18/06/2024
ইরানি মশলা-চা
-আবদুল মাজেদ
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খোলা জানালার মত। ব্যবহারকারীরা ইচ্ছেমত সব পোস্ট দিচ্ছে। নিজের সম্পর্কে হিত-গর্হিত সব তথ্য সবার সাথে ভাগ করে নিচ্ছে। এখানে চোখ রাখলে মানুষের দৈনন্দিন আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, খ্যাদ্যভ্যাস, গতিবিধি সব কিছুই জানা যায়। মানুষের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহই যাদের কাজ তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখলে তাদের অর্ধেক কাজের আসান হয়ে যাবে। আবার এটি বিভ্রান্তির জানালাও বটে। কারণ, আমরা যে ছবি, খাদ্যদ্রব্য, পোশাক শেয়ার করি তাতে আমাদের আটপৌরে জীবনাচরণের প্রতিফলন ঘটে না। আমি হয়ত গেলাম দক্ষিণে, পোস্ট দিয়ে জানান দিলাম আমি এখন উত্তরে অবস্থান করছি। আর ফেইক আইডি’র প্রতারণার শিকার হয়নি-এমন সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যায় নেহায়েত কম নয়। আমিও কমে যাই না। নানা রকমের খাদ্য-দ্রব্যের ছবি শেয়ার করি। তবে নিজের বাড়িতে যা রান্না হয় তা শেয়ার করি না। কারণ, তা এমন কিছু উল্লেখযোগ্য আইটেম নয় যে, শেয়ার করে বলতে হবে, দেখ দেখ কী উত্তম উত্তম খাবারের আয়োজন করেছি, যা না খেলে তোমাদের জীবনধারণ ব্যর্থ। তবে আমি যখন কোথাও মেহমান হয়ে যাই, তখন মেজবানের পরিবেশন করা খাদ্যদ্রব্যের ছবি প্রশংসাসূচক চিত্র পরিচিতিসহ ফেসবুকে পোস্ট করি। কোথাও নেমন্তন্ন খেতে গেলে পরিবেশিত খাদ্যদ্রব্যের রঙ-রস-স্বাদ-গন্ধের মুহূর্মুহূ প্রশংসা করাই সাধারণ ভদ্রস্থতা। কেবল প্রশংসা করলেই হবে না, অন্দরমহলের রাঁধুনির কর্ণকূহরে যেন সে প্রশংসাবাক্য পৌঁছে যায় সে বিষয়ে যতœবান হতে হবে। তা নাহলে পরেরবার নেমন্তন্ন খেতে এসে সমাদর কমবে না বটে, কিন্তু রাঁধুনির মনে একটা অতৃপ্তি থেকে যাবে। আমি আবার স্বভাবে মুখচোরা। প্রশংসাই হোক আর বদনামই হোক, সামনা-সামনি কথা বলতে পারি না। কেমন যেন জিহŸা আড়ষ্ট হয়ে আসে। কিন্তু পরোক্ষে কথা বলাতে আমি বেশ পটু। তবে পরোক্ষে যা বলি তা প্রশংসা-বাক্য না হয়ে প্রায়শই পরচর্চায় পর্যবসিত হয়। তাই আমি খাওয়ার টেবিলে বসেই জিজ্ঞাসা করি, এই কি সব, নাকি রান্নাঘরে আরো আছে? তখন জানানো হয় রান্নঘরে আরো আছে, তবে টেবিলে জায়গা না হওয়ায় একসাথে দেয়া হয়নি; পর্যায়ক্রমে আসতে থাকবে। আমি জানাই যে, সব আইটেমের ছবি একসাথে তুলব। তখন গৃহিনী সকল প্রকার আহার্য একটু গাদাগাদি করে হলেও টেবিলে সাজিয়ে দিন। আমি ছবি তুলে আমার মেজবান ও রাঁধুনির পরিচিতিসহ ফেসবুকে পোস্ট করে রাঁধুনিকে দেখিয়ে দিই। তারপর যখন একে একে রান্নার গুণমানের স্বীকৃতি আসতে থাকে তখন রাঁধুনির চোখমুছের অভিব্যক্তি দেখার মত বস্তু হয়ে ওঠে। রান্নঘরের তাপে দগ্ধ হয়ে সারাদিনের কষ্টের পুরস্কার সে হাতে-নাতে পেয়ে যায়। আমি যদি হাতে তসবিহ নিয়ে সারাদিন রাঁধুনির প্রশংসা করতাম, তবুও রাঁধুনিকে এতটা খুশি করা যেত না। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে আমার বাড়ির খাদ্য দ্রব্যের ছবি দেই না কেন? মোটা দাগে দুটো কারণ আছে। এক, যদি খাদ্যদ্রব্য গরিবি ধরণের হয়, প্রায়শই তাই হয়, তবে আমার সামাজিক অবস্থান নিয়ে সবাই চোখ ঠারাঠারি শুরু করবে। দুই, যদি খাদ্যদ্রব্য একটু ব্যয়বহুল হয়, তার সম্ভাবনা ইংরেজিতে যাকে বলে ফিউ এন্ড ফার বিটুইন, তখন আমার আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। পনের লাখ টাকায় ছাগল কিনে কে যেন ভাইরাল হলো, তারপর ফেঁসে গেল। কোন টা যে ছাগল সেটাই প্রশ্ন। আমি যাদের বাসার খাদ্যদ্রব্যের ছবি পোস্ট করি তারা সবাই ব্যবসায়ী। চাকুরীজীবীর বাসায় খাওয়াদাওয়া করলে ভুলেও সে ছবি দিই না। যদিও বা ছবিটা দেই, নাম পরিচয় গোপন রাখি।
আমাকে মাঝেমাঝে কেউকেটাদের সাথে নামীদামী হোটেলে চা পান করতে হয়। কেউকেটাদের সাথে টং দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তো আদা, লেবু, ধনেপাতা, মৌরি, জোয়ান এসব দিয়ে হাবিজাবি চা খাওয়া যায় না। তাই নামীদামী হোটেলে কিছুক্ষণের জন্য জড়োসড়ো হয়ে বসে সময় কাটাতে হয়। ঘনঘন নাম ও মালিকানা পরিবর্তন হয়, রাজধানীর এমনই একটা পাঁচতারকা হোটেলে একবার ‘চা-টা’ খাওয়ার নেমন্তন্ন পেয়েছিলাম। মেইন কোর্স শেষ হওয়ার পরে ওয়েটার সুদৃশ্য ট্রেতে কর্পোরেট প্যাকেটে বন্দী হরেক রঙের গ্রিন টি, সাথে গরম পানি, ও চিনি রেখে যায়। আমি দেখেশুনে খেই হারিয়ে ফেলি। বিরক্ত হয়ে নিতান্ত আনাড়ির মত বলে ফেলি, ভাই দুধ, চিনি ও চা পাতা দিয়ে বানানো ঘরোয়া চা পাওয়া যায় না? ওয়েটার বলল, হ্যাঁ পাওয়া যায়। একটা দেশি ব্রান্ডের নাম করে বলল, এটা দিয়ে বানানো মশলা চা বেশ চলছে। আমি বললাম, তাই দেন। খেয়ে দেখলাম, আমি ঘরে যে চা বানিয়ে খাই, এর রঙ, স্বাদ, গন্ধ প্রায় এক রমক। কেবল মশলার ফ্লেভারটা আলাদা যুক্ত হয়েছে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের জসিম উদ্দিন হলের আবাসিক ছাত্র আমার এক বড় ভাই প্রাইভেট ট্যুইশন করতেন। ফার্মেসি ডিপার্টমেন্টে পড়তেন। অনুমান করতে কষ্ট হয় না, খুবই মেধাবী ছাত্র। ছাত্র পড়ানোর সময় তাকে প্রতিদিন নাস্তা দেয়া হতো। এটা কেবল তার ক্ষেত্রেই নয়, প্রাইভেট টিউটরদেরকে দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া নাস্তা দেয়া হয়। আমাকেও দেয়া হতো। আমার এই বড় ভাই মেধাবী হওয়া ছাড়াও অত্যন্ত উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। কোনো রকম অনিয়ম তার সহ্য হয় না। টাকার বিনিময়ে ছাত্র পড়ানো হয়, সেখানে প্রতিদিন নাস্তা খাওয়া (এটা অবশ্য চুক্তির ভিতরে থাকে না) তার কাছে যথেষ্ট ন্যায়-সংগত মনে হয়নি। এর একটা হেস্তনেস্ত করা তার জন্য আবশ্যক হয়ে উঠল। তাই তিনি একদিন গৃহকর্তৃকে সামনে পেয়ে সরাসরি জানতে চাইলেন, ‘আপনি যে আমাকে প্রতিদিন নাস্তা দেন, এই নাস্তার আর্থিক মুল্য কত?’’
আমি আমার বড় ভাই-এর মত অতটা মেধাবী ছিলাম না, তবে কৌতুহলী ছিলাম তার চেয়ের বেশি। আমার হোস্টের মানসম্মানের কথা না ভেবে ওয়েটারের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম, আমকে যে মশলাদার দুধ-চা দিলেন, তার দাম কত? ওয়েটার কালবিলম্ব না করে বলল, দুইশ’ আশি টাকা। চোখ ছাড়াবড়া করে আর কি হবে। ওয়েটার আমার অবস্থা বুঝতে পেরে বুঝিয়ে বলল এটা কোন্ ব্রান্ডের চা, কি কি মশলা দেয়া হয়, কীভাবে রান্না করা হয়।
চা আবার রান্না হয় নাকি? চা তৈরি করা, চা বানানো এসবই শুনে আসছি। একবারই কেবল চা রান্নার কথা শুনেছি। কাজী নজরুল ইসলাম কবি জসিম উদ্দিনের সাথে কোনো এক নিভৃত পল্লীতে বেড়াতে গিয়ে চা খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তখন অন্দরমহলের ললনারা কীভাবে চা রান্না করতে হয় তা নিয়ে মহাসংকটে পড়ে যান। চা বানানোর সময় হরেক রকম মশলার প্রসঙ্গ ও প্রয়োগ যখন চলে আসে, আগুনের উপস্থিতি তো আছেই, তখন চা রান্না করতে আপত্তি কিসের।
হোটেলের যে টেবিলটাতে বসে আছি, তার থেকে মাত্র দশ-পনের হাত দূরে চা তৈরি হচ্ছে। ওয়েটার আমাকে সাথে নিয়ে চা তৈরির পদ্ধতি দেখালেন। ওয়েটার যে এতটা বদান্যতা দেখাচ্ছেন, তার কারণ কিন্তু আমি নই। এর কারণ আমার হোস্ট। তিনি এখানে ঘনঘন আসেন এবং ধনী লোক, সন্দেহ নেই। ওয়েটার তার কাছ থেকে মোটা টাকা টিপস পেয়ে থাকে। আমার খাতিরের রহস্য এখানেই। বৃটিশ আমলে রায় বাহাদুর-খান বাহাদুরদের কাছে লাট সায়েবের চেয়ে তার কুকুরটার খাতির কি কোনো অংশে কম ছিল?
বাসায় ফিরে বাজারের সাধারণ চা পাতা এবং রান্না ঘরের কৌটার মশলার শ্রাদ্ধ করে বানিয়ে ফেললাম মশলা চা। স্বাদ-গন্ধ কোনো অংশে কম নয়। হিসেব করে দেখলাম, দুধ, চিনি, চা পাতা, মশলার দাম হিসেবে নিয়ে এক কাপ চায়ের দাম বিশ টাকা হতে পারে। সাশ্রয়ী মূল্যে গুণে ও মানে ফাইভ স্টার হোটেল সমতুল্য চা, মন্দ কী?
ঈদের দিন আমি সব সময় কম খাই। মিষ্টি জাতীয় খাদ্য আমার হজম হয় না। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকায় দুধ খাইনে। পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, মাংসের মেইন কোর্স আসার পূর্ব পর্যন্ত কৃচ্ছ্রতা সাধন করে কাটাই, যাতে এগুলো একটু বেশি খাওয়া যায়। সম্প্রতি লিভারে কিঞ্চিৎ ফ্যাট দেখা দেয়ার কারণে এক্ষেত্রেও যথাসম্ভব রসনা-সংযত করে চলতে হয়। একটু খিদে রেখেই খেতে হয়। এজন্য মাঝে মাঝে শশা, গাজর পেটে চালান দিয়ে পেটটা ভরভরন্ত রাখতে হয়। তাই বিকালে চা খেতে মন চাইল। এক কাপ চা তৈরি করে ফেসবুকে ছবি (এক কাপ চা আর পনের লাখ টাকা দামের ছাগলে বিস্তর ফারাক) দিয়ে লিখলাম, সেবার হায়দ্রাবাদ গিয়ে ইরানি মশলা চা রান্না শিখে এসেছিলাম। পোস্ট দেখে কয়েক জন রেসিপি জানতে চাইল।
বস্তুত হায়দ্রাবাদে যখন ইরানি মশলা চা খাই তখনও ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলাম। যারা গ্রিন টি খেয়ে কর্পোরেট ভাব নিতে চান তাদের কথা আলাদা, আমার মত ক্রুড চা খোরের কাছে এই চা খুব ভাল লেগেছিল। চা বিক্রেতার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এ চায়ের গোপন রহস্য কী? চা পাতা কি ইরানের? তিনি জানিয়েছিলাম, চা পাতা স্থানীয়, মানে ভারতীয়। তবে মশলা ইরানি। এক কেজি চা পাতার সাথে একশ’ গ্রাম ইরানি বিভিন্ন ধরণের মশলা (এলাচি, লবঙ্গ, দারচিনি-হয়ত আরো থাকতে পারে। ব্যবসায়ী তো তার বিজনেস সিক্রেট পুরোটা হাট করে বলবে না) গুঁড়ো করে মিশিয়ে নেয়া হয়। তবে চা বিক্রেতা যাই বলুক, তার চায়ের রঙ ও স্বাদের জন্য অন্যতম ভূমিকা পালন করে দুধ। দেখলাম, বিশাল আকৃতির সসপ্যানে গরুর দুধ সারাদিন ধরে ঢিমে-আঁচে জ¦াল হচ্ছে। তবে এত কড়া দুধ যেহেতু আমার সহ্য হয় না, তাই আমি বাজারের ননী তোলা গুঁড়ো দুধ ব্যবহার করি। আর চায়ের পাতা আমাদের শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনের পাশে ছোটছোট দোকানে যে ক্লোন চা বিক্রি হয়, এগুলো রঙ, স্বাদ, গন্ধ ও গুণ-মানে কোন দিক দিয়েই কম নয়। আমরা দোকান থেকে বিভিন্ন ব্রান্ডের যে সব প্যাকেটজাত চা কিনি তার শ্রীমঙ্গলের ঐ চায়ের ধারে-কাছে দাঁড়াতে পারবে না।
আবার যদি কখনো কারো পাল্লায় পড়ে ফাইভ স্টার হোেেটলে যাই তবে সেখানে কোনো চা খাব না। কারণ, এক কাপ চা দুইশ’ আশি টাকা। আমার পকেট থেকে গেলেও দুইশ’ আশি টাকা, আমার হোস্টের পকেট থেকে গেলেও দুইশ’ আশি টাকা।
১৮/৬/২০২৪