27/07/2026
— "আপনার স্ত্রীর নাম?"
রিসেপশনে বসা লোকটার প্রশ্ন শুনে আমি উত্তর দেওয়ার আগেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা শান্ত গলায় বলল,
— "উনি আমার স্বামী নন।"
একটা মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল।
আমি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালাম।
চার বছর আগে এই মেয়েটাই আমার হাত ধরে বলেছিল,
— "তুমি ছাড়া অন্য কাউকে কোনোদিন স্বামী বলে ডাকব না।"
আজ সে অন্য একজনের স্ত্রী।
আর আমি...
আমি শুধু একজন অপরিচিত মানুষ।
হাসপাতালের করিডোরে নীরবতা নেমে এলো।
সে চোখ নামিয়ে বলল,
— "কেমন আছো?"
আমি ঠোঁটে হাসি এনে বললাম,
— "ভালো। তুমি?"
সে মিথ্যে হাসল।
— "আমিও ভালো।"
আমরা দুজনেই জানতাম, দুজনের হাসিই মিথ্যে।
চার বছর আগে...
আমাদের পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতায়।
প্রথমে তর্ক, তারপর বন্ধুত্ব, তারপর ভালোবাসা।
মেঘলা ছিল খুব সাধারণ একটা মেয়ে।
সে বলত,
— "আমার বড় বাড়ি লাগবে না। শুধু এমন একজন মানুষ চাই, যে কোনোদিন হাত ছেড়ে যাবে না।"
আমি বলতাম,
— "আমি যদি ছেড়ে যাই, তাহলে আমার শ্বাসও থেমে যাবে।"
দুই পরিবারে কথা হয়েছিল।
বিয়ের দিনও ঠিক হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু বিয়ের মাত্র বিশ দিন আগে বাবা ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হলেন।
চিকিৎসার জন্য সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গেল।
চাকরিটাও হারিয়ে ফেললাম।
মেঘলার বাবা সোজা বলে দিলেন,
— "যে ছেলে নিজের বাবার চিকিৎসা চালাতে পারে না, সে আমার মেয়েকে কীভাবে সুখে রাখবে?"
আমি অনেক অনুরোধ করেছিলাম।
শুধু ছয় মাস সময় চেয়েছিলাম।
কিন্তু কেউ শুনল না।
মেঘলা সেদিন আমার সামনে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,
— "চলো পালিয়ে যাই।"
আমি মাথা নেড়েছিলাম।
— "না। আমি চাই না, তোমার বাবার মাথা নিচু হোক।"
সে রাগে কেঁদে বলেছিল,
— "তাহলে তুমি আমাকে ভালোবাসো না।"
আমি উত্তর দিইনি।
কারণ কিছু ভালোবাসার উত্তর নীরবতাই হয়।
দুই মাস পর তার বিয়ে হয়ে গেল।
আমি দূর থেকে শুধু দেখেছিলাম।
তারপর শহর ছেড়ে চলে গেলাম।
দিন-রাত পরিশ্রম করলাম।
একটা ছোট ব্যবসা শুরু করলাম।
অসংখ্য ব্যর্থতার পর একদিন সফল হলাম।
কিন্তু সাফল্য মানুষকে সবকিছু দেয় না।
কিছু শূন্যতা থেকে যায়।
মেঘলার জায়গাটা ঠিক তেমনই ছিল।
..
আজ এত বছর পর আবার দেখা।
সে হাসপাতালে এসেছে তার শাশুড়িকে নিয়ে।
আমি এসেছি বাবার নিয়মিত চেকআপ করাতে।
হঠাৎ চোখে চোখ।
দুজনেই থেমে গেলাম।
ক্যান্টিনে বসে চা খেতে খেতে সে বলল,
— "তুমি বিয়ে করেছ?"
আমি মাথা নাড়লাম।
— "না।"
সে বিস্মিত হয়ে বলল,
— "কেন?"
আমি মুচকি হেসে বললাম,
— "সব প্রশ্নের উত্তর দিলে গল্প শেষ হয়ে যায়।"
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "আমি অনেকবার জানতে চেয়েছি, তুমি কেন আমাকে সেদিন থামাওনি।"
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম,
— "কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসতাম।"
সে অবাক হয়ে তাকাল।
আমি বললাম,
— "ভালোবাসা মানে শুধু নিজের করে পাওয়া নয়। কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়াও ভালোবাসা।"
তার চোখ ভিজে উঠল।
— "জানো, বিয়ের দিন কাবিননামায় সই করার আগে শেষবার তোমার ফোনের অপেক্ষা করেছিলাম।"
আমি তিক্ত হেসে বললাম,
— "আমি ফোন করেছিলাম।"
— "সত্যি?"
— "হ্যাঁ। কিন্তু তোমার নম্বর বন্ধ ছিল।"
সে মাথা নিচু করে বলল,
— "বাবা আমার ফোন নিয়ে নিয়েছিলেন।"
দুজনেই চুপ।
কেউ কাউকে দোষ দিলাম না।
কারণ সময়ের কাছে আমরা দুজনেই হেরে গিয়েছিলাম।
ঠিক তখনই সাত-আট বছরের একটা মেয়ে দৌড়ে এসে মেঘলাকে জড়িয়ে ধরল।
— "মা, দাদু ডাকছে।"
মেঘলা মেয়েটার মাথায় হাত রেখে বলল,
— "এটা আমার মেয়ে, রিধি।"
রিধি আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আঙ্কেল, আপনি কাঁদছেন?"
আমি দ্রুত চোখ মুছে হেসে বললাম,
— "না মা, চোখে একটু ধুলো গেছে।"
মেয়েটা নিজের ছোট্ট রুমালটা আমার হাতে দিয়ে বলল,
— "এটা দিয়ে মুছে নিন।"
আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না।
রুমালটা হাতে নিয়ে শুধু হাসলাম।
বিদায় নেওয়ার সময় মেঘলা ধীরে বলল,
— "হয়তো অন্য কোনো জন্মে আমরা একসঙ্গে থাকব।"
আমি শান্ত গলায় বললাম,
— "না... অন্য জন্মের অপেক্ষা করব না। এই জন্মেই তোমার সুখের জন্য দোয়া করব।"
সে চলে গেল।
আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
হাসপাতালের ভিড়ে মানুষ আসছিল, মানুষ যাচ্ছিল।
শুধু একটা জিনিস আর ফিরে এল না—
যে ভালোবাসাটা একদিন বিয়ের আগেই সংসারের স্বপ্ন দেখেছিল।
সেদিন বুঝেছিলাম—
কিছু মানুষের সঙ্গে বিয়ের পর প্রথম দেখা হয়, কিন্তু শেষবারের মতো হারিয়ে যাওয়াটা আসলে তারও অনেক আগে হয়ে যায়।
অনুগল্প: #হঠাৎ_দেখা।
লেখক: #মি_হাসিব