22/06/2026
১৯৯৪ সালের ২১ জুন। গ্রিসের বিপক্ষে ডিয়েগো ম্যারাডোনা একটা গোল করলেন। যে সে গোল না, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক জাদুকরী দৃশ্য। অথচ এর ঠিক আট দিন পর সব শেষ; ডোপিংয়ের অপবাদ মাথায় নিয়ে, প্রচণ্ড অপমানিত হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হলো তাকে।
পুরো বিশ্ব তখন দেখল ডোপিংয়ের এক অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু পর্দার আড়ালে যে একটা গভীর খেলা চলছিল, ফিফার একেবারে উঁচু মহলের ইশারা ছিল, তা কজন খেয়াল করেছে? জোয়াও হ্যাভেলেঞ্জ আর সেপ ব্লাটার কি তাকে ইচ্ছে করেই এত উঁচুতে তুলেছিলেন, যাতে আছাড়টা বেশ জোরে পড়ে?
গল্পটা আসলে অন্যরকম।
যুক্তরাষ্ট্রে যখন ম্যারাডোনা পা রাখলেন, তাকে দেখে চেনার উপায় ছিল না। তেত্রিশ বছর বয়স। চার বছর আগে ইতালির বিশ্বকাপ থেকে যে ভারী শরীরের মানুষটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বিদায় নিয়েছিলেন, তিনি এবার পনেরো কেজি ওজন কমিয়ে ফেলেছেন! ড্যানিয়েল চেরিনি নামের এক আর্জেন্টাইন বডিবিল্ডার পুরো একটা বছর তাকে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটিয়েছেন।
কঠোর ডায়েট আর এক অদ্ভুত রুটিন, যাকে ম্যারাডোনার দলের লোকেরা ভদ্রভাষায় বলত ‘এনার্জি-বুস্টিং’ বা শক্তি বর্ধন। তার দীর্ঘদিনের ট্রেইনার ফার্নান্দো সিগনিওরিনি দূর থেকে এসব দেখতেন আর মনে মনে এক ধরনের তীব্র অস্বস্তি বোধ করতেন।
কয়েক মাস আগে অবশ্য পুরো ব্যাপারটা ভেস্তেই যাচ্ছিল। ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। মানুষের তুমুল প্রত্যাশার চাপ সইতে না পেরে ম্যারাডোনা হুট করে দল থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিলেন। সাংবাদিকরা নাছোড়বান্দা, উত্তরের দাবিতে দুদিন ধরে তার বাড়ির সামনে ডেরা গেঁথে বসে রইল। বিরক্ত হয়ে ম্যারাডোনা একসময় ঘর থেকে বেরোলেন এবং একটা এয়ার রাইফেল দিয়ে সাংবাদিকদের দিকে তাক করে গু*লি ছুড়ে বসলেন!
তবুও তিনি ফিরলেন। এত কম সময়ে কীভাবে মানুষটা নিজেকে এভাবে বদলে ফেললেন, সেই রহস্য কেউ পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেনি।
ফক্সবরো, ম্যাসাচুসেটস। গ্রুপ ডি-র খেলা চলছে। আর্জেন্টিনা বনাম গ্রিস। আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যেই দুই গোলে এগিয়ে। গ্রিসের ডি-বক্সের ঠিক বাইরে দ্রুত ছয়টি ওয়ান-টাচ পাস হলো। তারপর বলটা এসে পৌঁছাল ম্যারাডোনার চেনা সেই বাঁ পায়ে। এক ছোঁয়ায় বলটাকে তিনি পাঠিয়ে দিলেন পোস্টের একেবারে ওপরের কোণায়।
তারপর সেই বিখ্যাত উদ্যাপন। সাইডলাইনের দিকে ছুটে গেলেন তিনি। চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, মুখ হাঁ করা। সরাসরি একটা টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে গিয়ে চিৎকার করতে করতে নিজের মাথাটা লেন্সের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন। কোনো ভাষা নেই, কোনো কথা নেই, শুধু তীব্র চিৎকার, রাগ আর নিজের পুনরুত্থানের এক অবিশ্বাস্য আত্মপ্রকাশ। ফুটবল দুনিয়ায় এই দৃশ্য চিরকালের জন্য এক আইকনিক ছবি হয়ে রয়ে গেল।
ম্যাচটা আর্জেন্টিনা জিতল ৪-০ ব্যবধানে। চার দিন পর বোস্টনে নাইজেরিয়াকেও হারাল ২-১ গোলে। ম্যারাডোনা সেই ম্যাচেও দুর্দান্ত খেললেন। কে জানত, দেশের জার্সিতে এটাই তার ৯১তম এবং শেষ ম্যাচ হতে যাচ্ছে!
নাইজেরিয়া ম্যাচের ঠিক পাঁচ দিন পরের কথা। একটা খবর এসে আকাশ ভেঙে পড়ল। ম্যারাডোনার দুটি আলাদা ইউরিন স্যাম্পল পজিটিভ এসেছে।
২৯ জুন ফিফার সেপ ব্লাটার সংবাদ সম্মেলন ডেকে ঠান্ডা গলায় ঘোষণা করলেন—‘ইউরিন স্যাম্পলের দুটি পরীক্ষাই পজিটিভ এসেছে। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ডিয়েগো ম্যারাডোনা ডোপিং নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা লঙ্ঘন করেছেন।’
তার শরীরে এফিড্রিনের পাঁচটি ভিন্ন রূপ পাওয়া গেল। ম্যারাডোনা যা-ই খেয়ে থাকুন না কেন, ওটা কোনো ভুল বা দুর্ঘটনা ছিল না। ওটা ছিল একটা ককটেল। তাকে টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কার করা হলো। এক বুক অপমান নিয়ে তিনি বিদায় নিলেন।
সেদিন রাতে আর্জেন্টিনার টেলিভিশনে ম্যারাডোনা কান্নাভেজা গলায় নিজের পক্ষ সমর্থন করে বললেন, ‘আমি জানি না কী হয়েছে, হয়তো আমরা অসাবধান ছিলাম। কিন্তু ঈশ্বরের কসম, খেলার জন্য আমি কোনো ড্রাগ নিইনি। আমার যে ক্ষমতা, তাতে ড্রাগ নেওয়ার কোনো প্রয়োজন আমার নেই। ওরা আমার পা দুটো কেটে ফেলেছে। এটা খুব নোংরা একটা ব্যবসা। আমি হ্যাভেলেঞ্জ আর ব্লাটারকে বিশ্বাস করতে চাই, কিন্তু এরপরে... না, আমি আর কিছু বলতে চাই না।’
মুখে সরাসরি না বললেও, ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর দুই ব্যক্তি—ফিফা প্রধান জোয়াও হ্যাভেলেঞ্জ এবং জেনারেল সেক্রেটারি সেপ ব্লাটার ততক্ষণে তার ট্র্যাজেডির অংশ হয়ে গেছেন।
পরবর্তী সময়ে একটা গুঞ্জন চারদিকে ডালপালা মেলেছিল। আমেরিকার মাটিতে সেটাই ছিল প্রথম বিশ্বকাপ। আয়োজকেরা ভয় পাচ্ছিলেন, মার্কিন মিডিয়ার নজর কাড়ার মতো কোনো বড় তারকা বুঝি সেখানে নেই। তাই টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ফিফা নাকি গোপনে ম্যারাডোনার সাথে যোগাযোগ করেছিল। একটা অলিখিত চুক্তি হয়েছিল—তুমি শুধু নিজেকে ফিট করে মাঠে নামো, ডোপিংয়ের নিয়মকানুনগুলো তোমার বেলায় একটু চোখ বুজে থাকবে।
যদি সত্যি এমন কোনো চুক্তি হয়ে থাকে, তবে ফিফাই ম্যারাডোনাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। একজন মাদকাসক্ত মানুষকে ইশারায় আশ্বস্ত করে তারা মাঠে নামাল, আর যখন পজিটিভ টেস্টের কথা লুকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে গেল, তখন নিয়মকানুনের পুরো খড়্গটা তার ওপরই চালিয়ে দিল।
আর্জেন্টিনায় তখন দোষারোপের খেলা শুরু হয়ে গেছে। ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান জুলিও গ্রোনডোনা দাবি করলেন, ম্যারাডোনার ডাক্তার ভুল করে তাকে সাধারণ একটা নাকের স্প্রে দিয়েছিলেন, এফিড্রিন সেখান থেকেই এসেছে। ম্যারাডোনা নিজে আঙুল তুললেন ‘রিপ ফুয়েল’ নামের একটি এনার্জি ড্রিংকের দিকে। বললেন, এটার আর্জেন্টাইন সংস্করণে কোনো এফিড্রিন থাকে না, কিন্তু আমেরিকায় এসে তার স্টক ফুরিয়ে যাওয়ায় এখানকার স্থানীয় ফর্মুলার ড্রিংকটি তিনি খেয়েছিলেন, তাতেই এফিড্রিন ছিল। ফিফার ডাক্তার অবশ্য এসব গল্প হেসে উড়িয়ে দিলেন। পাঁচ ধরনের উপাদান। একটা ককটেল। এর কোনো নির্দোষ বা সহজ ব্যাখ্যা হয় না।
আর্জেন্টিনার বাইরের প্রতিক্রিয়া ছিল আরও অদ্ভুত, বিশেষ করে সুদূর বাংলাদেশে। ঢাকায় ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রিয় তারকার অপমানের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ মিছিল করল।
শেষ পর্যন্ত ম্যারাডোনা এবং চেরিনি দুজনকেই ফুটবল থেকে পনেরো মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হলো, সাথে ২০ হাজার সুইস ফ্রাঙ্ক জরিমানা। আর্জেন্টিনা দল ম্যারাডোনাকে ছাড়াই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল। দেশের হয়ে ম্যারাডোনা আর কোনোদিন অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরতে পারেননি।
গ্রিসের বিপক্ষে সেই জাদুকরী গোলটা স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। ক্যামেরার দিকে চেয়ে করা সেই চিৎকার স্থায়ী হয়েছিল আরও সামান্য কিছু সময়। কিন্তু ম্যারাডোনার সেই পতন, আর তার পেছনের আসল অপরাধী কে—তা নিয়ে গত ত্রিশ বছর ধরে চলা তর্কের আজও কোনো শেষ হলো না। মানুষের মনে কুয়াশা রয়েই গেল।