03/09/2026
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের টেকসই উন্নয়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণে কিছু প্রস্তাবনা:
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল রাখা এবং জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ লক্ষ্যে আমার কিছু প্রস্তাবনা নিচে তুলে ধরা হলো—
১. জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করা:
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র অপরিহার্য—এর কোনো বিকল্প নেই। মুড়ির দোকানে বিদ্যুৎ তৈরি করা যাবে না; বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেই কেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি, স্পেয়ার পার্টস ও অন্যান্য উপকরণ নিশ্চিত করতেই হবে।
অনেক সময় দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও সময়মতো জ্বালানি বা প্রয়োজনীয় উপকরণ না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হয়।
তাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের Supply Chain শক্তিশালী করতে হবে। জ্বালানি আমদানি, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণের প্রতিটি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা প্রয়োজন।
২. ‘Capacity Payment’ সম্পর্কে সঠিক ধারণা জনগণের সামনে তুলে ধরা:
কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে নির্মিত একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দীর্ঘমেয়াদে সচল রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল, ঋণের দায়, অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও প্রস্তুত সক্ষমতা বজায় রাখার খরচ রয়েছে।
এই বাস্তবতার আলোকে Capacity Payment-এর কারিগরি ও অর্থনৈতিক বিষয়টি জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। Capacity Payment-এর কাঠামো, চুক্তির শর্ত, বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রস্তুত সক্ষমতা এবং প্রকৃত ব্যয়ের বিষয়গুলো সাধারণ মানুষকে পরিষ্কারভাবে বোঝানো উচিত।
তবে একই সঙ্গে প্রতিটি চুক্তিতে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ, কর্মদক্ষতা এবং জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
৩. সময়মতো Energy Payment ও Fuel Payment নিশ্চিত করা
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখতে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেই হবে না; সময়মতো Energy Payment এবং Fuel Payment পরিশোধ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নিয়মিত চালু রাখতে হলে জ্বালানি সরবরাহকারী, বিদ্যুৎ উৎপাদক এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি নির্ভরযোগ্য আর্থিক চক্র তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে হতাশাজনক পরিস্থিতি হলো—বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত, কিন্তু জ্বালানি বা অর্থের সংকটে কেন্দ্রটি বসে আছে। বিশেষ করে শীতকালে যখন দেশে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যায়, তখন অব্যবহৃত উৎপাদন সক্ষমতাকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
দেশের চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থাকলে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের মাধ্যমে তা রপ্তানি করার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার বাড়বে, বিনিয়োগের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন উন্নত হবে এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে।
৪. স্থানীয় Spare Parts ও Backup Industry গড়ে তোলা
বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে বিদেশি যন্ত্রপাতি ও স্পেয়ার পার্টসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় O-Ring, Gasket, Seal, Filter, Valve, Electrical & Instrumentation Components এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব।
আমাদের খুলনা শিপইয়ার্ডে আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন ধরনের O-Ring উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে—কিন্তু এই ধরনের দেশীয় সক্ষমতার বিষয়টি আমরা অনেক সময় জানিই না।
সরকারের উচিত বিদ্যুৎ খাতকে একটি Strategic Industry হিসেবে বিবেচনা করে স্থানীয় Spare Parts Manufacturing Industry গড়ে তুলতে নীতিগত সহায়তা, প্রযুক্তিগত সহায়তা, অর্থায়ন এবং মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা।
এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে জরুরি মেরামতের সময় বিদেশ থেকে স্পেয়ার পার্টস আমদানির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না।
৫. শীতকালীন উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ রপ্তানির ব্যবস্থা করা
শীতকালে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কমে যায়। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকে।
এই অব্যবহৃত সক্ষমতাকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করার জন্য Cross-Border Power Trade এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড সংযোগ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত—
শুধু বিদ্যুৎ আমদানি নয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রপ্তানির সক্ষমতাও তৈরি করা।
বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় শুধু ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি নয়, বরং বাংলাদেশ থেকে ভারত, নেপাল ও অন্যান্য সম্ভাব্য আঞ্চলিক বাজারে বিদ্যুৎ রপ্তানির সুযোগ নিয়েও আলোচনা হওয়া উচিত।
অর্থাৎ আমাদের বিদ্যুৎ নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত—Import Dependency কমানো এবং Regional Power Trade-এ সক্রিয় অংশগ্রহণ করা।
৬. তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকর ব্যবহার এবং Eastern Refinery-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় গ্যাস, কয়লা, তরল জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অন্যান্য উৎসের মধ্যে একটি সুষম Energy Mix প্রয়োজন।
বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকরভাবে ব্যবহার করার জন্য জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের Eastern Refinery-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিভিন্ন ধরনের ক্রুড অয়েল বা প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করে দেশে পরিশোধন করার সক্ষমতা যত বাড়বে, ততই জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবিলা করা সহজ হবে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় নৌপথ ব্যবহার করে বৃহৎ পরিমাণ তরল জ্বালানি তুলনামূলকভাবে কম খরচে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করার সুযোগ রয়েছে। তাই Refinery Capacity + River Transportation + Strategic Fuel Storage—এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় চালানোর পরিবর্তে যখন গ্যাস বা অন্যান্য উৎসে ঘাটতি থাকবে অথবা সিস্টেমের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে প্রয়োজন হবে, তখন এগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ শুধু নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। বরং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি সেগুলোকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখার সক্ষমতা তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের বিদ্যুৎ নীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত—
জ্বালানি নিরাপত্তা + নির্ভরযোগ্য Supply Chain + সময়মতো Payment + স্থানীয় Spare Parts Industry + আধুনিক Grid Management + আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য + সুষম Energy Mix।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু “বিদ্যুৎ উৎপাদন করা” নয়; বরং “সাশ্রয়ী, নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আঞ্চলিক বাজারে রপ্তানি করা।”
একটি শক্তিশালী বিদ্যুৎ খাতই হতে পারে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।