24/05/2026
ভোর রাত্রি বা ফজরের নামাজের সময় নিয়ে গাইলেন : ‘শোন শোন মুসলমান শোন দিয়া মন, ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম । প্রার্থনায় তাঁর হওরে নত, তাঁরই হুকুম পালন করো । আল্লাহু আকবার, আল্লাহু’...
কিছুটা হাতাশায় পুড়ে, দুপুরে গাইলেন : ‘দুপুর বেলার আলসেমিতে, পুরনো দিনের ভাবনা এলে, তুখোড় কোন গল্পের ফাঁকে, মনে পড়ে গেলে এই আমাকে। পত্র দিও । নিজের প্রতি যত্ন নিও’ । ঢেলে দিলেন সবটুকু সুর, শক্তি আর আবেগ...
দিনের শেষে, চরম অপেক্ষায় থাকা একজন প্রেমিকের হয়ে, ঠিক সন্ধ্যার জন্য গাইলেন : ‘সাঁঝের বেলায়, প্রাণের ভেলায়, পারিস যদি আসি । আলো ছায়ায়, প্রেমের মায়ায়, একটু পাশে বসিস । ভালোবাসিস বন্ধু, দিবানিশি, অন্তরেতে রাখিস’ । সন্ধ্যার জন্য আরও গাইলেন ‘সাঁঝের কবি’...
ভোর, দুপুর, সন্ধ্যা পেরিয়ে আসে রাত। রাত কে উল্লেখ করে অনেক গায়কই গান করেছেন । জেমস ও করেছেন। রাত কে উল্লেখ করে কয়েকটা গান রয়েছে জেমসের...
একজন সব হারা প্রেমিকের রাতে, সঙ্গী হয়ে বাজে : ‘খুব নিশিতে, কষ্ট হলে, তুমি বন্ধু চাঁদের কোলে মাথা রেখো। তবু যদি কষ্টে থাকো। তবে বন্ধু তারার চোখে চোখ রেখো। কষ্ট রেখোনা বন্ধু তুমি বুকের মাঝে, কষ্ট রেখোনা বন্ধু তুমি চোখের মাঝে ; কষ্টগুলো পাঠিয়ে দিও বন্ধু আমার কাছে’ অথবা খুব বেশি রোমান্টিক হলে সঙ্গী হয়, ‘এমনো নিশি রাতে, তুমি এসেছো, বসেছো মোর পাশে । মন আমার আনচান আনচান করে। আ বন্ধু ঠিক আছে...
এমন অনেক সময়মুখী, জীবনমুখী, কালজয়ী গান গেয়েছেন জেমস। তাঁর নিরানব্বই শতাংশ গানই, কোন না কোন বিশেষ বিষয় নিয়ে গাওয়া আর এজন্যই তিনি সবার থেকে আলাদা। আর এতো দিনেও তিনি নতুনের মতো। লোকে বলেছে বলুক অপসংস্কৃতি। কিন্তু আমি বলি, জেমসের গানেই বাংলার সংস্কৃতি হাসে এবং বাঁচে । বাংলার লাঠিয়াল, হা ডু ডু, বেদুঈন, ফিরে আসবো বাংলায়, বায়স্কোপের খেলা, হারা গাছের নুরজাহান গানগুলো তো বাংলাকেই পরিচয় করিয়ে দেয় ।
গীটার, ড্রামস্ আর বাবরি চুল নিয়ে কখনো কি কেউ ভেবেছিলো সেই গ্রামের মলম বিক্রেতা ‘মান্নান মিয়াঁর’ কথা। ‘প্রতি রবিবার তেবারিয়ার হাটে, তেবারিয়ার হাটে তেঁতুল তলায়। পঁচিশ বছর ধরে এক জায়গায় বসে, হৃদয়ের ক্ষত আছে যার যতো, মালিশে ঢেকে দেয় রক্ত ক্ষরণ, দিয়ে গেছে উপসম সারাটাজীবন ; মান্নান মিয়াঁর তিতাস মলম’ । আহা...
রিকশা ওয়ালার জন্য গাইলেন : ‘সারা গা ভেজা নোনা ঘামে, তবু পথ চলা নাহি থামে। তিনটি চাকা, লেখা ঠিকানা, পিচঢালা পথ বড় চেনা। শুধু বিশ্রাম মেলেনা রিকশা ওয়ালা। চাকা না চললে কাটবে উপোস বেলা। রিকশা ওয়ালা’ ।
দেশের নোংরা রাজনীতি নিয়ে গাইলেন : ‘রাজনীতির খোলস যে আমার। সাধনা ক্ষমতায় যাওয়ার। জনগণ চেনে না আমায়। ভন্ডপীরের তাবিজ আছে গায়। এই সমাজের ভন্ডামি। শুধুই জানি আমি ভন্ডামি’। নোংরা রাজনীতি নিয়ে আরও গাইলেন, ‘বোমা মোফিজ’, ‘পেশাদার খুনি’...
পিয়ানো অ্যালবামের ‘বাংলাদেশ’ গানটাকে বলা হয়, বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সঙ্গীত। ‘হাউজি’ গানে আছে বাংলাদেশে সংস্কৃতি, তাশ খেলা, ফাইভ এন্ড টু [৫২ ভাষা আন্দোলন], দিবসটি মহান টুন এন্ড ওয়ান, টয়েন্টি ওয়ান [একুশে ফেব্রুয়ারী]। বরিশালের ভাষায় তুই আর মুই, নাব্বার দুই। এমন অনেক অনেক কথা ।
বাবা এবং মা’কে নিয়ে বাংলায় যতো গান আছে, সেগুলোর মধ্যে জেমসের গাওয়া গান দুটি অতুলনীয়।
স্কুল জীবনের স্যারকে নিয়ে গাইলেন : ‘মানুষের ও যে আকাশের মতো হৃদয় থাকতে পারে, তাঁকে না দেখলে হয়তো আমার জানাই হতো না। রূপকথার ও বাইরে যে এক বিশাল জগৎ আছে, তাঁর কাছে না শুনলে হয়তো শোনাই হতো। আজকে আমার এই পৃথিবীর অনেক কিছু চেনা, ব্লাকবোর্ডের ওই কালো আকাশ আমায় এনে দে না। এনে দে না বয়সাটা সেই ছয় কিংবা সাত, হয়তো তবে ফিরে পেতাম স্যারের কোমল হাত। সালাম জানাই সহস্রবার আমার তিনি গুরু। তাঁর কাছেই হয়েছিলো শিক্ষা যে মোর শুরু’ । আহা গান, একজন বিখ্যাত রকস্টার হয়েও স্যারের কথা ক’জন ছাত্রই বা এভাবে বলতে পারে...
জীবনের সেরা সময় কাটানো সেই প্রিয় আজিজ বোর্ডিংকে ও ভুলেননি।
এই সমাজের মুখোশপরা বন্ধুদের নিয়েই তিনি গাইলেন : ‘আজকে যাকে বন্ধু ভাবিস, সে কখন শত্রু হয়। বন্ধু চেনা, শত্রু চেনার আছে কি কোন উপায়? কার কাছে তুই করবি নালিশ? বল্ কার খেয়ালে বসবে শালিস’ ? শেষে পরোপারের হিসাব নিকাশের কথাও স্বরণ করিয়ে দেয় গানে গানে। মুখোশ পরা বন্ধুদের জন্য আরও গেয়েছেন : ‘চিনে গেছি আমি কে যে দোস্ত, কে যে দুশমন’ ।
গার্মেন্টসে কাজ করা অসহায়, দরিদ্র মেয়েদের নাম দিলেন ‘সেলাই দিদিমণি’ । জানতে চাইলেন ‘কার লাগিয়া ছলোছলো কাজল দুটি আঁখি ? কেউকি তোমায় কথা দিয়ে কথা রাখেনি’ ?
বৈশাখ এলেই বেজে ওঠে : ‘এবার বৈশাখী ঝড়ে, সে রুমাল উড়িয়ে দিও, বৈশাখী শুভেচ্ছা নিও ।
এই পাল্লা দিয়ে চলা পরিবর্তনের যুগে, শত বছর পরেও বাংলা গান প্রেমী মানুষটা ‘প্রিয় আকাশী’ শুনে অনুভব করবে চিঠির প্রেমগুলো। ‘মধ্য রাতের ডাকপিয়ন’কে খুঁজে পাওয়ার বৃথা অপচেষ্টা চালাবে ।
হাতের স্পর্শ ছাড়া তেল তৈরীর যুগে, নতুন প্রজন্ম চরকার তথ্য পাবে ‘নাগর আলী’ শুনে। চরকা চালিয়ে কারও জীবন চলতো। বউকে শাড়ী, কানের সোনা কিনে দিতে পারতো ।
বৃষ্টি নিয়ে তিনি গেয়েছেন : ‘বৃষ্টি এতো জোরে এসোনা, দিও না দু’চোখ ভিজিয়ে, ও যে দেখতে পাবে না, কতোজল রেখেছি জমিয়ে’ । বৃষ্টি নিয়ে তাঁর আরও একটা গান আছে ; ‘বৃষ্টির জলে ভিজেছে, ছিঁড়েছে তোমার শেষ চিঠিটা, অজানায় হারিয়েছে, চিঠির কথা’ ।
দুর্ভিক্ষ নিয়ে গাইলেন : ‘আমায় যেতে দাও, সেই স্বপ্ন লোকে। যেখানে ক্ষুধা নেই’...
সবার মতো তিনিও যুদ্ধ চাননা। তাই তিনি সুরে সুরে গাইলেন : ‘আর নয় যুদ্ধ, আর নয় ধ্বংস, আর নয় হিংসা-বিদ্বেষ। আর নয় অপমৃত্যু, আর নয় হত্যা, আর নয় রক্ত প্লাবন’...
তাঁর গানে বাদ যায়নি একজন ফেরিওয়ালা ও । গ্রামে গ্রামে ঘুরে চুড়ি ফিতা বিক্রি করা মানুষটার জন্যও গাইলেন : ‘লেইস ফিতা লেইস। চুড়ি ফিতা রঙ্গিন সুতা, রঙ্গিন করিবে মন’ ।
জেলখানার কয়েদীর জীবন, প্রেম নিয়ে গাইলেন : ‘দিন রাত এখানে থমকে গেছে, কন্ডেম সেলের পাথর দেয়ালে। প্রতি নিশ্বাসে মৃত্যুর দিন আমি গুনছি, শোন জেল থেকে আমি বলছি’ ।
১৪’ই ফেব্রুয়ারী ভালোবাসা দিবসের জন্য গাইলেন : ‘ও ভ্যালেনন্টাইন, একান্তই তুমি আমার’ ।
একজন চাকুরি নির্ভর, কোনরকম টেনেটুনে সংসার চালানো মানুষের জন্য গাইলেন : ‘হিসেবের খাতাখুলে বসে থাকি মন ভুলে, কখন যে মাসটা ফুরায়। দিনে দিনে মাস গেলে বেতন পকেটে এলে আমারও যে প্রাণটা জুড়ায়’ ।
রাস্তার পাগলের জন্য গাইলেন : ‘তোমার আমার মতো সেও তো মানুষ। হাত, পা, কান, মাথা আছে, আছে তার হুশ। সেও হাসতে জানে, ভালোবাসতে জানে। দুঃখ কষ্টে তারও চোখে আসে জল। সে চৈতা পাগল’...
ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ছিলো আর এখনো আছে। যার যার ধর্ম নিয়ে তিনি গাইলেন : ‘আমাদের ধর্ম আমাদের কাছে, তোমাদের ধর্ম তোমাদের কাছে। যার যার ধর্ম তার তার কাছে। যার যার ভাষা তার তার দেশ’ ।
ঝড়ের রাত নিয়ে গাইলেন : ‘আমার স্মৃতির তলেতে, বাতাসে কান্নাতে, তুমি কথা দিয়েছিলে নিশ্চুপ কোন রাতে, যেখানে মেঘের মিছিলে আকাশটা যায় ছেঁয়ে । এই। এই ঝড়ের রাতে। আমার প্রেমের চিঠিতে, পুরাতন কবিতাতে, তুমি দাঁগ কেটেছিলে কিছু কিছু সংলাপে, যতোদূর মনে পরে ভালোবাসা ছিলো তাতে । এই, এই ঝড়ের রাতে’ ।
তরুণদের জন্য গাইলেন : ‘শুধু ভালোবাসাটুকু থাক্ আর সব মুছে যাক্। পৃথিবীর পথে পথে, আমরাই যাবো লিখে, আগুনের ফুলকি দিয়ে, নতুনের গান। জয় তরুণের জয়’।
আমি নিজে যখন বছরে এক আতবার গ্রামে যাই, এবং ফেরার সময় দুটি লাইন খুব বেশি মনে পরে। ‘বিদায় বান্ধবী বিদায়, আমিও ভুলে যাবো তুমিও ভুলে যেও আমায়’ ।
এরকম জীবনমুখী, সময়োপযোগী, ঐতিহাসিক এবং কালজয়ী অসংখ্য গান রয়েছে এই মানুষটার। এই মানুষটার গানে আমি অনুপ্রেরণা পাই। সাহস পাই। একজন গায়ক যে গানে গানে বলতে পারে, ‘আমিই শেষ শারাবি’, একজন গায়ক যে বলতে পারে ‘এই চোখে তাকিও না লুটপাট হয়ে যাবে’ সেটা জেমস কে দেখেই শেখা। ‘তুমি, আমি, তুমি’ তে ঘুরপাক না করেও গান বানানো যায়...
শ্রোতা হিসেবে সবাই চায়, একজন গায়ক জীবনের কথা বলুক, মানুষের কথা বলুক, মাটির কথা বলুক । জেমস বোধয় সেটা পুরোপুরির ও বেশি দিয়ে দিয়েছেন এবং সেটা একদম ভিন্ন কথায়। এজন্যই তিনি সবার থেকে আলাদা। প্রতিদিন নতুন...
তাঁর নিরানব্বই শতাংশ গানই কোন না কোন বিশেষ বিষয় নিয়ে। সব গান এক পোস্টে লেখা সম্ভব নয়। তাই আজকে এতোটুকুই। দীর্ঘকাল বাঁচুন এবং হাসুন...