05/12/2025
মুখোশ
মজিদের নতুন বাড়িতে মিলাদ। গ্রামের নিয়মে—নতুন ঘর মানেই মিলাদ, আর মিলাদ মানেই লোকজনের ভিড়। বয়সে নুইয়ে পড়া এক মুন্সি ধীর কণ্ঠে মিলাদ পড়ছেন। শেষে যখন মোনাজাতে হাত তোলেন, কণ্ঠ ধরে আসে, দাড়ি বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। মোনাজাত দীর্ঘ হতে থাকে; ছেলেরা অস্থির—তারা মূলত তবরুকের অপেক্ষায়।
মবিন পাশে বসে চাপা গলায় মজুকে জিজ্ঞেস করে,
— “কি খাওয়াবু রে মজু?”
হুজুরের প্রার্থনার মাঝেই কথা ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সবাই চুপ—মোনাজাত ভাঙার অপরাধ কেউই নিতে চায় না।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে এক ছেলে এসে মবিনের পাশে বসে। মবিন তাকে নুড়ি কুড়িয়ে আনতে পাঠিয়েছিল। ছেলের হাত থেকে পাথরগুলো নিয়ে মবিন তা উপর দিকে ছুড়ে দেয়। টিনের চাল কেঁপে ওঠে—সশব্দে নুড়িগুলো ঝরে পড়ে মোনাজাতে নিমগ্ন মানুষের মাথায়। কেউ কিছু বলে না—কেউ সাহসও পায় না। কারণ সবাই জানে, মবিন এ গ্রামের কুট-কৌশলের ওস্তাদ। কাকে কিভাবে দমাতে হয়, তা তার নখদর্পণে।
চল্লিশের কোঠায় তার বয়স, কিন্তু কৌশলে সে যেন শয়তানকেও হার মানায়। এই জন্যই গ্রামের মানুষ তাকে মসজিদ কমিটিতে রাখতে চায় না। তার জমিতে কাজ করা সাঁওতালদের সঙ্গে তার দহরম-মহরম, প্রায়ই সেখানেই কাটায় সময়।
মসজিদে মূল সংকট দেখা দেয় আজান ও জামাতের লোক ঠিক করার সময়। দু’একজন মোল্লা পাওয়া গেলেও তিন হাজার টাকার নিচে কেউ দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। মবিন তখনই সুযোগ খুঁজে পায়।
— “এত বোঝা উবান লাগবি? দুই হাজার দে বাবা, না পারলে হামিই পড়ামো।”
এরপর থেকেই সে নিজেকে মুয়াজ্জিন বলে দাবি করে। চেয়ারম্যানের দালালী সে করে, তাই কেউ তাকে ঘাঁটাতে পারে না। মসজিদে কখনো আজান হয়, কখনো হয় না; আবার একই ওয়াক্তে দু’বার–তিনবার আজান শোনা গেলে কারো আশ্চর্য হওয়ারও কিছু নেই।
এক কুয়াশামাখা সকালে রাস্তার পাশে টাওয়ারের তারে বসে থাকা ছোট ছোট পাখিগুলো দেখে সে পাশের লোককে বলে,
— “এগুলো পাখি না?”
লোকটি—যে পাশের গ্রামের—বলে,
— “হ্যাঁ, মনে হয় চড়ুই।”
এই সেই লোক, যে একদিন মসজিদে মবিনের আজানে ভুল ধরেছিল। বলেছিল,
— “ভাই, যেখানে টানা দরকার সেখানে টান দেবেন। না হলে গলদ হয়ে যায়।”
তখন লোকজন থাকায় মবিন জবাব দিতে পারেনি। আজ সুযোগ পেয়ে সে বিভ্রান্ত করে বলে,
— “এগুলো আবাবিল পাখি!” এ পাখিগুলো টাওরের তারে বসে তাই এগুলোকে তৈরান আবাবিল বলে। তার থেকে তৈরান।
লোকটি হতভম্ব। মবিনের মুখ দেখে বুঝার চেষ্টা করে—মজা করছে, নাকি সত্যি বলছে।
এদিকে কালুর বাপ, চোখে কম দেখে বলে বাসায় বসেই এশার নামাজ পড়ে। সেদিন বাজার করতে করতে এশার ওয়াক্ত হয়ে যায়। মসজিদে ঢুকে দেখে দু’জন পথিক অজু করছে। সে আজান দিয়ে তাদের নিয়ে নামাজ পড়ে। তার আগে আরেক মুসল্লি আজান দিয়ে একা একাই নামাজ পড়ে গেছে—কেউ জানে না কয়বার আজান হয়েছে।
মসজিদের পাশেই মজুর পান-সিগারেটের দোকান। তাকে কোনোদিন নামাজে দেখা যায় না। শীতের দিন, রাতে তেমন বিক্রি নেই—কুপির আলোয় বসে সে হিসাব মেলাচ্ছে। হঠাৎ মবিন টলতে টলতে এসে আজান দিতে শুরু করে। মজু হাঁক দেয়—
— “আর কয়বার আজান দিবু রে? আগেই দু’বার দেওয়া হছে!”
রমজান মাস। মুসল্লিরা সারা দিন রোজা রেখে মাগরিবের আজানের অপেক্ষায় থাকে। ছয়-সাতজনের ছোট জামাত—ছেলে-বুড়ো সবাই একসাথে ইফতার করে।যে যা পারে নিয়ে আসে। কেউ ছোলা-পিয়াজু, কেউ ফিরনী, কেউ সেমাই নিয়ে আসে।
বজলু বুড়া—বয়স সত্তরের কাছাকাছি—রোজা রেখেও মাঠে কাজ করে। তৃষ্ণায় চোখ গর্তে দেবে যায়। সে মসজিদে ইফতার করে। কিন্তু আজ মসজিদে নিয়ে যাওয়ার মতো কিছু নেই। কিছু না নিয়ে ইফতারে শামিল বেমানান। ইফতার কিছু নেই বলে গরম ভাতে লবণ-হলুদ মিশিয়ে নিয়ে আসে বজু। আজান পড়তেই যেন প্রতিযোগিতা—মিনিটে গামলা খালি।
বজলুর খুব খাওয়ার জন্য দুর্নাম আছে। সে বড় বড় হা করে গো গ্রাসে গিলে। শেষ ইফতারটুকুও গামলা ধুয়ে পানি ঢেলে ঢকঢক করে খায়। দূর থেকে মবিন তাকিয়ে থাকে—চোখে ক্রোধ। মনে মনে বলে,
— “দেখ, আজ তোর খাওয়া বন্ধ করো ছুঁ।”
তারপরের দিন…
বজলু যথারীতি সবার আগে আসে। মসজিদে ইফতার সাজায়। মুসল্লিরা জমায়েত হয়। মবিনও আসে। আজ সে রোজকার মতো নিজের ইফতার এনে গামলায় দ্রুত মিশিয়ে দেয়—। কিন্তু আজ সে দ্রুত আজান দেয় না। দীর্ঘ সুরে টেনে টেনে আজান দেয়।
বজলুর চোখ ঝলমল করছে—আজ ইফতার বেশী। সে বড় বড় লোকমা মুখে দিতে দিতে হঠাৎ পাথরের মতো শক্ত কিছুতে দাঁত আঘাত লাগে। যে দাঁতে কয়েকদিন ধরে ব্যথা—সেই দাঁত নড়ে যায়; ব্যথায় চোখে পানি চলে আসে।
আজান শেষে মবিন এসে দেখে বজলু কিছু খেতে পারছে না। অন্যরা ধীরে ধীরে, সাবধানে খাচ্ছে।
মবিন কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— “কি হছে বাহে?”
বজলু কিছু বলে না।
একটি ছেলে ধীর গলায় বলে,
— “ইফতারে কে বান বুট ভাজা মিশাছে—খালি কামড়ত পড়িচ্ছে।”
শিক্ষাঃ
মোনাফেক প্রকাশ্যে যত ধার্মিক সাজুক, ভেতরে সে কাফেরের চেয়েও ভয়ংকর।
📌 প্রপার হ্যাশট্যাগ
ূর
#বাংলাগল্প
#সমাজের_সত্য
#বাস্তবধর্মী_গল্প
#সাহিত্যপ্রেমী
# Sahitto-Sukh
---