11/09/2026
শুভ সন্ধ্যা সব্বাইকে। চলুন আজ একটা কল্পবিজ্ঞানের গল্প পড়াই আপনাদের, অবশ্য লাইক, কমেন্ট এতো কম পাই, বুঝতেই পারি না লেখাগুলো কি আদৌ পাঠযোগ্য? একটু বড়ো গল্প কিন্তু, ধন্যবাদ -
প্রলয়-স্ফটিক: সূর্যহৃদয়ে শেষ বার্তা
কল্পনায় : সৌমেন ভাদুড়ী
পর্ব ১: তুষারগহ্বরের গোপন অভিসার
কৈলাশ পর্বতের দক্ষিণ-পশ্চিম খাঁজের প্রায় চার হাজার মিটার গভীরে, চিরতুষারে ঢাকা এক দুর্গম আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে পর্বতগাত্রের প্রকাণ্ড এক ফাটল। ভৌগোলিক মানচিত্রে বা উপগ্রহ চিত্রে এই গুহার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। বাইরের তাপমাত্রা মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তীব্র তুষারঝড় বা ‘ব্লিজার্ড’ প্রতিনিয়ত আছড়ে পড়ছে পাথুরে দেয়ালে। কিন্তু গুহার সরু গোলকধাঁধা পার হয়ে প্রায় দেড়শো মিটার গভীরে প্রবেশ করলে থার্মোমিটারের পারদ এক অদ্ভুত স্থিতিশীলতায় থমকে দাঁড়ায় — ঠিক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
এখানেই লোকচক্ষুর আড়ালে, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্প্রদায়ের নজর এড়িয়ে গড়ে উঠেছে এক গোপনতম গবেষণাগার। পুরো ল্যাবটি তৈরি করা হয়েছে ভূ-গর্ভস্থ বিশেষ ড্রাই-আইস ও কোয়ান্টাম ইনসুলেশন প্রসেস ব্যবহার করে। এখানে কাজ করছেন চারজন বিজ্ঞানী। তাঁদের শীর্ষে রয়েছেন প্রবীণ গবেষক ড. অয়নাংশু মুখার্জি — পদার্থবিদ্যা ও কোয়ান্টাম মেটালার্জির আন্তর্জাতিক রূপকার। তাঁর সাথে রয়েছেন তরুণ মেটেরিয়াল সায়েন্টিস্ট অর্ণব, ইলেকট্রনিক্স ড্রাইভ স্পেশালিস্ট রিচার্ড এবং ডাটা অ্যানালিস্ট ড. সোফিয়া।
গবেষণাগারের কেন্দ্রে একটি বিশাল উচ্চ-চাপবিশিষ্ট ভ্যাকুয়াম চেম্বার। সেই চেম্বারের ঠিক মাঝখানে কোনো দৃশ্যমান আলম্ব ছাড়াই বাতাস ছাড়া ভেসে রয়েছে একটি ধূসর-রূপালী প্রকাণ্ড স্পিয়ার বা গোলক। শংকর ধাতুটির পারমাণবিক ও কোয়ান্টাম সাংকেতিক নাম — মেটাম্যাটেরিয়াল-১০৮ বা অ্যাস্ট্রা-অ্যালয়’ (Astra-Alloy)।
জেনিভার CERN-এর লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে (LHC) ‘হিগস বোসোন’ বা ঈশ্বরকণা আবিষ্কারের পর একটি গভীর অমীমাংসিত প্রশ্ন বিশ্ববিজ্ঞানকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। হিগস ফিল্ড পদার্থের ভর (mass) তৈরি করলেও, বিশেষ কোয়ান্টাম অবস্থায় কীভাবে সেই ভরকে শূন্যের কাছাকাছি এনে চরম ঘনত্বের অবিনাশী ক্রিস্টাল গঠন তৈরি করা যায়, তার উত্তর সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল না।
কিন্তু মহাদেব শিবের তাণ্ডব নৃত্য — অর্থাৎ কোয়ান্টাম ফিল্ডের অবিরাম সৃষ্টি ও ধ্বংসের যে প্রতীকী রূপ CERN-এর চত্বরে নটরাজ মূর্তির মাধ্যমে স্থাপিত, তার আসল গাণিতিক সংকেত লুকিয়ে ছিল কৈলাশের এই ভূ-গর্ভস্থ বিশেষ শূন্য-চৌম্বকীয় অক্ষবিন্দুতে (Zero-Magnetic Axial Point)। কৈলাশের স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক গঠনে এমন কিছু বিরল প্রাকৃতিক অ্যালিমেন্টাল ক্ষেত্র রয়েছে, যা কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনকে এক অদ্ভুত রেজোনেন্সে নিয়ে আসে।
অয়নাংশু তাঁর চোখের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে প্রকাণ্ড মনিটরগুলোর দিকে এগোলেন। "অর্ণব, পারমাণবিক ল্যাটিস পরিবর্তনের ডেটাটা আবার রান করাও। আমি দেখতে চাই কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রায় এর ভেতরে ফনন ভাইব্রেশনের কী পরিবর্তন হচ্ছে।"
অর্ণব কিবোর্ডে দ্রুত হাত চালিয়ে কমান্ড দিল। ভ্যাকুয়াম চেম্বারের ভেতরে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন লেজার গান থেকে নির্গত হলো কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের প্রকাণ্ড প্লাজমা ফোকাস। অথচ কাচের ওপাশে থাকা সেই ধূসর-রূপালী ধাতুটিতে বিন্দুমাত্র উত্তাপ সৃষ্টি হলো না!
"অবিশ্বাস্য অয়নদা!" অর্ণব চিৎকার করে উঠল। "স্পেকট্রোস্কোপি দেখাচ্ছে ধাতুটির থার্মাল এক্সপ্যানশন কো-দক্ষতা বা ক্ষেত্র-প্রসারণ গুণাঙ্ক (alpha) শূন্যের নিচে নেমে যাচ্ছে! এটি মোটেও গরম হচ্ছে না!"
"গরম হবে না অর্ণব," অয়নাংশু শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললেন। "কারণ অ্যাস্ট্রা-অ্যালয়ের পারমাণবিক স্ট্রাকচার সাধারণ পর্যায় সারণীর (Periodic Table) কোনো নিয়ম মেনে চলে না। বাইরে থেকে যখন চরম তাপশক্তি বা আল্ট্রা-হাই ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশন এর ওপর আছড়ে পড়ে, তখন এর 'কোয়ান্টাম ফনন' (Quantum Phonons) তাপশক্তিকে শুষে পরমাণুকে উত্তেজিত করার বদলে তা সাথে সাথে উচ্চ-ঘনত্বের মহাকর্ষীয় তরঙ্গে (Gravitational Waves) রূপান্তর করে বাইরে ছিটকে দিচ্ছে।"
"আর এর এব্রেসিভ পাওয়ার?" সোফিয়া ড্যাশবোর্ড থেকে প্রশ্ন তুলে ধরলেন।
"অসীম," অয়নাংশু ব্যাখ্যা করলেন। "যখন কোনো বস্তু তীব্র গতিতে বা প্রকাণ্ড শক্তিতে একে আঘাত করবে, তখন এর ইলেকট্রন ক্লাউড প্রোটন নিউক্লিয়াসের এত কাছে চলে আসবে যে এর পারমাণবিক বাঁধন ডায়মন্ড বা হীরাকেও হাজার গুণ ছাপিয়ে যাবে। এটি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যেকোনো কঠিন বস্তুকে ক্ষয় করে দিতে পারবে, কিন্তু নিজের ভেতরে কোনো ডিফরমেশন বা বিকৃতি ঘটবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা — এটি ওজনে অ্যালুমিনিয়ামের চেয়েও হালকা!"
কিন্তু আসল মিরাকল ঘটল সেদিন রাতে।
ল্যাবের সমস্ত যন্ত্রপাতির ফ্রিকোয়েন্সি যখন কৈলাশের বিশেষ চারশো বত্রিশ হার্টজ (432 Hz) প্রাকৃতিক ওম-রেজোনেন্সের সাথে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হলো, তখন ভ্যাকুয়াম চেম্বারে ভাসমান ধাতুটির ধূসর রঙ বদলে এক অলৌকিক নীলচে আভায় রূপান্তরিত হলো। ধাতুটির মসৃণ গায়ে কোনো খোদাই ছাড়াই ফুটে উঠতে লাগল পারমাণবিক স্ফটিকের অদ্ভুত কিছু জ্যামিতিক প্যাটার্ন — যা দেখতে অবিকল প্রাচীন তাম্রলিপি বা ইয়ন্ত্রের (Yantra) মত!
ধাতুটি শুধু জড় পদার্থ হিসেবে কাজ করছিল না। এটি ল্যাবে উপস্থিত বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কের আলফা ওয়েভ এবং আশপাশের শব্দতরঙ্গ গ্রহণ করে নিজেকে পুনর্গঠন করছিল। এটি ছিল এক জীবন্ত "জৈব-ধাতব মাধ্যম (Bio-Metallic Matrix)"।
পর্ব ২: পাতাল থেকে নক্ষত্রালোক
বিজ্ঞানীদের সামনে এখন কেবল তত্ত্ব যাচাইয়ের সময় নয়, ছিল সরাসরি প্রয়োগের চ্যালেঞ্জ। প্রজেক্টের নাম দেওয়া হলো 'প্রলয়-স্ফটিক'।
অয়নাংশু ও তাঁর টিম অ্যাস্ট্রা-অ্যালয়ের একটি ক্ষুদ্র প্রোটোটাইপ ব্যবহার করে তৈরি করলেন একটি বিশেষ ড্রিল-প্রোব — ‘ত্রিশূল-১’।
প্রথম লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলো পৃথিবীর ভরকেন্দ্র বা ‘আর্থস কোর’ (Earth's Core)। কৈলাশের তলদেশ থেকে নির্গত শক্তিশালী কোয়ান্টাম ফিল্ড এবং অ্যাস্ট্রা-অ্যালয়ের শূন্য-ডিফরমেশন গুণকে কাজে লাগিয়ে প্রোবটিকে ভূ-ত্বক ভেদ করে নিচে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
পৃথিবীর ক্রাস্ট এবং ম্যান্টল পার হয়ে প্রোবটি যখন পৃথিবীর ভেতরের প্রকাণ্ড ফুটন্ত তরল লোহার সাগরে পৌঁছাল, সেখানে তাপমাত্রা ছয় হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং চাপ প্রায় সাড়ে তিনশো গিগাপাসকাল। সাধারণ কোনো ধাতু তো দূরের কথা, যেকোনো জটিল যৌগ সেখানে বাষ্প হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু অ্যাস্ট্রা-অ্যালয় সেখানে পৌঁছাতেই তার ইলেকট্রন ক্লাউড অতিরিক্ত চাপের ফলে আরও বেশি সংকুচিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠল। প্রোবটি পৃথিবীর কোরের তরল লোহার মধ্য দিয়ে ঘুরে ভূতাত্ত্বিক ও চৌম্বকীয় তরঙ্গের সমস্ত ডেটা রেকর্ড করে প্রায় বারো ঘণ্টা পর অক্ষত অবস্থায় ফিরে এলো। এর পৃষ্ঠে একবিন্দু আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি!
প্রথম পরীক্ষাই প্রমাণ করে দিল — চাপ ও উত্তাপ যত বাড়ে, অ্যাস্ট্রা-অ্যালয় তত বেশি অবিনাশী হয়ে ওঠে।
এর পরের মিশন ছিল মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুঃসাহস। ‘ত্রিশূল-১’-কে উন্নত করে একটি স্বয়ংক্রিয় স্পেস-প্রোবে রূপান্তর করা হলো এবং উৎক্ষেপণ করা হলো সূর্য ও বুধ গ্রহের মধ্যবর্তী চরম উত্তপ্ত অঞ্চলে।
সূর্যের বিকিরণ অঞ্চল পার হয়ে প্রোবটি যখন করোনাল মাস ইজেকশনের (CME) মুখোমুখি হলো, সেখানে কোটি কোটি ভোল্টের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক প্লাজমা ঝড় বইছিল। পৃথিবীর কোনো স্যাটেলাইট এই অঞ্চলে কয়েক সেকেন্ডও টিকতে পারে না। কিন্তু ‘ত্রিশূল-১’ সেই প্লাজমা শক্তিকে শুষে নিয়ে নিজের পারমাণবিক স্পিন বাড়াতে শুরু করল। ধাতুটি তাপমাত্রার চাপকে ইলেকট্রিক সিগন্যালে বদলে কৈলাশের ল্যাবে ডেটা স্ট্রিম পাঠাতে শুরু করল।
ল্যাবের স্ক্রিনে ফুটে উঠল সূর্যের উপরিভাগের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম কোয়ান্টাম ফিল্ডের চিত্র।
অয়নাংশু স্তব্ধ হয়ে মনিটরের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। ড. সোফিয়া চোখ বড় বড় করে বললেন, "ড. মুখার্জি! ডেটা স্ট্রিম যা দেখাচ্ছে... সূর্যের ভরকেন্দ্রে এমন এক ধরণের শূন্য-ভ্যাকুয়াম ফিল্ড আছে, যা সরাসরি ঈশ্বরকণা বা হিগস ফিল্ডের উৎস তৈরি করছে! আমাদের যদি চিরস্থায়ী ও অসীম শক্তির উৎস খুঁজে বের করতে হয়, তবে এই প্রোবকে কেবল সূর্যের কাছে পাঠালে চলবে না... একে সোজা সূর্যের নিউক্লিয়ার কোর অর্থাৎ ভরকেন্দ্রের ভেতরে নামাতে হবে!"
"সূর্যের উদরে?" রিচার্ড হাতজোড় করলেন। "সেখানে পনেরো মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আর প্রকাণ্ড গ্র্যাভিটি!"
"কিন্তু আমাদের কাছে যে অ্যাস্ট্রা-অ্যালয় আছে রিচার্ড!" অয়নাংশুর চোখে তখন এক দূরদর্শী বৈজ্ঞানিক উন্মাদনা। "উত্তাপ আর চাপ যত বাড়বে, এটি তত বেশি শক্ত ও স্থিতিশীল হবে। এটি সূর্যকে ধ্বংস করবে না, বরঞ্চ সূর্যের ভেতরের মহাজাগতিক সৃষ্টির মূল ফ্রিকোয়েন্সি ডিকোড করে পৃথিবীতে পাঠাবে।"
বিজ্ঞানীদের চূড়ান্ত মিশন নির্ধারিত হলো — "সূর্যের ভরকেন্দ্রে ‘ত্রিশূল-২’ প্রেরণ"।
পর্ব ৩: অমাবস্যার রক্তপাত
কিন্তু বিজ্ঞানীদের এই বৈজ্ঞানিক নীরব বিপ্লব বেশিদিন গোপন রাখা সম্ভব হয়নি।
চীন সীমান্ত সংলগ্ন জিনজিয়াং সামরিক ঘাঁটির অতি-শক্তিশালী স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং রাডার এবং কিছু পশ্চিমা দেশের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের নজরে চলে আসে কৈলাশের স্থান-কাল থেকে নির্গত হওয়া সেই অদ্ভুত কোয়ান্টাম ফ্রিকোয়েন্সি। তারা প্রথমে ভেবেছিল ভারত ভূ-গর্ভস্থ কোনো নতুন নিউক্লিয়ার ওয়েপন টেস্ট করছে। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন তারা পৃথিবীর কোর এবং সূর্যের করোনা থেকে আসা সিগন্যালগুলো ইন্টারসেপ্ট করল, তখন তারা বুঝতে পারল — কৈলাশের বরফের নিচে এমন এক প্রযুক্তি রূপ নিচ্ছে যা পুরো বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য এক নিমেষে বদলে দিতে পারে।
যে দেশ এই 'মেটাম্যাটেরিয়াল-১০৮' নিজের কব্জায় আনবে, তার কাছে পৃথিবীর সব মিসাইল, লেজার, এমনকি নিউক্লিয়ার বোমাও খেলনা হয়ে যাবে। আর যদি এটি তারা নিজেরা অর্জন করতে না পারে, তবে পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে একে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেওয়াই তাদের কাছে একমাত্র বিকল্প ছিল।
দিনটি ছিল এক তীব্র অমাবস্যার রাত। কৈলাশের ওপর দিয়ে বইছিল ঘণ্টায় দেড়শো কিলোমিটার বেগের এক প্রকাণ্ড তুষারঝড়। বাইরের হাড়হিম করা আবহাওয়াকে ঢাল বানিয়ে উত্তর দিক থেকে নিঃশব্দে উড়ে এলো কোনো দেশের চিহ্নিতকরণ চিহ্নহীন কয়েকটি অত্যাধুনিক স্টিলথ ড্রোন এবং ব্ল্যাক-অপ্স কমান্ডো স্কোয়াড।
ল্যাবের ভেতর তখন বিজ্ঞানীদের কাজ চলছিল চূড়ান্ত পর্বে। ‘ত্রিশূল-২’-এর ফাইনাল কোয়ান্টাম টিউনিং করছিলেন অয়নাংশু ও অর্ণব।
হঠাৎই ল্যাবের ভারী ইস্পাতের দরজা প্রচণ্ড বিস্ফোরণে উড়ে গেল! ধোঁয়া ও অন্ধকারের মধ্য থেকে ছুটে এলো লেজার-গাইডেড বুলেটের বৃষ্টি।
"সবাই নিচে মাথা নোয়ান!" রিচার্ড চিৎকার করে উঠলেন, কিন্তু তার আগেই বুলেটের আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি।
অর্ণব ব্যাকআপ হার্ডড্রাইভ এবং মেটাম্যাটেরিয়ালের একমাত্র অবশিষ্ট স্যাম্পলটি রক্ষা করার জন্য মেইন কনসোলের দিকে দৌড় দিল। কিন্তু একটি নিষ্ঠুর থার্মাল-ব্লাস্ট ক্যানিস্টার তার ঠিক পাশে এসে ফাটল। আগুনের শিখায় তরুণ অর্ণব লুটিয়ে পড়ল কম্পিউটারের ওপর।
"অর্ণব!" অয়নাংশু আর্তনাদ করে উঠলেন।
ড. সোফিয়া রক্তাক্ত অবস্থায় অয়নাংশুর হাত চেপে ধরলেন, "স্যার! আপনাকে বাঁচতে হবে! ওরা ল্যাবের সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে, ওদের মূল উদ্দেশ্য এই ধাতু আর আপনাকে শেষ করা! আপনি পিছনের সিক্রেট প্যাসেজ দিয়ে পালান!"
সোফিয়া নিজেই শত্রু কমান্ডোদের বিভ্রান্ত করতে বিপরীত দিকে ছুটে গেলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারী অস্ত্রের গর্জনে ল্যাবের ভেতরের সমস্ত আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে গেল।
অয়নাংশু মুখার্জি কাঁপতে কাঁপতে ল্যাবের জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকালেন। চেম্বারগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে, সুপারকম্পিউটারগুলোতে আগুন জ্বলছে, তাঁর তিন সহকর্মী রক্তে ভেসে যাচ্ছেন। তিনি আর সময় নষ্ট না করে, অর্ণবের রক্তাক্ত হাত থেকে টেনে নেওয়া সেই ব্যাকআপ নোটবুক ও নিজের ডায়েরিটি জামার ভেতর পুরে নিয়ে ল্যাবের পিছনের গোপন তুষার-সুড়ঙ্গের অন্ধকারের দিকে পালিয়ে গেলেন।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো ভূ-গর্ভস্থ ল্যাবটিতে প্রকাণ্ড প্লাজমা এক্সপ্লোসিভ বসিয়ে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হলো। কৈলাশের চার হাজার মিটার নিচের সেই তুষারগহ্বর চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। বিশ্ব জানতেও পারল না — মানবজাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক অধ্যায় রক্তে ধুয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
পর্ব ৪: শিলিগুড়ির বিকেল ও হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস
সেই ঘটনার প্রায় চার মাস পরের কথা।
উত্তরবঙ্গে তখন শরৎকাল। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ঠান্ডা হাওয়া নেমে এসেছে ডুয়ার্স ও সমতলে। আকাশ একদম পরিষ্কার, ফাঁসিদেওয়া ও মহানন্দার তীর থেকে চোখ মেললেই দূরে দিগন্তে কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফাবৃত চূড়া শুভ্র আলোর মতো জলজল করছে।
শিলিগুড়ির মহানন্দা ড্রাইভের পাশেই অবস্থিত এক সুসজ্জিত সবুজ বাড়ি। বাড়িটির মালিক একজন প্রবীণ ল্যান্ডস্কেপ ইঞ্জিনিয়ার এবং সাহিত্যপ্রেমী লেখক। তিনি নিজের বাগানে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নানা বিরল প্রজাতির বৃক্ষ ও প্রকৃতির সমন্বয়ে এক সবুজ স্বর্গ গড়ে তুলেছেন।
সেদিন বিকেলে শিলিগুড়ির মহানন্দার পাড়ে সূর্য নামছিল সোনালী রঙ ছড়িয়ে। লেখকের বসার ঘরের কাচের জানলা দিয়ে বাইরের ল্যান্ডস্কেপিং বাগানের সৌন্দর্য চমৎকার দেখাচ্ছিল।
ঘরের ভেতরে এক কোণে বসেছিলেন একজন বৃদ্ধ লোক। উসকোখুসকো চুল, কপালে ও গালে কাটার গভীর দাগ, চোখের নিচে জমাট বাঁধা কালি আর গায়ে জড়ানো একটা ছেঁড়া ময়লা চাদর। তিনি এতই শীর্ণ যে মনে হচ্ছিল হাওয়া দিলেই উড়ে যাবেন।
চা এনে টেবিলে রাখলেন গৃহকর্তা অর্থাৎ লেখক। লোকটির দিকে তাকিয়ে তিনি মৃদু স্বরে বললেন, "ড. অয়নাংশু, প্রায় তিন বছর পর আপনাকে এই অবস্থায় দেখব আমি আশা করিনি। আপনি কোথায় ছিলেন এত দিন?"
অয়নাংশু গরম চায়ের কাপটিতে হাত রাখলেন। তাঁর হাত কাঁপছিল। চায়ের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টিতে তিনি কথা বলতে শুরু করলেন।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল শিলিগুড়ির মহানন্দা ড্রাইভে। আর সেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অয়নাংশু লেখকের সামনে উন্মোচন করলেন সেই অবিশ্বাস্য গল্প — কৈলাশের গোপন ল্যাব, হিগস ফিল্ড, CERN-এর ঈশ্বরকণা, ‘মেটাম্যাটেরিয়াল-১০৮’ বা অ্যাস্ট্রা-অ্যালয়ের অবিশ্বাস্য গুণাবলী, পৃথিবীর কোর ও সূর্যের করোনার অভিযান এবং শেষ অমাবস্যার রাতের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসলীলা।
লেখক স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। সাধারণ কোনো লোক এই গল্প শুনলে অয়নাংশুকে উন্মাদ বা পাগল বলে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিত। কিন্তু লেখক একজন কল্পবিজ্ঞানের পাঠক ও প্রাক্তন যান্ত্রিক প্রকৌশলী; তিনি অয়নাংশুর চোখের বিষাদ এবং তাঁর মুখের বৈজ্ঞানিক টার্মগুলোর গভীরতা বুঝতে পারছিলেন। এটি কোনো রূপকথা নয়, এটি এক নিষ্ঠুর সত্য যা বৈশ্বিক রাজনীতির হিংসার বলী হয়েছে।
"অয়নদা," লেখক নিচু গলায় বললেন, "আপনি এখন কোথায় যাবেন? পুলিশ বা আন্তর্জাতিক এজেন্সি কি আপনার পিছু নিয়েছে?"
অয়নাংশু মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো আশা ছিল না। "যাদের ভয় পেয়েছিলাম, তারা ভেবেছে আমি কৈলাশের বরফেই মরে পচে গেছি। আমি নিঃস্ব, আমার তিনটে সহকর্মী মরে গেছে, আমার ল্যাব শেষ। আমি শুধু চাইছিলাম এই সত্যিটা কাউকে বলে যেতে... এমন কাউকে, যে বিজ্ঞানের সত্যকে সম্মান করতে জানে।"
রাত নামার আগেই অয়নাংশু উঠে দাঁড়ালেন। লেখক তাঁকে অনেক অনুরোধ করলেন রাতে থেকে যাওয়ার জন্য, কিন্তু অয়নাংশু কারও সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চান না। তিনি শান্ত ভঙ্গিতে দরজার বাইরে পা বাড়ালেন। মহানন্দার পাশের অন্ধকার রাস্তায় তিনি মিলিয়ে গেলেন — এক নিঃসঙ্গ পথিকের মতো, যার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
অয়নাংশু চলে যাওয়ার পর লেখক ভারাক্রান্ত মনে ঘরে ফিরে এলেন। চায়ের কাপগুলো সরাতে গিয়ে হঠাৎই তাঁর চোখ গেল কাঠের চা-চক্রের টেবিলটার দিকে।
টেবিলের একপাশে পড়ে রয়েছে অয়নাংশুর সেই হাত-বান্ধা পুরোনো চামড়ার খাতাটা! অয়নাংশু আসার সময় যা বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেছিলেন!
উদ্বেগ ও প্রবল কৌতূহলে লেখকের হাত কাঁপতে লাগল। তিনি খাতাটি তুলে নিয়ে সাবধানে প্রথম পাতাটি খুললেন।
খাতাটি কোনো সাধারণ ডায়েরি নয়! এর প্রথম অর্ধাংশে লেখা রয়েছে ড. অয়নাংশুর চার বছরের অভিজ্ঞতার প্রতিটি ডিটেইল। আর পরের অংশজুড়ে আঁকা রয়েছে —কৈলাশের শূন্য-চৌম্বকীয় অক্ষের জিওমেট্রিক কো-অর্ডিনেট, CERN-এর হিগস-ফ্রিকোয়েন্সি ডায়াগ্রাম, এবং সবচেয়ে চমকপ্রদ হলো ‘মেটাম্যাটেরিয়াল-১০৮’ বা অ্যাস্ট্রা-অ্যালয় তৈরির নিখুঁত পারমাণবিক, কোয়ান্টাম ও মেটালার্জিক্যাল সমীকরণ!
কোন অনুপাতে কোন ধাতু মেলালে, কত হার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে এবং কোন চাপের মধ্যে এই অবিনাশী শংকর তৈরি সম্ভব — তার পুরো ফর্মুলা সেখানে স্পষ্ট ভাষায় নথিভুক্ত করা আছে!
ডায়েরির একদম শেষ পাতায় অয়নাংশুর কাঁপাকাঁপা হাতের সই এবং তার নিচে নীল কালিতে লেখা একটি বার্তা:
"আমার প্রিয় বন্ধু,
আমি জানি তুমি এই খাতাটি পাবে। পৃথিবী হয়তো আজ এই পরম বিজ্ঞানের যোগ্য হয়ে ওঠেনি। মানুষ আজ বিজ্ঞানের আলো দিয়ে অন্য মানুষকে মারার অস্ত্র বানায়। কিন্তু কোনো একদিন মানবের প্রজ্ঞা যখন রাজনৈতিক হিংসাকে ছাপিয়ে যাবে, তখন এই শংকর ধাতু নিশ্চয়ই সূর্যের হৃদপিণ্ডে পৌঁছাবে।
ততদিন পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষ জানুক বা না জানুক — গল্পের ছলে হলেও, কল্পবিজ্ঞানের কলমে এই পরম সত্যকে তুমি তোমার শব্দের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখো..."
লেখক চামড়ার খাতাটি বুকে চেপে ধরে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকালেন তিনি। উত্তর-পূর্বের দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার পেছনে আকাশে অজস্র নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে, আর দূরে কোথাও সূর্য আবার নতুন এক ভোরের জন্য তৈরি হচ্ছে।
লেখক টেবিলের দিকে হেঁটে গেলেন। কলমের ক্যাপটা খুললেন, তারপর সাদা কাগজের ওপর প্রথম লাইনটি লিখলেন:
‘বিজ্ঞান যা হারিয়েছে, কালির আঁচড়ে আজ তাকে অমরাবতী দেওয়ার সময় এসেছে...’