MD. ABDUL MAZED

MD. ABDUL MAZED Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from MD. ABDUL MAZED, Poet, Dhaka.

03/09/2024

অহমিকার খোরাক চাই

-এন্টারপ্রাইজ, রিভারসাইড, ক্যালিফোর্নিয়া, ২৯ জানুয়ারি, ১৯৭৫

গত সপ্তাহে ঢাকায় পার্লামেন্ট নিজের অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্ত করে দিয়েছে এবং ‘‘জাতির পিতা’’ শেখ মুজিবর রহমান একচ্ছত্র ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। সাধারণ পার্লামেন্টারী কাঠামোর আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

শেখ ঘোষণা করলেন, বাংলাদেশের দুশমন, পাচারকারী ও কালোবাজারীরা বিদেশী এজেন্টদের সহযোগিতায় দেশে ‘অব্যবস্থা’ সৃষ্টি করেছে। অতএব একচ্ছত্র ক্ষমতা গ্রহণ প্রয়োজন ছিল।

প্রধানমন্ত্রী ও ৩১৫ সদস্যের পার্লামেন্টে ৩০৮ সদস্য বিশিষ্ট দলের নেতা হিসেবে শেখের আগেই বিপুল ক্ষমতা ছিল। এই মুহূর্তে বোঝা যাচ্ছে না, বর্ধিত ক্ষমতা নিয়ে তিনি কি এমন করতে পারবেন। সম্ভবত যে সব সমালোচনা তিনি বরদাশত করতে পারবেন না, অথচ বন্ধও করতে পারেননি, এখন তা বন্ধ করতে পারবেন।

কিছুকাল আগে মেক্সিকোর ‘এক্সেলসিয়র’ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তাকে যখন প্রশ্ন করা হল, খাদ্যশস্যের অভাবের ফলে দেশে মৃত্যুর হার ভয়াবহ হতে পারে কি না, শেখ জবাব দিলেন, ‘এমন কোন আশংকাই নেই।’ প্রশ্ন করা হল, ‘‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টে বিরোধী দল বলে যে, ইতিমধ্যেই ১৫,০০০ লোক মারা গেছে।’ তিনি জবাব দিলেন, ‘‘তারা মিথ্যা বলেন।’’ কথা হল, ‘ঢাকার বিদেশী মহল মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলে উল্লেখ করে।’ শেখ জবাব দিলেন, ‘‘তারা মিথ্যা বলেন।’’ প্রশ্ন করা হল, ‘দুর্নীতির কথা কি সত্য নয়? ভুখাদের জন্য প্রেরিত খাদ্য কি কালোবাজারে বিক্রি হয় না?’ শেখ বলেন, ‘ না, এর কোনটাই সত্যি নয়।’

যে সব সমস্যা তার দেশকে বিপর্জস্ত করছে সে সবের কোন জবাব না থাকায় শেখের একমাত্র জবাব হচ্ছে তার নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতার বৃদ্ধি।
জনসাধারণের জন্য খাদ্য না হোক, তার অহমিকার খোরাক চাই।

‘‘ঐ ঘোড়া-রোগেই তো গরুটা মরল’’

23/06/2024

চাকরি জীবনের শ্বাসরুদ্ধকার একঘন্টা

ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি সিরাজদিখান উপজিলা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ভাটিতে ইছামতি নদীর ডানদিকের তীরে ঠিক যেখানে মাঠের ভিতর থেকে নেমে আসা একটি অগভীর সরু খালের মুখে আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল তখন ফিসফিস করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। চতুর্দিকে চক্রাকারে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কোন লোকালয় দেখা গেল না। না এ পারে, না ও পারে। এদিকে খাল দিয়ে হু হু করে জোয়ারের পানি ঢুকছে। কিছুক্ষণ পরে হয়ত খালের পাড় ডুবে যাবে। তখন দাঁড়ানোর জায়গা পাবো না। আমি হাতের ছাতাটা মেলে ধরে এই অচেনা ও প্রায় পাÐব-বর্জিত জায়গায় আমার করণীয় কী হবে সে বিষয়ে ভাবনায় নিমজ্জিত হলাম।
আজ থেকে আটাশ বছর আগে আমি যখন মুন্সিগঞ্জে চাকরি করি, তখন কোনো এক অনুসন্ধানকার্যে মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। আমি পূর্বে কখনো সেখানে যাইনি। মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে লঞ্চে চড়ে ধলেশ^রী হয়ে ইছামতি নদী উজিয়ে তালতলায় নেমে সড়কপথে সিরাজদিখান যেয়ে লোকজনের কাছে গ্রামটির অবস্থান জেনে সুবিধাজনক যানবাহনে যাওয়া যেতে পারে। অথবা ঢাকা থেকে ঢাকা-মাওয়া সড়কের নিমতলীতে নেমে সিরাজদিখান পৌঁছে আগের মতই জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনে নিয়ে গন্তব্যস্থলে যাওয়া যেতে পারে। আমি যেহেতু ঢাকাতেই রাত্রিযাপন করি, তাই আমার পক্ষে শেষোক্ত পন্থাটিই যুক্তিযুক্ত মনে করলাম।
সকাল সকাল সিরাজদিখান থানায় উপস্থিত হয়ে তাদের কাছে আমার গন্তব্যে পৌঁছনর সহজ পথটা জানতে চাইলাম। থানা থেকে সড়ক পথে যেতে নিরুৎসাহিত করা হলো। তারা জানালো নদীপথে নৌকায় গেলেই সহজ হবে। আমার সাথে থানার একজন কনস্টেবল থানার অদূরে নদীর ঘাটে গিয়ে আমাকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় উঠিয়ে দিয়ে বলল আমার কাঙ্খিত গন্তব্যের নিকটবর্তী স্থানে নামিয়ে দিতে। কনস্টেবল আমার নৌকার ভাড়াটাও ঠিক করে দিল যাতে মাঝি আমাকে অচেনা লোক পেয়ে ঠকাতে না পারে।
আমি ভাবলাম, মাঝি নিশ্চয় আমাকে কোনো ঘাটে নামাবে, যেখান থেকে আমার গন্তব্যে পৌঁছতে কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু সমাজ সংসার সব সময় আমার ভাবনার অনুগামী হলে কোনো দুঃখ থাকতো না। আন্দাজ পাঁচ কিলোমিটার চলার পর আমাকে যেখানে নামিয়ে দেয়া হলো সেখানে মনুষ্য প্রজাতির কোনো পদচিহ্ণ দেখা না গেলেও হাঁসের আনাগোনার সুস্পষ্ট চিহ্ন দেখতে পেলাম। হাঁসের দেখা না পেলেও পচা ভাদ্রের নরম মেঠো কাদায় হাঁসের পায়ের ছাপ সুস্পষ্ট। হাঁসের উপস্থিতির আরো স্পষ্ট প্রমাণ হিসাবে যা দেখলাম, তাতে আমার গা গুলিয়ে উঠল। যে সরু খালের পাড় বেয়ে আমাকে দক্ষিণ দিকে যেতে হবে সে পাড়ের পুরোটা জুড়ে রয়েছে হাঁসের মল। পা ফেলার জায়গা পর্যন্ত নেই।
জোয়ার ও বৃষ্টির পানিত ভেজা কর্দমাক্ত পথে সু পরে হাঁটা যাবে না। তাই ফাইলটা বাম বগলে চেপে ধরে ছাতার বাট ডান কাঁধে কোন রকমে আলতেভাবে চেপে ধরে, প্যান্ট হাঁটুর নিচ পর্যন্ত বটে নিয়ে জুতা-মোজা খুলে বাম হাতে নিয়ে ডান হাতে ছাতা ধরে হাঁটতে লাগলাম। আমার ডানদিকটা উঁচু, পাটক্ষেত। বাম দিকে খালের ওপারে নিচু, ধান ক্ষেত, জোয়ারের পানিতে প্লাবিত। প্রায় ৫০০ গজ এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, আমার পায়ে চলার পথ একটি ডোবার ভিতরে নেমে গেছে। সজোরে জোয়ারের পানি ঢুকছে এই ডোবার নিচু মত জায়গায়। এখানে নামলে ডুবে যাবো নিশ্চিত। ইতোমধ্যে ডানদিকের পাটক্ষেতের সীমানা শেষ হয়ে শুরু হয়েছে অপেক্ষাকৃত নিচু ধানক্ষেত। আউশ ধান পেকে গেছে। ধানগাছ মাটির সাথে শুয়ে আছে। ধানগাছের নিচে প্রায় চার ইঞ্চি পানি। সামনের ডোবার মত জায়গাটা আরো প্রায় ৫০০ গজ সামনে গিয়ে যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে পাহাড়ের মত উঁচু জায়গায় বসত বাড়ি দেখা যাচ্ছে। উচু ভিটির ঢালে উবু হয়ে বসে আছেন এক নারি। না, এভাবে বসে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না। এমনিতেই বসে আছেন। নিতান্ত রোমান্টিক না হলে এই বিবর্ণ মাঠের দিকে চেয়ে এই অসময়ে বসে থাকার কথা নয়। তিনি আমার দুরবস্থা বুঝতে পেরে দূর থেকে হাত ইশারা করে জানালেন আমি যেন আমার ডানদিক দিয়ে অর্থাৎ পশ্চিম দিকের ধান ক্ষেতের ওপর দিয়ে লোকালয়ে মানে সামনের উচু ভিটিতে গিয়ে উঠি। অল্প পানিতে শুয়ে পড়া ধান। এর ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে ধান ঝরে যেতে পারে। সেটাও গুরুতর বিষয় নয়। আমার কাছে ভয়াবহ যে বিষয়টা মনে হলো, তা হলো এই ধানগাছের নিচে বিষধর সাপ ওঁৎ পেতে নেই তো! পিছনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ যেখানে আমি নৌকা থেকে নেমেছিলাম সে জায়গা জোয়ারের পানির নিচে চলে গেছে। তা না হলে হয়ত নদীর কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে উত্তর কিংবা দক্ষিণগামী যেকোন নৌকায় উঠে পড়তাম। কিন্তু সে সম্ভাবনার দ্বার রুদ্ধ। সামনে প্রায় দুস্তর পারাবার। খাল পার হয়ে বাম দিকেও যাওয়ার উপায় নেই। অগত্যা অতি সন্তর্পণের প্রাণটা হাতের মুঠোয় নিয়ে ধানক্ষেতের উপর দিয়ে বা বাড়ালাম। বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় ছাতাটা গুটিয়ে নিলাম, দরকারে সময় ছাতা লাঠির কাজ করে।
এক পা ফেলে আরেক পা ফেলার আগে ধানগাছে আলগোছে পা রেখে নাড়া দিয়ে শব্দ করি। যাতে বিষধর সাপ যদি থাকে তো ভয় পেয়ে দূরে চলে যাক। এভাবে পাঁচ-সাত মিনিট হাঁটার পরে ধান ক্ষেতের সীমা শেষ হয়ে কেবল খালি জমিতে পা দিলাম। এই পাঁচ-সাত মিনিটকে মনে হলো যেন একযুগ। এরপর যে খালি জমিতে পা দিলাম সেখানে চার ইঞ্চি পরিমাণ পানি থাকলেও দেখেশুনে পা ফেলা যায়, অন্ততঃ সাপের পিঠে পা দেয়ার আশংকা নেই। আরো মিনট পাঁচেক হাটার পর উঁচু ভিটেয় পা দিয়ে যে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ‘যেন প্রাণ আসলো ধড়ে।’
ইদানিং যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সর্পে সর্পারণ্য হয়ে গেছে, সেদিন যদি এই অবস্থা থাকতো তবে ধান ক্ষেতেই আমার হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যেত। কারণ, আমার হারপিটো-ফোবিয়া বা সর্পভীতি আছে। তাহলে দেশে রটে যেত যে এক ব্যক্তি ধান ক্ষেতে রাসেল’স ভাইপারের দংশনে মৃত্যুবরণ করেছে। অবশ্য অজ্ঞাত পরিচয় বলা সম্ভব হতো না, কারণ পকেটে আমার পরিচয়পত্র ছিল।
ফেরার সময় থানা পুলিশের দেখানো পথে আর গেলাম না। এবার সড়ক পথ ধরলাম। ফেরার পথে রাস্তার যে দুরবস্থা দেখলাম তার বিবরণ আর দিতে চাইনে। তাহলে আপনারা আগামী সাত দিন অন্নজল গ্রহণ করতে পারবেন না। মনে মনে সিরাজদিখান থানার পুলিশ অফিসার ভাইদেরকে ধন্যবাদ দিলাম। কারণ, তাদের দেখানো পথই তুলনামূলকভাবে ভালো।

20/06/2024

দেশী পণ্য কিনে হই ধন্য (রম্য গদ্য)

শার্ট প্যান্টের কাপড় বিক্রি করে রাজধানীর এমন একটা বড়সড় শোরুমে গিয়ে কাপড় দেখতে দেখতে সেলস ম্যানকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই এ সব কাপড় কোন্ দেশে তৈরি? তিনি বিশাল শো-রুমের বিভিন্ন সেকশন দেখিয়ে বললেন এই অংশটায় পাবেন ভারতীয় কাপড়, আর ঐ অংশটায় সব বিদেশী কাপড়। একটু অবাক লাগলো এই জেনে যে, ভারতীয় কাপড় বিদেশী কাপড় নয়। আমারও একটু বিদেশী কাপড়ের প্রতি ঝোঁক বেশি, তাই ভারতীয় কাপড়ের সেকশন অতিক্রম করে বিদেশী কাপড়ের সেকশনে চলে গেলাম। সেলসম্যানকে তাকে রাখা আমার পছন্দের রঙ ও ডিজাইনের একটা কাপড় দেখিয়ে সেটা নামাতে বললাম। কাপড়ের থান সামনের টেবিলে নামাতেই জানতে চাইলাম, ভাই এটা কোন দেশে তৈরী? তিনি জানালেন, এটা স্কটল্যান্ডের তৈরি। থান কাপড়ের পাড়ের অংশে কোম্পানীর নাম লেখা আছে। যদিও জানি এটা ভারতীয় কোম্পানী। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য গুগলে সার্চ করে দেখলাম, কোম্পানীটি ভারতীয়। স্কটল্যান্ডের ফেব্রিক্স উৎপাদন শিল্প সম্পর্কে অনুসন্ধান করে দেখলাম, এই নামে কোনো কোম্পানী স্কটল্যান্ডে নেই। বললাম, ভাই এটা তো ভারতীয় কোম্পানী। তিনি তার পূর্বের কথায় ডেঁটে থাকলেন, না, এটা স্কটল্যান্ডের কাপড়।
আমার বন্ধুস্থানীয় একজন ব্যবসায়ী এলিফ্যান্ট রোডে একটি শো রুম নিয়ে ফ্রেব্রিক্স-এর ব্যবসা করেন। একদিন তার শো-রুমে চা পানের ফাকে তিনি আমাকে তাজ্জব সব বিজনেস আইডিয়া শুনিয়ে জানতে চাইলেন আমি তার ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছা পোষণ করি কী-না। তিনি আরো জানালেন যে, এভাবে ভ্যারাইটিস কোম্পানীর আইটেম তিনি আর বিক্রি করবেন না। তিনি এখন ব্রান্ড আইটেমে চলে যেতে চান। জানতে চাইলাম, বিশেষ কোন ব্রান্ডের ফেব্রিক্স তিনি তার শোরুমে রাখবেন, তার অনুমোদন/লাইসেন্স/পারমিট লাগবে কী-না, তার জন্য কি রকম ব্যয় করতে হবে ইত্যাদি। তিনি আমাকে অনেকগুলো কাপড়ের খন্ডিত নমুনা দেখালেন। বললেন, এই নমুনাগুলো চায়নাতে নিয়ে গিয়ে সেদেশের টেক্সটাইল কোম্পানীকে দিলে তারা এগুলো কম্পিউটারে এনালিসিস করে হবহু একই ডিজাইন ও রঙের কাপড় তৈরি করে দিবে। যেগুলো ভারতীয় ফেব্রিক্স বলে চালিয়ে দেয়া যাবে। দামে সস্তা হওয়ায় চলবেও ভাল। আমি নিজে একটা নাম দিয়ে লাইসেন্স পারমিট নিয়ে ব্রান্ড আইটেম হিসেবে চালাবো।
আন্তজেলা লাক্সারি কোচে চলার সময় নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, মাঝে মাঝে দুই একজন যাত্রী সারাপথ সেলফোনে জোরে জোরে যাত্রীদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথা বলে তার গুরুত্বটা জাহির করছে। তাদেরকে অনুরোধ করেও থামানো যাচ্ছে না। তাদের সেলফোনিক সংলাপে তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে সাধারণ যাত্রীদের ইতোমধ্যে যে উচ্চ ধারণা হয়ে গেছে, তার ফলে কেউ কিছু বলতেও সাহস পাচ্ছে না। ঢাকা থেকে সিলেটে আমার কর্মস্থলে যাওয়ার পথে বাসের মধ্যে এমনই এক বেআক্কেল যাত্রী পেয়েছিলাম। তিনি যে কতবড় হর্তাকর্তা এটা বুঝানোর জন্য তার ফার্মের কর্মচারিদেরকে সারাপথ ধরে পইপই করে কর্তৃত্বের সাথে দিকনির্দেশনা দিয়েই চলেছে। তার আলাপ থেকেই জানা গেল তিনি অন্যান্য আরো অনেক মহাকীর্তির সাথে মাছের ব্যবসাও করেন। তিনি তার কর্মচারিকে একটি বিশেষ মোকামের নাম উল্লেখ করে বল্লেন, সেখান থেকে যেন স্ট্যান্ডার্ড সাইজের ভারতীয় রুই সংগ্রহ করেন। তিনি দেশি রুই মাছ সাপ্লাইয়ের বড় একটি অর্ডার পেয়েছেন, তাই এই ভারতীয় রুইগুলোকে যেন ভৈরবের (মেঘনার) রুই হিসেবে চালাতে অসুবিধা না হয় সেভাবে যেন ভারতীয় রুইগুলোকে বাছাই করা হয়। তার ব্যবসায়ের গোমর ফাঁস হয়ে আরো দশজন ব্যবসায়ীর ক্ষতি হচ্ছে, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। তিনি যাত্রী সাধারণের ঘুমের বারোটা বাজিয়ে হারেছ-এর কায়দায় তার কর্তৃত্ব জাহির করেই চলেছেন। হারেছ-এর কায়দা? সেটা আবার কী?
বিগত শতাব্দীর আশির দশকের গোড়ার দিকের কথা। অনেকটা মায়ে তাড়ানো বাপে খেদানো হারেছ এদিক-ওদিক করে কিছু পয়সা যোগাড় করে ঢাকা বেড়াতে যাচ্ছে। সে বাসে যাওয়ার সময় একটু ভাবসাব নিয়ে যেতে চায়। তাই সে তার একদল বন্ধু ঠিক করেছে। স্টপেজে বাস থামলে সে যখন সিটে গিয়ে বসবে তখন তার বন্ধুরা অন্যান্য যাত্রীদের শুনিয়ে শুনিয়ে তার গুরুত্ব বর্ণনা করবে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ট্রেনের কামরায় গিয়ে বসার পরে যখন তার স্তাবকেরা তাকে ঘিরে ধরে নানা কথা বলে নেমে যাওয়ার সময় ‘লিডার ¯øামালেকুম’ বলে নেমে যায়-হারেসের ক্ষেত্রেও তার বন্ধুরা পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী স্তাবকতাপূর্ণ কথা বলে যাচ্ছে আর আশেপাশে বসে থাকা যাত্রীদের ছোখ ছানাবড়া হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সব বন্ধুই তো আর চাণক্যর সংজ্ঞা অনুযায়ী বন্ধু হয় না। বন্ধুবেশে দুয়েকজন বিশ^াসঘাতকও থাকে। হারেছ যখন তার বন্ধুদের তোষামোদের তেলে ভাসছে তখন এক বন্ধু পড়িমরি করে বাসে উঠে হারেছের কাছে এসেই দুম করে বলে ফেলল,‘‘আরে হারেছ, তুই নাকি তোর মা’র হার চুরি করে ঢাকায় যাচ্ছিস? তোর মা আমাগের বাড়ি বসে বসে কাঁদছে? হারেছ পিন ফোটানো বেলুনের মত চুপসে গিয়ে কোন রকমে বাস থেকে নেমে গেল। এ কাহিনী আমি শুনেছিলাম, জসিম উদ্দিন হলের আমার সিনিয়ার আমজাদ ভাই-এর কাছে। পথে চলতে এ ধরণের হারেছদের সাক্ষাৎ আপনারা প্রায়ই পাবেন।
যাই হোক, আমার ফ্রেব্রিক্সের ব্যবসায়ী বন্ধু এখনো তার ব্যবসা ভালোমত চালু করতে পারেনি। কিন্তু চাইনীজ পণ্য ভারতীয় ডিজাইনে প্রস্তুত করে নিজস্ব ব্রান্ডনেম দিয়ে চালানোর ধারণা কি এই প্রথম? নাকি এটা হরহামেশাই হচ্ছে। সেক্ষেত্রে চায়না থেকে হবহু ভারতীয় ডিজাইনের ফেব্রিক্স প্রস্তুত করে ভারতীয় কোম্পানীর নামে চালানো বিচিত্র নয়। আমার মনে সন্দেহ দানা বাঁধল। এদের আমাদানী এলসি-সংশ্লিষ্ট বিল অব এন্ট্রি পরীক্ষা করে তো দেখার সুযোগ নেই যে, শো-রুমের তাকে যে সব কাপড় শোভা পাচ্ছে সেগুলো চীন থেকে আমদানী করা না কি আসলেই ভারত থেকে আমদানী করা। সে কাজটি করার মত যথাযথ কর্তৃপক্ষ আছে। কিন্তু আমার মত সাধারণ ক্রেতার পক্ষে সে কাজ করা সম্ভব নয়। আমি কেবল নিশ্চয়তা চাই, আমার সীমিত ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে পণ্যটাকে যে দেশের পণ্য জেনে কিনছি সেটা যেন সে দেশেরই হয়।
আমি সেলসম্যানকে বললাম, ভাই আপনার এখানে যত ভারতীয় কাপড় আছে তার সবই নাকি আসলে চায়নার? আপনারা নাকি চায়নার কাপড় ভারতীয় বলে বিক্রি করেন? সেলস ম্যান তেলে-বেগুনে জ¦লে উঠল।
-কি বলেন। এমন কাজ করলে আমাদের বিজনেসের গুড উইল থাকবে? আমি বলি যে, শোনা যায় আপনারা নাকি ভারতীয় কাপড়ের ডিজাইন অনুযায়ী চায়না থেকে কাপড় তৈরি করিয়ে এনে ভারতীয় কোম্পানীর নামে চালান? এ কথা বলার সাথে সাথে আমার হাতে থাকা কথিত স্কটল্য্যান্ডের ফ্রেব্রিক্সের থানটা ছিনিয়ে নিয়ে বললেল, না না, এখানে সব কাপড় ভারতীয়। স্কটল্যান্ড, ইংল্যান্ডের কোনো কাপড় নেই।
আমি বললাম, আমি আসলে ভারতীয় এবং চিনা অরিজিনের ব্যাপারে কনফিউজড হয়ে পড়েছি, তাই আমার বরং দেশী কাপড়ই কেনা উচিত। আপনাদের এখানে বাংলাদেশী কাপড় নেই? আমার কথা শুনে তিনি মুখে অট্টহাসি দিলেন না বটে, কিন্তু যে ভঙ্গিমায় আমার দিকে তাকালেন তাতে আমার কান গরম হয়ে যাওয়া উচিত ছিল, একবার হাতিরপুল মাছবাজারের মৎস্য বিক্রেতারা যেভাবে আমার কান গরম করে দিয়েছিল।
গত শতকের নব্বই দশকের গোড়ার দিকে ইউনিভার্সিটির পড়ালেখা শেষ আসাসিক হল ত্যাগ করে একটা ব্যাচেলর বাসায় উঠি। এক রুমের বাসায় আমরা দুজন ব্যাচেলর থাকি আর প্রাইভেট ট্যুইশন করে দিনাতিপাত করি। দুজনে মেস করেই খাই। হাতিরপুল থেকে বাজার করি। নামমাত্র আয়। বিরানব্বই সালে মাসে ১২০০ টাকা ভাড়ার অর্ধেক ছয়শত টাকা আমাকে দিতে হয়। দুইটা ট্যুইশন থেকে পাই এক হাজার দুই শ’ টাকা। বাসাভাড়া বাদ দিয়ে অবশিষ্ট টাকায় খাওয়া ও আনুষঙ্গিক খচর চালাতে হিমশিম খেতেই হয়। হাতিরপুল বাজার থেকে টেংরা, পুঁটি, বাতাসি, টাকি এসব মাছ যখন যেমন পাই কিনি। বড়বড় রুই কাতলা দেখে চোখদুটো চকচক করে। কিন্তু দুজনের জন্য এতবড় মাছ তো কেনা যায় না। প্রাইভেট ট্যুইশন-এর আয়ে ট্যাক্স বসে না। বেহিসেবি বড় মাছ কিনলেও কোনো দপ্তরকে জবাবদিহির ব্যাপারও নেই। কিন্তু এখানে বড়মাছ কেটে ভাগ দেয়া হয় না। ফলে কেনাও হয় না। কিন্তু বাজারে গেলে বড় মাছের দরও জানতে চাই। দর জানতে চাইলেই যে কিনতে হবে এমন কোন নিয়ম নেই। এই যে, কোরবানির হাট থেকে যারা গরু কিনে ফেরে পথচারীকে দর বলতে বলতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই বলে দর জিজ্ঞাসা করেছি বলে এ গরুটি কিনে নিতে হবে? ইদানিং তো গরুর দাম জিজ্ঞাসা করতে করতে গরুর পিঠে সজোরে থাপ্পড় দেয়। গরু আরকি! আর মাছের দর, বিশেষ করে ইলিশ মাছের দর জিজ্ঞাসা করাটা বাঙালির জন্মগত অধিকার। তাই যদি না হবে, পথচারীকে ইলিশের দর জিজ্ঞাসা করা থেকে বিরত রাখার জন্য গোপাল ভাড় কে পরণের ধুতি খুলে মাথায় ফেটি বেঁধে রাস্তায় হাঁটতে হয়? যাইহোক, আমি যখন রুই, কাতলা, বোয়াল, চিতল-এর দরকষাকষির শেষে পাশের দোকানীর কাছ থেকে কাচকি মাছ কিনে থলেয় ভরলাম, তখন আশেপাশের দোকানীরা একযোগে হো হো করে হেসে উঠল। আমার কান রীতিমত গরম হয়ে গেল।
ফ্রেব্রিক্সে শো রুমের সেলসম্যান ভদ্রলোকটি নিতান্ত নিরুপায় হয়ে অত্যন্ত ব্যাজার মুখে দেশী কাপড়ের সেকশনটা দেখিয়ে দিল। আমি সেখান থেকে ৪০০ টাকা দিয়ে একটা প্যান্ট পিস ৫৫০ টাকা দিয়ে একটা শার্ট পিস কিনে চম্পট দিলাম। বিদেশী কাপড়গুলো সত্যিই কি ভারতীয়, নাকি ভারতীয় লেবাসে চায়নীজ সে বিতর্ক ওরাই তাকে বসে করতে থাক; আমি ততক্ষণে দেশী পণ্য কিনে ধন্য হই।

২০/০৬/২০২৪

18/06/2024

ইরানি মশলা-চা
-আবদুল মাজেদ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খোলা জানালার মত। ব্যবহারকারীরা ইচ্ছেমত সব পোস্ট দিচ্ছে। নিজের সম্পর্কে হিত-গর্হিত সব তথ্য সবার সাথে ভাগ করে নিচ্ছে। এখানে চোখ রাখলে মানুষের দৈনন্দিন আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, খ্যাদ্যভ্যাস, গতিবিধি সব কিছুই জানা যায়। মানুষের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহই যাদের কাজ তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখলে তাদের অর্ধেক কাজের আসান হয়ে যাবে। আবার এটি বিভ্রান্তির জানালাও বটে। কারণ, আমরা যে ছবি, খাদ্যদ্রব্য, পোশাক শেয়ার করি তাতে আমাদের আটপৌরে জীবনাচরণের প্রতিফলন ঘটে না। আমি হয়ত গেলাম দক্ষিণে, পোস্ট দিয়ে জানান দিলাম আমি এখন উত্তরে অবস্থান করছি। আর ফেইক আইডি’র প্রতারণার শিকার হয়নি-এমন সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যায় নেহায়েত কম নয়। আমিও কমে যাই না। নানা রকমের খাদ্য-দ্রব্যের ছবি শেয়ার করি। তবে নিজের বাড়িতে যা রান্না হয় তা শেয়ার করি না। কারণ, তা এমন কিছু উল্লেখযোগ্য আইটেম নয় যে, শেয়ার করে বলতে হবে, দেখ দেখ কী উত্তম উত্তম খাবারের আয়োজন করেছি, যা না খেলে তোমাদের জীবনধারণ ব্যর্থ। তবে আমি যখন কোথাও মেহমান হয়ে যাই, তখন মেজবানের পরিবেশন করা খাদ্যদ্রব্যের ছবি প্রশংসাসূচক চিত্র পরিচিতিসহ ফেসবুকে পোস্ট করি। কোথাও নেমন্তন্ন খেতে গেলে পরিবেশিত খাদ্যদ্রব্যের রঙ-রস-স্বাদ-গন্ধের মুহূর্মুহূ প্রশংসা করাই সাধারণ ভদ্রস্থতা। কেবল প্রশংসা করলেই হবে না, অন্দরমহলের রাঁধুনির কর্ণকূহরে যেন সে প্রশংসাবাক্য পৌঁছে যায় সে বিষয়ে যতœবান হতে হবে। তা নাহলে পরেরবার নেমন্তন্ন খেতে এসে সমাদর কমবে না বটে, কিন্তু রাঁধুনির মনে একটা অতৃপ্তি থেকে যাবে। আমি আবার স্বভাবে মুখচোরা। প্রশংসাই হোক আর বদনামই হোক, সামনা-সামনি কথা বলতে পারি না। কেমন যেন জিহŸা আড়ষ্ট হয়ে আসে। কিন্তু পরোক্ষে কথা বলাতে আমি বেশ পটু। তবে পরোক্ষে যা বলি তা প্রশংসা-বাক্য না হয়ে প্রায়শই পরচর্চায় পর্যবসিত হয়। তাই আমি খাওয়ার টেবিলে বসেই জিজ্ঞাসা করি, এই কি সব, নাকি রান্নাঘরে আরো আছে? তখন জানানো হয় রান্নঘরে আরো আছে, তবে টেবিলে জায়গা না হওয়ায় একসাথে দেয়া হয়নি; পর্যায়ক্রমে আসতে থাকবে। আমি জানাই যে, সব আইটেমের ছবি একসাথে তুলব। তখন গৃহিনী সকল প্রকার আহার্য একটু গাদাগাদি করে হলেও টেবিলে সাজিয়ে দিন। আমি ছবি তুলে আমার মেজবান ও রাঁধুনির পরিচিতিসহ ফেসবুকে পোস্ট করে রাঁধুনিকে দেখিয়ে দিই। তারপর যখন একে একে রান্নার গুণমানের স্বীকৃতি আসতে থাকে তখন রাঁধুনির চোখমুছের অভিব্যক্তি দেখার মত বস্তু হয়ে ওঠে। রান্নঘরের তাপে দগ্ধ হয়ে সারাদিনের কষ্টের পুরস্কার সে হাতে-নাতে পেয়ে যায়। আমি যদি হাতে তসবিহ নিয়ে সারাদিন রাঁধুনির প্রশংসা করতাম, তবুও রাঁধুনিকে এতটা খুশি করা যেত না। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে আমার বাড়ির খাদ্য দ্রব্যের ছবি দেই না কেন? মোটা দাগে দুটো কারণ আছে। এক, যদি খাদ্যদ্রব্য গরিবি ধরণের হয়, প্রায়শই তাই হয়, তবে আমার সামাজিক অবস্থান নিয়ে সবাই চোখ ঠারাঠারি শুরু করবে। দুই, যদি খাদ্যদ্রব্য একটু ব্যয়বহুল হয়, তার সম্ভাবনা ইংরেজিতে যাকে বলে ফিউ এন্ড ফার বিটুইন, তখন আমার আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। পনের লাখ টাকায় ছাগল কিনে কে যেন ভাইরাল হলো, তারপর ফেঁসে গেল। কোন টা যে ছাগল সেটাই প্রশ্ন। আমি যাদের বাসার খাদ্যদ্রব্যের ছবি পোস্ট করি তারা সবাই ব্যবসায়ী। চাকুরীজীবীর বাসায় খাওয়াদাওয়া করলে ভুলেও সে ছবি দিই না। যদিও বা ছবিটা দেই, নাম পরিচয় গোপন রাখি।
আমাকে মাঝেমাঝে কেউকেটাদের সাথে নামীদামী হোটেলে চা পান করতে হয়। কেউকেটাদের সাথে টং দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তো আদা, লেবু, ধনেপাতা, মৌরি, জোয়ান এসব দিয়ে হাবিজাবি চা খাওয়া যায় না। তাই নামীদামী হোটেলে কিছুক্ষণের জন্য জড়োসড়ো হয়ে বসে সময় কাটাতে হয়। ঘনঘন নাম ও মালিকানা পরিবর্তন হয়, রাজধানীর এমনই একটা পাঁচতারকা হোটেলে একবার ‘চা-টা’ খাওয়ার নেমন্তন্ন পেয়েছিলাম। মেইন কোর্স শেষ হওয়ার পরে ওয়েটার সুদৃশ্য ট্রেতে কর্পোরেট প্যাকেটে বন্দী হরেক রঙের গ্রিন টি, সাথে গরম পানি, ও চিনি রেখে যায়। আমি দেখেশুনে খেই হারিয়ে ফেলি। বিরক্ত হয়ে নিতান্ত আনাড়ির মত বলে ফেলি, ভাই দুধ, চিনি ও চা পাতা দিয়ে বানানো ঘরোয়া চা পাওয়া যায় না? ওয়েটার বলল, হ্যাঁ পাওয়া যায়। একটা দেশি ব্রান্ডের নাম করে বলল, এটা দিয়ে বানানো মশলা চা বেশ চলছে। আমি বললাম, তাই দেন। খেয়ে দেখলাম, আমি ঘরে যে চা বানিয়ে খাই, এর রঙ, স্বাদ, গন্ধ প্রায় এক রমক। কেবল মশলার ফ্লেভারটা আলাদা যুক্ত হয়েছে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের জসিম উদ্দিন হলের আবাসিক ছাত্র আমার এক বড় ভাই প্রাইভেট ট্যুইশন করতেন। ফার্মেসি ডিপার্টমেন্টে পড়তেন। অনুমান করতে কষ্ট হয় না, খুবই মেধাবী ছাত্র। ছাত্র পড়ানোর সময় তাকে প্রতিদিন নাস্তা দেয়া হতো। এটা কেবল তার ক্ষেত্রেই নয়, প্রাইভেট টিউটরদেরকে দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া নাস্তা দেয়া হয়। আমাকেও দেয়া হতো। আমার এই বড় ভাই মেধাবী হওয়া ছাড়াও অত্যন্ত উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। কোনো রকম অনিয়ম তার সহ্য হয় না। টাকার বিনিময়ে ছাত্র পড়ানো হয়, সেখানে প্রতিদিন নাস্তা খাওয়া (এটা অবশ্য চুক্তির ভিতরে থাকে না) তার কাছে যথেষ্ট ন্যায়-সংগত মনে হয়নি। এর একটা হেস্তনেস্ত করা তার জন্য আবশ্যক হয়ে উঠল। তাই তিনি একদিন গৃহকর্তৃকে সামনে পেয়ে সরাসরি জানতে চাইলেন, ‘আপনি যে আমাকে প্রতিদিন নাস্তা দেন, এই নাস্তার আর্থিক মুল্য কত?’’
আমি আমার বড় ভাই-এর মত অতটা মেধাবী ছিলাম না, তবে কৌতুহলী ছিলাম তার চেয়ের বেশি। আমার হোস্টের মানসম্মানের কথা না ভেবে ওয়েটারের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম, আমকে যে মশলাদার দুধ-চা দিলেন, তার দাম কত? ওয়েটার কালবিলম্ব না করে বলল, দুইশ’ আশি টাকা। চোখ ছাড়াবড়া করে আর কি হবে। ওয়েটার আমার অবস্থা বুঝতে পেরে বুঝিয়ে বলল এটা কোন্ ব্রান্ডের চা, কি কি মশলা দেয়া হয়, কীভাবে রান্না করা হয়।
চা আবার রান্না হয় নাকি? চা তৈরি করা, চা বানানো এসবই শুনে আসছি। একবারই কেবল চা রান্নার কথা শুনেছি। কাজী নজরুল ইসলাম কবি জসিম উদ্দিনের সাথে কোনো এক নিভৃত পল্লীতে বেড়াতে গিয়ে চা খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তখন অন্দরমহলের ললনারা কীভাবে চা রান্না করতে হয় তা নিয়ে মহাসংকটে পড়ে যান। চা বানানোর সময় হরেক রকম মশলার প্রসঙ্গ ও প্রয়োগ যখন চলে আসে, আগুনের উপস্থিতি তো আছেই, তখন চা রান্না করতে আপত্তি কিসের।
হোটেলের যে টেবিলটাতে বসে আছি, তার থেকে মাত্র দশ-পনের হাত দূরে চা তৈরি হচ্ছে। ওয়েটার আমাকে সাথে নিয়ে চা তৈরির পদ্ধতি দেখালেন। ওয়েটার যে এতটা বদান্যতা দেখাচ্ছেন, তার কারণ কিন্তু আমি নই। এর কারণ আমার হোস্ট। তিনি এখানে ঘনঘন আসেন এবং ধনী লোক, সন্দেহ নেই। ওয়েটার তার কাছ থেকে মোটা টাকা টিপস পেয়ে থাকে। আমার খাতিরের রহস্য এখানেই। বৃটিশ আমলে রায় বাহাদুর-খান বাহাদুরদের কাছে লাট সায়েবের চেয়ে তার কুকুরটার খাতির কি কোনো অংশে কম ছিল?
বাসায় ফিরে বাজারের সাধারণ চা পাতা এবং রান্না ঘরের কৌটার মশলার শ্রাদ্ধ করে বানিয়ে ফেললাম মশলা চা। স্বাদ-গন্ধ কোনো অংশে কম নয়। হিসেব করে দেখলাম, দুধ, চিনি, চা পাতা, মশলার দাম হিসেবে নিয়ে এক কাপ চায়ের দাম বিশ টাকা হতে পারে। সাশ্রয়ী মূল্যে গুণে ও মানে ফাইভ স্টার হোটেল সমতুল্য চা, মন্দ কী?
ঈদের দিন আমি সব সময় কম খাই। মিষ্টি জাতীয় খাদ্য আমার হজম হয় না। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকায় দুধ খাইনে। পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, মাংসের মেইন কোর্স আসার পূর্ব পর্যন্ত কৃচ্ছ্রতা সাধন করে কাটাই, যাতে এগুলো একটু বেশি খাওয়া যায়। সম্প্রতি লিভারে কিঞ্চিৎ ফ্যাট দেখা দেয়ার কারণে এক্ষেত্রেও যথাসম্ভব রসনা-সংযত করে চলতে হয়। একটু খিদে রেখেই খেতে হয়। এজন্য মাঝে মাঝে শশা, গাজর পেটে চালান দিয়ে পেটটা ভরভরন্ত রাখতে হয়। তাই বিকালে চা খেতে মন চাইল। এক কাপ চা তৈরি করে ফেসবুকে ছবি (এক কাপ চা আর পনের লাখ টাকা দামের ছাগলে বিস্তর ফারাক) দিয়ে লিখলাম, সেবার হায়দ্রাবাদ গিয়ে ইরানি মশলা চা রান্না শিখে এসেছিলাম। পোস্ট দেখে কয়েক জন রেসিপি জানতে চাইল।
বস্তুত হায়দ্রাবাদে যখন ইরানি মশলা চা খাই তখনও ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলাম। যারা গ্রিন টি খেয়ে কর্পোরেট ভাব নিতে চান তাদের কথা আলাদা, আমার মত ক্রুড চা খোরের কাছে এই চা খুব ভাল লেগেছিল। চা বিক্রেতার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এ চায়ের গোপন রহস্য কী? চা পাতা কি ইরানের? তিনি জানিয়েছিলাম, চা পাতা স্থানীয়, মানে ভারতীয়। তবে মশলা ইরানি। এক কেজি চা পাতার সাথে একশ’ গ্রাম ইরানি বিভিন্ন ধরণের মশলা (এলাচি, লবঙ্গ, দারচিনি-হয়ত আরো থাকতে পারে। ব্যবসায়ী তো তার বিজনেস সিক্রেট পুরোটা হাট করে বলবে না) গুঁড়ো করে মিশিয়ে নেয়া হয়। তবে চা বিক্রেতা যাই বলুক, তার চায়ের রঙ ও স্বাদের জন্য অন্যতম ভূমিকা পালন করে দুধ। দেখলাম, বিশাল আকৃতির সসপ্যানে গরুর দুধ সারাদিন ধরে ঢিমে-আঁচে জ¦াল হচ্ছে। তবে এত কড়া দুধ যেহেতু আমার সহ্য হয় না, তাই আমি বাজারের ননী তোলা গুঁড়ো দুধ ব্যবহার করি। আর চায়ের পাতা আমাদের শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনের পাশে ছোটছোট দোকানে যে ক্লোন চা বিক্রি হয়, এগুলো রঙ, স্বাদ, গন্ধ ও গুণ-মানে কোন দিক দিয়েই কম নয়। আমরা দোকান থেকে বিভিন্ন ব্রান্ডের যে সব প্যাকেটজাত চা কিনি তার শ্রীমঙ্গলের ঐ চায়ের ধারে-কাছে দাঁড়াতে পারবে না।
আবার যদি কখনো কারো পাল্লায় পড়ে ফাইভ স্টার হোেেটলে যাই তবে সেখানে কোনো চা খাব না। কারণ, এক কাপ চা দুইশ’ আশি টাকা। আমার পকেট থেকে গেলেও দুইশ’ আশি টাকা, আমার হোস্টের পকেট থেকে গেলেও দুইশ’ আশি টাকা।

১৮/৬/২০২৪

15/06/2024

বোতলভূত রহস্য
-আবদুল মাজেদ

[উৎসর্গঃ বোতলভূতকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যবর্গ]

হাতিরপুল ফ্রিস্কুল স্ট্রিটের দোতলার যে ঘরটাতে আমি ও আমার নবপরিণীতা স্ত্রী ভাড়ায় বসবাস করি, ভর সন্ধ্যায় তার নিচ তলা থেকে থেমে থেমে অনুমান বিশ মিনিট অন্তর অন্তর পটকা ফাটার শব্দ শোনা যেতে লাগল। চার বছরের সেশন-জ্যামসহ মোট আট বছরে বিশ^বিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করে ১৯৯২ সালের ২৯ ফ্রেব্রুয়ারি ফ্রিস্কুল স্ট্রিটের দোতলার এই ঘরটাতে ব্যাচেলর বোর্ডার হিসেবে অন্য এক জনের সাথে আমি যোগ দিই। আশির দশকের শেষার্ধের জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় পরস্পর-বিরোধী ছাত্র সংগঠনের ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার সময় যেসব পটকা গগনবিদারী শব্দে ফাটত, নিচ তলা থেকে আসতে থাকা শব্দ ততটা উচ্চগ্রামের নয়। বাড়ির সীমানার বাইরে এ শব্দ পৌঁছনোর কথা নয়। তাছাড়া ইট পাথরের বিল্ডিং-এর ফোকর গলে এ শব্দের প্রতিধ্বনি অনুরণিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। দরজা খুলে নিচের দিকে তাকাতেই সান-সেটের নিচের জানালা দিয়ে ধোঁয়াও বের হতে দেখলাম। বন্ধ দরজার ওপার থেকে মন্ত্রোচ্চারণের মত শব্দ ভেসে আসায় পরিবেশটা বেশ রহস্যময় মনে হলো। ক’দিন যাবৎ নিচতলায় বসবাসরত বাড়ির মালিকের ছোট ছেলেটাকে নিয়ে বেশ অশান্তিও চলছিল। পারিবারিক বিষয়ে নাকগলানো কিংবা আড়িপাতা অনৈতিক বিধায় মই-সদৃশ লোহার সিড়ি বেয়ে তরতর করে দোতলার ঘরে ফিরে গেলাম।
বিরানব্বই সালের ফ্রেব্রæয়ারিতে এ বাসায় যখন উঠি তখন দোতলায় ওঠার জন্য একটা কাঠের মই ছিল। ঘুনেধরা, উইপোকায় খাওয়া এবং রোদ-বৃষ্টিতে জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে পড়া সে সিড়ি দিয়ে উঠতে প্রথম দিকে বেশ ভয় করত। সবসুদ্ধ মাসিক ১২০০ টাকা ভাড়ার দোতলার ঘরটিতে দুটি মাঝারি আকারের চৌকি পেতে দুজন অনায়াসে থাকা যায়। এর সাথে সংলগ্ন একটি বড়সড় আকারের বাথরুম এবং দুজনের সংসারের কাজ চালানোর মত একটি চলনসই রান্নাঘরও ছিল। ১৯৯৫ সালে আমার বিয়ের পর তখনকার রুমমেট অন্যত্র চলে যাওয়ায় এখানেই সপরিবার বসবাস করতে শুরু করি। ২০০০ সালের জানুয়ারিতে বড় মেয়ের জন্ম হওয়ার কিছুদিন আগে পর্যন্ত সস্ত্রীক এখানেই ছিলাম। বাসা ছাড়ার সময় মাসিক ১৮০০ টাকা ভাড়া দিয়েছি। তখনকার দিনে এ ভাড়া নিতান্ত সস্তা ছিল। দীর্ঘদিন এক বাসায় থাকার কারণে বাড়িওয়ালা ও তার ছেলেদের সাথে এক প্রকার সখ্যতা গড়ে ওঠায় বাসাভাড়া আর বাড়ানো হয়নি।
বাড়িওয়ালার তিন ছেলে। ছোট ছেলেটা হাইস্কুলে পড়ে। এ বয়সেই ছয়ফুঠের কাছাকাছি উচ্চতার নধরকান্তি ছেলেটা। হঠাৎ করেই তার মানসিক সমস্যা দেখা দিল। বয়ঃসন্ধিকালে স্বাভাবিক মনোদৈহিক পরিবর্তনের সাথে সাথে ঠিক কি কারণে এই সমস্যা দেখা দিয়েছিল তা জানা মুস্কিল। কেউ বলে নিতান্ত মানসিক সমস্যা, কেউ বলে উপরি-ভাব অর্থাৎ ভূত-প্রেত-জি¦ন-এর আসর হয়েছে। যে যার মত ব্যাখ্যা দিতে থাকে। ছেলেটি সারাদিন ঘুমায় আর সন্ধ্যা হলেই তার মধ্যে খ্যাপাটে ভাব প্রকট হয়ে ওঠে। তখন বাসার যাবতীয় জিনিস সে ভাঙতে থাকে। যেমন দশাসই চেহারা তেমনি তার গায়ে শক্তি। তাকে থামানোই দায়।
আমার তখন পোস্টিং মুন্সিগঞ্জ। আমার স্ত্রী পড়ালেখা করে হোম ইকোনমিক্স কলেজে। ফলে আমি প্রতিদিন ভোরে চলে যাই, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরি। মুন্সিগঞ্জ থেকে ট্রলারে চেপে ঢাকাগামী বরিশালের চলতি লঞ্চে উঠে সদরঘাটে নেমে সময় বাঁচানোর জন্য পুরনো ঢাকার ভিতর দিয়ে হেঁটে নর্থ-সাউথ রোড, নাজিম উদ্দিন রোড, চানখারপুল, পলাশির মোড়, নীলক্ষেত হেয় বাসায় পৌঁছই। সময়ের সাথে সাথে রিকসা ভাড়ার টাকাও বেঁচে যায়। বলাই বাহুল্য, যথেষ্ট ক্লান্ত থাকি। তাই নিচে কি হচ্ছে তা জানার আগ্রহ থাকে না। তাছাড়া ঘরের দেয়াল ঘেঁষে সিড়ির পাশ দিয়ে একটি কাঁঠালগাছ তরতর করে উঠে গিয়ে দোতলার দরজা-সংলগ্ন সানসেটে যেখানে সিড়িটা শেষ হয়েছে সেখানে ঠিক মাথার উপরে একটা কাঁঠালগাছ ছাতার মত ঝাঁকড়া ডালপালা ছড়িয়ে দিয়েছে। মাগরিবের আজান শেষ হতে না হতেই রাজ্যের চড়ুইপাখি এসে এখানে আশ্রয় নিয়ে কিচিরমিচির করতে থাকে। ফলে নিচে কি হচ্ছে তা আমাদের কানে সচরাচর পৌঁছত না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ছোট ছেলেটার অসুস্থতার কারণে তার চিকিৎসার জন্য ওঝা দেখানো হচ্ছে। ছেলেটার পিতৃকূলের কাউকে বড় একটা কখনো দেখিনি। তবে মাতুলগোষ্ঠীর যে সকল শুভাকাঙ্খী প্রায়ই এ বাড়িতে আসে তাদের স্থির ধারণা ছেলেটার উপর আসমানি প্রভাব পড়েছে অথাৎ জি¦ন-ভূত (যে যেমনটা বিশ^াস করে)এর আসর হয়েছে। মাতুলগোষ্ঠী বলতে তার মামার পরিবারকেই বেশি দেখতাম। আমি যে ঘরে থাকি সে ঘরে একসময় থাকত, ছেলেটার ছোট মামা। সে আকস্মিকভাবে গণমাধ্যমের ভাষায়, ‘হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে’’ মারা যায়ার পরে (হৃদযন্ত্রে ক্রিয়া সচল থেকে কোনো প্রাণি কখনো মৃত্যুবরণ করেছে এমন কথা কখনো শুনিনি) দোতলার এই ঘরটি ভাড়া দেয়া হয়।
ঘরটি পশ্চিম দিকে সম্প্রসারণ করা হবে বলে পশ্চিম দিকে প্রমাণ সাইজের একটি দরজা রয়েছে। দরজাটি খোলা নিষিদ্ধ। ঠিক পশ্চিমের দেয়াল ঘেঁষে দক্ষিণের দেয়ালে সরু একটা একপাল্লার দরজা। দরজাটা এতই সংকীর্ণ যে একবর ষোলো ইঞ্চি সিঙ্গার টেলিভিশন কেনার আগে দর্জির গজ-ফিতা দিয়ে দরজাটা মেপে দেখেছিলাম, টেলিভিশনটা ঢুকবে কি-না। শেষ পর্যন্ত ঘরের নকশাবিদের ভুলের কারণে টেলিভিশনটি দরজা দিয়ে ঢুকাতে পেরেছিলাম। দরজার চৌকাঠের মাপ নিয়ে দেখলাম, মেঝে সংলগ্ন স্থানে দরজাটি পনের ইঞ্চি প্রশস্ত। আর উপরের দিকে উনিশ ইঞ্চি প্রশস্ত। ফলে দরজার উপরের দিকে অংশ দিয়ে টেলিভিশনটি মাথা সমান উচু করে ঘরের ভিতরে ঢোকাতে সক্ষম হই। পারফেকশন সবক্ষেত্রেই মঙ্গলদায়ক নয়।
যাই হোক, তার মামা ছেলেটার অসুস্থতা ডায়গনৌজ করেন এবং তিনিই ওজা-বদ্যি ডাকার ব্যবস্থা করেন। এক্ষেত্রে প্রথমেই ডাক পড়ে ওঝা বা ফকিরের। সে সন্ধ্যায় এসে জি¦ন-ভূত তাড়ানোর জন্য মন্ত্রতন্ত্র পড়ে নানান রকম তুকতাক করত। ওঝার অন্যান্য তুকতাকের মধ্যে একটা ছিল রোগীর ঘাড়ে ভরকরা জি¦ন-ভূত বোতলে ভরে ফেলা। বেয়াড়া জি¦ন-ভূত এতই দোর্দÐ প্রতাপশালী যে, তাকে বোতলে ভরেও রাখা যেত না। বোতল ভেঙে বেরিয়ে আসত। বোতল ভাঙার সাথে সাথে বোতল থেকে ধোঁয়াও বের হতো। এভাবে জি¦ন-ভূতের আছর দূর করা গেল তো শুরু হলো তাবিজের উৎপাত। কারা যেন ছোট ছেলেকে তাবিজ করেছে। কার মনে কী আছে তা বুঝার একমাত্র ক্ষমতা যার তিনিই হলেন অন্তর্যামী-সর্বশক্তিমান আল্লাহ। তাই তাবিজের উদ্দেশ্যও অনুমান করা সম্ভব হলো না। যে যার মত মনগড়া গল্প ফাঁদতে লাগলো। তাবিজের উদ্দেশ জানা না গেলেও তাবিজের অবস্থান চিহ্নিত করে তা খুজে বের করার মত বিস্তর এলেম আল্লাহ তার বান্দাকে দিয়েছে, তা ওঝা কিংবা ফকিরের ফিকিরি থেকে প্রমাণিত। তাবিজ খুঁজে বের করার জন্য গুনিন বা ওঝা নানা রকম ভারণ দেয়। আয়না ভারণ, বাটি চালান, হাত চালান আরো কত কি। এ সব করে গুনিন তাবিজের অবস্থান নির্দিষ্ট করে (পিনপয়েন্ট) বলে দেয়। সেখান থেকে তাবিজ খুঁজে বের করে নষ্ট করে ফেলা হয়। তখন তাবিজের কেরামতি নষ্ট হয়ে যায়। কখনও তাবিজ পাওয়া যায় বালিশের ভিতর, কখনও টিনের চালের কোন নির্দিষ্ট জায়গায়, কখনও আবার ঘরের মেঝেতে মাটির নিচে। অশরীরী জ¦ীন-ভূতের যাতায়াত লোমকূপের সূ² রন্ধ্রে এবং শিরায় শিরায়। তারা মানুষের খাস কামরায় ঢুকে বালিশের ভিতরেও তাবিজ রাখতে পারে, বেডরুমের মেঝের প্লাস্টারের নিচেও তাবিজ রাখা তাদের পক্ষে অসম্ভব নয়।
জি¦নকে যখন বোতলে ভরা হতো তখন ফকির বোতলের মুখে হাত দিয়ে পরিচয় করিয়ে দিন কোনটা জি¦নের বাদশা, কি তার নাম, কোনটা জি¦নের শাহজাদা এবং তার নাম পরিচয়ও বলে দিত। অন্ধকার ঘরে কোন দিক দিয়ে কোন্ বোতল কখন ছুটে আসত বলা মুস্কিল।
যেদিন বালিশের নিচে তাবিজ থাকে, সেদিন বালিশ ছিঁড়ে শিমুল তুলোর ভিতর থেকে তন্নতন্ন করে খড়ের গাদা থেকে সূঁচ খুঁজে বের করার মত তাবিজ খুঁেজ বের করা হয়। সমস্ত ঘর তুলোয় তুলোয় একাকার হয়ে যায়। আগেই বলেছি, এসব গুনিন ও ওঝা সাথে করে নিয়ে আসেন ছেলেটার মামা। তার মামা গুলশান এলাকায় থাকেন। গুলশান থেকে আড়াআড়ি ঢাকা শহর ডিঙিয়ে কেরানিগঞ্জ এলাকা থেকে তিনি এসব ওঝা-ফকির নিয়ে আসেন। গুনিন ও ওঝার এসব কাজ সশশীরে উপস্থিত থেকে একটা বেতের মোড়ায় বসে এই মামাই তদারক করেন। বালিশ ছিঁড়ে বালিশের তুলোকে তুলোধুনা করার সময় মামা তীক্ষè দৃষ্টি রাখেন এবং এক সময় সচকিত হয়ে তাবিজটা বের করে এনে বলেন, ‘এই যে তাবিজ। দেখেছ শয়তান কোন্ জায়গায় ঢুকে পড়েছে?’- মামা বিস্ময় প্রকাশ করেন। এক ছুটির দিনে দেখলাম, শাবল ও কোদাল দিয়ে বেডরুমের মেঝে খোঁড়া হচ্ছে। মেঝে খোঁড়ার সময় কালো রঙের মাটি আর দুয়েকটা ইটের খোয়া ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না। হঠাৎ করে মামা ঝুঁকে পড়ে তাঁর অনুসন্ধিৎসু চোখ দিয়ে কি যেন দেখে হাতে তেঁতুলের বিচির মত কি একটা তুলে নিয়ে এলেন। বস্তুটির উপরের ময়লা কাপড়ে মুছে পরিস্কার করতেই দেখা গেল ওঠাই একটা তাবিজ। এতক্ষণ যারা রুদ্ধশ্বাসে বসে দেখছিল, তারা একযোগে এতক্ষণ যাবৎ বুকের ভিতরে আটকে রাখা শ্বাস একযোগে ছেড়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ঘরের ভিতর যে দীর্ঘশ^াসের ঝড় বয়ে গেল। যাক, শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হলো। ছেলেটা ছেলেটা রেহাই পেলো।
কিন্তু, হা হতোস্মি। সকলই গরল ভেল। কিসের কি। সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই আবার শুরু হলো ছেলেটা সমস্যা। অবিকল একই রকম সমস্যা। দিনভর ঘুম। সন্ধ্যা হলেই আবার সেই তাÐব, চিৎকার চেচামেচি, ভাঙচুর। ঘরের সবগুলো অরক্ষিত, নাঙ্গা। কোনটির দরজার কাচ অবশিষ্ট নেই। তেজসপত্রও প্রায় শেষ। আবার সেই বোতলবাবার আগমন, ভূতকে বোতলে বন্দী করতে হবে। এবার বোতলে ভূতকে বন্দী করে সেই বোতল গরম পানিতে ফুটানো হলো। যেন রেশমের গুটিকে পানিতে সিদ্ধ করে গুটিপোকাকে গুটির ভিতরেই শেষ করে দেয়া। আবার কআবার সেই বিস্ফোরণ, বিস্ফোরণে আমাদের চোখ ছাড়াবড়া হয়ে বিস্ময়ে বিস্ফোনোন্মুখ হওয়া মত।
এ গেল দিনের বেলায় এবং সন্ধ্যারাতের উৎপাত। ঠিক পাশের বাসায় গভীর রাতে শুরু হলো নতুন উৎপাত। আমাদের দোতলার সংকীর্ণ দরজা দিয়ে বের হলে প্রায় দুইফুট চওড়া ছাদের সম্প্রসারিত অংশে দাঁড়ালেই নিচে একটি সেমিপাকা টিনশেডঘর। এখানে আমির হোসেনের পরিবার বসবাস করে। সে বাসার আমির হোসেন গভীররাতে বাসায় ফিরে ভাঙচুর শুরু করল। সে সাইকেলের চেইন দিয়ে সমস্তা শো কেচের কাচ ভেঙে তছনছ করে ফেলল, হাড়ি পাতিল, বাসনকোসন কিছুই বাদ গেল না। সেই সাথে আছে চিৎকার ও খিচতি-খেইড়। তবে কি এ বাড়ির ভুত ওঝার ঝাড় খেয়ে ও বাড়িতে আশ্রয় নিল? ওদের বাসার দেয়াল ঠিক আমার সিড়ির সাথে লাগানো। দরজার কাছে দাঁড়ালেই একটু দূরে তাদের রান্নাঘর দেখা যায়। আমিরের ছোটভাই সোহেল এসে দাঁড়াতেই জিজ্ঞাসা করলাম, সোহেল রাতে বাসায় কী হয়েছিল? সে বলল আমির ভাই রাতে মদ খেয়ে বাসায় এসে মাতলামি করছিল। বুঝলাম, দুই বাড়ির সমস্যা প্রায় কাছাকাছি। এ বাড়িতেও বোতলভূত ও বাড়িতেও বোতলভূত। ইংরেজিতে দুটোকেই স্পিরিট বলে। একটা তরল আরেকটা বায়বীয়।
যে বাড়িতে আমি ভাড়া থাকি, এদের সীমানার ভিতরে পরপর তিনটি ঘর। রাস্তা থেকে কঠের ফ্রেমে বাঁধানো ঢেউ টিনের গেট পার হলেই বামদিকে প্রথমে একটা সেমিপাকা টিনশেড। সেখানে থাকে এদের নানী। নব্বই বছরের বেশি বয়সী এই ভদ্র মহিলা সব সময় এই ঘরে একটা চেয়ারে বসে থাকেন। আদি নিবাস বিক্রমপুরের ষোলঘর। ধবধবে সাদা শাড়ি পরে থাকেন। পরনের শাড়িটা বেশি সাদা নাকি তিনি নিজ তা নিয়ে মাঝমাঝে দ্বিধায় পড়ে গেলেও তিনি যে সাদা মনের মানুষ তাতে কোনো সন্দেহ হয়নি। তার অভিব্যক্তিতে আভিজাত্যের চিহ্ন সুস্পষ্ট। এ বাড়ির তিনিই মালিক। আমি যখন বাইরে যাই মাঝে মাঝে আমাকে হাত ইশারায় ডাকেন। কেমন আছি, কেমন চলছে এমন দুচারটে প্রশ্ন করেন। আর প্রায়ই কথা প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাবা, বউ একখান পাইছ বটে, বউ-এর মত বউ।’ আমি যথারীতি দোয়া চেয়ে সালাম জানিয়ে বিদায় নিই। এর পরে আরেকটি সেমিপাকা টিন শেড। এখানেই মায়ের সাথে থাকে তিন ছেলের মধ্যে মেঝ এবং ছোট ছেলেটি। এর পরেই একরুমের দোতলা পাকা ঘর। যার নিচতলায় বড় ছেলে, আর দোতলায় ভাড়াটে হিসেবে আমি।
মেইন গেট থেকে ঢুকলেই ডানদিকের সীমানা প্রাচীরটি আসলে আমির হোসেনদের টিনশেড ঘরের দেয়াল। দেয়াল ঘেঁষে দশ পনের হাত দূরে দূরে দুটি মাঝারি আকারের আমগাছ। আমগাছ দুটির কান্ডের যে অংশ দেয়ালের সাথে লেগে থাকে শীতের শুরুতেই সেখানে দেখা যায় বিশাল আকারের শুঁয়োপোকা। একটু খেয়াল করে না দেখলে বুঝার উপায় নেই। শেওলা ধরা দেয়াল আর গাছের কালচে কান্ডের সাথে এমন ভাবে গায়েগায়ে এরা নিজেদের ঠাসবুনুনির মত সাজিয়ে রাখে যে ভালোভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে খেয়াল না করলে বোঝার উপায় নেই। এই শুঁয়ো পোকা থেকেই কিছুদিন পরে বের হবে বিশালাকৃতির কালোকালো প্রজাপতি। হাতের পাঞ্জা-আকৃতির এই বিশাল প্রজাপতিগুলোকে যখান গ্রামে দেখতাম তখন আমার চাচাত ভাই বাদল এগুলোকে বলত দাদাপাখি। প্রজাপতির এ রকম নাম আজ পর্যন্ত আমি কোথাও শুনিনি। মানুষ তার মায়ের কাছেই শব্দ ও ভাষা শিখে থাকে। হয়ত তার মা মানে আমার চাচী পশ্চিমবঙ্গের যে এলাকার মেয়ে সেখানকার আঞ্চলিক ভাষায় একে দাদাপাখিই বলে। গবেষণা করে দেখিনি।
যাইহোক, দোতলার যে ঘরটিতে থাকি, দুজনের জন্য এমনিতেই বেশ ভালো। নিরিবিলি। তবে পানির কষ্ট আছে। তার উপর লোহার সিড়ি দিয়ে ওঠানামা করা কষ্টকর বলে আমার স্ত্রী একটু গাঁইগুঁই করত। তার উপর একদিন পা পিছলে সটান নিচে নেমে এসেছিল। পায়ের ত্বক একটু ছড়ে গিয়েছিল, বড় ধরণের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তাই এই শুঁয়োপোকাগুলো যাতে আমার স্ত্রীর নজরে না পড়ে তার জন্য আমার চেষ্টার অন্ত ছিল না। একবার যদি এ দৃশ্য তার চোখে পড়ে যায় তবে এ বাসায় সে আর থাকবে না। তার উপরে জলে বাঘ ডাঙায় কুমিরের মত উভয় সংকট। একদিকের বোতলে বায়বীয় ভূত অন্যদিকের বোতলে তরল ভূত। ওঝা ও গুনিনদের কারিশমা তো আছেই।
এদের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। সরকারি কর্মচারি হিসেবে বারিধারায় দশকাঠা আয়তনের একটি প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। সেখানে সেমিপাকা ঘর করে ভাড়া দেয়া আছে। ঐ বাড়িভাড়ার আয় আর আমি ভাড়া দিই একহাজার আটশত টাকা। গ্রামের বাড়ির জমিজমা থেকে কিছু আয় আসে কিনা আমি জানি না। এই সামান্য আয়েই তাদের সংসার চালাতে হয়। তার উপরে সপ্তাহ অন্তর কবিরাজ, ওঝার খরচ চালাতেই প্রানান্তকর অবস্থা। আগেই বলেছি ভুতের আছরের অবসান হয় তো তাবিজ কবচের সমস্যা শুরু হয়। তাবিজ কবচ আবিস্কৃত হয় তো আবার ভূতের অত্যাচার শুরু হয়। এক পর্যায়ে আমার স্ত্রীকে রেখে মুন্সিগঞ্জের অফিস করাও কঠিন হয়ে গেল। তার উপরে মড়ার উপর খাড়ার ঘা নেমে এলো যখন ফকির সাহেব শোনালো যে, জোড়া বাণ মারা হয়েছে। তারমানে ছোট ছেলে তার বাবাকে একসাথে বাণ মারা হয়েছে। এ বাণ কাটানো অসম্ভব। বাণ কাটাতে গেলে যে কোন একজনকে হারাতে হবে। কিছুতেই দুজনকে একসাথে বাঁচানো যাবে না। পরিবার থেকে কাকে বাঁচানোর কথা বলা হয়েছিল, কিংবা আদৌ বলা হয়েছিল কি না, তা জানা সম্ভব হয়নি। তবে এর কিছুদিন পরে তার বাবা স্ট্রোক করে। ঢাকা মেডিকেলে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরে কিছুটা সুস্থ হন এবং খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটতে পারতেন। এরও কিছুদিন পরে কি এক অজ্ঞাত রোগে বাসার কাছেই একটি বড় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে সঠিক ডায়াগনৌসিস ছাড়াই এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এদিকে আমির হোসেনের অত্যাচার দিন দিন বেড়েই চলল। ঘরের ভিতরে ভাঙচুর করা ছাড়াও সে তাদের ঘরের টিনে চালে হেঁটে বেড়ায়। প্রায়ই সময় পরনে কাপড় রাখতে চায় না। তাদের টিনের চাল মানে আমার দরজার সামনেই। তার চোখের দিকে তাকাতে ভয় করে । চোখ দেখে মনে হয় এখুনি বুঝি সে তার দুচোখ দিয়ে আমাকে ভস্ম করে ফেলবে। তার স্ত্রী যখন ঘরের বাইরে আসে মাঝে মাঝে দেখতে পাই। বেচারী ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকে। আমাদের সামনে পড়লে লজ্জায় আরো ¤্রয়িমান হয়ে যায়।
আমির হোসেনকে খুব বেশিদিন ভাঙচুর করতে হয়নি। তারা যার বাড়িতে ভাড়া থাকত তারা টিনশেড ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করবে। তাই আমির হোসেনকে নোটিশ দেয়ায় সে অন্যত্র চলে যায়। এবার ভাঙচুর করার দায়িত্ব নিল খোদ বাড়িওয়ালা। তাদের এই ভাঙাগড়ার শব্দে বসবার করা দায়। ফলে আমিও শেওড়াপাড়ায় গিয়ে বাসা নিলাম।
বছর তিনেক শেওড়াপাড়ায় থেকে আবার আমি বাসা বদল করে হাতিরপুলে চলে আসি। এবারেও সেই ফ্রিস্কুল স্ট্রিট। ফ্রিস্কুল স্ট্রিটের যে বাড়িতে আমি থাকতাম ঠিক বিপরীত দিকের ‘ভাড়াইট্টা হিসেবে আবার ডেরা বাঁধলাম। পুর্বে যে বাসায় ছিলাম তাদের ছেলেদের সাথে দেখা হয়। দেখেশুনে স্বাভাবিক মনে হয়। পূর্বের অস্বাভাবিক বিষয় সম্পর্কে জানতে চেয়ে তাদেরকে বিব্রত করতে না চাইলেও কথা প্রসঙ্গে অনেক কিছু জানা গেছে। ওঝা ও ফকির সেই ১৯৯৮ সালেও বিভিন্ন ফিকিরে তাদের নিকট থেকে প্রায় দশলক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ টাকার কত অংশ ফকিরের পকেটে গেছে আর কত অংশ ফকিরের পিছনের মানুষগুলোর পকেটে গেছে তার সঠিক চিত্র আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু বোতলভূত শেষ পর্যন্ত কীভাবে জব্দ হলো, এবং তাবিজ কবচগুলো আরা পাওয়া যায় কি না সে বিষয়ে কৌতুহল রয়েই গেল। হঠাৎ করেই একদিন আমার হাতিরপুলের প্রাক্তন বাসার কাছে বসবাসকারী একজন জুনিয়ার বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেল। তার কাছে পূর্বের বাসার মালিকের খোঁজ খবর জিজ্ঞাসা করলাম। জানালো, ছোট ছেলেটা সুস্থ। তবে তার মামার সাথে বাড়ির দখল নিয়ে মামলা শুরু হয়েছে।
এদিকে কথায় কথায় জানা গেল, আমির হোসেনের ঘরে সৎ মা। তার নিজের মা নেই। দুই পক্ষের সন্তানদের সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে যাতে সমস্যা না হয় তাই তার সৎ মা তার নিজের গর্ভজাত সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিষ্কন্টক করতে চায়। বাকি কাহিনী বলাই বাহুল্য।
আমরা ভূতে অবিশ^াস করা সত্তে¡ও যখন ভূতুড়ে সব কান্ডকারখানা দেখি তখন আমাদের মস্তিষ্কও ভূতাশ্রিত হয়ে যায়। স্বাভাবিক যুক্তি, বুদ্ধিগুলো সঠিক ধারায় বয় না। তা না হলে আমার আগেই বুঝা উচিত ছিল যে, যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম সে বাড়ির মালিক তাদের নানী। নানীর অবর্তমানে মামা ও ভাগ্নে সবাই এ বাড়ির ওয়ারিশ। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কে কতটুকু পাবে সেটা বড় কথা নয়, যে জমিতে তাদের এই বাড়িটা অবস্থিত, তার আজকের বাজারে মূল্য হবে প্রায় তিন কোটি টাকা। বিগ ব্যাং এর পর থেকে বিশ^ব্রহ্মাÐের পরিসীমা যেমন ক্রমান্বয়ে প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে, তেমনিভাবে ঢাকা শহরের জমির দামের সীমাও ‘‘গ্রহ হতে গ্রহে ধাইছে।” এখানকার জমির উপরে অনেকের দৃষ্টি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তার উপরে যদি ন্যায্য ওয়ারিশান হয় তো কথাই নেই। যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় তাদের নানী ইন্তেকাল করেছেন। এমন মহামূল্যবান মালিকানা কাগজে-কলমে পেলেও দখলে যেতে না পারলে জমিতে কিছু করা সম্ভব নয়। তাই আগে দখল উচ্ছেদ করতে হবে। আর এ জন্যই যতরকম উদ্যোগ নেয়া দরকার মায়ের আপন ভাই তার ত্রæটি রাখেনি। ছোট ভাগ্নেটাকে কৌশলে নেশা জাতীয় কিছু খাওয়ানো, তাবিজ কবচ করা এবং ওঝা ডেকে বোতলভূতের নাটক মঞ্চস্থ করা-সব কিছুই করা হয়েছে। আদালতে মামলা চলমান রয়েছে, ছেলেটাও সুস্থ আছে। কেবল উঠতি বয়সে একটি মানব-সৃষ্ট সংকট তৈরি করে ছেলেটার লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে তার ভবিষ্যৎ বোতলবন্দী করে এমন এক অনিশ্চিত জগতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে এবং তার ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপর এমন এক স্থায়ী ট্রমা সৃষ্টি করা হয়েছে, যেখান থেকে বের করে আনার মত বোতলবাবা পাওয়া দুঃসাধ্য।

১৫/০৬/২০২৪

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when MD. ABDUL MAZED posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Establishment

Send a message to MD. ABDUL MAZED:

Share

Category