14/08/2026
মাত্র ৩ বছর বয়সে হারিয়েছিলেন দৃষ্টিশক্তি......🙂
এই মানুষটির নাম দর্পণ ইনানি, মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি Stevens–Johnson syndrome-এ আক্রান্ত হন এবং সম্পূর্ণভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান। পরবর্তী সময়ে তাঁর চোখে বহু অস্ত্রোপচারও করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে আসেনি।
অনেক পরিবার হয়তো তখন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেঙে পড়ত। কিন্তু দর্পণের বাবা-মা সতীশ ইনানি ও বিমলা ইনানি অন্য সিদ্ধান্ত নিলেন।
তাঁরা দর্পণকে আলাদা করে রাখতে চাননি। বরং তাঁকে সাধারণ শিশুদের মতোই বড় করতে চেয়েছেন।
দর্পণ ভর্তি হলেন একটি সাধারণ স্কুলে, Baroda High School, Alkapuri-তে। সেখানে তিনি ছিলেন স্কুলের একমাত্র দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। বই পড়ার জন্য তখন পর্যাপ্ত অডিওবুক বা ই-বুকও ছিলো না। তাঁর বাবা-মা অনেক সময় বইয়ের লেখা টাইপ করে দিতেন, যাতে তিনি screen-reading software ব্যবহার করে পড়তে পারেন।
আর আশ্চর্যের বিষয় হলো৷ দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও পড়াশোনায় তিনি ছিলেন অসাধারণ।🖤
দর্পন নিয়মিত ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর পেতেন এবং ক্লাসের সেরা তিনজনের মধ্যে থাকতেন। দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় তাঁর ফল ছিল ৯৯.৭৫ শতাংশ। পরে তিনি ভাদোদরার Maharaja Sayajirao University থেকে B.Com সম্পন্ন করেন।
২০১৫ সালে তিনি ভারতের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক CAT পরীক্ষায়ও অংশ নেন। বেশ কয়েকটি IIM থেকে ডাক পান এবং IIM Lucknow-এ MBA করার সুযোগও পেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি MBA না করে Chartered Accountancy (CA) এবং দাবাকে নিজের পেশাগত জীবনের কেন্দ্রে রাখেন।
দর্পণ বিভিন্ন খেলায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৩ বছর বয়সের দিকে দাবার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়।
দাবা তাঁর কাছে শুধু একটি খেলা ছিল না এটি হয়ে ওঠে এমন একটি জায়গা, যেখানে চোখে দেখা নয়, মস্তিষ্ক দিয়ে দেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি দৃষ্টিসম্পন্ন খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধেও খেলেছেন এবং গুজরাটের হয়ে U-13, U-15 ও U-17 পর্যায়ের জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন।🖤
২০১০ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী National Blind Chess Champion হন। এই রেকর্ডটি দীর্ঘদিন ধরে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত ছিলো।
এরপর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর যাত্রা আরও শক্তিশালী হয়।
২০১৩ সালে Serbia-তে World Junior Blind Chess Championship-এ তিনি ব্রোঞ্জ পদক জেতেন। এটি ছিল ভারতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
২০১৮ সালে ফ্রান্সের Creon Open Chess Tournament-এ তিনি তাঁর rating category-তে প্রথম হন। বিশেষ ব্যাপার হলো, এটি ছিল দৃষ্টিসম্পন্ন খেলোয়াড়দের জন্য উন্মুক্ত একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। অর্থাৎ সেখানে তিনি শুধু অন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী খেলোয়াড়ের সঙ্গে নয়, সাধারণ খেলোয়াড়দের সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
২০২১ সালে Greece-এ অনুষ্ঠিত 16th IBCA World Chess Olympiad for Visually Impaired-এ তিনি নিজের বোর্ডে ব্রোঞ্জ পদক জেতেন।
তাঁর ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ FIDE rating ছিল 2135, যা ভারতের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দাবাড়ুদের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক উচ্চতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।🖤
কিন্তু সবচেয়ে বড় অধ্যায় আসে ২০২৩ সালে।
চীনের হাংঝুতে অনুষ্ঠিত Asian Para Games 2023-এ দর্পণ ইনানি ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
পুরুষদের Individual Rapid VI-B1 Chess বিভাগে তিনি জেতেন স্বর্ণপদক।
এখানেই শেষ নয়.......🤭
তিনি Team Rapid VI-B1 বিভাগেও ভারতের হয়ে স্বর্ণপদক জেতেন।
অর্থাৎ একই আসরে তাঁর ঝুলিতে আসে দুটি স্বর্ণপদক। Asian Para Games-এর অফিসিয়াল ফলাফলেও Individual Rapid VI-B1-এ Darpan Satish Inani-কে প্রথম ও স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এই সাফল্যের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তাঁকে অভিনন্দন জানান।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো, দর্পণ শুধু একজন দাবাড়ুই নন, তিনি একজন Qualified Chartered Accountant-ও। অর্থাৎ যে মানুষটি দাবার বোর্ডে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তিনিই একই সঙ্গে হিসাববিজ্ঞানের কঠিন পেশাগত পরীক্ষাতেও সফল হয়েছেন।
দর্পণ ইনানির জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। তিনি নিজেই বলেছেন,
“It’s all about vision and not visibility.”
অর্থাৎ সফল হওয়ার জন্য চোখে দেখা সবকিছু নয়; আসল বিষয় হলো আপনার দৃষ্টিভঙ্গি, লক্ষ্য এবং মানসিক শক্তি।
আর তাঁর বাবার একটি কথাও তিনি বহুবার স্মরণ করেছেন,
“যতক্ষণ না জিতছ, ততক্ষণ লড়াই শেষ হয়নি।”
এই কথাটাই যেন দর্পনের জীবনের দর্শন হয়ে গেছে।
দর্পণের জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘Algorithms’ নামের একটি ডকুমেন্টারি, যেখানে ভারতের blind chess-এর জগত এবং দর্পণসহ কয়েকজন তরুণ দাবাড়ুর জীবন ও সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।
এমনকি তাঁর জীবনকাহিনি নিয়ে HDFC Life-এর ‘Bounce Back’ বিজ্ঞাপনও তৈরি হয়েছিল। সেখানে প্রতিকূলতার কাছে হার না মানা দর্পণের গল্পই তুলে ধরা হয়।
চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখা যায়, কিন্তু স্বপ্ন দেখতে লাগে অন্য কিছু।লাগে সাহস।লাগে অধ্যবসায়।লাগে এমন একটা মানসিকতা, যে আমি পারব-ই।”
দর্পণ ইনানির চোখে হয়তো পৃথিবীর আলো নেই, কিন্তু তাঁর মনের দৃষ্টিটা এতটাই পরিষ্কার যে, তিনি ৬৪ ঘরের একটি দাবার বোর্ড থেকেই নিজের জন্য পুরো পৃথিবী জয় করে নিয়েছেন।
চোখে নয়, স্বপ্নে আলো থাকলেই মানুষ অনেক দূর যেতে পারে।🖤