09/08/2026
মানুষের বিস্মৃতির চেয়ে অদ্ভুত আর কোনো দর্শন নেই।
সে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে জীবনের হিসাব করে—কত টাকা আছে, কী খাবে, কোথায় যাবে, কার কাছে নিজের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করবে। অথচ যে অদৃশ্য করুণার ওপর তার সমস্ত হিসাব দাঁড়িয়ে আছে, তার কথা মনে করার জন্য সে দিনের সামান্য কয়েকটি মুহূর্তও অনেক সময় খুঁজে পায় না।
যিনি আমাদের প্রার্থনার আগেই রিজিকের দরজা খুলে দেন, আমরা তাঁর স্মরণে পাঁচবার দাঁড়াতেও অলস হই। যিনি আমাদের মুখে শব্দ আসার আগেই আমাদের প্রয়োজন জানেন, তাঁর কাছেই ফিরে যেতে আমাদের কত অজুহাত! অথচ তিনি আমাদের কোনো অজুহাতের অপেক্ষায় থাকেন না। আমরা ঘুমিয়ে থাকি—তিনি আমাদের নিঃশ্বাস চালিয়ে দেন। আমরা ভুলে যাই—তিনি আমাদের রিজিকের পথ বন্ধ করেন না। আমরা তাঁর কথা মনে না রেখেও তাঁর দয়া থেকে বঞ্চিত হই না।
এইখানেই মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর রহস্য।
মানুষ মনে করে সে নিজের জীবন নিজেই বহন করছে। অথচ তার প্রতিটি নিঃশ্বাস প্রমাণ করে—সে নিজেকে বহন করছে না; তাকে বহন করা হচ্ছে।
একবার ভাবো, শেষবার তুমি কখন নিজের নিঃশ্বাসের জন্য কৃতজ্ঞ হয়েছিলে? কখন ভেবেছিলে—এই বাতাসটি আমি উপার্জন করিনি, তবু আমাকে দেওয়া হয়েছে। এই হৃদস্পন্দনের জন্য কোনো মূল্য দিইনি, তবু তা চলছে। আজকের রিজিকের জন্য হয়তো আমি পরিশ্রম করেছি, কিন্তু সেই পরিশ্রম করার শক্তিটুকু কোথা থেকে পেলাম—এই প্রশ্নটি মানুষ খুব কমই করে।
দর্শনের প্রথম শিক্ষা হলো প্রশ্ন করা। আর আত্মার প্রথম শিক্ষা হলো—নিজেকে প্রশ্ন করা।
আমি যদি আমার প্রাপ্তির মালিক হই, তবে আমার জন্মের সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল? আমি যদি আমার জীবনের নিয়ন্ত্রক হই, তবে ঘুমের মধ্যে আমার হৃদয় কে চালায়? আমি যদি আমার রিজিকের স্রষ্টা হই, তবে এমন কত রিজিক আছে যা আমি চাওয়ার আগেই আমার দরজায় এসে পৌঁছেছে?
মানুষের অহংকার এখানেই ভেঙে যায়।
আমরা অনেক সময় সৃষ্টিকে ভালোবাসতে গিয়ে স্রষ্টাকে ভুলে যাই। রিজিকের দিকে তাকিয়ে রিজিকদাতাকে ভুলে যাই। নিঃশ্বাসকে স্বাভাবিক মনে করি, অথচ বুঝি না—যে জিনিসটি প্রতিদিন বিনামূল্যে পাওয়া যায়, তার মূল্যই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি।
তাই নামাজ কেবল কিছু শারীরিক অঙ্গভঙ্গির নাম নয়; এটি মানুষের অহংকারের বিরুদ্ধে তার নিজের আত্মার সাক্ষ্য। দিনে পাঁচবার মানুষ যেন নিজেকে বলে—“আমি একা নই, আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ নই, আমার যা কিছু আছে, তার সবকিছুর পেছনে আমার চেয়েও বড় এক দাতা আছেন।”
আর আশ্চর্যের বিষয়—যাঁর কাছে ফিরে যেতে আমাদের কয়েক মুহূর্ত লাগে, তিনি আমাদের জন্য দিন-রাত অপেক্ষা না করেই দয়া বর্ষণ করেন।
মানুষ যদি একদিন তার প্রাপ্তির তালিকা না করে, বরং তার প্রাপ্তির দাতার কথা চিন্তা করে, তবে সে বুঝবে—তার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ঘরে নেই, ব্যাংকে নেই, পৃথিবীর কোনো বাজারেও নেই।
তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো—সে এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছে, এখনো ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে।
কারণ দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনুতাপের কোনো দর্শন মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারে না।
তাই যে মানুষ দিনে পাঁচবার সিজদায় মাথা রাখে, সে কেবল একজন ধর্মীয় মানুষ নয়; সে নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করা একজন মানুষ। আর যে মানুষ বারবার ভুলে যায়, তার জন্যও দরজা খোলা থাকে—কারণ স্রষ্টার দয়া মানুষের স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়।
মানুষ ভুলে যায়।
তিনি ভুলে যান না।
মানুষ চাওয়ার পরও দেরি করে।
তিনি চাওয়ার আগেই দিয়ে দেন।
আর হয়তো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই—
যাঁর দয়া ছাড়া একটি নিঃশ্বাসও সম্ভব নয়, তাঁর স্মরণকে জীবনের সবচেয়ে ছোট কাজ মনে করা—মানুষের সবচেয়ে বড় বিস্মৃতি।
লেখক আরফান সাদিক হিমু