07/10/2023
তেরো দিনের ছোট বাচ্চাসহ পাত্রীকে বিয়ে করতে এসেছে কবির। হবু বউ একবার কোলের বাচ্চাকে শান্ত করছে, আরেকবার পাত্রপক্ষের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। এর চেয়ে অদ্ভুত দৃশ্য বোধহয় কবির এর আগে কখনো দেখেনি। ছোটমামা দেখেশুনেও এমন পাত্রী দেখাতে নিয়ে আসবে, তা কখনো কল্পনাও করেনি সে।
কথায় কথায় জানতে পারে-বিয়ের পাত্রীর নাম সুনেরাহ। প্রায় পাঁচমাস আগে সুনেরাহ প্রেগন্যান্ট থাকাকালীন তার প্রাক্তণ স্বামী অনিক দূর্ঘটনায় মারা গেছে। সেই থেকেই বাবার বাড়িতে আছে সে। কবীর কী প্রশ্ন করবে-সেটাই ভেবে পাচ্ছে না। এমনকি এবাড়িতে আসার পর যখন জানতে পেরেছে, সুনেরাহ'র তেরোদিনের ছোট একটা মেয়ে বাচ্চাও আছে,সেই থেকে সে যেন একেবারে হতভম্ব হয়ে গেছে।
প্রায় মিনিট চারেক কেটে যাবার পর সে একরকম বিরক্তি আর সঙ্কোচে সুনেরাহ'র দিকে তাকালো। সদ্য মা হওয়া এক নারীকে যেন মনে হচ্ছে প্রস্ফুটিত পদ্ম। কয়েক সেকেন্ড সে তো দৃষ্টিই ফেরাতে পারলো না। সুনেরাহ'র হয়তো ঠিক এমনই সুন্দর হয়ে থাকাক উচিত জন্ম জন্মান্তর ধরে। কবিরের মা রাফিয়া রহমান পাশ থেকে ছেলেকে সামান্য ধাক্কা দিয়ে বললেন,
—তুই কী সুনেরাহ'র সাথে আলাদাভাবে কথা বলতে চাস? অবশ্য সেটাই উচিত। অফিস থেকে এভাবে জোর করে ধরে নিয়ে চলে এসেছি।
কবির জবাব দিতে যাবে, কিন্তু তার আগেই সুনেরাহ হঠাৎ বলে উঠলো,
—তার আর দরকার নেই। কারণ আমি এই বিয়েটা করছি না। আমার মেয়ের বয়স মাত্র তেরোদিন। ডেলিভারির ঘা শুকোয়নি আজও। আর এরমধ্যে আমি বিয়ে করবো? অসম্ভব। রাগিব ভাইয়া, এইসব পাগলামির মানে কী বলো তো? আমি তো তোমাকে একবারও বলিনি যে,আমার মেয়ের জন্য দ্বিতীয় বাবা এনে দাও। তাহলে হঠাৎ এই বিব্রতকর পরিস্থিতি কেন?
সুনেরাহ তার ভাইয়ের দিকে বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে তাকালো। কিন্তু এতে যেন রাগিবের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সে বোনের দিকে শান্তভঙ্গিতে চেয়ে কিছু একটা ইশারা করে। সুনেরাহ ব্যাপারটা কোনোভাবেই ধরতে পারে না। বছর দেড় হলো তার মা মারা গেছে। বাবা মারা গেছেন আরও আগে। বর্তমানে শশুরবাড়ি ছেড়ে এই রাগিবের বাড়িটাই তার শেষ সম্বল। যদিও বাপের বাড়ির সম্পত্তিতে তার যথেষ্ট অংশীদারিত্ব রয়েছে। তবে রাগিবের হাবভাব খুব একটা সুবিধের লাগে না। বিধবা বোনকে কোনোরকমে তাড়াতে পারলেই বাঁচে সে।
রাগিবের টনক না নড়লেও কবিরের কাছে সুনেরাহ'র কথাগুলো ভীষণ ভালো লাগলো। তার জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে হলে সাথে সাথে এই সুযোগটা লুফে নেবার চেষ্টা করতো—এ ব্যাপারটা শতভাগ নিশ্চয়তার সাথেই বলা যায়। কিন্তু সে এর ধারেকাছেও নেই! কতটা আত্মসম্মানী হলে কোনো মেয়ে এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও নিজের কাঠিন্য ধরে রাখতে পারে, সেটাই বড় প্রশ্ন। সে রাগিবকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—মিস সুনেরাহ যদি রাজি থাকেন, তবে এই বিয়েটা করতে আমার বিশেষ কোনো আপত্তি নেই। আমি উনার সঙ্গে জীবন সাজাতে রাজি।
কবিরের কথায় সুনেরাহ যেন হতভম্ব হয়ে গেল। একজন অবিবাহিত ছেলে তার মত বিধবা এক বাচ্চার মাকে এত সহজে বিয়ে করতে রাজি হবে,সে ভাবনাতেও আনতে পারেনি। তাছাড়া ঘরে ঢোকার সময় পাত্রীর অবস্থা শুনে কবিরের মুখের প্রকাশভঙ্গী তার দৃষ্টি এড়ায়নি। সে তখনই টের পেয়েছিল-এই মানুষটা তার প্রতি আগ্রহী হবে না। কিন্তু হঠাৎ করেই দাবার গুটি এমন তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরে যেতে পারে, ব্যাপারটা সে ঠিক বুঝতে পারে না। সে নির্বাক হয়ে কবিরের চোখের দিকে চেয়ে থাকে। কবির আবার বললো,
—আমি সিরিয়াস। সুনেরাহ,আপনার সাথে আলাদাভাবে কথা বলা যাবে?
সুনেরাহ একবার ভাইয়ের দিকে তাকালো। এই মুহুর্তে কী বলা উচিত আর কী করা উচিত-সে জানে না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে অজান্তেই মাথা নেড়ে সায় দিলো। এরপর ছোট মেয়েটাকে কোলে নিয়ে সোজা উঠে গেল নিজের ঘরের দিকে। কবিরও তার পিছু নিলো।
ঘরে ঢুকে কবির খেয়াল করে দেখে, ঘর জুড়ে অন্য একটি পুরুষের স্মৃতি লেপ্টে আছে। অগণিত ছবি, একটি কফি রঙের ব্লেজার ঝুলছে দেওয়ালে। একপাশে সুনেরাহ'র সাথে ভদ্রলোকের বেশ ঘনিষ্ঠ ছবি দেখে তার আর বুঝতে বাকি রইলো না,এটা আসলেই সুনেরাহ'র প্রাক্তণ স্বামী।
-আপনার স্বামীকে আপনি প্রচন্ড ভালোবাসতেন। তাই না?
-হুম, তা বাসতাম বৈ কী।
-ভদ্রলোকের নাম কী ছিল, বলা যাবে?
-অনিক মুস্তাফিজ। পেশায় একজন ইভেন্ট প্ল্যানার ছিল সে। লাভ ম্যারেজ। দীর্ঘ তিন বছর সংসার করেছি ওর সাথে।
কবির একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ভালোবেসে মানুষ বেঁচে যায় শুনেছে। কিন্তু এইভাবেও একটা মানুষ, একটা নারী ম'রে যায়-তা সুনেরাহ'কে দেখে সে খুব করে অনুভব করতে পারছে। সে সুনেরাহ'কে কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাবে, তার আগেই ছোট বাচ্চাটি হঠাৎ কেঁদে উঠলো। সুনেরাহ প্রাণপণে কান্না থামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বাচ্চার কান্না কোনোভাবেই থামে না। কবিরও বেশ উতলা হয়ে ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,
-ওকে একটু আলগা করে ধরুন। একটু দুপাশে ঘুরিয়ে আদর করে দেখুন তো।
সুনেরাহ কিছুটা অবাক হলেও কবিরের কথামতো বাচ্চাকে সেভাবে ধরলো। আর অদ্ভুতভাবে মেয়েটাও কিছুক্ষণের মধ্যেই থেমে যায়। সুনেরাহ এক আকাশ সমান কৃতজ্ঞতা নিয়ে কবিরের দিকে ফিরে তাকালো।
-আপনি কীভাবে বুঝলেন, ওকে এভাবে ধরলে চুপ করে যাবে?
-কেন জানি না, তবে আমার মনে হলো। অনেক আগে আমার ভাইয়ের বউকে মানে চাচাতো ভাবিকে দেখেছিলাম। সেটাই হঠাৎ খেয়ালে এলো। আচ্ছা, আপনার বাবুর নামটা কী?
—অনুদিতি।
—কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করবো?
—আমি জানি, আপনি কী প্রশ্ন করবেন। ডেলিভারির মাত্র তেরো-চৌদ্দ দিনের মাথায় কেন আমার বিয়ে দিতে আমার ভাই এতটা উতলা হয়ে গেছে,সেটাই তো জানতে চান। তাই তো? এ প্রশ্নের উত্তর আমারও জানা নেই। তবে আমার ধারণা, হয়তো আমি এবং আমার মেয়ে তার কাছে বোঝা হয়ে গেছি। নিজের ঘাড় থেকে বোঝা নামাতে পারলে সে হাফ ছেড়ে বাঁঁচবে। বাবা-মা দুজনই মারা যাবার পর একটা মেয়ে তার স্বামীকে নিয়ে একটু স্বস্তি খোঁজে। কিন্তু আমার পোড়া কপালে আমি সেটাও হারিয়েছি। এখন এই অনুদিতিই আমার জীবনের একমাত্র ভরসা।
কবিরের ভীষণ বলতে ইচ্ছে করছে,"আমিও আজ থেকে আপনার শেষ ভরসা হতে চাই"। কিন্তু সে দুঃসাহসে আর জোর পায় না। অচেনা নারীর কাছে নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে মুখ ফুটে বলার আর সাহস পেল না সে। মেয়েদের সম্পর্কে তার বাহ্যিক কিংবা অভ্যন্তরীণ দুইদিক থেকেই জ্ঞান একেবারে শূন্যের কোটায়। সেই জ্ঞান থেকে বলতে গেলে বরং হিতে বিপরীত হয়ে অনাস্থা ঘটে যাবে।
কবির জানালার বাইরে দৃষ্টি রাখলো। বেশ আয়োজন করেই বর্ষার সন্ধ্যে নেমে আসছে। আকাশ জুড়ে মেঘেদের লুকোচুরি। মনে হচ্ছে এক্ষুণি বৃষ্টি নামবে। কবিরের কেমন যেন সংশয় হতে লাগলো। সে কিছুটা আমতা আমতা করে বললো,
—আমাদের এক হবার সম্ভাবনা আছে?
—আপনি আমাকে করুণা করছেন, তাই না? পুরুষ মানুষ তো সচরাচর বিধবা কিংবা ডিভোর্সি নারীদের প্রতি করুণা করে না। তবে আপনি কেন?
—করুণা নয়, আপনাকে বিয়ে করতে চাওয়ার কারণ আপনার স্নিগ্ধতা। একথা সত্য যে, আমি জানতাম না আমার ছোটমামা আপনার সাথে আমার বিয়ে নিয়ে আলাপ করবেন। আবার আমার আম্মাও এভাবে রাজি হবেন। শুরুতে বরং বিরক্তই হয়েছিলাম। কিন্তু আপনাকে যত দেখছি, কেন জানি ততই মুগ্ধ হচ্ছি। আপনি এটাকে কী বলবেন?
সুনেরাহ আড়ালে একবার মুচকি হাসলো। কবির আবার বলে,
—আমার সম্পর্কে জানবেন না?
—নাহ। আমরা কী বাইরে গিয়ে বিয়ের বাকি আলাপটা এগোনোর কথা বলতে পারি?
কবির কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে ওর দিকে তাকালো। সুনেরাহ সত্যি সত্যিই ওকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেছে? আনন্দে যেন কিছুক্ষণ ওর মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হলো না। সুনেরাহ নিজে থেকেই কিছু বলতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ বিছানার উপর তার ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো। কবির সেদিকে তাকিয়ে দেখে, নাম্বারটি "ডিয়ার হাজবেন্ড" বলে সেভ করা। কবিরের এভাবে তাকিয়ে থাকা দেখে সুনেরাহও মনে হলো বেশ ভয় পেয়েছে।
গল্প— ্গ পর্ব:-০১
লেখক— Sharifa Suhasini
যারা এখনো আমাদের গ্রূপে জয়েন না হয়ে গল্প পড়ছেন তারা এখনোই আমাদের গ্রূপে জয়েন হয়ে নিন আমাদের গ্রুপ টা পাবলিক করা আমাদের গ্রূপের গল্প গল্প মন ছুঁয়ে যাবে নীল লেখায় চাপ দিয়ে জয়েন হন 👉👉 📕 সাহিত্য ডাইরি 📗 follow