09/02/2026
একাকীত্বের সখ্যতা ~~~~
শহরের এক কোণে পুরনো এক অ্যাপার্টমেন্টের চারতলায় একা থাকে নীলাদ্রি। সাত বছর আগে চাকরির সূত্রে এই শহরে আসা, তারপর থেকে এই ঘরটাই তার সব। ঘরের এক কোণে রাখা একটা কাঠের টেবিল, কিছু পুরনো বই আর জানালার পাশে ঝুলে থাকা নীল পর্দা—এই নিয়ে নীলাদ্রির জীবন। নীলাদ্রি মানুষের সাথে মেশে না এমন নয়। অফিসে সে সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলে, বন্ধুদের আড্ডায় যোগ দেয়। কিন্তু ভিড়ের মাঝে থেকেও প্রায়ই তার মনে হয় সে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। এক সন্ধ্যায় ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সে দেখছিল নিচের ব্যস্ত রাস্তা। সবাই কোথাও না কোথাও ছুটে যাচ্ছে—কারও ঘরে ফেরার তাড়া, কেউ প্রিয়জনের হাত ধরে হাঁটছে। অথচ নীলাদ্রির কাছে এই "ফেরা" মানেই নিস্তব্ধ এক আকাশ।
মাঝে মাঝে এই একাকিত্ব অসহ্য হয়ে উঠত। রাতের বেলা যখন শহরের শব্দ থিতিয়ে আসত, তখন তার মনে হতো নিজের অস্তিত্বটাই যেন অর্থহীন। এই শূন্যতা কাটানোর জন্য সে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করত, অন্যের সুখী জীবনের ছবি দেখত। কিন্তু এতে তার নিঃসঙ্গতা কমত না, বরং আরও বাড়ত। সে বুঝতে পারল, সে আসলে একা থাকতে ভয় পায় না, বরং একা অবস্থায় নিজের চিন্তার মুখোমুখি হতে ভয় পায়।
একদিন হঠাৎ খুব ঝড়বৃষ্টি শুরু হলো। লোডশেডিংয়ের অন্ধকার ঘরে একা বসে নীলাদ্রি প্রথমে খুব অস্বস্তি বোধ করছিল। সে অনুভব করল যে দিনের পর দিন কারও সাথে মনের কথা না বলে থাকাটা তার সহনসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যখন সে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুরু করল, তখন অনুভব করল এক অদ্ভুত শান্তি। সে কোনো মোবাইল বা ল্যাপটপ না ছুঁয়ে নিজের মনের ডায়েরিটা খুলল। কয়েক বছর পর আবার কলম চলল তার। সে তার মনের জমানো সব হতাশা, ছোটবেলার স্বপ্ন আর বর্তমানের শূন্যতা কাগজের বুকে উজার করে দিল।
সেদিন থেকে নীলাদ্রির কাছে একাকিত্ব আর বোঝা হয়ে রইল না। সে শিখল যে, একা থাকা মানে সমাজচ্যুত হওয়া নয়, বরং নিজের সত্তাকে নতুন করে আবিষ্কার করা। সে বুঝতে পারল নির্জনতা (Solitude) মানুষের সৃজনশীলতা বাড়াতে পারে যদি আমরা তা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করি。 সে এখন একা কফি শপে যায়, পার্কের বেঞ্চে বসে বই পড়ে এবং সবচেয়ে বড় কথা—সে নিজের সঙ্গ উপভোগ করতে শিখেছে।
একাকিত্ব এখন তার কাছে কষ্টের কারাগার নয়, বরং এক সৃজনশীল নির্জনতা। সে জানে, মানুষের ভিড়ে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেয়ে নিজের নির্জনতায় নিজেকে চেনা অনেক বেশি জরুরি।