18/08/2026
জেলা প্রশাসক যখন শিক্ষক!
বিস্ময়কর খবরটি পড়ে আরেকবার বুঝে নিলাম এমন মানুষ আছে বলেই তো পৃথিবী ও মানবসভ্যতা এখনও টিকে আছে।
প্রথম আলো খবরটি দিয়েছে, স্কুলছাত্রী সাদিয়া আফরিনের পড়াশোনার খরচ চালাতে না পেরে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলেন মা আরফা বেগম। আবেদনে সাড়া দিলেও তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা করলেন না জেলা প্রশাসক। তিনি ডেকে নিয়ে সাদিয়াকে এক সপ্তাহের বাড়ির কাজ (পড়া) দিলেন, ঠিক করে দিলেন পড়াশোনার রুটিনও। বললেন, পরের সপ্তাহে এসে সেই পড়া বুঝিয়ে দিতে হবে।
নির্ধারিত পড়া শেষ করে দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হয় সাদিয়া। জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম পড়া বুঝে নিয়ে আবার পরের সপ্তাহের পড়া ঠিক করে দেন। এই রুটিনে সপ্তাহ থেকে মাস, মাস থেকে এক বছর পেরিয়ে যায়। এসএসসি পরীক্ষা দেয় সাদিয়া আফরিন। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, সে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সাদিয়াদের বাড়ি দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকায়। সে স্থানীয় কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে ৪৩ জন অংশ নেয়। এর মধ্যে ২২ জন পাস করেছে। তাদের মধ্যে একমাত্র সাদিয়া আফরিনই জিপিএ-৫ পেয়েছে।
মেয়ের এমন সাফল্যে খুশি মা আরফা বেগম। নিজে পড়ালেখা করতে না পালেও কষ্ট করে মেয়েদের পড়ালেখা করাতে চান তিনি। আরফা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়ের বই কেনার জন্য আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে ডিসি স্যারের কাছে আবেদন করেছিলাম। স্যার আমাদের সহযোগিতা করেছেন। শুধু অর্থ দিয়ে নয়, মেয়েকে নিয়মিত পড়া দিয়েছেন, পড়া নিয়েছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন। আজকে মেয়েটা ভালো রেজাল্ট করেছে!’
গেল শনিবার (১৫ আগস্ট) মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সাদিয়াদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য আলাদা সড়ক নেই। অন্যের লিচুবাগানের ভেতর দিয়ে সরু পথ পেরিয়ে টিনের ছাপরায় পৌঁছাতে হয়।
দুই শতক জমির ওপর অবস্থিত ঘরের মাঝখানে বেড়া দিয়ে দুই ভাগ করা হয়েছে। এক পাশে সাদিয়ার মা–বাবা ও ছোট বোনের ঘুমানোর জায়গা। অন্য পাশে সাদিয়া ও তার মেঝ বোনের থাকার জায়গা। একটি আলমিরার ওপরে সাজানো সাদিয়ার বইপত্র। ঘরের পাশেই ছোট্ট একটি রান্নাঘর। রান্নাঘরের টিনের চালে লকলকে লতার ফাঁকে ঝুলছে চালকুমড়া। পড়ার একটি টেবলও নেই সাদিয়ার।
বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের শত ব্যস্ততা থাকে। সেখান থেকে সময় বের করে একজন প্রান্তিক মানুষের মাথার ছায়া হয়ে উঠা খুব বড় ব্যাপার। আমাদের শিক্ষকরা এই জেলা প্রশাসককে নির্দ্বিধায় ও অসঙ্কোচে তাদের আদর্শ মানতে পারে।
আন্তরিক শুভকামনা জানাই জেলা প্রশাসক মহোদয়ের প্রতি।
অভিনন্দন সাদিয়া। তোমার শ্রম, একাগ্রতা ও অধ্যবসায় সার্থক হয়েছে।