15/06/2021
🍂 কবি ফররুখ আহমেদ স্মরণে
🔸যে মানুষটার অকালমৃত্যুতে জাতির বিবেক ঘুমিয়ে ছিলো, যাকে চিনতে পারেনি মৃত্যুর প্রায় অর্ধশতাব্দী পার হলেও | যার প্রাপ্য কৃতিত্বটুকুনও মূল্যায়ন করেনি জীবিত কিংবা মৃত্যুর পরে এ জাতি | সেই কবি ফররুখ আহমদ বাংলা কাব্য -সাহিত্যের জন্যে কত কি যে করেছেন | আমৃত্যু খেটেখুটে গেছেন তা মূল্যায়ন তো দূরের কথা, কেউ কেউ স্বীকৃতি দিতেও নারাজ | এর একটাই কারণ তিনি এক বিশেষ কাব্য -ধারার অনুসারী এবং নিজস্ব একটা আদর্শ আর ভাবধারায় স্থির ও বিশ্বাসি ছিলেন |
তাঁর কাব্যের দেহে প্রতিবাদের বারুদমাখা বুলেট ছিলো | শোষিতদের বিরুদ্ধ অসহ্যের চিৎকারের পরিবেশে তৈরী করতে পেরেছিলন তিনি | যারা বিপরীত পথে হেঁটেহুটে লুটেপুটে হয়রান হয়েছিল তারাও কবির কবিতায় ধর্মীয় চেতনা ও ঐতিহ্যের একটা অনাবিল স্বাদ নিতে বুঁদ হয়ে থাকতো |
সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর সৃষ্টির প্রতি কবির বিশ্বাস, ভাবাদর্শ ও উপলব্ধি এতই প্রগাঢ় ও আন্তরিক যে তাঁর বহু কবিতা হয়ে উঠেছে উজ্জ্বল, উচ্ছল ও হৃদয়স্পর্শী | অনড় বিশ্বাস আর আবেগের তোড়ে তিনি খাঁটি কবিতার সীমা লঙ্ঘন করেননি কখনও | দীর্ঘ বক্তব্যের কারণে অনেক সময় কবিতার খেই হারিয়ে ফেলে, বেঘাত ঘটে ছন্দে, কথায় কিন্তু ফররুখ আহমদের বেলায় তা হয়নি |
বিশুদ্ধতায় মোড়া আগাগোড়া যে কবি এসব তার অন্যতম প্রধান লক্ষণ | বিক্রি হয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরের দামে তিনি কখনও আপোষ করেননি| খাঁটি কবির এসব লক্ষণ তাঁর কবিসত্তার মর্মমূলে সব সময় প্রতীয়মান হয়েছে | তার কবিতা, কবিতার প্রচার প্রসার হারায়নি কখনো এটা তাঁর ও পাঠকদের সৌভাগ্যের ফসলও বটে |
ফররুখ আহমদ সমসাময়িক কবিরদের মধ্যে সবচে বেশি স্বতন্ত্র ও একক বিশিষ্ট ছিলেন | তাকে সরাসরি কোনো দলের বা কাতার বন্দী করা যায় না | যাদের মধ্যে বেদনাবোধ আছে তারা এবং তাঁর বিপরীতমনারাও কবির মৃত্যুর পরে আজ পর্যন্ত যে ভীষণ শূন্যতা রেয়েই গেছে তা অনুভব করে | তাঁর শূন্যস্থান এত বছরে পুরোন হয়নি আর হবেও না কখনও |
কবি ফররুখ আহমদ একজন বিশেষ ইসলামিক ঐতিহ্যানুসারীই ছিলেন না, একজন ঐতিহ্যানুসন্ধানীও ছিলেন বটে | তিনি চেয়ে ছিলেন বাংলা কাব্য সাহিত্যে নতুন ঐতিহ্য নির্মাণ করতে এবং করে গেছেনও | কবি তাঁর সৃজনশীলতাকে ইসলামের হারানো ঐতিহ্য ও তার নানা অলিগলিতে সীমাবদ্ধ রেখেছেন | চেতনার ফুয়েল জ্বালিয়েছেন পতাকাবাহীর চিন্তায়, কাজে কর্মে | দ্বীনের মিনার সব সময় উঁচু করতেই যত প্রচেষ্টা ছিলো | এ অভাগা জাতির জন্যে একজন পাঞ্জেরী খুঁজেছেন আমৃত্যু | সিন্দবাদ, হাতেম, নৌফেল ও শাহেরজাদী ইত্যাদি নাম- চরিত্র তাঁর কাব্যের অনুষঙ্গ বানিয়েছেন বারবার |
সবচে মজার ব্যপার হলো ইংরেজ যুগ, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ- এ তিন সংঘাতের মুখেও অনেক ঝড়- ঝাপটায় অনেকেই নড়বড়ে হয়েছেন, লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিলেন | তবে তাঁর মন নাও সত্যের সমুদ্রে নোঙর করে স্থির ছিলেন | তুমুল ঝড়েও একাৎ ওকাৎ হননি | যিনি অবিচল তাঁর লক্ষ্যে ও আদর্শে | আর এটাই ছিলেন কবি ফররুখ আহমদ| এটাই বাংলা সাহিত্যে এক বিরল দৃষ্টান্ত |
স্বদেশের প্রকৃতিও তাকে মুগ্ধ করেছে ভীষণ | চারিদিকের মানুষের দুঃখ -দুর্দশায় কবি মন আলোড়িত হয়েছে বহু কবিতা ও সনেটে | তবে সবচে নিখুঁত দৃষ্টিতে ধ্রুবতারা হয়ে তার মনে ফুটেছিল ইসলামের সুশৃঙ্খল সুগন্ধী ফুল | যা তাঁর বইয়ের পাতায় পাতায় দোলা দেয় | যা পৃথিবীর আনাচেকানাচে সুরভি ছড়ায় এখনও | কতজনই আমৃত্যু কবির কবিতার নিমগ্ন পাঠক!
কবিতা লিখতে যে দীর্ঘপ্রস্তুতি, ব্যপক জানাশোনা, শুদ্ধদৃষ্টি লাগে কবি-মানসের অধিকারী হতে হয় তা তাঁর সব ছিলো | ইসলামের সুশৃঙ্খল সুগন্ধী মেখেও তিনি সাহিত্যের সব শাখায়, স্রোতে ভেসেছেন, লিখেছেন এটাও একটা বিরলতা বটে | তার বিশুদ্ধ কবি মানসিকতা তাঁকে আরও উজ্জ্বল করেছে সবার মাঝে | তাঁর শব্দভান্ডার বাংলা সাহিত্যে সম্পদ বাড়িয়েছে | যার ব্যপকতা আমাদের সাহিত্যের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ |
কবি ফররুখ আহমদ একজন শক্তিমান,একনিষ্ঠ, সমৃদ্ধশালী কবি, একনাগারে একজন মুসলিম বুদ্ধিজীবীও ছিলেন | কবির বর্ণাঢ্য সৃষ্টি আমাদের সাহিত্যাঙ্গন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে শুধু ঔদাসীন্য ও চর্চাহীনতার কারণে | সামাজিকভবে আমরা তার কবি, কবিস্বত্তার ও কবিতার প্রতি অনীহা প্রকাশ করে আছি শুধু তাঁর ইসলামী বিশ্বাসের কারণে | ফররুখ আহমদকে আমাদের বেশি বেশি চর্চা করতে হবে | আমাদের তরুণদের কাছে তুলে ধরতে হবে তার লেখা ও কবিসত্তা |
দুঃখের বিষয় হলো যে মানুষটা নিজের জন্যে, পরিবারের জন্যে কিচ্ছু ই করেননি শুধু বাংলা সাহিত্যের জন্যে, এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্যে, স্বদেশের প্রকৃতি ধারণ করেছেন গেছেন তাঁর মানসপটে| সে আগাগোড়া নৈতিক মানুষটাকে আমরা ভালোবাসতে পারিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ও পরবর্তী সময়েও | এটা ব্যপক লজ্জাজনকও বিষয় | আহমদ সফা এ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন কবি ও কবি পরিবারের সাথে সে সময়ের আচরণ কেমন করা হয়েছিল! অতিসম্প্রতি দেখলাম কবির শেষ স্মৃতিচিহ্ন তাঁর বসতভিটাটুকুও কেঁড়ে নেয়া হচ্ছে| সত্যিই আমরা জাতি হিসেবে খুব লজ্জিত |
কবির মৃত্যুর পর সে সময়ে সবচে বেশি যে তরুণটি সবার প্রথমে অসহায় কবি পরিবারের সাহায্যে এগিয়ে এসে উদ্যোগ নিয়েছেন এবং তাঁর হারাতে বসা সাহিত্যকর্ম সংকলনে ভূমিকা নেন তিনি হলেন মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান | তার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং আরও কয়েকজন উদ্যোমী তরুণ কবি মিলে একটা সেরা কাব্য সংকলনও বের করেছেন | যার নাম দেয়া হয়েছে 'ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা' | সে কাব্য সংকলন নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করেছেন সেসময়কার তরুণ কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ | তাকে লেখা নির্বাচনে, মুদ্রণ ও প্রকাশনার জন্যে সহায়তা করেছেন মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, ফজল শাহাবুদ্দীন ও ফজল মাহমুদ সহ আরও অনেকে| এ সকল মানুষদের কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞতা | পরিশেষে প্রিয় কবির রুহের মাগফেরাত কামনা করছি | মহান আল্লাহর কাছে জান্নাতের সুউচ্চ মাকামের জন্যে দুআ রাখছি |
🌿লিখেছেনঃ
মিজান রহমান বর্ণ
(লেখক ও সাহিত্যিক)