18/07/2026
পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার তাঁতীবন্দ গ্রামে অবস্থিত তাঁতীবন্দ জমিদার বাড়ি, যা স্থানীয়ভাবে বিজয় বাবুর জমিদার বাড়ি নামে অধিক পরিচিত, বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়িগুলোর একটি। আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন নাটোর কালেক্টরেটের সেরেস্তাদার উপেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী এই জমিদার বংশের ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তাঁর বংশধর গুরু গোবিন্দ চৌধুরীর পুত্র জমিদার বিজয় গোবিন্দ চৌধুরীর শাসনামলে এই জমিদারির প্রভাব, প্রতিপত্তি ও সমৃদ্ধি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। তাঁর উদ্যোগেই প্রায় শতাধিক বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠে এই সুবিশাল রাজপ্রাসাদ, যার এক-তৃতীয়াংশজুড়ে ছিল দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা, রাজকীয় নাচঘর, পারিবারিক থিয়েটার, দুর্গা মন্দির এবং সুপেয় পানির জন্য একাধিক বড় দিঘি।
এই জমিদারবাড়ির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর বিলাসবহুল জীবনযাপন ও রাজকীয় আয়োজন। জমিদার বিজয় গোবিন্দ চৌধুরী বিনোদনের জন্য একাধিক হাতি পালন করতেন এবং প্রজাদের আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়মিত ‘হস্তী নাচ’-এর আয়োজন করতেন। তবে এসব হাতির রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল ব্যয় মেটাতে তিনি ‘হস্তী পোষনার্থী হাতি খরচ’, সংক্ষেপে ‘হাতি খরচ’ নামে একটি বিশেষ কর বা খাজনা চালু করেছিলেন। কঠোর প্রশাসক হলেও তিনি ছিলেন প্রজাদরদি ও অসাম্প্রদায়িক। খরা, বন্যা বা অনাবৃষ্টির কারণে ফসল নষ্ট হলে তিনি হিন্দু ও মুসলিম-উভয় সম্প্রদায়ের দরিদ্র প্রজাদের খাজনা সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিতেন।
তাঁতীবন্দ জমিদার বাড়ির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হলো প্রায় ২৫ বিঘা আবাসিক এলাকার ভেতরে নির্মিত দুটি সুউচ্চ ও কারুকার্যমণ্ডিত মঠ, যা আজও ‘বিজয় বাবুর মঠ’ নামে সমগ্র পাবনা জেলায় পরিচিত। কালের বিবর্তনে এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে মূল প্রাসাদের অধিকাংশ ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অট্টালিকার ছাদ ও দেয়ালজুড়ে জন্ম নিয়েছে বট ও পরজীবী গাছের শেকড়, আর লতাপাতায় ঢেকে গেছে একসময়কার ঐশ্বর্যময় প্রাসাদ।