04/07/2023
ভাতের সাথে বি'ষ মিশিয়ে নিজের মা'কে খেতে দিয়েছি। নাহ্, তিনি আমার সৎ মা না। তিনি আমার জন্মদাত্রী মা। তবে তাকে মা'রতে চাওয়ার একমাত্র কারন হলো পরকীয়া। ঘরে এতোবড় একজন যুবতী মেয়ে থাকতেও তিনি পরকীয়া করছেন তার দেবরের সাথেই। কাহিনীটা বেশ কয়েক বছর ধরেই চলে আসছে। আমার বাবা নেহাৎ ভালো মানুষ বলেই এবং চাকরির জন্য বাইরে থাকার কারনেই এখনো এই ঘটনা জানেন না। তবে ছোট থেকে দেখে আসছি মায়ের সাথে কাকার একটা সংযোগ আছে। ছোট ছিলাম বলেই আগে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ ছিল না। বড় হওয়ার সাথে সাথে এবং সময়ের পরিবর্তনে সবটাই এখন বুঝতে পারছি।
বাবাকে বলে লাভ হবেনা, তিনি তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে কখনো অবিশ্বাস করবেন না। তবে ঠকানোর শাস্তি আমার কাছে ক্ষমার যোগ্য না। তাই আটঘাট বেঁধে নেমেছি শাস্তি দিতে।
সকালে উঠে মা'য়ের কোলে শুয়ে ছিলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। শেষবারের মায়ের হাতে খাবার খেলাম। বায়না ধরলাম আমিও নিজের হাতে খাইয়ে দিবো। যেই বলা সেই কাজ। নিজের হাতে বি'ষ মিষিয়ে ভাতের দলা পাকিয়ে মুখে পুরে দিলাম।
চোখের সামনেই ছটফট করে দুমড়ে মুচড়ে গেলো শরীরটা মৃ'ত্যু যন্ত্র'নায়। আমি তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিলাম। পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে কিছুটা। চোখের সামনে মায়ের মৃ'ত্যু দেখাটা ভয়ংকর। নিশ্বাস আঁটকে আসছে আমার। চোখ দুটো বন্ধ করে মায়ের মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরলাম।
চোখদুটো উল্টে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলো আমার মা। নিথর হয়ে গেলো শরীরটা। আমি বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
রুমের দরজা বন্ধ করে কাকার কাছে গেলাম পায়েসের বাটি নিয়ে। সকালেই আমার জন্য তৈরি করেছিল মা। কাকাকে দিয়ে বললাম "মা পাঠিয়েছে তোমার জন্য।" কাকা একটা মিষ্টি হাসি দিলো। এই হাসির মানে আমি জানি, বুঝি। আমিও পায়ের উপর পা দিয়ে বসে পড়লাম কাকার পাশেই। কাকা চেটেপুটে পায়েসটা শেষ করলো। আমি তাকিয়ে দেখছি, মানুষ মৃ'ত্যুর আগে কিভাবে তৃপ্তি সহকারে খাবার খায়। কে জানে, হয়তো কাকা বুঝেছিল এটাই তার শেষ খাওয়া।
খাওয়ার পরে যা হওয়ার সেটাই হলো। মৃ'ত্যু যন্ত'নায় ছটফট করতে লাগলো। আমি কানে কানে বললাম "একটা সুখের সংসার নষ্ট করার জন্য তুমি এবং আমার মায়ের মতো মহিলাই যথেষ্ট। তোমার প্রিয়তমাকে পাঠিয়ে দিয়েছি উপরে। তোমার জন্য অপেক্ষা করছে, যাও তোমারও যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।"
৩য় নাম্বার মৃ'ত্যুটাও নিজের চোখে দেখলাম। প্রথম খু'নটা ছিল আমার প্রেমিকের। এতো এতো ভালোবাসার পরে শুনলাম অন্য একজনের সাথে তার সম্পর্ক আছে। ব্যাস, মে'রে দিলাম। তুমি যেই হওনা কেন, আমার কাছে ঠকানোর কোনো মাফ নেই।
বাড়িতে কেউ নেই, বাবার উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখলাম। চিঠিতে লেখা ছিল--
প্রিয় বাবা
তুমি হয়তো জানতে না তোমাকে বহু আগে থেকেই ঠকানো হয়েছে। তোমাকে বেশি ভালোবাসার জন্য তোমাকে ঠকানোটা মেনে নিতে পারিনি। তাই তোমার স্ত্রী এবং ছোট ভাইকে মে'রে দিয়েছি। আমি স্বীকার করছি আমি খু'ন করেছি। হয়তো তুমি বা তোমরা আমাকে খুঁজবে। কিন্তু এখানে থাকলে আমার শাস্তি হয়ে যাবে। আমি সেটা চাইনা। তাই আমাকে খুঁজো না। তোমাকে ভালোবাসি বাবা, দুঃখ পেয়ো না।
ইতি তোমার আদরের মেয়ে
রোদ
চিঠিটা লিখে বাড়ির পেছনে বড় একটা গর্ত করে লাশ দুটোকে গর্তে রেখে দিলাম। ভালোবেসে ম'রেছে, দুজনের একসাথে থাকার অধিকার আছে। এটাই তো চেয়েছিল তারা। তাই এক কবরেই দুজনকে মাটিচা'পা দিলাম।
তারপর বেরিয়ে পড়লাম অজানার উদ্দেশ্যে। দিগবিদিক হয়ে ধান ক্ষেতের আলের পাশ দিয়ে ভোঁ দৌড়।
এক পর্যায়ে বড় রাস্তার পাশে উঠতেই হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, এতো এতো সাহস থাকলেও সন্ধ্যার পরে বাইরে থাকা আমার সাহসে কুলোয় নি কোনোদিন। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি পাশেই একটা ঝোপ নড়ে উঠলো। আমি উঠে হাত পা ঝেড়ে আবার চলা শুরু করলাম কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য ঝোপে নড়াচড়া করা শব্দটা আমার পিছু ছাড়লো না। মনে সাহস নিয়ে শাড়ির আঁচলে বাঁধা কয়টা ময়লা টাকা গুনে সামনে এগিয়ে চললাম। যাওয়ার কোনো যায়গা আপাতত নেই। তাও এই টাকা দিয়ে কয়েকদিন চালিয়ে নিয়ে কোনো কাজ খুঁজে নিবো এমন ভাবনা নিয়েই বেরিয়ে ছিলাম।
হুট করেই পেছন থেকে কারো ডাক পড়লো। আমি তাকাতেই ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো এক সুদর্শন যুবক। যদিও চারদিকটা অন্ধকার, কিছু দেখার জো নেই। তাও অন্ধকারে অবয়বে মনে হচ্ছে সুদর্শনই হবে। আমি একটু পিছিয়ে গিয়ে কাঁপা স্বরে বললাম "ক..কে ওখানে?" লোকটা সামনে এগিয়ে এসে কোমল গলায় জবাব দিলো "ভয় পাবেন না, আমি শব্দ।" যাহ্ বাবা, শব্দ আবার কারো নাম হয় নাকি? শুনিনি তো জিন্দিগিতেও। তাও জিজ্ঞেস করলাম "আমাকে ডাকলেন কেন?" শব্দ আবারও ঠান্ডা গলায় বললো "রাত হয়ে যাচ্ছে তো। আপনি কোথায় যাচ্ছেন? এদিকের রাস্তা তো ভালো না। সচরাচর কোনো মানুষ এদিকে আসে না। আপনি কি ভুল করে এই রাস্তায় চলে এসেছেন?" মানুষ আসেনা মানে? আমি কি? উনি কি? উনি নিজেও তো এসেছেন এখানে।
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম "কে বলেছে আসেনা? আমি এসেছি, আপনি এসেছেন। আর বলছেন আসেনা কেউ?" শব্দ হালকা হেঁসে বললো "আপনি তো খুব পাকা মেয়ে। আপনি তো ভুলে এসেছেন হয়তো, আর আমি এদিকেই থাকি।" আমি আবারও ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম "কই দেখি আপনার বাসা কোথায়? কেউ না আসলে আপনি এখানে থাকেন কিভাবে?" শব্দ বাঁকা হেসে বললো "আমার বাসা নেই, আমি ঝোপঝাড় গাছপালায় থাকি বুঝলে? এখান থেকে চলে যাও, যায়গাটা মোটেও ভালো নয়।" বলেই পেছনে হাঁটা শুরু করলো। আমি ডেকে ডেকে বললাম "আরে আরে শুনে যান, গাছে থাকেন মানে? আপনি কি বাঁ'নর?" শব্দ জবাব দিলো না, একবার তাকিয়ে বিরবির করে চোখের আড়াল হয়ে গেলো।
পরমুহূর্তেই অন্ধকার, চারদিকে নিস্তব্ধ। পোকামাকড়ের ডাক ছাড়া আর কিছু নেই। নিস্তব্ধতা একদম জেঁকে বসলো। আমি মনে মনে এই অন্ধকার নিস্তব্ধতা থেকে বের হওয়ার জন্য প্রার্থনা করলাম শব্দের সাথে আরেকবার দেখা হোক। পথ চিনিয়ে নিয়ে যাক আমাকে।
আশ্চর্য, চোখ খুলতেই দেখি শব্দ দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে।
চলবে?...
গল্প_জ্বীনবর
লেখিকা_তিশা মুনি
পর্ব_০১