পাগলা দাশুর ডায়েরি থেকে

  • Home
  • India
  • Siliguri
  • পাগলা দাশুর ডায়েরি থেকে

পাগলা দাশুর ডায়েরি থেকে বাংলায় লেখা গল্প, কবিতা, রহস্য উপন্যাস, ইত্যাদি

12/09/2026

শুভ সন্ধ্যা সব্বাইকে, আজকে আরও একটা অন্যরকমের গল্প -

জিজ্ঞাসার ছায়াবৃত্ত

কল্পনায় : সৌমেন ভাদুড়ী

কে এই শূন্য ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে? কেন দেওয়ালের চুন খসা দাগগুলো হঠাৎ এত অচেনা মনে হয়? কখন ভোরের আলো তার সমস্ত তেজ হারিয়ে এক ধূসর কুয়াশায় বদলে গেল? কোথায় হারিয়ে গেল সেই শৈশবের উঠোন, যেখানে প্রতিটি মাটির ঢেলার একটি করে নাম ছিল? কী কারণে দরজার কড়া নড়ে উঠলেও বাইরে কাউকে দেখা যায় না?
কবে থেকে এই একলা হাঁটা শুরু হয়েছিল? কে শিখিয়েছিল সময়ের দিকে তাকালে বুক কেঁপে ওঠে? কেন হাত বাড়ালে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই আঙুলের ফাঁকে ধরা পড়ে না? কী এমন অপরাধ ছিল যার জন্য প্রতিটি স্মৃতি আজ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জবানবন্দি চাইছে? কোথায় ফেলে আসা হলো সেই পুরোনো ঠিকানার চিঠিগুলো, যার খামের ওপর অচেনা হাতের কাঁপা কাঁপা হস্তাক্ষর ছিল? কে সেই অচেনা ডাকপিয়ন, যে নিঃশব্দে দরজার নিচ দিয়ে একরাশ না-বলা কথা ঠেলে দিয়ে চলে যেত?
কখন আয়নায় তাকিয়ে নিজের চোখ দুটোকে অন্য কারো চোখ বলে ভ্রম হয়? কেন চোখের পাতায় জমে থাকা জলের কোনো নিজস্ব ওজন থাকে না? কী ছিল সেই প্রতিশ্রুতির ভেতরে, যা ঝরাপাতার মতো শুকনো বাতাসে উড়ে গেল? কোথায় সেই নদী, যার পাড়ে বসে সন্ধ্যা নামার প্রতীক্ষা করা যেত কোনো উদ্বেগ ছাড়াই? কেন রাতের বাতাস এত ভারী, যেন সহস্র শতাব্দীর অপূর্ণ দীর্ঘশ্বাস বয়ে নিয়ে আসছে? কে সেখানে ওত পেতে বসে থাকে, যখন ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে পড়ে? কী চায় সেই অস্পষ্ট ছায়া, যা প্রতি রাতে জানালার কাঁচে নিঃশব্দে ভেসে ওঠে আর মিলিয়ে যায়?
কবে মানুষের হৃদয় এত জটিল গোলকধাঁধা হয়ে উঠল, যেখানে নিজের পদশব্দ শুনলেও আতঙ্ক জাগে? কেন শব্দের চেয়ে স্তব্ধতাই আজ এত বেশি বধির করে দেয়? কোথায় গেল সেইসব মানুষ, যারা একদিন হাতের তালুতে হাত রেখে অসীম দূরত্বের ভয় মুছে দিয়েছিল? তারা কি সত্যিই ছিল, নাকি পুরোটাই কোনো দীর্ঘ জ্বরের ঘোরে দেখা অলীক কল্পনা? কে ঠিক করে দেয় মিলনের পর বিচ্ছেদের এই অমোঘ জ্যামিতি? কেন যে মানুষটিকে সবচেয়ে বেশি চেনা মনে হতো, সে-ই এক নিমেষে সবচেয়ে দূরবর্তী নক্ষত্র হয়ে যায়? কী নাম সেই বেদনার, যার কোনো ভাষা নেই, কোনো ব্যাকরণ নেই, কোনো প্রতিষেধক নেই?
কখন ট্রেনের বাঁশি এত বিষাদগ্রস্ত হয়ে উঠল? কোথায় ছুটে চলেছে এই অন্তহীন লোহার চাকাগুলো, কোন স্টেশনের সন্ধানে? কে বসে আছে সেই কামরার ভেতর, যার মুখ আবছা জানালার ওপাশে চিরতরে হারিয়ে গেল? কেন গন্তব্যের চেয়ে যাত্রাপথই এত বেশি রক্তক্ষরণ ঘটায়? কীসের আশায় মানুষ প্রতিনিয়ত ছুটে চলে এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক সম্পর্ক থেকে অন্য সম্পর্কে, এক শূন্যতা থেকে আরেক অতল শূন্যতায়? কবে শেষ হবে এই নিরন্তর পলায়ন? কাকে ফাঁকি দেওয়ার এই মরিয়া চেষ্টা—সময়কে, মৃত্যুকে, নাকি নিজেকে?
কেন ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো আছড়ে পড়ে? কী চায় এই ধাবমান সেকেন্ডের ভগ্নাংশগুলো? কে পরিমাপ করে এই ব্যথার আয়ুষ্কাল? কোথায় সেই দাঁড়িপাল্লা, যেখানে এক ফোঁটা অশ্রুর বিপরীতে পুরো ব্রহ্মাণ্ডের ওজন মাপা যায়? কখন সূর্যাস্ত এত রক্তাক্ত রূপ নিল? কেন সন্ধ্যার আকাশ দেখলে মনে হয় কেউ মহাবিশ্বের সমস্ত আলো এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিল? কী অপেক্ষা করছে এই কালচে অন্ধকারের ওপারে?
কে প্রথম উচ্চারণ করেছিল সেই শব্দটি, যা মানুষকে ভালোবাসতে বাধ্য করেছিল? কেন ভালোবাসা এত নিঃস্ব করে দিয়ে যায়? কী ছিল সেই দৃষ্টির অতলে, যা মুহূর্তের মধ্যে জীবনের সমস্ত পথ উল্টেপাল্টে দিল? কোথায় সেই স্পর্শের রেশ, যা একদা পাথরের মধ্যেও প্রাণ সঞ্চার করেছিল? কবে থেকে বিশ্বাস আর সন্দেহের ব্যবধান এক সূক্ষ্ম সুতোর মতো ভঙ্গুর হয়ে গেল? কেন মানুষ সবচেয়ে কাছের মানুষটির কাছেই সবচেয়ে বেশি মুখোশ পরে দাঁড়ায়? কী লুকোনোর এই প্রাণান্তকর প্রয়াস? কে-ই বা বিচারক, আর কে-ই বা এখানে আসামী?
কখন থেকে মেঘের ডাক আর আনন্দের বার্তা বয়ে আনে না? কেন বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা এক একটা ধারালো তীরের মতো স্মৃতিকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়? কোথায় সেই ভেজা মাটির গন্ধ, যা সব ক্ষত ভুলিয়ে দিতে পারত? কীসের এই আকাল, যা বুকের ভেতরটা মরুভূমির মতো খাঁ-খাঁ করিয়ে তোলে? কে এসে দাঁড়াবে এই নির্জন চৌকাঠে এক অঞ্জলি শান্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে? কেউ কি আদৌ আসবে, নাকি এই অপেক্ষাই জীবনের একমাত্র অর্থ?
কেন রাতের গভীরে সমস্ত নিস্তব্ধতা হঠাৎ কোনো আর্তনাদের মতো কানে বাজে? কে জাগিয়ে রাখে এই ঘুমহীন চোখ দুটোকে? কীসের বিচার চাইছে এই নিঃসঙ্গ বিবেক? কোথায় লুকাবে এই পাপ, এই পুণ্য, এই অর্ধেক বেঁচে থাকার লজ্জা? কবে মানুষ মুক্ত হবে নিজের তৈরি এই লোহার খাঁচা থেকে? কেন উত্তরের সন্ধান করতে গিয়েই প্রশ্নগুলো আরো দীর্ঘ, আরো অগাধ হয়ে ওঠে?
কখন এই সব ‘কে’, ‘কী’, ‘কেন’, ‘কবে’, ‘কোথায়’ নিজের ভারে নিজেই ভেঙে পড়বে? কে নিভিয়ে দেবে এই অনন্ত জিজ্ঞাসার চিতা? কোথায় মিশে যাবে এই সমস্ত না-পাওয়া উত্তরের দীর্ঘশ্বাস? কেন সবকিছু জেনেও মানুষ এই একাকী অন্ধকারের কাছে বারবার নতুন করে প্রশ্ন রেখে যায়? কী পড়ে থাকবে শেষ নিঃশ্বাসের পর—একটি পূর্ণচ্ছেদ, নাকি কেবলই একটি উত্তরহীন প্রশ্নচিহ্ন?

11/09/2026

শুভ সন্ধ্যা সব্বাইকে। চলুন আজ একটা কল্পবিজ্ঞানের গল্প পড়াই আপনাদের, অবশ্য লাইক, কমেন্ট এতো কম পাই, বুঝতেই পারি না লেখাগুলো কি আদৌ পাঠযোগ্য? একটু বড়ো গল্প কিন্তু, ধন্যবাদ -

প্রলয়-স্ফটিক: সূর্যহৃদয়ে শেষ বার্তা

কল্পনায় : সৌমেন ভাদুড়ী

পর্ব ১: তুষারগহ্বরের গোপন অভিসার

কৈলাশ পর্বতের দক্ষিণ-পশ্চিম খাঁজের প্রায় চার হাজার মিটার গভীরে, চিরতুষারে ঢাকা এক দুর্গম আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে পর্বতগাত্রের প্রকাণ্ড এক ফাটল। ভৌগোলিক মানচিত্রে বা উপগ্রহ চিত্রে এই গুহার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। বাইরের তাপমাত্রা মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তীব্র তুষারঝড় বা ‘ব্লিজার্ড’ প্রতিনিয়ত আছড়ে পড়ছে পাথুরে দেয়ালে। কিন্তু গুহার সরু গোলকধাঁধা পার হয়ে প্রায় দেড়শো মিটার গভীরে প্রবেশ করলে থার্মোমিটারের পারদ এক অদ্ভুত স্থিতিশীলতায় থমকে দাঁড়ায় — ঠিক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
এখানেই লোকচক্ষুর আড়ালে, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্প্রদায়ের নজর এড়িয়ে গড়ে উঠেছে এক গোপনতম গবেষণাগার। পুরো ল্যাবটি তৈরি করা হয়েছে ভূ-গর্ভস্থ বিশেষ ড্রাই-আইস ও কোয়ান্টাম ইনসুলেশন প্রসেস ব্যবহার করে। এখানে কাজ করছেন চারজন বিজ্ঞানী। তাঁদের শীর্ষে রয়েছেন প্রবীণ গবেষক ড. অয়নাংশু মুখার্জি — পদার্থবিদ্যা ও কোয়ান্টাম মেটালার্জির আন্তর্জাতিক রূপকার। তাঁর সাথে রয়েছেন তরুণ মেটেরিয়াল সায়েন্টিস্ট অর্ণব, ইলেকট্রনিক্স ড্রাইভ স্পেশালিস্ট রিচার্ড এবং ডাটা অ্যানালিস্ট ড. সোফিয়া।
গবেষণাগারের কেন্দ্রে একটি বিশাল উচ্চ-চাপবিশিষ্ট ভ্যাকুয়াম চেম্বার। সেই চেম্বারের ঠিক মাঝখানে কোনো দৃশ্যমান আলম্ব ছাড়াই বাতাস ছাড়া ভেসে রয়েছে একটি ধূসর-রূপালী প্রকাণ্ড স্পিয়ার বা গোলক। শংকর ধাতুটির পারমাণবিক ও কোয়ান্টাম সাংকেতিক নাম — মেটাম্যাটেরিয়াল-১০৮ বা অ্যাস্ট্রা-অ্যালয়’ (Astra-Alloy)।
জেনিভার CERN-এর লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে (LHC) ‘হিগস বোসোন’ বা ঈশ্বরকণা আবিষ্কারের পর একটি গভীর অমীমাংসিত প্রশ্ন বিশ্ববিজ্ঞানকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। হিগস ফিল্ড পদার্থের ভর (mass) তৈরি করলেও, বিশেষ কোয়ান্টাম অবস্থায় কীভাবে সেই ভরকে শূন্যের কাছাকাছি এনে চরম ঘনত্বের অবিনাশী ক্রিস্টাল গঠন তৈরি করা যায়, তার উত্তর সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল না।
কিন্তু মহাদেব শিবের তাণ্ডব নৃত্য — অর্থাৎ কোয়ান্টাম ফিল্ডের অবিরাম সৃষ্টি ও ধ্বংসের যে প্রতীকী রূপ CERN-এর চত্বরে নটরাজ মূর্তির মাধ্যমে স্থাপিত, তার আসল গাণিতিক সংকেত লুকিয়ে ছিল কৈলাশের এই ভূ-গর্ভস্থ বিশেষ শূন্য-চৌম্বকীয় অক্ষবিন্দুতে (Zero-Magnetic Axial Point)। কৈলাশের স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক গঠনে এমন কিছু বিরল প্রাকৃতিক অ্যালিমেন্টাল ক্ষেত্র রয়েছে, যা কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনকে এক অদ্ভুত রেজোনেন্সে নিয়ে আসে।
অয়নাংশু তাঁর চোখের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে প্রকাণ্ড মনিটরগুলোর দিকে এগোলেন। "অর্ণব, পারমাণবিক ল্যাটিস পরিবর্তনের ডেটাটা আবার রান করাও। আমি দেখতে চাই কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রায় এর ভেতরে ফনন ভাইব্রেশনের কী পরিবর্তন হচ্ছে।"
অর্ণব কিবোর্ডে দ্রুত হাত চালিয়ে কমান্ড দিল। ভ্যাকুয়াম চেম্বারের ভেতরে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন লেজার গান থেকে নির্গত হলো কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের প্রকাণ্ড প্লাজমা ফোকাস। অথচ কাচের ওপাশে থাকা সেই ধূসর-রূপালী ধাতুটিতে বিন্দুমাত্র উত্তাপ সৃষ্টি হলো না!
"অবিশ্বাস্য অয়নদা!" অর্ণব চিৎকার করে উঠল। "স্পেকট্রোস্কোপি দেখাচ্ছে ধাতুটির থার্মাল এক্সপ্যানশন কো-দক্ষতা বা ক্ষেত্র-প্রসারণ গুণাঙ্ক (alpha) শূন্যের নিচে নেমে যাচ্ছে! এটি মোটেও গরম হচ্ছে না!"
"গরম হবে না অর্ণব," অয়নাংশু শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললেন। "কারণ অ্যাস্ট্রা-অ্যালয়ের পারমাণবিক স্ট্রাকচার সাধারণ পর্যায় সারণীর (Periodic Table) কোনো নিয়ম মেনে চলে না। বাইরে থেকে যখন চরম তাপশক্তি বা আল্ট্রা-হাই ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশন এর ওপর আছড়ে পড়ে, তখন এর 'কোয়ান্টাম ফনন' (Quantum Phonons) তাপশক্তিকে শুষে পরমাণুকে উত্তেজিত করার বদলে তা সাথে সাথে উচ্চ-ঘনত্বের মহাকর্ষীয় তরঙ্গে (Gravitational Waves) রূপান্তর করে বাইরে ছিটকে দিচ্ছে।"
"আর এর এব্রেসিভ পাওয়ার?" সোফিয়া ড্যাশবোর্ড থেকে প্রশ্ন তুলে ধরলেন।
"অসীম," অয়নাংশু ব্যাখ্যা করলেন। "যখন কোনো বস্তু তীব্র গতিতে বা প্রকাণ্ড শক্তিতে একে আঘাত করবে, তখন এর ইলেকট্রন ক্লাউড প্রোটন নিউক্লিয়াসের এত কাছে চলে আসবে যে এর পারমাণবিক বাঁধন ডায়মন্ড বা হীরাকেও হাজার গুণ ছাপিয়ে যাবে। এটি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যেকোনো কঠিন বস্তুকে ক্ষয় করে দিতে পারবে, কিন্তু নিজের ভেতরে কোনো ডিফরমেশন বা বিকৃতি ঘটবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা — এটি ওজনে অ্যালুমিনিয়ামের চেয়েও হালকা!"
কিন্তু আসল মিরাকল ঘটল সেদিন রাতে।
ল্যাবের সমস্ত যন্ত্রপাতির ফ্রিকোয়েন্সি যখন কৈলাশের বিশেষ চারশো বত্রিশ হার্টজ (432 Hz) প্রাকৃতিক ওম-রেজোনেন্সের সাথে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হলো, তখন ভ্যাকুয়াম চেম্বারে ভাসমান ধাতুটির ধূসর রঙ বদলে এক অলৌকিক নীলচে আভায় রূপান্তরিত হলো। ধাতুটির মসৃণ গায়ে কোনো খোদাই ছাড়াই ফুটে উঠতে লাগল পারমাণবিক স্ফটিকের অদ্ভুত কিছু জ্যামিতিক প্যাটার্ন — যা দেখতে অবিকল প্রাচীন তাম্রলিপি বা ইয়ন্ত্রের (Yantra) মত!
ধাতুটি শুধু জড় পদার্থ হিসেবে কাজ করছিল না। এটি ল্যাবে উপস্থিত বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কের আলফা ওয়েভ এবং আশপাশের শব্দতরঙ্গ গ্রহণ করে নিজেকে পুনর্গঠন করছিল। এটি ছিল এক জীবন্ত "জৈব-ধাতব মাধ্যম (Bio-Metallic Matrix)"।

পর্ব ২: পাতাল থেকে নক্ষত্রালোক

বিজ্ঞানীদের সামনে এখন কেবল তত্ত্ব যাচাইয়ের সময় নয়, ছিল সরাসরি প্রয়োগের চ্যালেঞ্জ। প্রজেক্টের নাম দেওয়া হলো 'প্রলয়-স্ফটিক'।
অয়নাংশু ও তাঁর টিম অ্যাস্ট্রা-অ্যালয়ের একটি ক্ষুদ্র প্রোটোটাইপ ব্যবহার করে তৈরি করলেন একটি বিশেষ ড্রিল-প্রোব — ‘ত্রিশূল-১’।
প্রথম লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলো পৃথিবীর ভরকেন্দ্র বা ‘আর্থস কোর’ (Earth's Core)। কৈলাশের তলদেশ থেকে নির্গত শক্তিশালী কোয়ান্টাম ফিল্ড এবং অ্যাস্ট্রা-অ্যালয়ের শূন্য-ডিফরমেশন গুণকে কাজে লাগিয়ে প্রোবটিকে ভূ-ত্বক ভেদ করে নিচে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
পৃথিবীর ক্রাস্ট এবং ম্যান্টল পার হয়ে প্রোবটি যখন পৃথিবীর ভেতরের প্রকাণ্ড ফুটন্ত তরল লোহার সাগরে পৌঁছাল, সেখানে তাপমাত্রা ছয় হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং চাপ প্রায় সাড়ে তিনশো গিগাপাসকাল। সাধারণ কোনো ধাতু তো দূরের কথা, যেকোনো জটিল যৌগ সেখানে বাষ্প হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু অ্যাস্ট্রা-অ্যালয় সেখানে পৌঁছাতেই তার ইলেকট্রন ক্লাউড অতিরিক্ত চাপের ফলে আরও বেশি সংকুচিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠল। প্রোবটি পৃথিবীর কোরের তরল লোহার মধ্য দিয়ে ঘুরে ভূতাত্ত্বিক ও চৌম্বকীয় তরঙ্গের সমস্ত ডেটা রেকর্ড করে প্রায় বারো ঘণ্টা পর অক্ষত অবস্থায় ফিরে এলো। এর পৃষ্ঠে একবিন্দু আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি!
প্রথম পরীক্ষাই প্রমাণ করে দিল — চাপ ও উত্তাপ যত বাড়ে, অ্যাস্ট্রা-অ্যালয় তত বেশি অবিনাশী হয়ে ওঠে।
এর পরের মিশন ছিল মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুঃসাহস। ‘ত্রিশূল-১’-কে উন্নত করে একটি স্বয়ংক্রিয় স্পেস-প্রোবে রূপান্তর করা হলো এবং উৎক্ষেপণ করা হলো সূর্য ও বুধ গ্রহের মধ্যবর্তী চরম উত্তপ্ত অঞ্চলে।
সূর্যের বিকিরণ অঞ্চল পার হয়ে প্রোবটি যখন করোনাল মাস ইজেকশনের (CME) মুখোমুখি হলো, সেখানে কোটি কোটি ভোল্টের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক প্লাজমা ঝড় বইছিল। পৃথিবীর কোনো স্যাটেলাইট এই অঞ্চলে কয়েক সেকেন্ডও টিকতে পারে না। কিন্তু ‘ত্রিশূল-১’ সেই প্লাজমা শক্তিকে শুষে নিয়ে নিজের পারমাণবিক স্পিন বাড়াতে শুরু করল। ধাতুটি তাপমাত্রার চাপকে ইলেকট্রিক সিগন্যালে বদলে কৈলাশের ল্যাবে ডেটা স্ট্রিম পাঠাতে শুরু করল।
ল্যাবের স্ক্রিনে ফুটে উঠল সূর্যের উপরিভাগের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম কোয়ান্টাম ফিল্ডের চিত্র।
অয়নাংশু স্তব্ধ হয়ে মনিটরের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। ড. সোফিয়া চোখ বড় বড় করে বললেন, "ড. মুখার্জি! ডেটা স্ট্রিম যা দেখাচ্ছে... সূর্যের ভরকেন্দ্রে এমন এক ধরণের শূন্য-ভ্যাকুয়াম ফিল্ড আছে, যা সরাসরি ঈশ্বরকণা বা হিগস ফিল্ডের উৎস তৈরি করছে! আমাদের যদি চিরস্থায়ী ও অসীম শক্তির উৎস খুঁজে বের করতে হয়, তবে এই প্রোবকে কেবল সূর্যের কাছে পাঠালে চলবে না... একে সোজা সূর্যের নিউক্লিয়ার কোর অর্থাৎ ভরকেন্দ্রের ভেতরে নামাতে হবে!"
"সূর্যের উদরে?" রিচার্ড হাতজোড় করলেন। "সেখানে পনেরো মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আর প্রকাণ্ড গ্র্যাভিটি!"
"কিন্তু আমাদের কাছে যে অ্যাস্ট্রা-অ্যালয় আছে রিচার্ড!" অয়নাংশুর চোখে তখন এক দূরদর্শী বৈজ্ঞানিক উন্মাদনা। "উত্তাপ আর চাপ যত বাড়বে, এটি তত বেশি শক্ত ও স্থিতিশীল হবে। এটি সূর্যকে ধ্বংস করবে না, বরঞ্চ সূর্যের ভেতরের মহাজাগতিক সৃষ্টির মূল ফ্রিকোয়েন্সি ডিকোড করে পৃথিবীতে পাঠাবে।"
বিজ্ঞানীদের চূড়ান্ত মিশন নির্ধারিত হলো — "সূর্যের ভরকেন্দ্রে ‘ত্রিশূল-২’ প্রেরণ"।

পর্ব ৩: অমাবস্যার রক্তপাত

কিন্তু বিজ্ঞানীদের এই বৈজ্ঞানিক নীরব বিপ্লব বেশিদিন গোপন রাখা সম্ভব হয়নি।
চীন সীমান্ত সংলগ্ন জিনজিয়াং সামরিক ঘাঁটির অতি-শক্তিশালী স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং রাডার এবং কিছু পশ্চিমা দেশের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের নজরে চলে আসে কৈলাশের স্থান-কাল থেকে নির্গত হওয়া সেই অদ্ভুত কোয়ান্টাম ফ্রিকোয়েন্সি। তারা প্রথমে ভেবেছিল ভারত ভূ-গর্ভস্থ কোনো নতুন নিউক্লিয়ার ওয়েপন টেস্ট করছে। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন তারা পৃথিবীর কোর এবং সূর্যের করোনা থেকে আসা সিগন্যালগুলো ইন্টারসেপ্ট করল, তখন তারা বুঝতে পারল — কৈলাশের বরফের নিচে এমন এক প্রযুক্তি রূপ নিচ্ছে যা পুরো বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য এক নিমেষে বদলে দিতে পারে।
যে দেশ এই 'মেটাম্যাটেরিয়াল-১০৮' নিজের কব্জায় আনবে, তার কাছে পৃথিবীর সব মিসাইল, লেজার, এমনকি নিউক্লিয়ার বোমাও খেলনা হয়ে যাবে। আর যদি এটি তারা নিজেরা অর্জন করতে না পারে, তবে পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে একে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেওয়াই তাদের কাছে একমাত্র বিকল্প ছিল।
দিনটি ছিল এক তীব্র অমাবস্যার রাত। কৈলাশের ওপর দিয়ে বইছিল ঘণ্টায় দেড়শো কিলোমিটার বেগের এক প্রকাণ্ড তুষারঝড়। বাইরের হাড়হিম করা আবহাওয়াকে ঢাল বানিয়ে উত্তর দিক থেকে নিঃশব্দে উড়ে এলো কোনো দেশের চিহ্নিতকরণ চিহ্নহীন কয়েকটি অত্যাধুনিক স্টিলথ ড্রোন এবং ব্ল্যাক-অপ্স কমান্ডো স্কোয়াড।
ল্যাবের ভেতর তখন বিজ্ঞানীদের কাজ চলছিল চূড়ান্ত পর্বে। ‘ত্রিশূল-২’-এর ফাইনাল কোয়ান্টাম টিউনিং করছিলেন অয়নাংশু ও অর্ণব।
হঠাৎই ল্যাবের ভারী ইস্পাতের দরজা প্রচণ্ড বিস্ফোরণে উড়ে গেল! ধোঁয়া ও অন্ধকারের মধ্য থেকে ছুটে এলো লেজার-গাইডেড বুলেটের বৃষ্টি।
"সবাই নিচে মাথা নোয়ান!" রিচার্ড চিৎকার করে উঠলেন, কিন্তু তার আগেই বুলেটের আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি।
অর্ণব ব্যাকআপ হার্ডড্রাইভ এবং মেটাম্যাটেরিয়ালের একমাত্র অবশিষ্ট স্যাম্পলটি রক্ষা করার জন্য মেইন কনসোলের দিকে দৌড় দিল। কিন্তু একটি নিষ্ঠুর থার্মাল-ব্লাস্ট ক্যানিস্টার তার ঠিক পাশে এসে ফাটল। আগুনের শিখায় তরুণ অর্ণব লুটিয়ে পড়ল কম্পিউটারের ওপর।
"অর্ণব!" অয়নাংশু আর্তনাদ করে উঠলেন।
ড. সোফিয়া রক্তাক্ত অবস্থায় অয়নাংশুর হাত চেপে ধরলেন, "স্যার! আপনাকে বাঁচতে হবে! ওরা ল্যাবের সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে, ওদের মূল উদ্দেশ্য এই ধাতু আর আপনাকে শেষ করা! আপনি পিছনের সিক্রেট প্যাসেজ দিয়ে পালান!"
সোফিয়া নিজেই শত্রু কমান্ডোদের বিভ্রান্ত করতে বিপরীত দিকে ছুটে গেলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারী অস্ত্রের গর্জনে ল্যাবের ভেতরের সমস্ত আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে গেল।
অয়নাংশু মুখার্জি কাঁপতে কাঁপতে ল্যাবের জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকালেন। চেম্বারগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে, সুপারকম্পিউটারগুলোতে আগুন জ্বলছে, তাঁর তিন সহকর্মী রক্তে ভেসে যাচ্ছেন। তিনি আর সময় নষ্ট না করে, অর্ণবের রক্তাক্ত হাত থেকে টেনে নেওয়া সেই ব্যাকআপ নোটবুক ও নিজের ডায়েরিটি জামার ভেতর পুরে নিয়ে ল্যাবের পিছনের গোপন তুষার-সুড়ঙ্গের অন্ধকারের দিকে পালিয়ে গেলেন।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো ভূ-গর্ভস্থ ল্যাবটিতে প্রকাণ্ড প্লাজমা এক্সপ্লোসিভ বসিয়ে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হলো। কৈলাশের চার হাজার মিটার নিচের সেই তুষারগহ্বর চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। বিশ্ব জানতেও পারল না — মানবজাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক অধ্যায় রক্তে ধুয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

পর্ব ৪: শিলিগুড়ির বিকেল ও হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস

সেই ঘটনার প্রায় চার মাস পরের কথা।
উত্তরবঙ্গে তখন শরৎকাল। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ঠান্ডা হাওয়া নেমে এসেছে ডুয়ার্স ও সমতলে। আকাশ একদম পরিষ্কার, ফাঁসিদেওয়া ও মহানন্দার তীর থেকে চোখ মেললেই দূরে দিগন্তে কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফাবৃত চূড়া শুভ্র আলোর মতো জলজল করছে।
শিলিগুড়ির মহানন্দা ড্রাইভের পাশেই অবস্থিত এক সুসজ্জিত সবুজ বাড়ি। বাড়িটির মালিক একজন প্রবীণ ল্যান্ডস্কেপ ইঞ্জিনিয়ার এবং সাহিত্যপ্রেমী লেখক। তিনি নিজের বাগানে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নানা বিরল প্রজাতির বৃক্ষ ও প্রকৃতির সমন্বয়ে এক সবুজ স্বর্গ গড়ে তুলেছেন।
সেদিন বিকেলে শিলিগুড়ির মহানন্দার পাড়ে সূর্য নামছিল সোনালী রঙ ছড়িয়ে। লেখকের বসার ঘরের কাচের জানলা দিয়ে বাইরের ল্যান্ডস্কেপিং বাগানের সৌন্দর্য চমৎকার দেখাচ্ছিল।
ঘরের ভেতরে এক কোণে বসেছিলেন একজন বৃদ্ধ লোক। উসকোখুসকো চুল, কপালে ও গালে কাটার গভীর দাগ, চোখের নিচে জমাট বাঁধা কালি আর গায়ে জড়ানো একটা ছেঁড়া ময়লা চাদর। তিনি এতই শীর্ণ যে মনে হচ্ছিল হাওয়া দিলেই উড়ে যাবেন।
চা এনে টেবিলে রাখলেন গৃহকর্তা অর্থাৎ লেখক। লোকটির দিকে তাকিয়ে তিনি মৃদু স্বরে বললেন, "ড. অয়নাংশু, প্রায় তিন বছর পর আপনাকে এই অবস্থায় দেখব আমি আশা করিনি। আপনি কোথায় ছিলেন এত দিন?"
অয়নাংশু গরম চায়ের কাপটিতে হাত রাখলেন। তাঁর হাত কাঁপছিল। চায়ের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টিতে তিনি কথা বলতে শুরু করলেন।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল শিলিগুড়ির মহানন্দা ড্রাইভে। আর সেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অয়নাংশু লেখকের সামনে উন্মোচন করলেন সেই অবিশ্বাস্য গল্প — কৈলাশের গোপন ল্যাব, হিগস ফিল্ড, CERN-এর ঈশ্বরকণা, ‘মেটাম্যাটেরিয়াল-১০৮’ বা অ্যাস্ট্রা-অ্যালয়ের অবিশ্বাস্য গুণাবলী, পৃথিবীর কোর ও সূর্যের করোনার অভিযান এবং শেষ অমাবস্যার রাতের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসলীলা।
লেখক স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। সাধারণ কোনো লোক এই গল্প শুনলে অয়নাংশুকে উন্মাদ বা পাগল বলে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিত। কিন্তু লেখক একজন কল্পবিজ্ঞানের পাঠক ও প্রাক্তন যান্ত্রিক প্রকৌশলী; তিনি অয়নাংশুর চোখের বিষাদ এবং তাঁর মুখের বৈজ্ঞানিক টার্মগুলোর গভীরতা বুঝতে পারছিলেন। এটি কোনো রূপকথা নয়, এটি এক নিষ্ঠুর সত্য যা বৈশ্বিক রাজনীতির হিংসার বলী হয়েছে।
"অয়নদা," লেখক নিচু গলায় বললেন, "আপনি এখন কোথায় যাবেন? পুলিশ বা আন্তর্জাতিক এজেন্সি কি আপনার পিছু নিয়েছে?"
অয়নাংশু মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো আশা ছিল না। "যাদের ভয় পেয়েছিলাম, তারা ভেবেছে আমি কৈলাশের বরফেই মরে পচে গেছি। আমি নিঃস্ব, আমার তিনটে সহকর্মী মরে গেছে, আমার ল্যাব শেষ। আমি শুধু চাইছিলাম এই সত্যিটা কাউকে বলে যেতে... এমন কাউকে, যে বিজ্ঞানের সত্যকে সম্মান করতে জানে।"
রাত নামার আগেই অয়নাংশু উঠে দাঁড়ালেন। লেখক তাঁকে অনেক অনুরোধ করলেন রাতে থেকে যাওয়ার জন্য, কিন্তু অয়নাংশু কারও সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চান না। তিনি শান্ত ভঙ্গিতে দরজার বাইরে পা বাড়ালেন। মহানন্দার পাশের অন্ধকার রাস্তায় তিনি মিলিয়ে গেলেন — এক নিঃসঙ্গ পথিকের মতো, যার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
অয়নাংশু চলে যাওয়ার পর লেখক ভারাক্রান্ত মনে ঘরে ফিরে এলেন। চায়ের কাপগুলো সরাতে গিয়ে হঠাৎই তাঁর চোখ গেল কাঠের চা-চক্রের টেবিলটার দিকে।
টেবিলের একপাশে পড়ে রয়েছে অয়নাংশুর সেই হাত-বান্ধা পুরোনো চামড়ার খাতাটা! অয়নাংশু আসার সময় যা বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেছিলেন!
উদ্বেগ ও প্রবল কৌতূহলে লেখকের হাত কাঁপতে লাগল। তিনি খাতাটি তুলে নিয়ে সাবধানে প্রথম পাতাটি খুললেন।
খাতাটি কোনো সাধারণ ডায়েরি নয়! এর প্রথম অর্ধাংশে লেখা রয়েছে ড. অয়নাংশুর চার বছরের অভিজ্ঞতার প্রতিটি ডিটেইল। আর পরের অংশজুড়ে আঁকা রয়েছে —কৈলাশের শূন্য-চৌম্বকীয় অক্ষের জিওমেট্রিক কো-অর্ডিনেট, CERN-এর হিগস-ফ্রিকোয়েন্সি ডায়াগ্রাম, এবং সবচেয়ে চমকপ্রদ হলো ‘মেটাম্যাটেরিয়াল-১০৮’ বা অ্যাস্ট্রা-অ্যালয় তৈরির নিখুঁত পারমাণবিক, কোয়ান্টাম ও মেটালার্জিক্যাল সমীকরণ!
কোন অনুপাতে কোন ধাতু মেলালে, কত হার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে এবং কোন চাপের মধ্যে এই অবিনাশী শংকর তৈরি সম্ভব — তার পুরো ফর্মুলা সেখানে স্পষ্ট ভাষায় নথিভুক্ত করা আছে!
ডায়েরির একদম শেষ পাতায় অয়নাংশুর কাঁপাকাঁপা হাতের সই এবং তার নিচে নীল কালিতে লেখা একটি বার্তা:

"আমার প্রিয় বন্ধু,
আমি জানি তুমি এই খাতাটি পাবে। পৃথিবী হয়তো আজ এই পরম বিজ্ঞানের যোগ্য হয়ে ওঠেনি। মানুষ আজ বিজ্ঞানের আলো দিয়ে অন্য মানুষকে মারার অস্ত্র বানায়। কিন্তু কোনো একদিন মানবের প্রজ্ঞা যখন রাজনৈতিক হিংসাকে ছাপিয়ে যাবে, তখন এই শংকর ধাতু নিশ্চয়ই সূর্যের হৃদপিণ্ডে পৌঁছাবে।
ততদিন পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষ জানুক বা না জানুক — গল্পের ছলে হলেও, কল্পবিজ্ঞানের কলমে এই পরম সত্যকে তুমি তোমার শব্দের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখো..."

লেখক চামড়ার খাতাটি বুকে চেপে ধরে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকালেন তিনি। উত্তর-পূর্বের দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার পেছনে আকাশে অজস্র নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে, আর দূরে কোথাও সূর্য আবার নতুন এক ভোরের জন্য তৈরি হচ্ছে।
লেখক টেবিলের দিকে হেঁটে গেলেন। কলমের ক্যাপটা খুললেন, তারপর সাদা কাগজের ওপর প্রথম লাইনটি লিখলেন:
‘বিজ্ঞান যা হারিয়েছে, কালির আঁচড়ে আজ তাকে অমরাবতী দেওয়ার সময় এসেছে...’

শুভ সন্ধ্যা সব্বাইকে, আজ একটা কেমিক্যাল গল্প শোনাই থুড়ি পড়াই আপনাদের। ধন্যবাদ -                        রাসায়নিক অনুঘটক  ...
10/09/2026

শুভ সন্ধ্যা সব্বাইকে, আজ একটা কেমিক্যাল গল্প শোনাই থুড়ি পড়াই আপনাদের। ধন্যবাদ -

রাসায়নিক অনুঘটক

কল্পনায় : সৌমেন ভাদুড়ী

জীবন যখন টেস্টটিউবে একের পর এক কঠিন অনুঘটক ঢেলে দেয়, তখন কিছু মানুষ ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যায়, আর কিছু মানুষ পরিণত হয় ইস্পাতে। সুজয়া তেমনই এক নারী — রূপ, শিক্ষা আর শৌখিনতার এক অপূর্ব মিলন। ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন, জীবনকে দেখতে চান মুক্ত চোখে। অথচ শিলিগুড়ি শহরের অলক্ষ্যে থাকা এই নারী নিজের সমস্ত সাফল্য আর সৌন্দর্যের পেছনে ঢেকে রেখেছেন এক গভীর লড়াইয়ের গল্প। তাঁর অনুরোধেই আসল নামটা গোপন থাক, অভিজ্ঞতার কঠিন বর্মের অন্তরালে তিনি না হয় 'সুজয়া' হয়েই থাকুন।
গল্পের শুরুটা বেশ সুন্দর আর সাধারণ বাচ্চাদের মতো। কলকাতার লরেটো স্কুলের বারোটা বছর ক্লাসের প্রথম বেঞ্চটা যেন সুজয়ার জন্যই সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু বিধাতার সমীকরণ বড় অদ্ভুত। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের উচ্চপদস্থ অফিসার বাবার সমস্ত সাধ্য আর ভালোবাসাকে হার মানিয়ে, সুজয়ার মাধ্যমিকের ঠিক আগেই চিরতরে হারিয়ে গেলেন তাঁর মা। মাতৃহারা বুকফাটা যন্ত্রণা বুকেই চেপে রেখে সুজয়া স্কুলে প্রথম হলেও, বোর্ডের প্রত্যাশিত র‍্যাঙ্কটা অধরা রয়ে গেল। তাও থামেনি তাঁর লড়াই। ওই স্কুলেই পিওর সায়েন্সে ভর্তি হওয়া, প্রিয় বিষয় কেমিস্ট্রিকে আঁকড়ে ধরা এবং পরবর্তীতে উচ্চ-মাধ্যমিক ও জয়েন্টে দুর্দান্ত ফলাফল করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা।

ঝড় এসে যখন ভেঙে দিয়ে যায় নীড়,
চোখের জলে কি থামানো যায় রে কালবৈশাখীর ভিড়?
ভাঙা কাচ বুকে গুঁজে নিয়ে তাই হাঁটে যে একাকী পথ,
তারই তো নাম জীবন-সংগ্রাম, তারই তো নাম রথ।

প্রথমবার কো-এড কলেজে পা রেখে যখন পড়াশোনা আর বয়সের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা অর্জনে সুজয়া ব্যস্ত, তখন অলক্ষ্যেই একাকী, স্ত্রী-হারা বাবার জীবনের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। সুজয়ার বি-টেক গ্রাজুয়েশনটাও দেখে যাওয়া হয়নি তাঁর। তবে যাওয়ার আগে দেখে গিয়েছিলেন সামান্য অপছন্দের এক জামাইকে — যে ছিল সুজয়ারই সহপাঠী ও এক দারুণ নন-বেঙ্গলী কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।
আত্মীয়দের হাজারো অমত সত্ত্বেও বি-টেক শেষেই চারহাত এক হলো এবং ক্যাম্পাসিংয়ের সূত্রে সুজয়ারা দু'জনেই পাড়ি দিলেন আমেরিকায়। চাকরির পাশাপাশি চলল মাস্টার্স। কিন্তু ক্যারিয়ারের নতুন মোড় ও নতুন সুযোগের হাতছানিতে কোল খালি হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে গন্তব্য হলো জাপান। সেখানেই জন্ম নিল তাঁদের একমাত্র কন্যা। স্বামী পাশে থাকলেও, সেই কঠিন দিনগুলোয় সুজয়ার সবচেয়ে বড় শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর শাশুড়ি।
এরপর ক্যারিয়ারের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ সুজয়াকে একে একে নিয়ে গেল চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং পরিশেষে সুইজারল্যান্ডে। স্বামী তখন সেখানেই কর্মরত, আর মেয়ে হোস্টেলের শৃঙ্খলে নিজেকে স্বাধীন ও স্বাবলম্বী করে তুলছিল। এদিকে সুজয়ার সততা, রূপ, মার্জিত ব্যক্তিত্ব আর দৃঢ়চেতা স্বভাবের জোরে শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলোর কাছে — বিশেষ করে শাশুড়ি ও ননদের কাছে — তিনিই হয়ে উঠলেন মূল ভরসাস্থল।
কিন্তু সুইজারল্যান্ডে এসে বেশ কিছুদিন সংসার করতেই সুজয়ার তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে যায়নি সত্যটা। তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর স্বামী দীর্ঘ বেশ কয়েকবছর ধরে তারই এক জুনিয়র নারী সহকর্মীর (কলিগ) সাথে লিভ-ইন রিলেশনে আবদ্ধ, যে কিনা অনেকটা বয়সে ছোট। চোখের জলে ভেসে না গিয়ে, হৃদয়ের আবেগগুলোকে এক পলকে বস্তাবন্দী করলেন সুজয়া। মস্তিষ্কের কঠোর নির্দেশে নিলেন মিউচুয়াল ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা যখন খোরপোষ নেওয়ার অনুরোধ জানালেন, সুজয়ার একটাই স্পষ্ট উত্তর ছিল — "খোরপোষের টাকায় কি অপমানের মূল্য চোকানো যায়?"
সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটালেন সুজয়ার শাশুড়ি। নিজের গর্ভজাত সন্তানের এই অন্যায় মেনে না নিয়ে, তিনি পুত্রের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে বেছে নিলেন পুত্রবধূ সুজয়াকেই।

অভিমানী হিয়া সহে অনল, সয় অপমানভার,
বিকিকিনি তো হয় না প্রেমে, বিকায় না অধিকার।
মর্যাদা যার আলোর মতন দীপ্ত ও অনন্যা,
মাথা নোয়ায় না বিকিয়ে নিজেকে, সে যে তেজস্বিনী কন্যা।

বিদেশের পাঠ চুকিয়ে সুজয়া ফিরে এলেন ভারতে। হায়দ্রাবাদের এক শীর্ষস্থানীয় ফার্মে বড় পদে যোগ দিয়ে সেখান থেকেই ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিলেন মেয়েরই পছন্দের এক বিদেশি পাত্রের সাথে।
কিন্তু অফুরন্ত সাফল্য আর শিক্ষার আলোও কি মানুষের ভেতরের পরম একাকীত্ব মুছে দিতে পারে? জীবনের এই রূপোলি আলোছায়ায় সুজয়া তাই ফিরে এসেছেন শিলিগুড়িতে। খুড়তুটো বোনের সহায়তায় গড়ে তুলেছেন নিজের এক সুন্দর ও শৌখিন বাংলো। সেখান থেকেই অনলাইনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন শিক্ষার আলো। আজ শিলিগুড়ির সেই বাংলোয় শ্বশুরবাড়ির প্রিয়জনেরা নিয়মিত আসেন, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দেন তাঁকে।
বাহ্যিক জগতের সামনে সুজয়া এক আপসহীন 'আয়রন লেডি'। কিন্তু নির্জন রাতের আঁধারে যখন সাজানো ঘরের দেয়ালগুলো নীরব হয়ে যায়, তখন একেকটা রাতে বালিশ ভিজে ওঠে তাঁর অশ্রুতে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মন প্রশ্ন তোলে — শৈশব থেকেই কেন তাঁর জীবনটা শুধুই এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের গল্প হয়ে রইল?
তবে যৌবনের উপান্তে এসেও তিনি নিজেকে একেবারে নিঃশেষ হতে দেননি। ঘুরতে ভালোবাসার অবাধ টানে আর জীবনকে নতুন করে উপভোগ করার ছন্দে আজ এক পাঞ্জাবী পাইলটের সাথে তাঁর এক আত্মিক ও মানসিক 'মেন্টাল লাভ' সম্পর্ক তৈরী হয়েছে। কিন্তু ন্যাড়া তো আর বারবার বেলতলায় যায় না! তাই সেই প্রেমকে কোনো আইনি বা সামাজিক বাঁধনে না বেঁধে তিনি ভাসিয়ে রেখেছেন মুক্ত বাতাসে — বছরে মাত্র পাঁচ-ছয়বার, দু-তিনদিনের একটু মানসিক স্বস্তি, ভ্রমণ আর চিল-আউটের আশ্রয় হিসেবে।

মেঘের পালকে ভেসে যায় মন, সীমানাবিহীন দূর,
ক্ষত মুছে দিয়ে বাজে বাতাসে বিষাদ-রোমান্টিক সুর।
পাওয়া না-পাওয়ার হিসেব ভুলিয়ে ওড়ে জীবনের গান,
ধূপের মতন সুবাস ছড়িয়ে বাঁচে ছাইচাপা প্রাণ।

সুজয়া হয়তো কেমিক্যালের জটিল বিক্রিয়া সামলেছেন সারাজীবন, কিন্তু জীবনের ল্যাবরেটরিতে নিজের অপমানকে আত্মসম্মানে বদলে দিয়ে তিনি যেভাবে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, তা সত্যিই এক অনুপ্রাণিত করার মতো রূপকথা।

শুভ সন্ধ্যা সব্বাইকে, আজ আরও একটা অন্যরকমের গল্প (ধারাবাহিক না) আপনাদের জন্য। প্লিজ কমেন্ট করবেন। ধন্যবাদ -             ...
09/09/2026

শুভ সন্ধ্যা সব্বাইকে, আজ আরও একটা অন্যরকমের গল্প (ধারাবাহিক না) আপনাদের জন্য। প্লিজ কমেন্ট করবেন। ধন্যবাদ -

অক্ষিগোলকের ব্যবচ্ছেদ

কল্পনায় : সৌমেন ভাদুড়ী

নীল কাঁচের জানালাটার ওপর তখন একটানা বৃষ্টি ঝরে পড়ছে। শহরের পিচঢালা রাস্তা বেয়ে নেমে যাওয়া ঘোলা জলের স্রোতের দিকে তাকিয়ে ছিলেন দেবব্রত। বয়স পঁয়তাল্লিশ ছুঁইছুঁই, একটা মাঝারি মাপের প্রকাশনা সংস্থায় সম্পাদনার কাজ করেন তিনি। আপাতদৃষ্টিতে দেবব্রতর জীবন শান্ত, নির্বিবাদ। কিন্তু তার মাথার ভেতর প্রতিটা মুহূর্ত এক অসহ্য শব্দের কারখানা।
টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপের পর্দাটা নিভে গেছে অনেকক্ষণ। দেবব্রত সেখানে নিজের আবছা প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিলেন। আয়নার মতো সেই মসৃণ কালো তলে ভেসে উঠছে একজোড়া ক্লান্ত চোখ। চোখ দুটো যেন বহু বছর ধরে না-ঘুমোনোর ক্লান্তিতে রক্তাভ হয়ে আছে। হঠাৎ করেই পাশের কিউবিকল থেকে অনির্বাণ এসে বসল। অনির্বাণের হাতে ধূমায়িত কফির কাপ।
"কী ব্যাপার দাদা? আপনাকে আজকাল খুব অন্যমনস্ক দেখায়। শরীর খারাপ নাকি?" অনির্বাণের গলায় পরিচিত উদ্বেগ।
দেবব্রত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "না অনির্বাণ, শরীর খারাপ নয়। আসলে একটা শব্দ ইদানীং আমাকে খুব তাড়া করে বেড়াচ্ছে — ধর্ষণ।"
অনির্বাণ একটু চমকে উঠল। অফিসঘরের শান্ত পরিবেশে এই শব্দটা কিছুটা বেমানান, কিছুটা অস্বস্তিকর। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলা খাদে নামিয়ে বলল, "হঠাৎ এ কথা? কোনো খবর পড়েছেন নাকি সংবাদপত্রে?"
"আমরা সংবাদপত্রে যা পড়ি, আইন যাকে চিহ্নিত করে, তা তো কেবল শরীরের হিসেব," দেবব্রত ধীর গলায় বলতে শুরু করলেন। "আমরা ধরে নিয়েছি, এই হিংস্রতা কেবল একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গের শরীরকে লক্ষ্য করে ঘটে। কিন্তু ধর্ষণ কি শুধুই মাংসের ওপর জবরদস্তি? শুধুই কি যৌনতার আগ্রাসন? একজন পুরুষ কি কখনো ধর্ষিত হয় না?"
অনির্বাণ কফির কাপে চুমুক দিয়ে কিছুটা যুক্তির সুরে বলল, "পুরুষের শারীরিক হেনস্থা নিয়ে তো আজকাল কিছু আলোচনা হচ্ছে দাদা। কিন্তু সেটা তো সংখ্যায় কম..."
"আমি শুধু শারীরিক সংসর্গের কথা বলছি না রে," দেবব্রত বাধা দিয়ে বলে উঠলেন। তাঁর কণ্ঠে এক ধরনের অদ্ভুত শীতলতা ছিল। "ভাব তো সেই ছেলেটির কথা, যে প্রতিদিন ঘরে ফেরে শুধু এই ভয়ে যে দরজার ওপাশে তার জন্য অপেক্ষা করছে কিছু নির্মম, ধারালো শব্দ। তার পৌরুষকে ব্যঙ্গ করে, তার অক্ষমতাকে উপহাস করে সমাজ আর পরিবারের মানুষেরা অবিরত যা বলে চলেছে — তা যখন তার কানের পর্দায় গিয়ে আছড়ে পড়ে, তখন কি তার শ্রবণেন্দ্রিয় ধর্ষিত হয় না? অনিচ্ছাকৃতভাবে যখন কোনো বিষাক্ত, কদর্য দৃশ্য তাকে দিনের পর দিন দেখতে বাধ্য করা হয়, তখন তার দর্শনেন্দ্রিয়ের ওপর কি কোনো অনাচার ঘটে না?"
অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। দেবব্রতর এই প্রশ্নের গভীরতা তাকে অপ্রস্তুত করে তুলছিল। সে বলল, "কিন্তু সেটাকে আপনি মানসিক নির্যাতন বা ট্রমা বলতে পারেন। তাকে ধর্ষণ বলা কি ঠিক হবে?"
"কেন নয়?" দেবব্রতর চোখ দুটো জ্বলে উঠল। "সম্মতিহীন যে কোনো হিংস্র অনুপ্রবেশই তো ধর্ষণ। একটা শরীরকে যেমন তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভেঙে ফেলা যায়, তেমনি একজন মানুষের চেতনাকে কি প্রতিদিন ছিন্নভিন্ন করা যায় না? যখন তোমার সত্তা, তোমার অস্তিত্ব, তোমার নিজস্ব ভাবনাগুলোকে চারপাশের নোংরা রাজনীতি আর মানসিক চাপ দিয়ে পদদলিত করা হয়, সেটা তো আসলে চেতনারই ধর্ষণ। আর এই ধর্ষণে নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই। শরীরী ক্ষতের জন্য হাসপাতাল আছে, আইনের ধারা আছে। কিন্তু যখন আত্মা বা চেতনার রক্তক্ষরণ হয়, তার কোনো মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি হয় না।"
অনির্বাণ নিজের ডায়েরির পাতা ওল্টাতে লাগল। তার মনে পড়ে গেল তার নিজের ছোটবেলার কথা। বাবার প্রতিদিনের মাতলামি, মায়ের ওপর চালানো শব্দবাণ আর সেই বিষাক্ত দাম্পত্যের সাক্ষী হতে থাকা তার শৈশব। সে কি চায়নি চোখ দুটো বন্ধ করে রাখতে? কান দুটো চেপে ধরে পালিয়ে যেতে? অথচ সমাজ তাকে শিখিয়েছিল, পুরুষকে শক্ত হতে হয়, পুরুষ কাঁদে না। সেই না-কাঁদার আড়ালে তার পঞ্চেন্দ্রিয় কতবার যে বলি হয়েছে, তার কোনো নাম সে কোনোদিন দিতে পারেনি।
দেবব্রত নিজের ব্যাগ থেকে একটা পুরনো চামড়ায় বাঁধানো নোটবই বের করলেন। পাতা উল্টে একটা জায়গায় আঙুল রাখলেন। "গত রাতে যখন শহরের কোলাহল একটু থিতিয়ে এসেছিল, যখন মনে হচ্ছিল আমার ভেতরে কেউ একজন তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করছে, তখন এই কয়েকটা লাইন লিখেছিলাম।"
অনির্বাণ ঝুঁকে পড়ল নোটবইটির দিকে। দেবব্রত শান্ত অথচ কাঁপাকাঁপা গলায় কবিতাটি পড়ে শোনালেন :

অশ্লীল আয়না

চামড়ার গভীরে কোনোদিন হাত বাড়ায়নি যে ঘাতক,
সেও কি তবে নিষ্পাপ?
প্রতিদিন অলিন্দে ঢুকে পড়ে যে কর্কশ উচ্চারণ,
শব্দহীন আততায়ী হয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করে স্নায়ু,
সেই বধির কান তবে কার কাছে চাইবে সুবিচার?

চোখের তারায় জোর করে সেঁটে দেওয়া দৃশ্যের কঙ্কাল,
যেখানে আলো নেই, কেবল পচাগলা সমাজের থুতু—
আমার দর্শন তবে কার পায়ে সমর্পণ করব আজ?
তুমি যাকে বলো সংসার, আমি তাকে বলি দৃশ্যদূষণ,
তুমি যাকে বলো পৌরুষ, আমি তাকে বলি জমাট রক্তের খরা।

শরীর অমর নয়, সে তো ছাই হবে কাঠের আগুনে,
কিন্তু এই যে চেতনা, যার কোনো জন্ম-মৃত্যু নেই,
তাকে যে প্রতিদিন শয্যাশায়ী করে রেখে যায়
পারিবারিক ব্যঙ্গ আর নাগরিক হিংসার ধারালো নখ—
সেই ক্ষতচিহ্ন মুছবে কোন গঙ্গার জলে?

আমি পাথর হতে চেয়েছিলাম, অথচ মানুষ হয়ে রইলাম;
তাই প্রতিটা অসম্মতির আর্তনাদ
আমার আত্মাকে টুকরো টুকরো করে কেটে রেখে যায়।

কবিতাটি শেষ হওয়ার পর ঘরে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এল। বাইরে বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। কাঁচের ওপর জলের ফোঁটাগুলো সশব্দে আছড়ে পড়ে গড়িয়ে যাচ্ছে।
অনির্বাণ ধীরে ধীরে বলল, "আপনার কবিতাটা বুকের ভেতরটা ভারী করে দেয় দাদা। কিন্তু চেতনা যদি অমরই হয়, গীতা বা দর্শনে তো তাই বলা হয়েছে, তবে ইহজন্মে কি এই হিংস্রতা থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই? আমরা কি তবে সারা জীবন এই সামাজিক আর মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েই কাটিয়ে দেব?"
দেবব্রত একটু হাসলেন। সে হাসিতে কোনো ঔদ্ধত্য ছিল না, ছিল গভীর অভিজ্ঞতার প্রজ্ঞা। তিনি চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে বললেন, "চেতনা স্বয়ংপ্রকাশিত এবং অমর, এটা সত্য। কিন্তু আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো তো এই মর্ত্যের মাটির তৈরি। কান শোনে, চোখ দেখে, মন অনুভূতিকে গ্রহণ করে। বাইরের বিষবাষ্প যদি চেতনা অবধি পৌঁছাতে না দিতে চাও, তবে তোমাকে একটা অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করতে হবে।"
"কীসের প্রাচীর?" অনির্বাণ কৌতূহলী চোখে তাকাল।
"অনাসক্তির প্রাচীর। সচেতন প্রত্যাখ্যানের প্রাচীর," দেবব্রত বলতে লাগলেন। "সমাজ তোমাকে প্রতিনিয়ত এমন কিছু শোনাবে যা তোমার সত্তাকে অপমান করে। পরিবার তোমাকে এমন কিছু দেখাবে যা তোমার রুচিকে হত্যা করে। তখন তোমাকে চোখ আর কানের মাঝখানে এক ফিল্টার বসাতে হবে। বুদ্ধ যেমন বলেছিলেন — কেউ যদি তোমাকে কোনো উপহার দেয় আর তুমি যদি তা গ্রহণ না করো, তবে উপহারটি কার কাছে থাকবে? উত্তর হলো, যে দিয়েছিল তার কাছেই। ঠিক তেমনি, কেউ যখন কদর্য কথা ছুঁড়ে দেয়, বা কোনো নোংরা দৃশ্য দিয়ে তোমার চেতনাকে দলিত করতে চায়, তোমাকে সচেতনভাবে সেটা বর্জন করতে হবে। গ্রহণ না করাই হলো একমাত্র প্রতিরোধ।"
তিনি একটু থেমে আবার বললেন, "আর সবচেয়ে বড় প্রতিকার হলো স্ব-চেতনার জাগরণ। যখন তুমি জানবে তোমার ভেতরের 'আমি'টা এই শরীর বা সামাজিক পরিচিতির চেয়েও অনেক বড়, তখন বাইরের আঘাতগুলো আর গভীরে পৌঁছাতে পারবে না। একটা প্রদীপকে যেমন বাইরে থেকে কোনো বাতাস নেভাতে পারে না যদি তার চারপাশে একটা কাঁচের আবরণ থাকে, তেমনি আত্মজ্ঞান হলো সেই আবরণ। পুরুষ হোক বা নারী, নিজের আত্মমর্যাদাকে কোনো সামাজিক বা পারিবারিক অনুমোদনের ওপর নির্ভর করিয়ে রাখা যাবে না। নিজের ভেতরে একটা নিস্তব্ধ মন্দির তৈরি করতে হবে, যেখানে বাইরের কোনো চিৎকার পৌঁছাতে পারবে না।"
অনির্বাণ জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টি এবার কিছুটা ধীর হয়েছে। মেঘের ফাঁক গলে এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে ভিজে যাওয়া গাছের পাতার ওপর। পাতাগুলো যেন সদ্য স্নান সেরে উজ্জ্বল সবুজ হয়ে উঠেছে।
দেবব্রত ল্যাপটপটা আবার অন করলেন। তাঁর মুখে আর কোনো অস্থিরতা ছিল না। যে উত্তর তিনি খুঁজছিলেন, তা হয়তো পুরোপুরি মেলেনি, কিন্তু লড়াইয়ের পথটা অন্তত স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বুঝেছেন, পৃথিবী কখনোই নিখুঁত হবে না; শব্দের আর দৃশ্যের আগ্রাসন কখনোই থামবে না। কিন্তু নিজের আত্মাকে অপবিত্র হতে না দেওয়ার দায়িত্ব একান্তই নিজের।
নীরবতা ভেঙে দেবব্রত কিবোর্ডে আঙুল রাখলেন। অনির্বাণ নিজের জায়গায় ফিরে গেল। অফিসঘরের চেনা যান্ত্রিক শব্দের ভেতরেও তখন কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম শান্তির সুর বাজছিল — যা কোনো শরীরী বা মানসিক হিংসার স্পর্শের বহু ঊর্ধ্বে।

Address

Siliguri
734007

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when পাগলা দাশুর ডায়েরি থেকে posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category