05/10/2025
শহরতলী — ২১ বছরের যাত্রা
সময় সবকিছু বয়ে নিয়ে যায়,
কিন্তু কিছু যাত্রা থেকে যায় অগনিত শ্রোতাদের মনে চিরস্থায়ী হয়ে—
যেখানে সুর হয়ে ওঠে স্মৃতি,
কথা হয়ে ওঠে প্রতিবাদ,
আর ভালোবাসা হয়ে ওঠে উত্তরাধিকার।
৬ই অক্টোবর, শহরতলীর ২১তম জন্মদিনে মুক্তি পাচ্ছে আমাদের তৃতীয় অ্যালবাম “এখন, এখানে…”।
ছয় বছরের নিরলস পরিশ্রম, অনেক চড়াই উৎরাই, নানান প্রতিবন্ধকতা ও স্বপ্ন আর সংগ্রামের পথ পেরিয়ে এই অ্যালবামটির শেষ গান “অপ্রলাপ” দিয়ে আমরা সম্পূর্ণ করছি আমাদের আরেকটি অধ্যায়।
★শুরুটা★
শহরতলীর গল্প শুরু ২০০৪ সালে—
কিছু গান, কিছু লিরিক, আর অদম্য এক তৃষ্ণা থেকে।
২০০৭ সালে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম—প্রথম গান “আসাদের খোলা চিঠি” রেকর্ড করব।
ভয়, অনিশ্চয়তা আর দোটানার মাঝেই গেলাম দেশের প্রক্ষাত শব্দ প্রকৌশলী জুয়েল মোরশেদ ভাইয়ের বাসায়। সেখানে প্রথম সাহস পেলাম।
কবিতা ছিল আসাদ চৌধুরী স্যারের। তাঁকে ভয়ে ভয়ে গান শুনালাম। গান শেষ করে তিনি কেবল হাসলেন, বললেন—
“আমি খুব খুশি হয়েছি যে তোমরা আমার সৃষ্টি কে ব্যান্ড সংগীতেরও অনন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছো ।” এক পর্যায়ে তার আবেগঘন কান্না দেখে সেদিনই আমরা শপথ নিলাম—
গান করব কেবল হৃদয়ের জায়গা থেকে, যা সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে দেশের সুধীজন ও বোদ্ধা শ্রেনীকেও সংযুক্ত করবে।
সেই থেকেই শুরু হলো বাংলাদেশের প্রথম থিয়েট্রিকাল রক ঘরানার যাত্রা।
★প্রথম অ্যালবাম — বরাবর শহরতলী (২০১০)★
নিদ্রাহীন রাত, অজস্র স্বপ্ন আর আবেগের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়েছিল এই অ্যালবাম।
তখন ছিলেন—
কণ্ঠে বজ্রধ্বনি গালিব,
গিটারে বিদ্যুৎ,
বেজ আর অনবদ্য লিরিকে তপন মাহমুদ এবং ড্রামসে সানি।
এই অ্যালবাম শুধু সঙ্গীত নয়—
এটা ছিল আমাদের অস্তিত্বের ঘোষণা।
এবং সেই ঘোষণা সাড়া ফেলে দিয়েছিলো দেশের সব শ্রেণীর শ্রোতার হৃদয়ে।
★দ্বিতীয় অ্যালবাম — অপর পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য (২০১২)★
শহরতলীর গান মানেই কবিতা, গল্প আর সংলাপের মিশ্রণ।
এই অ্যালবামে কীবোর্ডে ছিলেন রূপম,
আর আমাদের দীর্ঘদিনের সহযাত্রী সোহাগ—
যিনি কেবল গায়ক নন, গল্পকথক, কবি আর ভাবনার দিকনির্দেশক।
কিছুদিন গিটারে ছিলেন সুখন, এর পর দীর্ঘ সময়ের জন্য ছিলো সৌরভ।
এই অ্যালবামে পুরোনো সদস্যদের ভেতরে ছিলেন—
বেজে তপন মাহমুদ,
ড্রামসে সানি।
আর যার কথা না বললেই নয়, সে হচ্ছে আমার বন্ধু নিশাত, যার জন্য তৈরী করতে পেরেছিলাম আমাদের “গনজোয়ার” গানটি।
★দীর্ঘ বিরতি, নতুন শুরু★
তারপর এলো এক দীর্ঘ নীরবতা।
কিন্তু সেই নীরবতা কখনো আমাদের থামাতে পারেনি।
ছয় বছরের স্বপ্ন ও শ্রম শেষে,
আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি তৃতীয় এ্যালবাম “এখন, এখানে…”-এর সামনে।
এই যাত্রায় ছিলেন—
গিটারে সুমন, কিছুদিনের জন্য ঈমন ভাই ও মিয়াদাদ, তারপর ফাহিম।
আজ আমাদের সাথে আছেন—কীবোর্ডে সাদি,
বেজ গিটারে রাজীব ভাই (যিনি আমাদের শেষ অবধি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা),
আর ড্রামসে অনবদ্য রবী ভাই এবং শব্দ প্রকৌশলী হিসেবে আছেন মাহীম।
★কৃতজ্ঞতার আসন★
এই ২১ বছরের পথচলায় আমরা কৃতজ্ঞ অসংখ্য মানুষের কাছে।
🎶 সাউন্ডে—
অগণিত সময় দিয়ে আমাদের পথ দেখানো রাজু ভাই।
🎶 অর্কেস্ট্রেশনে—
আমার গুরু ফারসিম, যিনি “দেশমাতার কাছে চিঠি” গানটিকে এক মহাকাব্যে রূপ দিয়েছেন।
🎶 কীবোর্ডে—
প্রথম অ্যালবামে বাজানো মিঠু ভাই, যাঁর প্রতি আমাদের চিরকৃতজ্ঞতা।
🎶 গীতিকবিতায়—
আমাদের পথকে সমৃদ্ধ করেছেন রানা ভাই ও আসিক ভাই।
🎶 স্টুডিওতে—
২০১৯-এ “শহরতলীর আকাশ” রেকর্ড করা হয়েছিল সেতু ভাইয়ের স্টুডিওতে।
যা শেষ পর্যন্ত এই অ্যালবামের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
🎶 অটুট সাহসে—
শেষ তিনটি গান রেকর্ড করা সম্ভব হয়েছিল কেবল তাওকির (স্টুডিও চানাচুর)-এর কারণে।
★ভিজ্যুয়ালের মায়াজাল★
১. “বিষাদসিন্ধু” — হৃদয়ের শ্রমের ফসল আফজাল হোসেন মুন্না
২. “উপছায়া” — আলোর খেলা সত্তো দা
৩. “মুক্তি” — স্বাধীনতার ডাক মঞ্জুর মোরশেদ
৪. "তুমিহীন তোমার শহর"- আমাদের সবার পছন্দের বখতিয়ার ভাই।
৫. “আরেকটি প্রহর” ও “কবির মৃত্যু” — কল্পনার অনন্য ভিজ্যুয়াল হিশাম।
৬. সর্বদা কাছ থেকে ভালোবাসা দিয়ে যাওয়া হাসিব। যার সৃষ্টি "অসমাপ্ত", "অপ্রলাপ" এর মত গান।
★তপন মাহমুদ — শহরতলীর কথার কারিগর★
শহরতলীর সর্বাধিক গানের পেছনের নেপথ্য কবি তিনি।
তাঁর কলমে প্রতিবাদ রূপ নেয় সুরে,
বেদনা রূপ নেয় ছন্দে,
অভিমান রূপ নেয় মঞ্চের বজ্রধ্বনিতে।
আজ মানুষ শহরতলীকে যে কারণে ভালোবাসে,
যে কারণে আমাদের গান আলাদা করে চেনে—
তার অন্যতম কারিগর আমাদের তপন মাহমুদ।
তপনের লেখা শুধু লিরিক নয়—
এগুলো শহরতলীর আত্মার কণ্ঠস্বর,
আমাদের প্রজন্মের ব্যথা-বিসর্জনের দলিল,
আমাদের অস্তিত্বের পরিচয়।
তাঁর কথার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে শহরতলী পেয়েছে রূপ চিত্র।
তপন আমাদের কাছে কেবল একজন লিরিসিস্ট নন,
তিনি শহরতলীর মেরুদণ্ড—
আমাদের গানকে মানুষের মনের গভীরে পৌঁছে দেওয়ার অনন্য হাতিয়ার।
আমাদের আত্মার অংশ আরেকজন, যাকে শহরতলী কোনোদিন ভুলতে পারবে না—
আমাদের আজীবন ব্যান্ড ম্যানেজার শিফাত।
যিনি আমাদের শ্রোতাদের সাথে সরাসরি সংযোগের সেতু হয়ে আছেন, থাকবেন।
আরও স্মরণ করি সেই দিনটিকে,
যেদিন জুয়েল মোরশেদ ভাইয়ের স্টুডিওতে রেকর্ড হলো আমাদের প্রথম গান “আসাদের খোলা চিঠি”।
সেদিনই জন্ম নিল শহরতলী।
★আজকের শহরতলী★
২১ বছর পর শহরতলী কেবল একটি ব্যান্ড নয়—
এটি একটি পরিবার।
একটি স্মৃতি।
একটি সংগ্রাম।
একটি ভালোবাসা।
পুরোনোরা ধীরে ধীরে জায়গা করে দিচ্ছে নতুনদের জন্য।
যাতে শহরতলী সময়ের আহ্বানে,
নতুন শ্রোতার হৃদয়ে,
আরও নতুন করে পৌঁছে যেতে পারে।
যাদের নাম বললাম, যাদের কথা স্মরণ করলাম—
তাদের প্রতিটি অবদানেই আজ শহরতলী এখানে দাঁড়িয়ে।
শহরতলী আজও বিশ্বাস করে—
আমরা এক পরিবার।
★আর আমি★
আমি — মিশু খান।
শহরতলীর শুরু থেকে আজ অব্দি আছি কেবল আপনাদের ভালোবাসার টানে।
জীবনের অর্ধেকটা সময় আমি উৎসর্গ করেছি এই শহরতলীতে।
অসংখ্য দিন, রাত, ঘাম, কান্না, স্বপ্ন—সব কিছু ঢেলে দিয়েছি কেবল এক অনিঃশেষ ক্ষুধার জন্য:
নতুন সঙ্গীতের ক্ষুধা।
জানি না আর কতদিন পারবো…
কিন্তু এতটুকু জানি,
এই দেহে যতদিন প্রাণ আছে,
ততদিন গান করে যাবো।
কারণ সঙ্গীত ছাড়া আমার জীবন মানে—
একটা অন্তহীন শূন্যতা।
★শুরু থেকে ইচ্ছা★
যদি কোনোদিন আমার সুর থেমেও যায়,
শহরতলীর নাম যেন বেঁচে থাকে প্রতিটি শ্রোতার হৃদয়ে।
আমাদের এই যাত্রা কেবল কিছু গান নয়—
এটা একটি প্রজন্মের গল্প,
একটি সময়ের ইতিহাস,
একটি ভালোবাসার উত্তরাধিকার।
শহরতলী—এটাই আমার জীবন, এটাই আমার রক্ত, এটাই আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি।