06/06/2026
🌿 অফিস মানেই শুধু কাজের জায়গা নয়; এটি ক্ষমতা, সম্পর্ক, প্রভাব ও স্বার্থের সূক্ষ্ম এক সমীকরণ। এখানে কেউ দক্ষতা দিয়ে এগিয়ে যায়, কেউ পরিশ্রম দিয়ে, আবার কেউ কৌশলী সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায়। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি—যারা কাজে পিছিয়ে, তারাই অনেক সময় প্রশংসা, ঘনিষ্ঠতা ও তোষামোদে এগিয়ে থাকে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, অযোগ্য ও অদক্ষ কর্মীরা কি সত্যিই তেলবাজির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নেয়? গবেষণা ও কর্মক্ষেত্রের আচরণ বিশ্লেষণ বলছে, এমন প্রবণতা অস্বাভাবিক নয়। এই প্রবন্ধে বিষয়টি গবেষণার আলোকে বিশ্লেষণ করা হবে।
📌 ১. অযোগ্যতার আড়ালে আত্মরক্ষার কৌশল
যেসব কর্মী নিজেদের দক্ষতা নিয়ে অনিশ্চিত থাকে, তারা প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সচেষ্ট হয়। মনোবিজ্ঞানে একে “Impression Management” বলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে যারা নিজের পারফরম্যান্সে দুর্বল, তারা ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে অতিরিক্ত ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে। এতে তারা নিজের ঘাটতি আড়াল করতে চায়। কাজের মাধ্যমে নয়, সম্পর্কের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করে।
📌 ২. তেলবাজি একটি কৌশলী সামাজিক আচরণ
Robert Cialdini তার প্রভাববিষয়ক গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবে প্রশংসা ও সমর্থন পছন্দ করে। ফলে চাটুকারিতা অনেক সময় অবচেতনভাবেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অদক্ষ কর্মীরা এই মানবিক দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে পারে। তারা জানে, বসকে খুশি রাখতে পারলে কিছু সীমাবদ্ধতা উপেক্ষিত হতে পারে। এটি নৈতিক না হলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে এমন কৌশল কার্যকর হতে দেখা যায়।
📌 ৩. দক্ষদের আত্মবিশ্বাস বনাম অদক্ষদের নির্ভরতা
দক্ষ কর্মীরা সাধারণত নিজের কাজের ওপর ভরসা রাখে। তারা বিশ্বাস করে, ফলাফলই তাদের হয়ে কথা বলবে। অন্যদিকে অদক্ষরা ফলাফলে দুর্বল হওয়ায় ব্যক্তিগত সম্পর্ককে হাতিয়ার বানায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কম দক্ষ কর্মীরা “Ingratiation Tactics” বেশি ব্যবহার করে। কারণ তারা জানে, কর্মদক্ষতায় প্রতিযোগিতা করা কঠিন।
📌 ৪. ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা তেলবাজিকে উৎসাহ দেয়
যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে পারফরম্যান্স মূল্যায়ন স্বচ্ছ না হয়, তাহলে তোষামোদ বাড়ে। সাংগঠনিক আচরণবিষয়ক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেখানে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নেই, সেখানে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা প্রভাব ফেলে। ফলে অযোগ্য কর্মীরা সুযোগ পায়। দক্ষরা হতাশ হয়, আর তেলবাজরা শক্ত অবস্থান তৈরি করে।
📌 ৫. স্বল্পমেয়াদে লাভ, দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি
তেলবাজি হয়তো সাময়িক সুবিধা দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ দক্ষতার পরিবর্তে আনুগত্যকে প্রাধান্য দিলে কাজের মান নেমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ পারফরম্যান্স সংস্কৃতিতে চাটুকারিতা টেকসই নয়। যোগ্যতা ও ফলাফল শেষ পর্যন্ত মূল্য পায়।
📌 ৬. কর্মক্ষেত্রে নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের প্রশ্ন
চাটুকারিতা কর্মক্ষেত্রের নৈতিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে সহকর্মীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। অযোগ্য কর্মীরা যখন অযথা পুরস্কৃত হয়, তখন যোগ্যরা হতাশ হয়। এর ফলে “Employee Engagement” কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিকে দুর্বল করে।
📌 ৭. সমাধানের পথ কী?
প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পারফরম্যান্স মেট্রিক্স স্পষ্ট করতে হবে। নেতৃত্বকে সচেতন হতে হবে যেন প্রশংসা ও বাস্তব অবদানের মধ্যে পার্থক্য বোঝা যায়। দক্ষ কর্মীদের স্বীকৃতি দিতে হবে। তাহলেই তেলবাজির প্রবণতা কমবে।
🌺 অফিসে অযোগ্য ও অদক্ষ কর্মীরা তেলবাজিতে এগিয়ে থাকে—এই বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন নয়। গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, আত্মরক্ষা ও প্রভাব তৈরির কৌশল হিসেবে তারা চাটুকারিতাকে বেছে নেয়। তবে এটি কোনো স্থায়ী সাফল্যের পথ নয়। দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতা, সততা ও পরিশ্রমই প্রকৃত শক্তি। তাই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—দু’পক্ষেরই উচিত দক্ষতাকেই প্রাধান্য দেওয়া, তোষামোদকে নয়।