02/17/2026
সংবিধানে গণভোট বনাম বিএনপির অবস্থান: একটি সমালোচনা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণভোটের বিষয়টি সবসময়ই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সম্প্রতি বিএনপি যে এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে, তা বেশ কিছু কারণে সমালোচনার দাবি রাখে।
১. রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানই ১৯৭৭ সালে সংবিধানে গণভোটের বিধান যুক্ত করেছিলেন। আজ যখন সেই একই বিধানের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে, তখন সংবিধানের দোহাই দিয়ে এর বিরোধিতা করা দলটির রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। নিজের শেকড় বা আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে আসা জনগণের কাছে ভুল বার্তা দেয়।
২. জনগণের রায়কে ভয় পাওয়া?
গণভোট হলো সরাসরি গণতন্ত্রের একটি বহিঃপ্রকাশ, যেখানে জনগণ কোনো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সরাসরি 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোট দেয়। সংবিধানের অজুহাতে এর বিরোধিতা করার অর্থ দাঁড়াতে পারে যে, দলটি হয়তো জনগণের সরাসরি রায় নিতে ভয় পাচ্ছে অথবা তারা মনে করছে জনগণের মতামতের চেয়ে আইনি মারপ্যাঁচ বড়।
৩. সংবিধান কোনো অপরিবর্তনীয় ধর্মগ্রন্থ নয়
বিএনপি বলছে সংবিধানে এখন গণভোটের বিধান নেই (পঞ্চদশ সংশোধনীর পর)। কিন্তু সংবিধান স্থবির কোনো দলিল নয়। জনস্বার্থে এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করতে সংবিধান সংশোধন করাই যায়। সংবিধানের দোহাই দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আটকে রাখা প্রগতিশীল রাজনীতির পরিপন্থী।
৪. সংসদীয় একনায়কত্বের ঝুঁকি
গণভোটের বিধান না থাকলে ক্ষমতা কেবল সংসদের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক সময় সংসদ জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়। বিএনপি যদি কেবল সংসদীয় কাঠামোর ওপর নির্ভর করতে চায়, তবে তা পরোক্ষভাবে 'সংসদীয় একনায়কত্ব' বজায় রাখার পক্ষেই অবস্থান নেওয়া হয়, যা অতীতে বাংলাদেশের জন্য শুভ হয়নি।
৫. আস্থার সংকট
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যে আস্থার সংকট রয়েছে, তা কাটাতে গণভোট একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারত। এই সুযোগকে নাকচ করে দিয়ে বিএনপি আসলে রাষ্ট্র সংস্কারের যে দাবিগুলো তুলছে, তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সারকথা: সংবিধান রক্ষার দোহাই দিয়ে গণভোটের বিরোধিতা করা আদতে গণতন্ত্রের হাত-পা বেঁধে রাখার শামিল। জনগণের ক্ষমতায়নের চেয়ে আইনি জটিলতাকে বড় করে দেখা কোনো গণমুখী রাজনৈতিক দলের পরিচয় হতে পারে না।
কিসের এতো ভয়?
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে উনার বক্তব্য স্পষ্ট—আইনগত এখতিয়ার নেই, তফসিলে ফরম নেই, নির্ধারিত কেউ নেই। ঠিক আছে, আইনগত প্রক্রিয়া জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো:
যেখানে রাষ্ট্র সংস্কারের কথা হচ্ছে, সেখানে জনগণের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে কি কাগজের ফরম বড়?
এক সময় যারা গণভোটের প্রবর্তক ছিলেন, আজ তারা কেন সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনমত যাচাইয়ের (Referendum) বিরোধিতা করছেন?
'সংবিধান বিজ্ঞানী' সেজে কি আসলে সংস্কারের প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা চলছে?
দোহাই যখন ঢাল
সংবিধান কোনো স্থবির বা পবিত্র অপরিবর্তনীয় বস্তু নয় যে তাকে ছোঁয়া যাবে না। জনস্বার্থে সংবিধান পরিবর্তন করাই যায়। কিন্তু যখনই কোনো পরিবর্তনের কথা আসে, তখনই এই "আইনগত জটিলতা"র দোহাই দেওয়া আসলে দায়িত্ব এড়ানোর রাজনৈতিক কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।
জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত নেবে (গণভোট), নাকি কেবল গুটিকয়েক 'বিজ্ঞানী' আর নেতার ব্যাখ্যার ওপর রাষ্ট্র চলবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। সংবিধান জনগণের জন্য, জনগণ সংবিধানের জন্য নয়।
আশা করি, আমাদের 'সংবিধান বিজ্ঞানীরা' এই সহজ সত্যটা দ্রুত উপলব্ধি করবেন।