20/06/2026
টাইম মেশিন
✍🏻প্রত্যুষা বিশ্বাস
দিয়ার রান্নাঘরের জানলা দিয়ে গার্লস স্কুলের গেট টা দেখা যায়।দুপুরের রান্নার ফাঁকে বারবার চোখ চলে যায় ওই দিকে। কতো মেয়েরা মা বাবা র হাত ধরে স্কুলে আসছে। ফুচকা ঝালমুড়ি বিক্রি হয় গেটের বাইরে ছুটির সময়। দিয়ার ও মনে পড়ে যায় সেই কমলীনী বালিকা বিদ্যালয়ের দিন গুলো।সে ও তো এমন ভাবেই বিনুনি দুলিয়ে স্কুল যেত বাবার হাত ধরে। অংক খুব ভালোবাসত দিয়া, পড়াশোনা তেও মোটমুটি ভালোই ছিল। কিন্তু সে সব আজ অতীত। এখন মেয়ের স্কুল বরের অফিস সংসার রান্না এই নিয়েই দিয়ার জগৎ। স্কুল কলেজের জীবন টা যেন মনে হয় আগের জন্মের কথা।
স্কুল অব্দি বেশ ভালো ভাবেই চলেছিল পড়াশোনা। কলেজে গিয়ে সব কেমন বদলে গেল। রেজাল্ট টা বিশেষ ভালো হল না,হয়তো নিজের দোষেই হয়নি। ফাঁকি দিয়ে নিজেই ফাঁকিতে পড়ে গেছে....রাতের জন্য চিকেন টা ম্যারিনেট করতে করতে এসব-ই ভাবছিল দিয়া। তারপর আর পড়াশুনা বিশেষ করা হয়নি আর আজকালকার দিনে চাকরি তো দূরস্ত। মধ্য মেধার দিয়ার বিয়ে হয়ে যায় কিছু দিন পরেই, আইটি কর্মী অমিতের সাথে।
কলেজ পাশ করে কিছুদিন সরকারি চাকরির জন্য পড়ছিল দিয়া, বিয়ের পরেও প্রস্তুতি চলছিল। তবে টুয়া জন্মানোর পর আর পড়াশুনার সময় সুযোগ কোনটাই হয়নি। আসলে সময়ের কাজ সময়ে না করলে পরে আর হয়ে ওঠে না। সংসারে যে দিয়া অসুখী তা নয়, তবে দিনের শেষে নিজেকে বড় ব্যর্থ লাগে। অমিত যখন সারাদিন অফিসে খেটে এসে বলে একা মানুষ আর পারছি না এতো খরচ সামলাতে। হয়তো দিয়া কে অসম্মান করতে বলে না তবু ওই একা মানুষ শব্দ দুটো কানে বড় বাজে।
দিয়ার এখন বড় আশার জায়গা ওর মেয়ে টুয়া। দিয়া নিজে যা পারেনি টুয়া যেন পারে সেদিকে কড়া নজর দেয়। মাঝে মাঝে হয়তো একটু বেশি ই কড়া হয়ে যায়। আসলে নিজে ফাঁকি দিয়ে কলেজের পর আর এগোতে পারেনি, পি এইচ ডি করার স্বপ্ন অধরা ই থেকে গেছে যা আর কখনই পূরণ হবে না,, তাই মেয়ে কে ফাঁকি দিতে দেখলে বড্ড রাগ হয় দিয়ার। কী করে বোঝায় যে ওর সব সময় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই স্কুল বা কলেজের দিনে। আবার নতুন করে সব শুরু করতে মন চায়। বারবার মনে হয় আর একটা সুযোগ পেলে খুব ভালো করে পড়াশুনা করতাম।কিন্তু সেই টাইম মেশিনটা যে এখন ও আবিষ্কার হয়নি।
ক্লাস সিক্সের টুয়া এসব বোঝে না। মায়ের সারাদিন পড়া পড়া শুনে বিরক্ত হয়। ভাবে বাবা ও তো পড়াশুনা করে ভালো চাকরি করে কই বাবা তো এতো খিটখিট করে না লেখা পড়া নিয়ে। মায়ের সব তাতেই বাড়াবাড়ি। একদিন তো মায়ের বকা খেয়ে টুয়া বলেই দিল' তুমি নিজে করতে পড়াশুনা? মাসীমণি তো চাকরি করে তুমি কেন পাওনি?' হ্যাঁ দিয়ার দিদি সরকারি স্কুলের দিদিমনি,কলেজ পাশ করেই এস এস সি দিয়ে চাকরি পেয়ে গেছে। কিন্তু এখন কী আর সেই দিন আছে, সেসব আর কিভাবে বোঝায় এতটুকু মেয়েকে।
সামনের স্কুলের মেয়ে গুলো কে দেখলে তাই বড্ড মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। সময় যে কী ভীষণ দামি সে কথা দিয়া নিজের জীবন দিয়ে বুঝছে।সময় একবার গেলে আর ফিরে পাওয়া যায় না। এই মেয়ে গুলোর কেউ হয়তো দশ বছর পর ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বা গবেষক হয়ে বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করবে আবার অনেকে দিয়ার মতোই সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে রান্নাঘরে দিন কাটাবে।
এসব ভাবতে ভাবতে বেল বেজে ওঠে। টুয়া ফিরেছে স্কুল থেকে। দিয়া দরজা খুলে দেখে মেয়ে ভীষণ খুশি। লাফিয়ে এসে মা কে জড়িয়ে ধরে। আজ টুয়ার স্কুলে তাৎক্ষণিক বক্তৃতার প্রতিযোগিতা হয়েছে, আর তাতে টুয়া প্রথম হয়েছে।প্রথমে তো টুয়া ভেবে ই পায়নি কী বলবে। তারপর নাকি ওর মায়ের বলা কথা গুলো মনে পড়ে।এই যে মা ওকে সব সময় বলে সময় খুব দামি। সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। এই বিষয়ে টুয়া বক্তৃতা দেয়। দিদিমনি রাও ওর খুব প্রশংসা করেছেন । এবার টুয়া বুঝেছে মা ঠিকই বলে। এবার থেকে আর ও একটুও সময় নষ্ট করবে না বলে মাকে প্রমিস করে। দিয়া মেয়ে কে দেখে হাসে আর ভাবে এভাবেই আমার জীবনের হারিয়ে যাওয়া সময় আর স্বপ্ন তোর মধ্যে দিয়েই ফিরে পাব।।