01/06/2026
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে...” — জীবনানন্দ দাশের এই পঙ্ক্তি শুধু কবিতার নয়, যেন এক অন্তহীন মানুষের ভেতরকার যাত্রারও ভাষা। আর সেই ভাষাকেই পর্দায় এক অন্যরকম আবহে ফুটিয়ে তুলেছেন মাসুদ হাসান উজ্জ্বল তাঁর বনলতা সেন চলচ্চিত্রে।
খায়রুল বাশারের অভিনয়ে এক ধরনের নীরব বিষণ্নতা আছে, যা চিৎকার করে না, অথচ দর্শকের মনে ধীরে ধীরে জমে থাকে। তাঁর চোখের ভাষা অনেক সময় সংলাপের চেয়েও বেশি কথা বলে। আর বনলতা যেন এখানে শুধু একজন নারী নয়— সে ক্লান্ত মানুষের আশ্রয়, হারিয়ে যাওয়া সময়ের গন্ধ, কিংবা বহুদিনের পথচলার শেষে পাওয়া এক চিলতে শান্তি।
এই সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এটি গল্প বলার চেয়ে অনুভূতি তৈরি করতে বেশি আগ্রহী। অনেক দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, যেন জীবনানন্দের কবিতার কোনো হারিয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আলো-আঁধারি, নিস্তব্ধতা, মানুষের একাকীত্ব— সবকিছু মিলে চলচ্চিত্রটি এক ধরনের কাব্যিক বিষাদের জন্ম দেয়।
বর্তমান সময়ে যখন অধিকাংশ সিনেমা দর্শককে চমকে দিতে ব্যস্ত, বনলতা সেন সেখানে দর্শককে থামিয়ে দেয়। ভাবতে শেখায়। অনুভব করতে শেখায়। এ যেন দ্রুতগতির পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ।
সিনেমা শেষ হওয়ার পরও এর রেশ থেকে যায়। মনে হয়, আমরা সবাই হয়তো কোনো না কোনো বনলতা সেনকে খুঁজে বেড়াচ্ছি— যে আমাদের সমস্ত ক্লান্তি, ব্যর্থতা আর দীর্ঘ পথচলার শেষে দু’দণ্ড শান্তি দেবে।
বাংলা চলচ্চিত্রে এমন কাব্যময় নির্মাণ খুব বেশি আসে না। সেই কারণেই বনলতা সেন শুধু একটি সিনেমা নয়, বরং এক অনুভূতির নাম।
“সব পাখি ঘরে আসে, সব নদী— ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।”
দীর্ঘদিন পর এমন একটি চলচ্চিত্র দেখলাম, যেটি শেষ হওয়ার পরও মনের ভেতর নীরবে চলতে থাকে।
Masud Hasan Ujjal