11/08/2026
হজ্বের উপলব্ধি ১৩
আমার হজ্ব ঠিক কখন ফরজ হয়েছিল? আল্লাহ ভালো জানেন। কিন্তু আমি নিজে নিজে যখন হিসেব করতে বসি তখন মনে হয় কি গাফেল আমি! অনেক আগেই বোধহয় আমার হজ্ব ফরজ হয়ে গেছিল। আমি বুঝতেই পারলাম না। 😰😰
ঘটনাটা খুলে বলি।
হজ্বের যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন বেশ লেকচার শুনতে শুরু করলাম। শুনতে শুনতে জানতে পারলাম হজ্ব একজন মুসলিমের উপর কখন কিভাবে ফরজ হয়। তো সেই অনুযায়ী হিসেব করতে বসলাম।
ষোল হাজার টাকা বেতন দিয়ে যে চাকরি শুরু করেছিলাম সেই চাকরি একসময় খুব ভালো একটা ইনকাম ফোর্স হয়ে উঠলো। জীবনে খেয়ে পরে দায়িত্ব চিকিৎসা সামাজিকতা সেরে হাতে উদ্বৃত্ত থাকা শুরু হলো। এই সময়ের হঠাৎ অফার এলো জায়গা কেনার। হিসাব নিকাশ করে দেখা গেল কিস্তি দেয়া সম্ভব। তো জায়গায় ইনভেস্টমেন্ট শুরু হলো।
সেই ইনভেস্টমেন্ট হতে হতে মাস্টার্সে ক্লাস নেয়া শুরু করলাম। নতুন কিছু আয় যোগ হলো। সবাই পরামর্শ দিলো ডিপিএস করো। এই করতে করতে অষ্ট্রেলিয়া আসার সময় হয়ে গেল। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রহমতে স্কলারশিপের কারণে প্লেন ফেয়ার ছাড়া তেমন কোন বড় খরচ লাগলোই না। দেশ থেকে আসার সময় উল্টো জমানো অর্থ নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিলাম। তার উপর আছে বিয়ের গহনা।
একবারো ভাবলাম না আচ্ছা হিসেব করে দেখি আমাদের জন্য হজ্ব ফরজ হয়েছে কিনা। একবারো ভাবলাম না জীবনে যত যাই ই করি না কেন আল্লাহর ঘরে যাওয়াটাই প্রথম কাজ যখন সেটা ফরজের আওতায় চলে আসে। আর হজ্ব তো কোন খরচ নয়, সেটা ইনভেস্টমেন্ট। দুনিয়ার সেরা ইনভেস্টমেন্ট...
কেন এত গাফিলতি?
"শুধু গাফলতে শুধু খেয়ালের ভুলে দরিয়া অথই ভ্রান্তি নিয়াছি তুলে"
ফররুখ ঠিক বলেছেন। জ্ঞানের অভাব। বোঝার অভাব। কনভেনশনাল চিন্তা। সব কাজ শেষ করে তারপর হজ্ব করতে যাবো। বাবা শ্বশুর আনকেল আম্মা চাচী সবাই বৃদ্ধ বয়সে হজ্ব করেছেন এবং এটাই স্বাভাবিক। এইসব ভাবা...
আর এইসব যখন ভাবছিলাম বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। যদি হজ্ব করার আগে মরে যেতাম? যদি আর্থিক অবস্থা অবনতি হতো? যদি অসুস্থ হয়ে যেতাম? যদি অন্য কোন বিপদ হতো?
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনেক বড় বাঁচা বাঁচিয়েছেন। যে জীবন দুনিয়ার হাজারো কাজের মাঝে তাকে প্রায়োরিটি দিতে শিখেনি সেই জীবনকে তিনি অবারিত রহমত দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এবং অবশেষে কাবায় পৌঁছানোর নিমন্ত্রণ করেছেন। তার অথিতি করেছেন। কি করে এই শুকরিয়া আদায় করবো?
কাবার সামনে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ ব্লাক আউট ছিলাম। বার বার নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিলাম আরো আগে কেনো আসিনি? কেন যে স্রষ্টাকে এক এবং অদ্বিতীয় বলে স্বীকার করে নিয়েছিলাম তার সাথে দেখা করতে এত দেরী হলো কেন? বিশ্বাসের সাথে রিকনসিলিয়েশনের জন্য কি আমার আরো আরো আগে আসা উচিত ছিলো না?
আফসোস! হৃদয় যতদিন কানায় কানায় পূর্ণ ছিল কাবার সামনে দাঁড়ানোর তারিখ ঠিক করতে পারিনি। যখনই হৃদয় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল শূন্যতা শূন্যতার ঘরের মাঝে নিজের অস্তিত্ব প্রতিধ্বনিত হতো প্রতি মূহুর্তে পাগল হয়ে গেলাম, কোথায় গেলে শান্তি পাই? আল্লাহর প্রয়োজন টের পেতে শুরু করলাম। অবাক হয়ে দেখলাম যে বাগান সাজাবো বলে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলাম সেই বাগান এই লহমায় ভেঙে চুরে নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে! এক মূহুর্তের ধনী আমি ভিখিরি হয়ে যেতে পারি। এক নিমিষেই সব ধূলোয় মিশে যেতে পারে!
তো কিসের জন্য এত মোহ এত আলাভোলা হয়ে থাকা?
তাহলে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সত্যি কথা যে ভগ্ন হৃদয় তার প্রভুর কাছে সবচেয়ে প্রিয়? মহান আল্লাহ আমাদের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণায় নিমজ্জিত করেন যেন আমরা তার কাছে ফিরে আসি?
হয়তো এটাই আমার জন্য লেখা ছিল। আমি দুঃখের সাগরে ভাসতে ভাসতে আল্লাহর মেহমান হয়ে । ভিখিরি হয়ে। মিসকীন মুসাফির হয়ে তার কাছে পৌঁছাবো। তা না হলে কি করে বুঝতাম জীবনের মানে কি? জীবনে কার মুখাপেক্ষী হয়ে হয়? মানুষ ক্ষণিকের সঙী মাত্র...
আসলেই তো আমি কি? আল্লাহর সামনে একজন ভিখিরি। আমার কেউ নেই আমার কিচ্ছু নেই। আমি তুচ্ছ ক্ষুদ্র নগন্য। আর তুচ্ছ তার রক্ষাকবচ সর্বোচ্চ উচ্চতার প্রভু মহান রব। আল্লাহ তাআলা।
এই যে এত কথা লিখছি, কেন? পাঠক, হিসেব করতে পারলে হিসেবের সময় এলে এখনই হিসেবে করতে বসে পড়ুন। আপনার জন্য হজ্ব ফরজ হয়েছে কিনা! হজ্ব ফরজ হলে ওমরাহ করবেন না। ফরজ কাজ শেষ করে যত ইচ্ছে নফল করুন। আর হিসেবে করে যদি দেখেন আপনার হজ্ব ফরজ হয়নি, দোয়া করতে থাকুন। আশা করি আমার মতো গিলটি ফিলিংস এ ভুগতে হবে না: কেন এত দেরী করে ফেললাম কাবার সামনে আসতে! যদি দেরী না করতাম জীবন আরো অনেক সহজ হতো। বরকতময় হতো।
জানি না কি ভুলে হীরা ফেলে কাঁচ তুলে ভিখিরি সেজেছি আমি
আমার সেই ভুল প্রভু ভেঙে দাও।
হে আল্লাহ! আমাদের ছোট বড় সব গুনাহ মাফ করে দিন। আমীন।
উম্মে সালমা টুঅং ১২/০৭/২০২৬