04/05/2026
সেনা-সেটেলার কর্তৃক সংঘটিত ‘লংগদু গণহত্যা’ দিবস আজ: বিচারহীনতার ৩৭ বছর
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত ও বর্বরোচিত ‘লংগদু গণহত্যা’র ৩৭ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৮৯ সালের এই দিনে রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলায় তৎকালীন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের আমলে পাহাড়ি আদিবাসীদের ওপর এই ভয়াবহ নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও এই বর্বর হত্যাযজ্ঞের কোনো সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার হয়নি, যা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রতি অনাস্থা তৈরি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত, ১৯৮৯ সালের ৪ মে বিকেল ৪টা থেকে ৫টার দিকে লংগদু উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ সরকার দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হওয়ার পর পাহাড়িদের ওপর এই পরিকল্পিত হামলা শুরু হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তায় সেটেলার বাঙালিরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে আক্রমণ করে। নির্বিচারে গুলি, দা ও বল্লমের আঘাতে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অন্তত ৩২ জন জুম্ম নিহত হন এবং আহত হন অন্তত ১১ জন।
হামলাকারীরা সেদিন কেবল মানুষ হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা লংগদু ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও ৩নং লংগদু মৌজার হেডম্যান অনিল বিহারী চাকমার বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার স্ত্রীসহ আশ্রয় নেওয়া বহু মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। লাশগুলো বাড়িতে স্তূপ করে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, সেই দিন কমপক্ষে ৬টি গ্রাম আক্রান্ত হয়েছিল এবং কয়েকশ ঘরবাড়ি, অসংখ্য বৌদ্ধ মন্দির ও দুটি গির্জা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে হাজার হাজার পাহাড়ি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
বিভিন্ন সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এই হামলায় সেটেলারদের সাথে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর যোগসাজশ ছিল স্পষ্ট। উপজেলা সদরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও হেডম্যান অনিল বিহারী চাকমার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তির পরিবারও রক্ষা পায়নি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, সরকারিভাবে নিহতের সংখ্যা কম দেখানো হলেও প্রকৃত সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।
হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিন পর, ১৯৮৯ সালের ৯ মে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়সহ রাঙ্গামাটির ২২ জন বিশিষ্ট নাগরিক একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি ও ন্যায়বিচারের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ৩৭ বছরেও কোনো সরকার এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
৩৭ বছর পেরিয়ে গেলেও লংগদু গণহত্যার বিচারহীনতা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের কাছে আজও এক গভীর ক্ষত। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর প্রশ্ন এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার কি কখনো হবে, নাকি অপরাধীরা চিরকালই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে?