26/08/2026
**ঢাকা ও লখনৌ: এক নবাবি ঐতিহ্য, দুই উত্তরসূরি দুই শহরের নবাবি দস্তরখানের ঐতিহাসিক আত্মীয়তা**
পুরান ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানি, কাবাব, কোরমা, নেহারি কিংবা শিরমাল খেতে গিয়ে কখনো কি মনে হয়েছে, লখনৌর নবাবি খাবারের সঙ্গে আমাদের খাবারের এত মিল কেন?
জাফরান, ঘি, কেওড়া, সুগন্ধি চাল এবং ধীর আঁচে রান্না করা মাংস। যেন একই পরিবারের দুই সন্তানের ভিন্ন স্বাদ! এই মিল শুধু কাকতালীয় নয়। এর পেছনে রয়েছে পারস্য ও মধ্য এশীয় প্রভাব, মোগল শাসন, নবাবি সংস্কৃতি এবং কয়েক শতাব্দীর স্থানীয় অভিযোজন।
**ঢাকায় নবাবি খাবারের বিকাশ**
১৬১০ সালে সুবাহদার ইসলাম খান ঢাকাকে মোগল বাংলার রাজধানী করেন। প্রশাসনের সঙ্গে ঢাকায় আসেন মোগল কর্মকর্তা, সৈন্য, অভিজাত পরিবার এবং তাঁদের বাবুর্চিরা। তাঁদের হাত ধরে বিরিয়ানি-পোলাও, কাবাব, কোরমা, কালিয়া, নেহারি, শিরমাল, বাকরখানি ও জর্দার মতো খাবার এবং নতুন রান্নার কৌশল ঢাকার খাদ্য সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে। তবে ঢাকা শুধু এসব খাবার গ্রহণ করেনি। বাংলার স্থানীয় উপকরণ ও রুচির সঙ্গে মিলিয়ে নিজের মতো করে গড়ে তুলেছে। এভাবেই তৈরি হয়েছে স্বতন্ত্র *ঢাকাইয়া নবাবি খাবারের ঘরানা*।
**অন্যদিকে আওধ ও লখনৌ**
মোগল সাম্রাজ্যের ক্ষমতা দুর্বল হতে শুরু করলে বহু দরবারি বাবুর্চি ও শিল্পী বিভিন্ন আঞ্চলিক নবাবি দরবারে আশ্রয় নেন। বিশেষ করে ১৮শ ও ১৯শ শতকে আওধের রাজধানী লখনৌ হয়ে ওঠে এক অসাধারণ রন্ধন সংস্কৃতির কেন্দ্র।
এখানে খাবারের স্বাদের পাশাপাশি সুবাস, কোমলতা, Texture এবং মসলার ভারসাম্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। পরিশীলিত হয় *দমপোক্ত* রান্নার পদ্ধতি, যেখানে পাত্র সিল করে দীর্ঘ সময় ধীর আঁচে খাবার রান্না করা হয়। এই ধারাতেই বিখ্যাত হয় ওঠে **লখনৌভি বিরিয়ানি | গালৌটি কাবাব | কাকোরি কাবাব | শামি কাবাব | কোরমা | নেহারি | শিরমাল | জর্দা**
**তাহলে ঢাকা ও লখনৌর এত মিল কেন?**
কারণ দুই শহরের খাদ্য সংস্কৃতির ঐতিহাসিক শিকড় অনেকটাই অভিন্ন : *পারস্য ও মধ্য এশীয় প্রভাব → মোগল রাজকীয় রান্না → আঞ্চলিক নবাবি দরবার → স্থানীয় অভিযোজন**| ঢাকা লখনৌর সরাসরি অনুকরণ নয়, আবার লখনৌও ঢাকার উৎস নয়। বরং দুটিই বৃহত্তর *Indo-Persian-Mughal Culinary radition-এর স্বতন্ত্র আঞ্চলিক প্রকাশ*।
**একই শিকড়, কিন্তু স্বাদ আলাদা**
লখনৌভি রান্না সাধারণত সূক্ষ্ম সুবাস, সংযত মসলা, মাংসের কোমলতা এবং Balanced Flavour-এর জন্য পরিচিত। অন্যদিকে ঢাকাইয়া নবাবি খাবার সময়ের সঙ্গে তুলনামূলক Richer, Bolder এবং Heavier Flavour তৈরি করেছে। এখানে ঘি, বেরেস্তা, মাংস, আলু, মসলা ও সুগন্ধির উপস্থিতি অনেক বেশি স্পষ্ট। তাই লখনৌভি বিরিয়ানি এবং ঢাকাইয়া কাচ্চি একই ঐতিহাসিক পরিবারের মনে হলেও, তারা এক খাবার নয়। **একটি আওধি পরিশীলন, অন্যটি ঢাকাইয়া অভিযোজন।**
**তারপর গল্পে আসে কলকাতা**
১৮৫৬ সালে ব্রিটিশরা আওধ দখল করার পর শেষ নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ কলকাতার মেটিয়াবুরুজে বসবাস শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে আসে দরবারি সংস্কৃতি, সংগীত এবং বাবুর্চিদের রন্ধনঐতিহ্য। বাংলার নতুন পরিবেশে সেই আওধি ঘরানা আবারও অভিযোজিত হয়। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে কলকাতা বিরিয়ানি, যার সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো আলু। তাই ঢাকা, লখনৌ ও কলকাতা একে অন্যের নকল নয়। তারা একই বৃহৎ রন্ধন ঐতিহ্যের তিনটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক শাখা।
একটি বিরিয়ানির হাঁড়ি তাই শুধু চাল ও মাংসের Combination নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সাম্রাজ্যের উত্থানপতন, মানুষের অভিবাসন,বাণিজ্য, রাজদরবার, এবং কয়েকশ বছরের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। হয়তো সেই কারণেই পুরান ঢাকার কাচ্চি খাওয়ার পর লখনৌর কাবাবের সামনে বসলে একেবারে অপরিচিত মনে হয় না।
**স্বাদ এক নয়। Recipe এক নয়। শহরও এক নয়।** তবু তাদের Culinary DNA-তে রয়ে গেছে এক পুরোনো ঐতিহাসিক আত্মীয়তা।**
#ঢাকা #লখনৌ #পুরানঢাকা #নবাবিখাবার #কাচ্চিবিরিয়ানি