16/03/2026
আমরা পৃথিবীকে দিয়ে আলোচনা শুরু করি। Quran-এর Surah An-Naba-তে আল্লাহ বলেন:
“اَلَمۡ نَجۡعَلِ الۡاَرۡضَ مِهٰدًا”—“আমি কি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য বিছানা বা বিশ্রামের স্থান বানাইনি?”
এরপর বলা হয়েছে—“وَّ الۡجِبَالَ اَوۡتَادًا”—আর পাহাড়গুলোকে করেছি খুঁটির মতো।
কুরআনের বর্ণনায় পৃথিবী এমন এক সত্তা যা নড়াচড়া করে, কাঁপে, কখনো ঝাঁকুনি দেয়। আর পাহাড়গুলো সেই জমিনকে স্থির রাখার জন্য যেন পেরেকের মতো কাজ করে—যা তাকে ধরে রাখে এবং স্থিতিশীলতা দেয়।
আরবিতে “পৃথিবী” বোঝাতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয় তা স্ত্রীবাচক ধরণের। অন্যদিকে “পাহাড়” শব্দটি পুরুষবাচক ধরণের। পৃথিবীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—সে উৎপাদন করে। গাছ, লতা, শস্য, ফল—সবকিছুই তার বুক থেকেই বেরিয়ে আসে। এই কারণেই তাকে “মিহাদ” বলা হয়েছে। “মিহাদ” শব্দের একটি অর্থ হলো মায়ের কোলে শিশুর বিশ্রামের জায়গা।
একইভাবে মানব সমাজে পুরুষকে সাধারণত পরিবারের দায়িত্ব বহনকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে—যে পরিবারের জন্য উপার্জন করে, স্থিরতা বজায় রাখে এবং শৃঙ্খলা রক্ষা করার চেষ্টা করে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আল্লাহ প্রথমে পৃথিবী ও পাহাড়ের সম্পর্কের কথা বলেন, তারপরই বলেন—“وَخَلَقْنَاكُمْ أَزْوَاجًا”—“আর আমি তোমাদেরকে জোড়া জোড়া করে সৃষ্টি করেছি।”
এখানে যেন এক অসাধারণ চিত্র ফুটে ওঠে। কল্পনায় ধরুন—অসীম বিস্তৃত পৃথিবী, আর তার বুকের উপর সুউচ্চ পাহাড় দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
এই অংশের শেষ দিকে আল্লাহ আবার আকাশের কথা উল্লেখ করেন। আর আকাশে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো জিনিস হলো সূর্য। অর্থাৎ, শুরুতে বিস্তৃত জমিন ও তার উপর পাহাড়, আর শেষে বিশাল আকাশ ও তার মাঝে উজ্জ্বল সূর্য—এইভাবে শুরু ও শেষ দুটোতেই একটি করে জোড়া তুলে ধরা হয়েছে। মাঝখানে আরেকটি জোড়া—মানুষের মধ্যে নারী ও পুরুষ।
এরপর বলা হয়েছে:
“وَّ جَعَلۡنَا الَّیۡلَ لِبَاسًا”—আমি রাতকে বানিয়েছি আচ্ছাদন।
“وَّ جَعَلۡنَا النَّهَارَ مَعَاشًا”—আর দিনকে বানিয়েছি জীবিকা অর্জনের সময়।
এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, একদিকে নারী-পুরুষের জুটি, আর অন্যদিকে রাত ও দিনের জুটি।
আরেকটি জায়গায়, Surah Al-Lail-এ আল্লাহ বলেন:
“وَالَّيْلِ إِذَا يَغْشَىٰ” — কসম রাতের, যখন তা সবকিছু ঢেকে দেয়।
“وَالنَّهَارِ إِذَا تَجَلَّىٰ” — কসম দিনের, যখন তা উদ্ভাসিত হয়।
“وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالْأُنثَىٰ” — এবং কসম তাঁর, যিনি পুরুষ ও নারী সৃষ্টি করেছেন।
দিন-রাতের সম্পর্ক গভীরভাবে বুঝতে পারলে নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়েও অনেক কিছু উপলব্ধি করা যায়।
কুরআনে রাতকে পোশাকের সাথে তুলনা করা হয়েছে। বৈবাহিক সম্পর্কেও এই ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পাশে দাঁড়াবে, একে অপরকে সমর্থন করবে, একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠ থাকবে এবং পরস্পরের ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখবে। যেমন পোশাক মানুষের শরীরকে আড়াল করে, তেমনি দাম্পত্য সম্পর্কও ব্যক্তিগত বিষয়গুলোকে সুরক্ষিত রাখে।
স্বামী-স্ত্রী একে অপরের রক্ষাকবচও। ধরুন রান্না করার সময় হঠাৎ গরম তেলের ফোঁটা ছিটকে এলো। যদি পোশাক থাকে, তা আগে পোশাকে লাগে এবং শরীরকে রক্ষা করে। ঠিক তেমনই, কেউ যদি আপনার জীবনসঙ্গীকে কষ্ট দেয় বা অপমান করে, তখন আপনি তার পাশে দাঁড়ান—যেন আঘাতটা আপনার উপর পড়ে, তার উপর নয়।
এটাই একে অপরের জন্য “পরিচ্ছদ” হওয়ার বাস্তব অর্থ।
এই সম্পর্কের মধ্যে আছে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা, মানসিক বন্ধন, সুরক্ষা, গোপনীয়তা এবং পরস্পরের প্রতি আন্তরিক বোঝাপড়া। পোশাক যেমন শরীরের সুন্দর অংশ যেমন ঢেকে রাখে, তেমনি অসম্পূর্ণ অংশও লুকিয়ে রাখে।
তেমনিভাবে দাম্পত্য জীবনে কিছু সৌন্দর্য আছে যা শুধু দুজনের জন্যই নির্দিষ্ট। আবার কিছু দুর্বলতা আছে যা কেবল একজন সঙ্গীই জানবে—সেগুলো অন্য কারো জানার প্রয়োজন নেই।
রাত যেমন পৃথিবীকে ঢেকে রাখে, তেমনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের এই দিকগুলোও শুধুই স্বামী-স্ত্রীর গোপন বিষয়।
কিন্তু দিন তো সবকিছু দৃশ্যমান করে দেয়। তাই আল্লাহ বলেছেন—দিন হলো জীবিকা অর্জনের সময়।
বাস্তব জীবনে একজন পুরুষ বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারবে না যদি ঘরের ভেতরে তার সঙ্গীর সহযোগিতা না থাকে। আবার কখনো দুজনকেই কাজ করতে হয়। এমন উদাহরণ সাহাবাদের যুগেও ছিল—পুরুষ ও নারী একসাথে বাগানে কাজ করত।
জীবনের বাস্তবতা হলো—পরস্পরকে সহযোগিতা করতে হবে। আজ কে সন্তানকে স্কুল থেকে আনবে, কে রান্না করবে, কে বাসন পরিষ্কার করবে—এসব বিষয় দুজন মিলে ঠিক করতে হয়।
আমি আসলে কী বোঝাতে চাইছি? দায়িত্বের কথা।
বিয়েতে শুধু ভালোবাসা থাকে না; দায়িত্বও থাকে।
দুঃখের বিষয়, অনেক মুসলিম দাম্পত্য জীবনে বিষয়টি কেবল দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। আর ডেটিং সংস্কৃতিতে থাকে শুধু আবেগ ও ভালোবাসা।
কুরআন কিন্তু এই দুইটিকে একত্র করেছে—ভালোবাসা ও দায়িত্ব।
অর্থাৎ, দায়িত্বের সাথে ভালোবাসা।
বাস্তবে দায়িত্ব পালন করা সহজ নয়। কাজ করতে করতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দিনের শেষে তাই রাতের প্রয়োজন হয়—বিশ্রাম নেওয়ার জন্য, নতুন শক্তি পাওয়ার জন্য।
যদি রাতে সেই বিশ্রাম না পাওয়া যায়, তবে পরের দিনের দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে যায়। আবার যদি দিনে কাজ না করা হয়, তবে আরামদায়ক রাতও পাওয়া যায় না।
অর্থাৎ, দুটো একে অপরের উপর নির্ভরশীল।
এই আলোচনার শুরুতে ছিল পৃথিবী ও পাহাড়। শেষে ছিল আকাশ ও সূর্য। কিন্তু মাঝখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে—আল্লাহ বলেন:
“وَّ جَعَلۡنَا نَوۡمَكُمۡ سُبَاتًا”—“আমি তোমাদের ঘুমকে এমন কিছু বানিয়েছি যা তোমাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়।”
এখানে আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই পুরো অংশে প্রায় সবকিছুই জোড়ায় জোড়ায় এসেছে:
পৃথিবী-পাহাড়
আকাশ-সূর্য
পুরুষ-নারী
দিন-রাত
কিন্তু ঘুমের সাথে তার জোড়া—জাগ্রত থাকা—সেটা সরাসরি বলা হয়নি।
কারণ, মানুষ নিজেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।
কুরআনে ঘুমকে অনেক সময় মৃত্যুর সাথে তুলনা করা হয়েছে। যেমন ঘুম থেকে আমরা আবার জেগে উঠি, তেমনি মৃত্যুর পরও একদিন আমরা জেগে উঠব—বিচারের দিনে।
সেদিনের জাগরণ হবে চূড়ান্ত জাগরণ। এরপর আর কোনো ঘুম থাকবে না। জান্নাতে কেউ ক্লান্ত হবে না, তাই সেখানে ঘুমের প্রয়োজনও হবে না।
আর জাহান্নামের অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে—
“لَا يَمُوتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَىٰ”—সেখানে সে না মরবে, না প্রকৃত অর্থে বাঁচবে।
এইভাবে কুরআন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী যুক্তির মাধ্যমে মানুষের সামনে আখিরাতের বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
নোমান আলী খান।