29/06/2026
ছোট্ট নজরুলের মোটর গাড়ি চড়া
— বই পর্যালোচনা | রাহুল রায়
আমার মতো গ্রামে বেড়ে উঠা প্রায় সকলেরই শৈশব গুলো সহজ, সরল ও নির্মল। অনেকটা অপু-দূর্গার ছেলেবেলার মতো— গ্রামের আনাচে-কানাচে, বাঁশবাগানে, পুকুর পাড়ে ঘুরে বেড়ানো, ফড়িং ধরা এবং প্রকৃতির ছোটখাটো জিনিস নিয়ে খেলা করা। গ্রামে বায়োস্কোপওয়ালা এলে অবাক বিস্ময়ে বাক্সের ভেতরের রঙিন ছবি দেখা, কালবৈশাখীর ঝড় উঠলে ছুটে গিয়ে আম কুড়ানো ও বৃষ্টিতে ভেজা। আবার দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শুনে ছুটে গিয়ে রেললাইনের ধারে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকা। কীভাবে লোহার বিশাল দানবটি গর্জন তুলে শত শত মানুষকে বয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে। তখন মনে হত, ট্রেনটি যেন অচেনা এক জগতের প্রতিক।
দূর্ভাগ্যক্রমে দূর্গার রেললাইন দেখার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। পরে অবশ্য অপু ট্রেনে চড়েছিল। কিন্তু শৈশবের মতো সেই বিস্ময় আর কৌতূহলকে কি সে তখনও একই তীব্রতায় অনুভব করতে পেরেছিল? বোধহয় পারেনি। কারণ প্রথমবারের অভিজ্ঞতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অনন্য মুগ্ধতা। অজানার প্রতি যে টান আমাদের টেনে নিয়ে যায়, চেনা স্পর্শে তা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে। আর সেই কারণেই প্রথম অভিজ্ঞতাগুলো হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় স্মৃতি। তারা কেবল একটি মুহূর্তকে নয়, একটি সময়কে, একটি বয়সকে, একটি অনুভূতিকেও ধারণ করে রাখে।
তেমনি আরো এক অসাধারণ কবির শৈশব কেটেছিল আমাদের মতোই কৌতূহল আর স্বপ্নে ভরা দিনগুলোর মধ্যে। অথচ কালক্রমে ছোট্ট বালকটি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। দেশ-কাল ও প্রজন্মের সীমানা পেরিয়ে মানুষ তাঁকে চিনেছিল ‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলাম নামে। কিন্তু কেউ কি জানে, কেমন ছিল তাঁর বাল্যকালের বিস্ময়গুলো? কেমন ছিল প্রথমবার মোটরগাড়িতে চড়ার অভিজ্ঞতা? নতুন ও অচেনা যন্ত্রদানবকে দেখে তাঁর মনেই বা কি প্রতিক্রিয়া জেগেছিল?
অঙ্কিতা মহান্তীর সম্পাদনায় ‘ছোট্ট নজরুলের মোটর গাড়ি চড়া’ কমিক বইটি আমাদের সামনে তুলে ধরে এক ভিন্ন নজরুলকে। বড্ড বেশি প্রাণোচ্ছল, জেদি ও বেমানানপনা। দারিদ্র্য ও শোকময় শৈশবের কারণে আমরা নজরুল কে 'দুখু মিয়া' নামে মনে রেখেছি। কিন্তু এই কমিক বইয়ের পাতায় সেই পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে নতুন করে তিনি ধরা দেন। যিনি পাখির মতোই পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন দেশদেশান্তরের— চেনা পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে আরও দূরে, আরও অজানার দিকে।
মাথাভর্তি ঘন কোঁকড়ানো চুল, গায়ে সাদামাটা লাল পাঞ্জাবি ও পরনে সাদা ধুতি— এই সরল বেশভূষায় ছোট্ট নজরুল যেন বইয়ের পাতা ভেদ করে জীবন্ত হয়ে উঠেছেন। গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, বন্ধু শৈলকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েছেন কিছু একটা দেখতে। এলাকার আরও অনেক মানুষের মতো তাঁদের মনেও জেগেছে প্রবল কৌতূহল, তাই লোকজনের পিছু পিছু তাঁরাও এগিয়ে চলে। শৈল ম্যাজিস্ট্রেট রায় সাহেব চ্যাটার্জি মশাইয়ের নাতি; সচ্ছল পরিবারের সন্তান। কিন্তু সামাজিক অবস্থানের সেই ব্যবধান তাদের বন্ধুত্বের মাঝে কোনো প্রাচীর তুলে দিতে পারেনি।
বাড়ি ফেরার ফেরার পথে ঘটে যায় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। ভুল রাস্তায় এসে পড়া দুই ইংরেজকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেওয়ার সুবাদে ছোট্ট নজরুল ও শৈলর ভাগ্য জুটে যায় প্রথমবার মোটর গাড়িতে চড়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। কেমন ছিল সে অভিজ্ঞতা? মুহূর্তের মধ্যেই তাদের চারপাশের পৃথিবী যেন বদলে যায়। ঘরবাড়ি, গাছপালা, মাঠ-ঘাট সব পেছনে ফেলে গাড়ি ছুটে চলতে থাকে দুরন্ত গতিতে। বিস্ময়ে অভিভূত নজরুল বুঝতেই পারে না— ডানে তাকাবে, বাঁয়ে তাকাবে, নাকি সামনের পথের দিকে। চারপাশের সবকিছু যেন এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে দিয়ে ছুটে যাচ্ছে।
কমিক বইটির অন্যতম আকর্ষণ হল এর চিত্রায়ণ। ছোট্ট নজরুলের শৈশবের প্রতিটি মুহূর্তকে ধারাবাহিকভাবে এমন জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, পাঠক যেন শুধু পড়েন না, চোখের সামনে সেই ঘটনাগুলো ঘটতে দেখেন। সুমন মল্লিকের তুলিতে ছোট্ট নজরুল কখনো বিস্মিত, কখনো দুরন্ত, কখনো বা স্বপ্নমগ্ন— প্রতিটি অভিব্যক্তিই হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত। পথঘাট, ঘরবাড়ি, গাছপালা আর মানুষজনের চিত্রায়ণও এতটাই স্বাভাবিক ও বিস্তারিত যে, বইয়ের পাতায় যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে তৎকালীন বাংলার জনজীবন।
তবে এই চিত্রভাষাকে পূর্ণতা দিয়েছেন গল্পকার সুমনা মাজি। সুমন মল্লিকের আঁকা প্রতিটি দৃশ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তিনি ছোট্ট নজরুলের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও কৌতূহলকে সহজ অথচ সাবলীল ভাষায় বুনে গেছেন। ফলে শব্দ ও ছবি পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে এবং এক প্রাণবন্ত আখ্যানের জন্ম দিয়েছে।
সেই আখ্যানের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে ছোট্ট নজরুলের উদার ও সংবেদনশীল মন। বইটির অন্তিম পর্বে নিস্পাপ ছোট্টো নজরুল অনায়াসেই বলে বসে, “আসলে কী বল তো, একে অপরকে বোঝার জন্য শুধু ভাষা নয়, মানসিকতাও দরকার।” শিশুমনের এই সরল উপলব্ধিই যেন বইটির মূল বার্তা— একটি সহজ সত্য, যা আজও আমাদের সমাজকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।
বই : ‘ছোট্ট নজরুলের মোটর গাড়ি চড়া’
লেখা ও ছবি : সুমনা মাজি, সুমন কুমার মল্লিক
সম্পাদনা : অঙ্কিতা মহান্তী
সহযোগিতা : ত্রিদেব রুইদাস
প্রকাশক : হাতেখড়ি |
মূল্য : ৩০০