04/11/2022
বই: দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধামুক্তি ও ইসলাম; স্বাভাবিক ও সংকটকালীন সময়ে করণীয়
লেখক: তানবীর হাসান বিন আব্দুর রফীক
পৃষ্ঠা: ৩২০
নির্ধারিত মূল্য: ১৫৫ টাকা
প্রকাশনী: পরিশুদ্ধি প্রকাশন
শর্ট পিডিএফ লিংক কমেন্ট এ
বইয়ের ভূমিকা থেকে
সমস্ত গুণগান সেই আল্লাহর তরে যিনি ক্ষুধায় আমাদের খানা খাইয়েছেন এবং ভয় থেকে নিরাপদ রেখেছেন। সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক সেই প্রিয় নবীর ওপর- মহান রবের দরবারে যাঁর দু’আ ছিলো—
اللهُمَّ اجْعَلْ رِزْقَ آلِ مُحَمَّدٍ قُوتًا
“হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পরিবারবর্গকে রিযিকস্বরূপ (নূন্যতম) খোরাকী দিন।”
তাঁর আপনজন ও সহচরগণের ওপরও সলাত ও সালাম, যাদের বীরত্বগাথা স্মরণ করিয়ে কবি নজরুল গেয়ে উঠেছেন-
“শুকনো রুটিরে সম্বল করে // যে ইমান আর যে প্রাণের জোরে
ফিরেছে জগৎ মন্থন করে// সে শক্তি আজ ফিরিয়ে আন।”
‘দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধামুক্তি ও ইসলাম; স্বাভাবিক ও সংকটকালীন সময়ে করণীয়’ এই বই লেখায় হাত দেয়ার পেছনে প্রধানতম দু’টি কারণ:
প্রথমত, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবের একটি পথ অনুষন্ধান করা। ইসলাম চায় না সামান্য বোবা প্রাণীও ক্ষুধার্ত থাকুক। যারা অভাবীদের খানা খাওয়াতে উৎসাহটুকুও দেয় না মহান আল্লাহ ঐ সমস্ত নির্দয় প্রাণের নিন্দা করেছেন। কুরআন একে চিহ্নিত করেছে বিচার দিবসকে মিথ্যারোপকারীদের গুণ হিসেবে। মহান আল্লাহর বাণী-
أَرَأَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ (1) فَذَلِكَ الَّذِي يَدُعُّ الْيَتِيمَ (2) وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ
“তুমি কি তাকে দেখেছো, যে বিচার দিবসকে মিথ্যারোপ করে? এ তো সে-ই, যে ইয়াতীমকে ধাক্কা দেয়। আর মিসকীনদের খাবার দিতে উৎসাহ দেয় না।”
আমরা খাওয়ানোর দলে থাকতে না পারলেও উৎসাহদাতাদের দলে হলেও যেন থাকি।
দ্বিতীয়ত, ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা, ইসলামই কেন আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দীন সে বিষয়টি স্পষ্ট করা। মহান আল্লাহর বাণী-
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”
ইসলামের সমালোচকদের একটি জনপ্রিয় প্রশ্ন হচ্ছে ইসলাম যদি পরিপূর্ণ দীন হয়, তাহলে পৃথিবীতে এতো এতো সমস্যা, নতুন উদ্ভাবিত কতো হাজারো সমস্যা- ইসলাম এগুলোকে কিভাবে মোকাবেলা করে? যদিও আমি একটি সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি কিন্তু দেখাতে চেষ্টা করেছি যে, ইসলাম একটি সমস্যাকে কতো দিক দিয়ে সমাধান করে, ইসলাম শুধুমাত্র সমস্যার সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং সমস্যাসৃষ্টির সমস্ত প্রবেশপথকে ইসলাম বন্ধ করে দিয়েছে। এজন্যই ইসলামের অবস্থান সবার উপরে। মহান রবের ঘোষণা-
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
“তিনিই সে সত্তা যিনি তাঁর রসূলকে হিদায়াত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, যেন তিনি সমস্ত দীনের উপর একে বিজয়ী করেন, যদিও মুশরিকরা অপছন্দ করে।”
দুর্ভিক্ষের আলামত দেখা দিলে পরিকল্পনার ছঁক তৈরি করা এটি নবী ইউসুফ আলাইহিস সালামের সুন্নাহ। আমি নিজেকে খুবই ক্ষুদ্র এবং নিজের জ্ঞানকে খুবই সীমিত বলে জ্ঞান করি, আমি শুধুমাত্র কুরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি রূপরেখা তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। তবে কাজটি শুরু করার আগে আমি ইসতিখারা করেছিলাম এবং বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম। নানাবিধ সংকটকে ঘিরে আমাদের ইমামগণের মধ্যে বই রচনার রেওয়াজ রয়েছে, যেমন মহামারীকে ঘিরে ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘বাযলুল মা’উন ফী ফাযলিত ত্ব’উন’, অর্থাৎ, ‘মহামারীর মর্যাদা বর্ণনায় ক্ষুদ্র প্রয়াস’। আমিও বলবো আমি নগণ্যের এই বইটুকু মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস। দুর্ভিক্ষের ওপর স্বতন্ত্র কোনো বই ইতোপূর্বে আমাদের সম্মানিত কোনো ইমাম রচনা করেছেন কিনা আমার জানা নেই। আমি কারূনের মতো বলতে চাই না যে-
إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي
“এ তো আমি আমার জ্ঞানবলে পেয়েছি।”
বরং আমি নবী সুলাইমান আলাইহিস সালামের সভাসদে উপস্থিত কিতাবের জ্ঞানপ্রাপ্ত ব্যক্তির মতো বলতে চাই-
هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ وَمَنْ شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ
“এ আমার রবের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞ হই নাকি হই অকৃতজ্ঞ। আর যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো নিজের (কল্যাণের) জন্যেই কৃতজ্ঞ হয়, আর যে অকৃতজ্ঞ হয় (সে জেনে রাখুক) নিশ্চয়ই আমার রব অভাবমুক্ত, মহানুভব।”
দুর্ভিক্ষ নামটি হারিয়ে গেলে কি বইটির আবেদন কমে যাবে? বইটিকে একপেশেভাবে দুর্ভিক্ষের বই ভেবে নিলে বিরাট ভুল হবে। কেননা ইসলামের যে সমাধানগুলো আমি তুলে ধরেছি সেগুলো একজন মুসলিমের জীবনে সব সময়ের জন্য অনুসরণীয়, সর্বোচ্চ বইয়ের ৫% আলোচনাকে শুধুমাত্র দুর্ভিক্ষের সময়েই করণীয় বলে গণ্য করা যেতে পারে। সাধারণ ব্যক্তি পর্যায়ের যে ক্ষুধাসমস্যা বা খাদ্য সংকট ইসলাম এটাকে কিভাবে মোকাবেলা করে সেটি জানতে হলেও বইটি পড়া উচিত। এই ক্ষুধা যখন চরম আকার ধারণ করে সেটিকেই আমরা দুর্ভিক্ষ বলছি। তাছাড়া স্বাভাবিক সময়ে একটি দেশের অর্থনীতি ঠিক কিভাবে চলবে, কিভাবে চললে রাস্ট্রকে কোনো সংকটের মুখোমুখী হতে হবে না- সেটি জানার জন্য হলেও বইটি পড়া উচিত। বাজারে দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতির মতো পরিস্থিতি কেন তৈরি হয় সেটি জানার জন্য হলেও বইটি পড়া উচিত।
বইয়ের কাজে হাত দেয়ার পূর্বেই কিছু মানুষের সাথে পরামর্শ করেছিলাম। তাঁদের মধ্যে প্রিয় শাইখ সাঈদুর রহমান (Sayedur Rahman) পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে সাহস যুগিয়েছেন, প্রিয় ভাই খোন্দকার সাহিল রিদওয়ান (Khandkar Sahil Ridwan) এবং প্রিয় ভাই দীন মুহাম্মাদ শেখের (Din Muhammad Sheikh) নামও তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন শব্দ/বাক্য জটিল বলে মনে হলে উস্তাদ আব্দুল্লাহ মজুমদার (Abdullah Mojumder) ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং সহযোগিতা পেয়েছি। এছাড়া একটি বিশেষ মাসয়ালার ফতোয়া খুঁজতে গিয়ে প্রিয় সহপ্রশিক্ষণার্থী প্রিয় ভাই মাওলানা মিফতাহুল ইসলামের (Miftahul Islam) সহযোগিতা পেয়েছিলাম। এ দু’জনের ভূমিকা ভোলার নয়। বইটি পড়ে নানাভাবে পরামর্শ দিয়েছেন প্রিয় ভাই আবূ সুফিয়ান সূফি (Md Abu Sufian Sufi) এবং প্রিয় উস্তাদ খোন্দকার সালাহউদ্দীন Khandakar Salahuddin ভাই। সালাহউদ্দীন ভাই বইটি আদ্যপ্রান্ত পড়েছেন বলে জানিয়েছেন। প্রিয় শাইখ সাইফুল্লাহ আল মামুন আল-মাদানী (Saifullah Al Mamun) ভয়েস ম্যাসেজে প্রেরণা যুগিয়েছেন এবং সাথে দু’আ দিয়েছেন। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন আমার প্রিয় প্রচ্ছদকার ভাই বায়েজীদ আহমেদ মীকা (Bayazid Ahmed Micka)। মহান রব সকলকে কবুল করে নিন এবং প্রত্যেককে প্রত্যেকের উত্তম জাযা দান করুন!
মানুষের বলা বা লেখায় ভুল হওয়াটা অতি স্বাভাবিক। যদি কোনো ধরনের ভুলত্রুটি আল্লাহর কোনো বান্দার চোখে পড়ে তাহলে তা জানানোর অনুরোধ। আমি তাঁর জন্য অগ্রীম দু’আ করছি— আল্লাহ যেন তাঁকে দুনিয়া ও আখিরাতে তীব্র ক্ষুধার যন্ত্রণা হতে হিফাযত করে রাখেন।
পরিশেষে আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দু’আ করছি— তিনি যেন এ গ্রন্থের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে একে কবুল করে নেন এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ক্ষমা করে দেন। মহান আল্লাহ যেন এর লেখক, লেখকের পিতা-মাতা, লেখকের স্ত্রী-সন্তানাদি, সকল পাঠক এবং বই সংশ্লিষ্ট সকলকে নাজাত দিয়ে দেন। আমীন!
সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিজন ও সহচরগণের ওপর।