28/04/2026
দমবন্ধ করা পরিস্থিতি মশাই, দু’দিকেই বিপদ; এই নিয়ে বাংলায় অনেক প্রবাদ প্রচলিত হয়েছে, তবে এই পোড়া গরমে সেই সব কাজে লাগবে কি না কেউ জানে না। মুশকিলটা কোথায় সেটা সবাই যে যার নিজের মতো করে একটা কিছু বলছে; তাদের মধ্যে যার দল ভারী, তারাই পরবর্তী পাঁচ বছর ধরে পিঠ চাপড়াবে—খেতে দিতেও পারে নাও দিতে পারে, ভালবাসতেও পারে আবার নাও বাসতে পারে।
আমরা পেন্ডুলাম ছিলাম, আছি, থাকব। আমাদের অরণ্য, আহা! আমাদের অরণ্য
চুরি হয়ে গেছে, নেই হয়ে গেছে। জীর্ণ মানুষ আরও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আসছে। নাহিদ ইসলামের মতো একটা ছাগলকে একজন লেনিনের সঙ্গে তুলনা করেছে! দেখলাম আজ।
ব্যক্তিগত আক্রোশ আর রাজনৈতিক যুক্তি দুটো এক বিষয় নয়—এই নিয়ে বিস্তারিত একটি ক্যাম্পেইন চালানো দরকার। ফ্যাসিস্টদের অত্যাচার চরমে পৌঁছেছে, ঘেউ ঘেউ করে এগিয়ে আসছে। আমরাই যারা মধ্যবিত্ত, সাংস্কৃতিকভাবে শূন্য, তারাই বাসি রুটি অথবা সস্তা বিস্কুট দিয়ে ডেকে আনছি। ইতিহাস থেকে আসলে আমরা কিছু শিখতে পারিনি, নাকি আমরা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের গল্প সবাইকে শোনাতে ব্যর্থ হয়েছি? হয়তো ভেবেছি এসব জেনে কী হবে, তার থেকে কোনও একটা লাইন বেছে নিয়ে ঢুকে পড়লেই হয়। তবে সেই সব লাইন আর বেশি দিন থাকবে না, আমাদের এবার ঢুকে পড়তে হবে গ্যাস চেম্বারে। কঙ্কালসার মানুষের চোখের ভেতর সেদিন আগুন ছিল। আমরা নিজেরাই নিজেদের শরীরে ক্ষত করে চলেছি। আজ সেই কঙ্কালসার মানুষেরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমাদের অবর্তমানে এই জায়গাগুলিতে যারা বসে-শুয়ে থাকবে, যারা প্রযুক্তিকে ঈশ্বর ভাববে, তাদের কানে বেজে উঠবে জয়গান। রিকশাওয়ালার পাশে ঘুমিয়ে থাকবে নেড়ি কুকুর; দুপুরের সাথে আমরাও গলে যাব, হড়পা বানে ভেসে যাবে আমাদের নন্দনতত্ত্ব। হয়তো সেখানে সাম্যবাদের কথা থাকবে, তবে নিশ্চিত করে বলা যায় আমরা থাকব কিনা।
আগের শতাব্দীতেও এরকম কিছু একটা ঘটেছিল ইউরোপে, আর এই শতাব্দীতে আমার দেশ ভারতবর্ষে। ‘থার্ড রাইখ’ জল্লাদের মতো খাঁড়া হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে, আমরা শুধু টুকটাক নিজেদের গর্দান এগিয়ে দেব। আত্মপরিচয়কে বলিষ্ঠ করার জন্য যে সহিংসতা, তাকেই তো তেল-জল দিয়ে লালন করছে বাঙালি। অথবা আমরা যারা রূপকথা থেকে ডিরেক্ট কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর ওপর লাফ দিয়েছি, আমরা হয়তো সেদিনও সংখ্যায় খুব কম ছিলাম। এখন আমরা সবাই একটা লাইন বেছে নিয়েছি, এর থেকে বেশি কিছু করতে পারিনি। লাইনের ছেলে তাই লাইনের মেয়ের হাত ধরেছি; লাইনের ধারে কয়লার উনুনে ভাত-আলুসেদ্ধ রান্না হচ্ছে, লাইন কাঁপিয়ে চলে যাচ্ছে দূরপাল্লার ট্রেন।
এই তো সেদিনও টালিগঞ্জ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, তার তলায়, ঠিক তার তলায় মানুষ থাকত। এই তো সেদিনও বিকেলবেলা মাঠে আমরা সবাই খেলতে যেতাম, এই তো সেদিনও ঘুড়ি কিনতাম, এই তো সেদিনও কারও বাড়িতে সুমনের ক্যাসেট দেখে চমকিত হতাম। এই তো সেদিনও ছোটমামা বেঁচে ছিল, এই তো সেদিনও টিভিতে মাত্র তিনটে চ্যানেল। আজ আমরা সবাই বেমানান। বানর দল উঠে আসছে, দুই দল শিম্পাঞ্জির মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলছে। উগান্ডাতে? শুধু উগান্ডাতে?
রহিত ঘোষাল
২৮/০৪/২৬