03/16/2026
দিনের বেলা ঘরের কাজ, আর রাতে মালিকের বিছানায় শরীর বিলিয়ে ঘুরলো ভাগ্যের চাকা। সৌদি আরবের তপ্ত দুপুরের রোদে রিয়াদ শহরের ধুলোবালি যখন রিয়া আক্তারের গায়ে লাগত, তখন তার মনে হতো এই তপ্ত বালুগুলো আসলে তার জীবনেরই এক একটা দীর্ঘশ্বাস। ২২ বছরের রিয়া, যার চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর রিকশার চাকা থেমে গেল, আর থেমে গেল রিয়ার জীবন। অসুস্থ মা আর ছোট ভাই-বোনদের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে সে পাড়ি জমালো সুদূর আরবে। দালালের মাধ্যমে কাজ পেল এক বিশাল অট্টালিকায়। বাড়ির মালিক ৩৬ বছরের আহমেদ আল-সাউদ।
শুরুটা ছিল একদম অন্যরকম। আহমেদ আল-সাউদ যেমন সুদর্শন, তেমনি তার ব্যক্তিত্ব ছিল গম্ভীর। কিন্তু তার চোখের গভীরে ছিল এক আদিম তৃষ্ণা। বিয়ের মাত্র দুই বছরের মাথায় ডিভোর্স হওয়া আহমেদ ছিলেন বড্ড নিঃসঙ্গ। রিয়া যখন প্রথম দিন তার ঘরে কফি নিয়ে গেল, আহমেদ তার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন রিয়া কোনো মানুষ নয়, বরং এক দামী শৌখিন পণ্য।
কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই শুরু হলো রিয়ার জীবনের সেই অন্ধকার অধ্যায়। একদিন রাতে আহমেদ তাকে নিজের শয়নকক্ষে ডেকে পাঠালেন। কোনো ভূমিকা ছাড়াই তিনি রিয়াকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন— এখানে থাকতে হলে শুধু ঘর মুছলে হবে না, মালিকের একাকীত্বও দূর করতে হবে। রিয়া কেঁদেছিল, প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু আহমেদ ঠান্ডা মাথায় তাকে মনে করিয়ে দিলেন, “তোমার মা’র অপারেশন আর ভাইয়ের পড়াশোনার টাকা তো আমিই দিচ্ছি। তুমি কি চাও তারা আবার রাস্তায় নামুক?”
রিয়ার কাছে তখন কোনো পথ ছিল না। নিজের পরিবারের বাঁচার তাগিদে সে নিজের শরীরটাকে আহমেদের হাতে সঁপে দিল। দিনের বেলা সে ছিল সাধারণ হাউজমেইড, আর রাত বাড়লে সে হয়ে উঠত আহমেদের কামনার খোরাক। আহমেদ তাকে ব্যবহার করতেন ঠিক যেভাবে একজন মানুষ তার দামী খেলনা ব্যবহার করে। রিয়ার ‘ইনার কনফ্লিক্ট’ বা মানসিক দ্বন্দ্ব তাকে ছিঁড়ে খাচ্ছিল। সে যখন দেশে টাকা পাঠাত, তখন তার মনে হতো সেই টাকাগুলো যেন তার সতীত্বের রক্তে ভেজা। সে আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পারত না।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, লালসার এই সম্পর্কটা ধীরে ধীরে মায়ার দিকে মোড় নিতে শুরু করল। আহমেদ খেয়াল করলেন, রিয়া কেবল একজন নারী নয়, সে বড্ড যত্নশীল। একদিন আহমেদ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার বাড়ির অন্য কাজের লোকেরা কেবল নিজেদের ডিউটি পালন করছিল, কিন্তু রিয়া সারারাত জেগে আহমেদের মাথায় জলপট্টি দিল, তাকে নিজের হাতে সুপ খাইয়ে দিল। আহমেদ যখন জ্বরের ঘোরে কাঁপছিলেন, রিয়া তখন জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে তার সুস্থতা চেয়েছিল।
আহমেদ অবাক হলেন। তিনি সারা জীবনে অনেক নারী দেখেছেন, কিন্তু এমন নিঃস্বার্থ সেবা আর মায়া কারো কাছে পাননি। তিনি বুঝতে পারলেন, যে মেয়েটাকে তিনি এতদিন কেবল ভোগ করেছেন, সেই মেয়েটার হৃদয়ে এক সমুদ্র সমান ভালোবাসা আছে। আহমেদের পাথরের মতো শক্ত মনে প্রথমবার ভালোবাসার অঙ্কুর গজাল।
একদিন রাতে আহমেদ রিয়াকে ডেকে বললেন, “রিয়া, আমি জানি আমি তোমার সাথে পশুর মতো ব্যবহার করেছি। কিন্তু আমি আজ তোমাকে এক নতুন পরিচয় দিতে চাই। তুমি কি আমাকে ক্ষমা করে আমার স্ত্রী হবে? আমি তোমাকে আর পণ্য হিসেবে নয়, আমার বিবি হিসেবে দেখতে চাই।”
রিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। যে হাতগুলো তাকে এতদিন অবহেলায় ছুঁয়েছে, সেই হাতগুলো আজ সম্মানের সাথে তার হাত ধরল। রিয়া দেখল, তার ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ হয়তো তাকে এক নতুন জীবন দিতে চাইছেন। সে রাজি হলো। আহমেদ তার নাম রাখলেন ‘রিহাম’। খুব ঘরোয়াভাবে তাদের বিয়ে হলো।
বিয়ের পর রিয়ার জীবন যেন কোনো রূপকথার গল্প। আহমেদ তাকে প্রতিদিন অঢেল টাকা দিতেন—কখনো ৫০০০ রিয়াল, কখনো ১০০০০ রিয়াল। আহমেদ বলতেন, “এটা তোমার হকের টাকা। তোমার পরিবারকে পাঠাও, তাদের সব কষ্ট দূর করো।” রিয়া দেশে টাকা পাঠাল, মায়ের সুচিকিৎসা করাল, ভাই-বোনদের সেরা স্কুলে ভর্তি করাল। যে রিয়া একদিন বাসি রুটি খেয়ে রাত কাটিয়েছে, সে আজ রিয়াদের সবচেয়ে দামী রেস্তোরাঁয় ডিনার করে।
আহমেদ এখন রিয়াকে নিয়ে দুবাই, কাতার আর ইউরোপে ঘুরে বেড়ান। রিয়া এখন আর হাউজমেইড নয়, সে এখন আহমেদ আল-সাউদের ‘মালিকা’। তবে রিয়া ভোলেনি তার অতীত। সে আজও যখন হীরা-জহরত পরে আয়নার সামনে দাঁড়ায়, তখন তার মনে পড়ে সেই অন্ধকার রাতগুলোর কথা। সে জানে, এই সুখের পেছনে অনেক চোখের জল আর বিসর্জন লুকিয়ে আছে।
এখন রিয়া প্রবাসে থেকেও তার গ্রামের মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণা। সবাই ভাবে রিয়া কত ভাগ্যবতী! কিন্তু রিয়া জানে, ভাগ্যের এই পরিবর্তনটা কোনো মিরাকল নয়, বরং এক ভয়াবহ বাস্তবতার সাথে লড়াই করে ছিনিয়ে আনা এক জয়। সে আজ তার পরিবারের মাথা উঁচু করে রেখেছে। প্রবাস তাকে অনেক কাঁদিয়েছে ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে সেই প্রবাসই তাকে দিয়েছে এক রাজকীয় পরিচয়। রিয়ার জীবন আজ সোনালি আভায় মোড়ানো, কারণ সে জানে—অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়েই তবে আলোর দেখা মেলে।
🌸 গল্পটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন! এমন বাস্তব, হৃদয়ছোঁয়া ও অনুপ্রেরণামূলক গল্প নিয়মিত পেতে আমাদের পেজটি ফলো দিয়ে পাশে থাকুন। ⭐ আপনার একটি স্টার আমাদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।