর সময় নিয়ে খেতো। এসব খুউব মনে পরে। ডাইনিং টেবিলটাতে খেতে বসলেই মনে পরে। এরপর থেকেই মাথাটা কেমন জট বেঁধে আছে, আর বুকের ভেতরে যেন এক ভারী পাথর চেপে বসেছে।
কিছুক্ষণ আগে রাতের স্নানের সময় হঠাৎ বুক ভেঙে কান্না আসছিল। মনে হচ্ছিল, বুকটা চৌচির হয়ে যাচ্ছে। শাওয়ারের জলেও শরীর ঠান্ডা হচ্ছিল না, মাথার ভেতরের উত্তাপ কমছিল না। চোখে জলও আসছিল না, কিন্তু ভেতরটা যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল।
একা একাই চিৎকার করে কাঁদতে চাইলাম, কান্না না এসে বুক ভাঙতে থাকে। একা একাই মাকে ডাকলাম অনেক সময়। মা নিশ্চয়ই শুনেন, উত্তর দেন-আমি তা অনুভব করি।
মায়ের চিকিৎসার জন্য যতটুকু অর্থের প্রয়োজন ছিল, ঈশ্বরের কৃপায় তা আমাদের ছিল। কিন্তু মা বুঝতেই দিলো না যে সে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদি জানতাম, মা চলে যাচ্ছে, তাহলে নিজের জীবনের সবকিছু দিয়েও তাঁকে ধরে রাখার চেষ্টা করতাম।
বাবা-মা প্রতিটি মানুষের জীবনে এক ও অদ্বিতীয়। তাঁদের ভালোবাসা, যত্ন, ত্যাগ ও মমতার কোনো বিকল্প পৃথিবীতে নেই। এ জগতে এমন কেউ নেই, যে বাবা-মায়ের মতো ভালোবাসতে পারে। এটি প্রতিটি মানুষের জীবনের এক চিরন্তন সত্য।
ছবিতে যে কাঁঠাল, জাম্বুরা (বাতাবিলেবু) ও আম্রপালি আমগাছ দেখা যাচ্ছে, তিনটি গাছই আমাদের সামনের উঠানের। গাছে ফল এলেই মা খুব উচ্ছ্বসিত হতো। এবারও গাছে প্রচুর ফল ধরেছে, কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠ, সেই ফোনকল আর শুনতে পাই না।
এটাই জীবনের নির্মম সত্য-যে সমাধিতে শায়িত, তার নীরবতার ভাষা বুঝতে হলে একদিন আমাদেরও তার মতোই নীরব হতে হবে।
মাকে খুব মনে পড়ে। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ। ❤️