25/12/2025
মানুষের জীবন কখনো কখনো এমন এক বালুকণা হয়ে যায়, যা সময়ের স্রোতে ভেসে বেড়ায় কিন্তু কোথাও থিতু হতে পারে না। নীলাভের জীবনটাও ঠিক তেমনই। শহরের এক কোণে ছোট একটা ভাড়া বাসায় সে একা থাকে। তার নিঃসঙ্গতা তাকে কামড়ে ধরে না, বরং নিঃশব্দে গিলে খায়।
নীলাভের প্রতিদিনের রুটিন খুব সাধারণ। সকালে ঘুম থেকে ওঠা, অফিসে যাওয়া, আর সন্ধ্যায় ফিরে আসা। কিন্তু এই সাধারণত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর হাহাকার। তার ঘরের দেয়ালগুলো যেন তার কান্নার সাক্ষী। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে তার জীবন এমন ছিল না। তখন তার জীবনে রোদ ছিল, হাসি ছিল। ছিল মৈত্রেয়ী।
মৈত্রেয়ী ছিল নীলাভের স্ত্রী। তাদের ছোট সংসারে অভাব থাকলেও ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু ভাগ্য বড় নিষ্ঠুর। এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার পথে মৈত্রেয়ী এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়। নীলাভ যখন হাসপাতালে পৌঁছাল, তখন মৈত্রেয়ীর নিথর দেহটা সাদা কাপড়ে ঢাকা। সেই থেকে নীলাভের ভেতরের পৃথিবীটা থমকে গেছে।
মাঝে মাঝে মাঝরাতে নীলাভের ঘুম ভেঙে যায়। সে অনুভব করে মৈত্রেয়ী পাশে শুয়ে আছে। সে হাত বাড়িয়ে মৈত্রেয়ীর অস্তিত্ব খোঁজে, কিন্তু স্পর্শ পায় কেবল শীতল চাদরের। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করে বলে, "কেন গেলে মৈত্রেয়ী? আমাকে সাথে নিলে না কেন?"
দুঃখের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। এটা মানুষের সাথে মিশে যায়। নীলাভ এখন আর কাঁদে না। তার চোখ শুকিয়ে গেছে অনেক আগে। কিন্তু তার বুকের ভেতরটা সারাক্ষণ ভার হয়ে থাকে। সে যখন রাস্তার মোড়ে কোনো দম্পতিকে হাত ধরে হাঁটতে দেখে, তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হয়, কেউ যেন এক মুঠো লবণ ছিটিয়ে দিয়েছে তার তাজা ক্ষতে।
অফিসে নীলাভ খুব কম কথা বলে। কলিগরা তাকে 'মৌনী বাবা' বলে ডাকে। তারা জানে না যে, যে মানুষটা নিজের ভেতরে একটা আস্ত সমাধিক্ষেত্র বয়ে বেড়ায়, তার মুখে হাসি মানায় না। একদিন তার এক সহকর্মী জিজ্ঞেস করেছিল, "নীলাভ সাহেব, আপনি কখনো বেড়াতে যান না?"
নীলাভ সামান্য হেসে উত্তর দিয়েছিল, "কোথায় যাব? আমার গন্তব্য তো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।"
সহকর্মীটি কথাটার গভীরতা বুঝতে পারেনি। সে হয়তো ভেবেছিল নীলাভ রসিকতা করছে। কিন্তু নীলাভ জানত, তার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এক একটি না বলা গল্প।
শহরে যখন উৎসব আসে, নীলাভ তখন নিজেকে আরও বেশি গুটিয়ে নেয়। মানুষের আনন্দ তাকে বিদ্ধ করে। দীপাবলির আলো তার চোখের জলকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। সে জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবেন, ওই যে দূরের তারাটা, ওটাই কি মৈত্রেয়ী? সে কি দেখতে পাচ্ছে নীলাভ কতটা কষ্টে আছে?
একবার বৃষ্টির দিনে নীলাভ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যখন তার গায়ে পড়ছিল, তার মনে পড়ল মৈত্রেয়ীর কথা। মৈত্রেয়ী বৃষ্টি খুব ভালোবাসত। সে বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে নীলাভকে বলত, "জানো, বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা এক একটা আশীর্বাদ।"
নীলাভ আজ সেই বৃষ্টির ফোঁটায় কোনো আশীর্বাদ পায় না। সে পায় কেবল বিষাদমাখা শীতলতা। সে বৃষ্টির কাছে মৈত্রেয়ীকে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানায়, কিন্তু প্রকৃতি কেবল নিস্তব্ধতায় উত্তর দেয়।
সময়ের সাথে সাথে মানুষের দুঃখ কমে না, বরং মানুষ সেই দুঃখের সাথে মানিয়ে নিতে শেখে। নীলাভও শিখেছে। সে এখন জানে, এই নিঃসঙ্গতাই তার শেষ ঠিকানা। তার কোনো অভিযোগ নেই, কোনো দাবি নেই। সে শুধু চায় তার এই দীর্ঘশ্বাসের অবসান হোক।
একদিন রাতে নীলাভ আয়নার সামনে দাঁড়াল। দেখল তার চুলে পাক ধরেছে, চোখের নিচে কালচে দাগ। সে নিজেকে চিনতে পারল না। আয়নার প্রতিবিম্বটা যেন এক অন্য মানুষ। যে মানুষটার ভেতরে কোনো প্রাণ নেই, কেবল স্মৃতিরা বাসা বেঁধে আছে।
সে ভাবল, মৃত্যু কি খুব যন্ত্রণার? নাকি এই বেঁচে থাকাটাই আসল যন্ত্রণা? প্রতিদিন তিল তিল করে মরে যাওয়া, আর একবারেই মরে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য কী? নীলাভ ডায়েরিটা হাতে নিল। শেষ পাতায় লিখল—
"দুঃখ কোনো অসুখ নয় যে সেরে যাবে। এটা একটা ছায়া, যা রোদেও থাকে, অন্ধকারেও থাকে। মৈত্রেয়ী, আমি আসছি।"
গল্পের শেষটা হয়তো বিয়োগান্তক, কিন্তু বাস্তব অনেক সময় এর চেয়েও কঠিন হয়। নীলাভের মতো হাজারো মানুষ আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, যারা হাসির আড়ালে এক সমুদ্র কষ্ট লুকিয়ে রাখে। তাদের চোখের কোণে জমে থাকা জল কেউ দেখে না, তাদের মনের হাহাকার কেউ শোনে না। তারা বেঁচে থাকে কেবল নিঃশ্বাসের প্রয়োজনে, কিন্তু তাদের আত্মা মরে যায় অনেক আগেই।
দুঃখের এই গল্পটা কেবল নীলাভের নয়, এটা সেই সব মানুষের যারা হারানোর বেদনা নিয়ে প্রতিদিন যুদ্ধ করে যাচ্ছে। আর এই যুদ্ধের কোনো পুরস্কার নেই, আছে কেবল এক গভীর নিঃসঙ্গতা।