22/08/2026
আমিও এক মীরাকে চিনতাম
মীরাবাই আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগে বেঁচে ছিলেন। তিনি ছিলেন সাধিকা, কবি এবং গায়িকা। ইতিহাসের সেই মীরার সঙ্গে আমার কখনও দেখা হয়নি। দেখা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মীরার সঙ্গে পরিচয় তাঁর গানের মধ্যে, কখনও তাঁর জীবনকাহিনিতে, কখনও বা লোকমুখে প্রচলিত গল্পে।
তবে, আমিও এক মীরাকে চিনতাম। তিনি ছিলেন আমার মাসি।
কৈশোরের স্বপ্ন দেখার বয়সেই এক জমিদার পরিবারের বধূ হয়ে নতুন জীবনে পা রেখেছিলেন
যদিও আমার ছোটবেলার স্মৃতিতে তাঁকে সবসময়ই দেখেছি শ্রীরামপুরের একটি ছোট্ট বাড়িতে, স্বামীকে হারানোর পর একমাত্র ছেলে কানাইকে নিয়ে সংগ্রাম করে জীবন কাটাতে। কানাইদা আমার থেকে বছর দুই-তিনেকের বড় ছিল।
তাঁর জীবনও ছিল নানান পরীক্ষা ও প্রতিকূলতায় ভরা, অনেকটা মীরাবাইয়ের মতোই।
অল্প বয়সেই স্বামীকে হারিয়েছিলেন। একমাত্র ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে সামান্য রেলওয়ে পেনশনে জীবন চালাতে হয়েছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে, এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতায়, স্বামীকে হারিয়ে একা হাতে একটি সন্তানকে বড় করে তোলা কতটা কঠিন ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
স্বামীর মৃত্যুর পরে তিনি চাইলে বাবার বাড়ি, ভাইয়ের বাড়ি বা শ্বশুরবাড়ির আশ্রয়ে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি স্বাধীন জীবন বেছে নিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতার মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছে। স্বামীর বিশাল পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবুও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে কখনও সরে আসেননি।
মীরাবাইয়ের সঙ্গে তাঁর আরেকটি বিস্ময়কর মিল ছিল তাঁর সহজাত সংগীত প্রতিভা। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তালিম ছাড়াই তিনি অসাধারণ দক্ষতায় গান গাইতে পারতেন। শুধু তাই নয়, অসংখ্য গান ও তাদের কথা তাঁর নিখুঁতভাবে মনে থাকত, যা আমাকে সবসময়ই বিস্মিত করত।
শ্রীরামপুর ও আশপাশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তিনি ছিলেন এক সুপরিচিত মুখ। কোনো উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা লোকসংগীতের আসর হলে আয়োজকদের প্রথম দিকের পছন্দের মধ্যে তিনি থাকতেন। তাঁকে প্রায়শই আমন্ত্রণ জানানো হতো বাউল ও বাংলার লোকগান পরিবেশনের জন্য।
কিন্তু তাঁর শিল্পচর্চার সবচেয়ে অনন্য দিক ছিল, তিনি কখনও নিজেকে পেশাদার শিল্পী বলে মনে করতেন না। গান গাওয়ার জন্য কোনোদিন পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে দেখিনি। কেউ সাম্মানিক দিতে চাইলে তিনি মৃদু হেসে বলতেন,
"আমি তো ভগবানের জন্য গান গাই। সেই গান শুনে যদি কারও ভালো লাগে, বা কারও মনে আনন্দ জাগে, সেটাই আমার প্রাপ্তি। তার জন্য আবার অর্থ নেব কী করে?"
তাঁর কাছে গান ছিল না উপার্জনের মাধ্যম; ছিল ভক্তি, ছিল সাধনা। হয়তো সেই কারণেই তাঁর কণ্ঠে লোকগানের সুর কেবল সংগীত হয়ে থাকত না, তা যেন এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে রূপ নিত। মীরাবাই যেমন তাঁর ভক্তিকে গানের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন, আমার মাসিও তেমনি তাঁর গানকে ঈশ্বরের প্রতি নিবেদন হিসেবেই দেখতেন।
তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল তাঁর জীবনদর্শন। কোনোদিন তাঁকে ভাগ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে শুনিনি।
বলতেন, "সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সবই জগন্নাথদেবের আশীর্বাদ। তাঁর দানকে অভিযোগ করে ছোট করা যায় না।"
এই বিশ্বাসের গভীরতা অনুভব করেছিলাম তাঁর একমাত্র পুত্রের মৃত্যুর পর। একজন মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় শোকের সময়েও তিনি অন্যদের দেখভালে ব্যস্ত ছিলেন। আমরা দূর থেকে এসেছি বলে চা আর জলখাবারের ব্যবস্থা করছিলেন, যেন আমাদের কষ্টটাই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ছোটবেলার একটি ঘটনা মনে আছে। এখন তাঁর সেই সময়কার বয়সের কাছাকাছি এসে বুঝতে পারি, তিনি কত গভীর জীবনবোধ দিয়ে বিষয়টাকে দেখেছিলেন জীবনের এক গভীর শিক্ষা দিয়েছিলেন তাঁর সেই সহজ অথচ অসাধারণ ব্যবহারের মাধ্যমে।
একবার স্কুলে আমি এমন এক দুষ্টুমি করেছিলাম যে শিক্ষক আমাকে ক্লাসের বাইরে কান ধরে দাঁড় করিয়েছিলেন। বন্ধুরা হাসছিল, আর আমি অপমানে মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম। বাড়ি ফিরে ঠিক করেছিলাম, আর স্কুলেই যাব না।
ভয়ে বাবাকে কিছু বলতে পারিনি। তাই গেলাম মাসির কাছে।
আমি তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে স্কুলটা আমার আর ভালো লাগছে না, অন্য স্কুলে চলে যেতে চাই।
তিনি মন দিয়ে শুনলেন।
তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “তুই সবচেয়ে ভালো কী করতে পারিস?”
আমি বললাম, “খেলাধুলো।”
সেদিন তিনি আমার অপমান নিয়ে একটি কথাও বললেন না। বরং বললেন, যদি আমি সেই বছর “স্পোর্টস বয় অফ দ্য ইয়ার” হতে পারি, তাহলে তিনি বাবার সঙ্গে কথা বলে স্কুল বদলের ব্যাপারে ভাববেন।
সেই স্বপ্নটাই আমাকে গ্রাস করল।
পরের কয়েক সপ্তাহ আমি প্রতিটি খেলায় অংশ নিলাম, প্রাণপণ চেষ্টা করলাম। শেষ পর্যন্ত সত্যিই সেই পুরস্কার পেলাম।
কিন্তু তখন আর স্কুল বদলানোর ইচ্ছেই রইল না।
অনেক বছর পরে বুঝেছিলাম, তিনি আমার সমস্যাকে সরাসরি সমাধান করেননি। তিনি আমার দৃষ্টি অপমান থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন অর্জনের দিকে।
এটাই ছিল তাঁর জীবনদর্শন।
তিনি ছিলেন অন্তরে একজন বিদ্রোহী। কিন্তু তাঁর বিদ্রোহ ছিল নিঃশব্দ।
তিনি সমাজের সব নিয়ম মেনে নিতেন না। আবার চিৎকার করে প্রতিবাদও করতেন না। তিনি নীরবে নিজের পথ বেছে নিতেন এবং দৃঢ়তার সঙ্গে সেই পথেই চলতেন।
আমাদের বৃহত্তর পরিবারের পরিসরে তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রম, তাঁর জীবনযাপন, তাঁর বিশ্বাস, তাঁর সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে পরিবারের অনেকেই একমত ছিলেন না। একজন অল্পবয়সি মহিলার একা থাকা, নিজস্ব মত নিয়ে চলা, প্রকাশ্যে গান গাওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া, অথচ সেই শিল্পের জন্য কখনও অর্থ গ্রহণ না করা, এসবই অনেকের কাছে ছিল অস্বাভাবিক। ফলে তাঁকে নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, এমনকি কখনও কখনও কটাক্ষও চলত পরিবারের আড়ালে-আবডালে।
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, তিনি নিজেও খুব ভালো করেই জানতেন কে তাঁর সম্পর্কে কী ভাবেন। তবুও তাঁকে কখনও কাউকে এড়িয়ে চলতে দেখিনি, কাউকে অপমান করতে দেখিনি, কিংবা কারও প্রতি তিক্ত হতে দেখিনি।
বরং ঠিক উল্টো। বিপদের সময়, প্রয়োজনে, পরিবারের সকলের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতেন তিনিই। এমনকি যাঁরা তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে নিয়ে সমালোচনা করতেন, সমস্যার সময় তাঁরাও নির্দ্বিধায় তাঁর দ্বারস্থ হতেন। আর তিনি কখনও অতীতের হিসেব কষতেন না; সবার জন্য তাঁর দরজা, তাঁর সময় এবং তাঁর স্নেহ সমানভাবে খোলা থাকত।
বাউলরা বলে, ঈশ্বরকে খুঁজতে দূরে যেতে হয় না, মানুষের নিজের মধ্যেই তাঁর বাস। তারা কঠোর আচার-বিচার মানে না; তারা খোঁজে প্রেম, স্বাধীনতা আর অন্তরের মানুষকে। আশ্চর্যের বিষয়, আমার মাসি ছিলেন একজন অসাধারণ বাউল-সংগীত শিল্পী, অথচ তাঁর ব্যক্তিগত ভক্তি ছিল শ্রীরামপুরের জগন্নাথদেব এবং ঘরের বালগোপালের প্রতি।
অনেকে এটাকে বৈপরীত্য বলবেন।
তিনি বলতেন, “সত্য যেখানে পাই, সেখান থেকেই গ্রহণ করি।”
“আমার মনের মানুষ জগন্নাথদেব।”
সকালে জগন্নাথদেবকে ভোগ না দিয়ে তিনি নিজে একফোঁটা জলও মুখে তুলতেন না।
তবুও তিনি কখনও অন্যের উপর নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দেননি। বরং পরিবারের ছেলে-মেয়েদের স্বাধীনভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন।
তিনি বলতেন,
“পৃথিবী থেকে ভালোটা গ্রহণ করো। কিন্তু নিজেকে কোনও প্রতিষ্ঠানের কাছে সমর্পণ কোরো না। আমি মূর্তিপূজা করি, আবার বাউল গানও গাই। দুটোই আমার কাছে সত্য। আমার জগন্নাথই আমার মনের মানুষ।”
জীবন তাঁকে খুব কমই সুখ দিয়েছিল। অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়েছেন। পরে পঞ্চাশ পেরিয়ে হারিয়েছেন তাঁর একমাত্র ছেলে, কানাইকে।
এরপরও তিনি আরও প্রায় দশ বছর বেঁচে ছিলেন।
আশ্চর্যের বিষয়, তাঁকে খুব কমই শোক করতে দেখেছি। তিনি কানাইদার কথা এমনভাবে বলতেন, যেন মানুষটা এখনও পাশের ঘরেই আছে।
সেই শক্তি কোথা থেকে আসত?
হয়তো ভক্তি থেকে।
হয়তো সংগীত থেকে।
হয়তো সেই সহজ অথচ গভীর দর্শন থেকে, যা তাঁকে সারাজীবন পথ দেখিয়েছে।
তাই যখনই মীরাবাইয়ের কথা শুনি, আমার মাসির মুখটাই ভেসে ওঠে।
ইতিহাস এক মীরাকে চিনেছে।
আর আমি সৌভাগ্যবান,
আমিও এক মীরাকে চিনতাম।