30/01/2026
প্রায়ই দেখা যায়, কিছু অমুসলিম ইসলামকে আক্রমণ করতে গিয়ে অভিযোগ তোলে যে মুসলমানরাও নাকি মূর্তি পূজা করে। এই অভিযোগের পক্ষে তারা উদাহরণ হিসেবে হাজির করে কাবা ঘরের হাজরে আসওয়াদ—যাকে মুসলমানরা চুম্বন করে বা স্পর্শ করে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিষয়টি না বুঝে যারা এমন দাবি করে, তারা আসলে ইসলামের মূল আকিদা ও উপাসনার দর্শন সম্পর্কে চরম অজ্ঞতার পরিচয় দেয়।
ইসলামের ভিত্তি হলো তাওহিদ—আল্লাহ এক, তিনি নিরাকার, অদ্বিতীয় এবং তাঁর কোনো শরিক নেই। মুসলমানদের আকিদা অনুযায়ী কোনো পাথর, মূর্তি, মানুষ বা বস্তু সৃষ্টিকর্তা নয়, উপাস্য নয় এবং ক্ষমতার উৎসও নয়। হাজরে আসওয়াদও এর ব্যতিক্রম নয়। মুসলমানরা কখনোই বিশ্বাস করে না যে এই পাথর তাদের গুনাহ মাফ করতে পারে, দোয়া কবুল করতে পারে বা কোনো উপকার–অপকারের মালিক। সমস্ত ক্ষমতার একমাত্র অধিকারী আল্লাহ তাআলাই।
হাজরে আসওয়াদ চুম্বন বা স্পর্শ করা মুসলমানদের কাছে ইবাদত নয়, বরং এটি নবিজি মুহাম্মদ ﷺ–এর একটি সুন্নত। সুন্নতের অর্থ হলো—রাসূল ﷺ যেভাবে আমল করেছেন, ভালোবাসা ও আনুগত্যের কারণে তা অনুসরণ করা। এখানেই ইসলামের সঙ্গে মূর্তিপূজার মৌলিক পার্থক্য। মূর্তিপূজায় বস্তুটিকে উপাস্য মনে করে তার সামনে মাথা নত করা হয়, সাহায্য চাওয়া হয় এবং অলৌকিক ক্ষমতা আরোপ করা হয়। কিন্তু হাজরে আসওয়াদের ক্ষেত্রে এসবের একটিও নেই।
এই বিষয়ে সবচেয়ে শক্ত দলিল হলো হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)–এর সেই বিখ্যাত বক্তব্য। তিনি হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করার সময় প্রকাশ্যে বলেছিলেন—
“আমি জানি, তুমি শুধু একটি পাথর। তুমি কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারো না। আমি রাসূল ﷺ–কে তোমাকে চুম্বন করতে দেখেছি বলেই তোমাকে চুম্বন করছি।
এই বক্তব্য সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে এবং এটি ইসলামের আকিদাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। যদি হাজরে আসওয়াদকে উপাস্য মনে করা হতো, তবে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এমন কথা বলতেন না। এই একটি হাদিসই প্রমাণ করে দেয়—মুসলমানরা পাথর পূজা করে না, বরং নবিজি ﷺ–এর অনুসরণ করে।
আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো—ইসলামে নামাজ পড়ার সময় কাবার দিকে মুখ করা হলেও কাবাকে সিজদা করা হয় না। সিজদা করা হয় একমাত্র আল্লাহকে। কাবা নিজেই একটি দিকনির্দেশক কেন্দ্র, উপাস্য নয়। কাবার ভেতরে যদি কোনো মূর্তি রাখা হতো, তবে ইসলাম সেটাকে কখনোই সহ্য করত না—ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবিজি ﷺ মক্কা বিজয়ের দিন কাবা থেকে সব মূর্তি ভেঙে ফেলে শিরক নির্মূল করেছিলেন।
হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কে হাদিসে গুনাহ মাফের ফজিলত এসেছে, কিন্তু সেখানেও কোথাও বলা হয়নি যে পাথর নিজে গুনাহ মাফ করে। বরং আল্লাহ তাআলা তাঁর দয়ার কারণে কিছু আমলের সাথে সওয়াব ও ক্ষমা যুক্ত করেছেন। যেমন জমজমের পানি পান করা, আরাফার দিন, রমজান মাস—এসব সময় ও স্থানের বরকতও আল্লাহর দেওয়া, বস্তু বা সময়ের নিজস্ব ক্ষমতা নয়।
সুতরাং যারা হাজরে আসওয়াদকে দেখিয়ে মুসলমানদের মূর্তিপূজার অভিযোগ করে, তারা দুটি জিনিস গুলিয়ে ফেলে—উপাসনা আর আনুগত্য। মুসলমানরা পাথরকে সৃষ্টিকর্তা মনে করে না, বরং আল্লাহকেই একমাত্র রব ও মালিক হিসেবে বিশ্বাস করে। হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা আল্লাহর ইবাদত নয়, নবিজি ﷺ–এর সুন্নতের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ মাত্র।
অতএব ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার—মুসলমানদের আকিদা পাথরের উপর নয়, আল্লাহর উপর। কাবা ঘর, হাজরে আসওয়াদ কিংবা যে কোনো প্রতীক—সবই আল্লাহর নির্দেশ মানার অংশ, উপাস্যের বিকল্প নয়। এই মৌলিক পার্থক্য না বুঝে করা অভিযোগ আসলে যুক্তিহীন এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।