19/05/2023
মধ্যে_রাতের_গান
পর্ব : ১
"আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়"
ঘড়িতে রাত তিনটা। ছোট্ট একটা চিরকুট লিখে সেটা টেবিলের উপর রেখে দিলো রুহি। তারপর নিঃশব্দে পা বাড়ালো ছাদের দিকে।
ছাদে এসে চোখ বন্ধ করে এক পা দু পা করে এগিয়ে যেতে লাগলো ছাদের কিনারার দিকে। আর মাত্র একটা ধাপ বাকি। তারপরেই ৪ তলা থেকে মাটিতে পতন, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে মৃত্যু। রুহি যখন শেষ ধাপের জন্য পা বাড়াবে তখন কেউ একজন ডেকে উঠলো,
--- এই মেয়ে, এই?
রহুি চমকে উঠলো, এমন হঠাৎ কারে কারো ডাকে। পেছন ফিরে দেখে পাশের ছাদে একটা ছেলে দাড়িয়ে আছে। বিরক্ত হলো রুহি। মরার সময়ও পুরুষ মানুষ এসে ঝামেলা করছে। রুহি কিছু বলার আগেই ছেলেটি প্রশ্ন করলো,
--- এই মেয়ে মাথা ঠিক আছে? কি করছো তুমি? চলে এসো ওখান থেকে। চলে এসো বলছি।
রুহির মনে হলো ছেলেটি তাকে ধমক দিয়ে জোর খাটিয়ে কথা বলছে। রুহি নিজের জায়গাতে দাড়িয়ে থাকলো। নড়লো না এক চুল। রাত তিনটার সময় মরতে এসেও যে এমন ঝামেলায় পড়তে হবে রুহি ধারনাও করতে পারে নি। অদ্ভুত লাগছে ব্যপারটা।
একটা ছেলে তাকে মরতে পাঠিয়েছে অন্য একটা ছেলে আবার মৃত্যুর সময় এসে বাধা দিচ্ছে। রুহিকে নড়তে না দেখে ছেলেটি বললো,
--- ওখানেই দাড়াও তুমি। আমি আসছি।
আসছি মানে? বলে কি এই ছেলে? রুহিদের ছাদ থেতে ওই ছাদের দুরত্ব ১০ ফিটের বেশি। মাটিতে হলে এটা তেমন দুরত্ব না, কিন্তু চার তলার উপার এটাই অনেক। এই ছেলে কি এতটা পথ লাফিয়ে চলে আসবে? রুহি যখন এসব ভাবতে ব্যাস্ত ততক্ষণে ছেলেটি রুহিদের ছাদে চলে এসেছে। রুহির মনে হলো সে মহাশূন্যে ভাসছে। নিজের উপর যেনো কোনো কন্টোল নেই তার।
না পাড়ছে ছাদ থেকে লাফ দিতে, না পাড়ছে ছেলেটির কথা মত ছাদের কিনারা থেকে মাঝখানে চলে যেতে। রুহির মনে হলো পা দুইটা যেনো টন টন ভারী। ছেলেটা এসে রুহির হাত ধরে টেনে ছাদের মাঝখানে নিয়ে এলো। সারা শরির শিউরে উঠলো রুহির। মানুষের হাত এত ঠান্ডা হয়? হতে পারে?রুহি ভ্রু জোরা বাকিয়ে চেয়ে রইলো ছেলেটির হাতের দিকে।
রুহির মনে হলো এটা হাত নয়, উত্তর মেরুর মাইনেস ৮০ ড্রিগী সেলসিয়াস থেকে নিয়ে আসা এক টুকরো বরফ খন্ড। রহি এবার ছেলেটির দিকে চাইলো। পরনে টাউজার, কালো বা নেভি ব্লু রঙের হবে, আবছা আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
গায়ে সাদা রঙের একটা টির্সাট।ডান হাতে একটা ঘড়ি, মাথার চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। সেই এলোমেলো চুল গুলো আরো এলোমেলো করে দিয়ে গেলো একটা দমকা বাতাস। মুখে খোচা খোচা দাড়ি। ছেলেটি রুহির চেয়ে বেশ লম্বা, দেখতেও সুন্দর। ছেলেটি বললো,
--- সমস্যা কি তোমার? মরতে যাচ্ছিলে কেনো?
এই প্রথম রুহি কথা বললো,
--- আপনার সমস্যা কি? দেখছেন একজন মরতে যাচ্ছে, তাকে বাধা দেওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিলো?
ছেলেটির ঠান্ডা উত্তর,
--- মানবিকতার অধিকারে।
রেগে গেলো রুহি, রাগী কণ্ঠে বললো,
--- আপনার মানবিকতা আপনার কাছেই রাখেন। দুনিয়ায় অনেক জায়গা আছে, সেখানে মানবিকতা দেখান গিয়ে।
--- আচ্ছা, অন্য জায়গাতেই মানবিকতা দেখাবো। কিন্তু তোমাকেও তো মানবিকতা দেখিয়ে ফেলছি।এই জন্যই যানতে চাইছি, কি এমন হলো যে আত্নহত্যা করতে হবে? বেঁচে থাকার জন্য একটা কারনই যথেষ্ট। তোমার জিবনে কি সেই একটা কারন ও নেই? আমাকে বলতে পারো। শুনার পর যদি মনে হয় যে তোমার মারা যাওয়াই উচিৎ।আমি নিজে তোমাকে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবো।
--- আপনাকে কেনো বলতে যাবো? আপনি কে?
--- কেউ না। আসলে জিবনের গোপন কথাগুলো অপরিচিত মানুষকেই বলা উচিৎ। তাহলে, তারা আমাদের গোপন কথা নিয়ে খোটা দিবে না,পচাবে না, কাউকে বলে দেওয়ার ও ভয় থাকে না। আর তুমি মারাই তো যাবে, যাবার আগে নিজের কথা গুলো কাউকে বলে গেলে। কেউ একজন যানলো তেমার কথা। এতে তেমন লাভের কিছু না হলেও ক্ষতিও নেই।
ফুপিয়ে কেদে উঠলো রুহি। এই কান্না থামার না। সুমুদ্রের ঢেউ যেমন একটার পর একটা তীরে আছড়ে পড়ে তেমনি কান্নাটাও ধারাবাহিক ভাবে চলতে লাগলো।
--- আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসি, ওর নাম সাহিল।
টানা এক ঘন্টা কান্না করার পর কথা বললো রুহি। কান্না করতে করতে এস সময় হেচকি উঠে গেলো তার। দাড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও যেনো ফুরিয়ে গেলো। ছাদের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়লো রুহি। ছেলেটিও বসলো পাশে। অপেক্ষা করতে লাগলো রুহির কান্না থামার।রুহির কথা শুনে ছেলেটা প্রশ্ন করলো,
--- তারপর?
রুহি বললো,
--- আমাদের চার বছরের সম্পর্ক। সাহিল কে আমি কতটা ভালোবাসি বলে বুঝাতে পারবো না। নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসি তাকে। গত চারটা বছর কি করি নাই সাহিলের জন্য? ওর চাকরী ছিলো না, টিউশনি ছিলো না, টাকা ছিলো না। তারপরও আমি ছিলাম। একটা রিলেশনে বয়ফ্রেন্ডের যা যা করা দরকার আমি মেয়ে হয়ে সেই গুলো করেছি।
নিজের শপিংয়ের টাকায় ওকে গির্ফট করেছি, রিকশা ভাড়া নেই ভাড়া দিয়েছি, কত বার বাড়ি ভাড়াটাও দিয়েছি। ওর জম্মদিনে ওর পছন্দের ফোন গির্ফট দিয়েছি। এক কথায় নিজের সমস্ত সুখ, ইচ্ছে, আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে সাহিল কে সুখি করতে চেয়েছি,ওর ইচ্ছে গুলো পূরণ করেছি। এমন কোনো কিছু করি নাই যে আমি করি নি।
কারন,আমি সাহিল কে ভালোবাসতাম,ভালোবাসি। আমি ভাবতাম এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবে। একদিন সাহিল আমার ইচ্ছে গুলো পূরন করবে। আমরা একসাথে বাঁচবো। কিন্তু, চাকরি পাবার পর সে আমাকে ভুলে গেলো।
অন্য একটা মেয়েকে মেয়েকে বিয়ে করছে। আগামীকাল সাহিলের বিয়ে। প্রিয় মানুষের বেইমানি, তাদের অবহেলা,তাদের কাছে পাত্তা না পাওয়া যে কতটা কষ্টের এটা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। এই তীব্র কষ্ট নিয়ে বাঁচা যায় না। বাঁচতে ইচ্ছেও করে না।
একটানা কথা গুলো বলে থামলো রুহি। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে তার। রুহি চোখ মুছে ছেলেটির দিকে চাইলো। পরিক্ষার আগের দিন ছাত্র/ছাত্রী শিক্ষকের কথা যতটা মনোযোগ,গুরুত্ব দিয়ে শোনে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে সেটাই মনে হলো রুহির। মিনিট দুয়েক পর ছেলেটা বললো,
--- তো, তুমি মারা গেলে কি হবে?
রুহি যেনো বুঝতেই পারলো না প্রশ্নটা। রুহি জিঙ্গাসু দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে চাইলো, ছেলেটি বললো,
--- মানে, সাহিল তো তোমাকে ভালোবাসে না। কখনো ভালোবেসেছে বলেও মনে হয় না। সে তোমাকে ব্যবহার করেছে। আর তুমি বোকার মত তার এশারায় নেচেছো। কথাটা হয়ত তিতা লাগবে কিন্তু এটাই সত্য।
এখন, যে ছেলেটা তোমাকে ভালোবাসে না, কখনো ভালোবাসে নি তুমি মারা গেলে কি তার কিছু আসে যাবে? সে কি কষ্ট পাবে? তার কি খারাপ লাগবে? যদি খারাপ লাগতো,যদি কষ্ট পেতো তাহলে সে কখনো তোমাকে হারাতে দিতো না। সেও তোমাকে তোমার মতই ভালোবাসতো।
রুহি বললো,
--- আমি মারা গেলে অব্যশই সাহিল কষ্ট পাবে। তখন বুঝবে আমি তাকে কতটা ভালোবাসতাম। তখন বুঝবে কাকে হারিয়েছে সে।
---কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?
ছেলেটার আচমকা এমন প্রশ্নে কিছুটা হতভম্ব হলো রুহি। তারপর জবাব দিলো,
--- অর্নাস ৩য় বর্ষ।
ছেলেটা বললো,
--- অথচ ইন্টারে পড়া মেয়েদের মত কথা বলছো।
রুহি ব্যঙ্গাত্বক সুরে বললো,
--- আপনি খুব মেয়ে বিশারদ মনে হয়?
--- আমার ছয়টা র্গালফ্রেন্ড। তার মধ্যে দুই জন আছে ইন্টারে পড়ে। তাই যানি, বুঝি কোনটা আবেগের বয়স। কোন বয়সে মেয়েরা আবেগী থাকে, কোন বয়সে আবেগী কথাবার্তা বলে।
ছেলেটার কথা শুনে প্রচন্ড রাগ হলো রুহির। ইচ্ছে করলো নিজে মরার আগে ছেলেটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় ছাদ থেকে। রুহি রাগী গলায় বললো,
--- নিজে যে এত বড়বড় কথা বললেন।
আপনি তো সেই সাহিলের মতই। একই দলের লোক। বরং এক ধাপ এগিয়ে। আপনি নিজেও তো মেয়েদের ঠকাচ্ছেন। সাহিল তাও শুধু একজনের সাথে প্রতারনা করেছে, আপনি তো ছয়টা মেয়ের সাথে প্রতারণা করছেন।
রুহির কথা শুনে ছেলেটা হেসে ফেললো। হাসতেই থাকলো। অনেকক্ষণ হাসার পর হাসি থামিয়ে বললো,
--- এখানে তোমার ধারনায় ছোট্ট একটা ভুল আছে। আমি কারো সাথে প্রতারণা করছি না। আমার যে ছয়টা র্গালফ্রেন্ড, এটা তুমি যেমন যানলে তারাও যানে। সবটা যেনেই তারা আমার সাথে কথা বলে।
হয়ত কথা বলতে ভালো লাগে। এটাকে যদি প্রেম বলো তাহলে প্রেম,ভালোবাসা বললে ভালোবাসা, আবার সময় কাটানো বললে সময় কাটানো। এদের মধ্যে যদি শুনি কাল কারো বিয়ে আমার খারাপ লাগবে না, আবার ওরা যদি শুনে আমার বিয়ে তাহলে ওরাও কষ্ট পাবে না।
রুহি অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
--- এরকমটাও হয়?
--- জি হয়, আমার সাথে হচ্ছে তো।
রুহি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর বললো,
--- আপনি আমাকে দেড়ি করিয়ে দিচ্ছেন। আপনি আপনার কাজে যান, র্গালফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলেন গিয়ে। আমাকে আমার কাজ করতে দেন।
--- তোমার আবার কি কাজ? মারা যাওয়া?
--- জি।
--- একদিন পর মরলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। তুমি কাল মারা যেও । আমি কিছু বলবো না। কিন্তু, আজ একটা কজ করতে হবে। তুমি সাহিলকে ফোন দিবে। তাকে বলবে, সে যদি অন্য কাউকে বিয়ে করে তুমি আত্নহত্যা করবে। সত্যই মারা যাবে। এটা শুনে সাহিল কি বলে সেটা আমাকে যানিয়ে মারা যেও।
রুহি জিঙ্গেস করলো,
--- আপনার কথা আমি কেনো শুনতে যাবো?
--- নিজের জন্যই শুনবে। তুমি বললে না, তুমি মারা গেলে সাহিল কষ্ট পাব। এই জন্য তুমি কাজটা করবে। দেখা গেলো সাহিল সত্যই তোমাকে ভালোবাসে। তোমার মরার কথা শুনে সে ছুটে চলে আসলো তোমার কাছে।
তারপর তোমাদের বিয়ে হয়ে গেলো, সুখের সংসার হলো। অথচ,সামান্য একটা কাজ না করে যদি তুমি মারা যাও তাহলে এসব কিছুই হবে না। তুমিও মারা যাবে, সাহিল ও সারাজীবন কষ্ট পাবে। কাজটা কি ঠিক হবে তাহলে?
রুহি কিছু বললো না। দুই জনের মধ্যে নামলো নিরাবতা। একটা সময় রুহি নিরাবতা ভেঙ্গে বললো,
--- ঠিক আছে, একদিন পর নাহয় মরলাম।
রুহির কথা শুনে ছেলেটার মুখে হাসির রেখা ফুটলো। মনে হলো এই কথাটা শুনার জন্যই যেনো অপেক্ষায় ছিলো সে। ছেলেটা হাতে ঘড়ির দিকে চেয়ে বললো,
--- রাত শেষ হয়ে এসেছে। আযান দিবে এক্ষুনি। আমাদের মনে হয় যাওয়া উচিৎ।
রুহি চারদিকে চাইলো। আকাশে জোৎস্না নেই। আসলেই তো! এতটা সময় পেরিয়ে গেলো অথচ সে বুঝতেই পারলো না। দুজনেই উঠে দাড়ালো। রুহি জিঙ্গেস করলো,
--- আপনি কোথায় থাকেন?
--- আসমানে।
--- মানে?
ছেলেটি হেসে ফেললো,যেনো অনেক মাজার একটা জোকস বলেছে। তারপর হাসি থামিয়ে বললো,
-- পাশের বিলডিংয়ের চিলেকোঠার ঘড়ে থাকি। কাল দেখা হবে।
--- ও আচ্ছা।
যাওয়ার কথা বললেও ছেলেটি দাড়িয়ে রইলো। তারমানে রুহিকে আগে যেতে হবে। রুহি মনে মনে ভাবলো,"তারমানে ছেলেটা কি এখনো মনে করছে সে আগে চলে গেলে আমি ছাদ থেকে লাফ দিবো? "
রুহি চলে এলো। রুহি মাত্র কয়েকটা সিড়ি নেমেছে। তখন মনে পড়লো, আচ্ছা ছেলেটার নাম তো জিঙ্গেস করা হলো না। এখনো নিশ্চয়ই ছাদে আছে।
রুহি ছাদে উঠে এলো। ছাদে ছেলেটি নেই। রুহি চারদিকে তাকালো নাহ,কোথাও কেও নেই। অবাক হলো রুহি। তখনই রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে দুরের কয়েকটা মসজিদ থেকে ভেসে এলো আযানের সুর। রুহি বিষ্ময় নিয়েই পা বাড়ালো সিড়ির দিকে।বাবা মা জেগে উঠার আগেই তাকে রুমে যেতে হবে।
Waiting for next part.....